সূচীপত্র
ভূমিকা
প্রথম অধ্যায়: রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার শার’য়ী মর্যাদা ও প্রতিদান
প্রথম পরিচ্ছেদ: রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা পোষণের কারণ
ক. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি আল্লাহর ভালোবাসা
১. রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনের শপথ
২. রাসূলুল্লাহর (সা) উচ্ছ্বসিত প্রশংসা
৩. ওহীর অনুসরণ ও সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার ক্ষেত্রে প্রত্যয়ন
৪. রাসূলুল্লাহর (সা) সম্মানকে সমুন্নত করা
৫. রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে আওয়াজ নীচু করাকে তাকওয়া আখ্যা দেওয়া
৬. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি আল্লাহর রহমত ও কল্যাণ বর্ষণ করা
৭. আল্লাহ তা’আলার তাকে বন্ধু (খালীল) হিসেবে গ্রহণ
৮. রাসূলুল্লাহর (সা) শত্রুদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণের প্রস্তাব
খ. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন ঈমানের প্রধান শর্ত
গ. উম্মাতের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা) অসাধারণ করুণা
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার মাত্রা-পরিমাপ ও ফাযীলত
ক. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার পরিমাপ
১. নিজের জীবনের চেয়ে ‘রাসূলুল্লাহকে (সা) অধিক ভালোবাসা
২. পিতা-মাতা ও সন্তানের চেয়ে আল্লাহর রাসূলকে অধিক ভালোবাসা
৩. রাসূলুল্লাহকে (সা) পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ এবং সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসা
৪. রাসূলুল্লাহর (সা) চেয়ে অন্য কোনো বস্তু অধিক প্রিয় হলে তার প্রতি কঠোর হুঁসিয়ারী
৫. রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় তার প্রতি সাহাবীগণের ভালোবাসার নমুনা
খ. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি অসাধারণ সম্মান-মর্যাদা
১. মর্যাদার কারণে স্থির চোখে রসূলুল্লাহর দিকে না তাকানো
২. স্থির চিত্ত ও শরীরে রাসূলুল্লাহর (সা) কথা শোনা
৩. রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে অতি নীচু স্বরে কথা বলা
৪. রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে বিনয় ও সর্বোচ্চ আদব মিশ্রিত আচরণ
৫. রাসূলুল্লাহর (সা) বিছানা মুশরিক পিতার জন্য অপছন্দ করা
৬. রাসূলুল্লাহর (সা) সম্মানে পাথর, গাছ ও পাহাড়ের সাজদাহ ও সালাম প্রদান
৭. রাসূলুল্লাহর (সা) সাক্ষাত লাভে পাহাড়-পর্বতের আনন্দ প্রকাশ
গ. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার ফাযীলত ও সুফল
১. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা ঈমানের স্বাদ পাওয়ার উপায়
২. রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গে পরকালে সহাবস্থান করার সৌভাগ্য
৩. পাপের ক্ষমা এবং দুনিয়া ও আখিরাতের প্রয়োজন পূরণ
৪. দুনিয়া ও আখিরাতে নূর ও রহমত অর্জন করা
৫. নবী-রাসূল, সিদ্দীক ও শহীদগণের সঙ্গ লাভ
৬. কিয়ামাতের দিন সুপারিশ লাভ
৭. বান্দার প্রতি আল্লাহর দশবার রহমত বর্ষণ
৮. হাওয কাওসার থেকে পানি পানের সৌভাগ্য অর্জন
৯. স্বাচ্ছন্দ্য ও লাবন্যময় উজ্জ্বল বর্ণের চেহারা অর্জন
দ্বিতীয় অধ্যায়: রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন
প্রথম পরিচ্ছেদ: প্রথম নিদর্শন, রাসূলুল্লাহকে (সা) চেনা-জানা, তার প্রতি গভীর ঈমান আনা এবং তার সাক্ষাৎ ও সাহচর্য লাভের প্রবল আগ্রহ থাকা
ক. রাসূলুল্লাহকে (সা) চেনা ও জানা
খ. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ঈমান পোষণ করা এবং তার পেশকৃত সকল বিষয়কে
১. ইসরা ও মি’রাজের ঘটনা শোনামাত্র সত্য বলে স্বীকার করা
২. রাসূলুল্লাহর (সা) সম্মুখে কা’আব ইবন মালিকের সত্য উচ্চারণ
গ. রাসূলুল্লাহর (সা) সাক্ষাত ও তার সঙ্গ লাভের প্রবল আকাঙ্খা
১. সাহাবীগণের নিকট রাসূলুল্লাহর (সা) সাক্ষাত লাভ ছিল সর্বাধিক প্রিয় বস্তু
২. আল-আশ’আরী গোত্রের লোকদের রাসূলুল্লাহর (সা) দর্শন লাভের ব্যাকুলতা
৩. হিজরাতের সাথী হওয়ার সুসংবাদে আনন্দ-অশ্রু
৪. রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় আগমনের বার্তা শুনে আনসার সাহাবীগণের আনন্দ উৎসব
৫. জনৈক সাহাবীর জান্নাতে রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গী হওয়ার প্রার্থনা
৬. রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গ লাভ থেকে বিচ্ছেদের আশঙ্কায় আনসার সাহাবীগণের অস্থিরতা
৭. পরকালে রাসূলুল্লাহকে (সা) দেখা সম্ভব হবে না, বিরহের এমন আশঙ্কায় জনৈক সাহাবীর অস্থিরতা
৮. বৈষয়িক স্বার্থ অর্জনের পরিবর্তে আনসারগণের রাসূলুল্লাহকে (সা) গ্রহণ
৯. রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যুর সময় অতি নিকটবর্তী, এমনটা অনুভব করেই আবু বকরের কান্না
১০. রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যুর পর তার কথা স্মরণ হওয়ায় আবু বকরের কান্না
১১. সাওয়াদ ইবন গাযিয়্যাহর অন্তিম ইচ্ছা রাসূলের (সা) শরীরের সাথে নিজের শরীরের স্পর্শ লাগানো
১২. রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে আবু বকরের অতিশীঘ্র মিলিত হওয়ার প্রবল আকাঙ্খা
১৩. রাসূলুল্লাহর (সা) কবরের পাশে সমাধিস্থ হতে উমার ফারুকের প্রবল আকাঙ্খা
১৪. মৃত্যু পথযাত্রী বিলালের রাসূলুল্লাহর (সা) সাক্ষাত লাভের সুযোগ হচ্ছে মর্মে আনন্দ প্রকাশ
১৫. রাসুলুল্লাহর বিরহে খেজুর গাছের কাণ্ডের গুমরে গুমরে কান্না করা
১৬. রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যুর দিন মদীনা মুনাওয়ারা যেন অন্ধকারে নিমজ্জিত
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: দ্বিতীয় নিদর্শন, সকল সময় রাসূলুল্লাহর (সা) আলোচনা করা, তার জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং তার প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করা
১. রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে মিলিত হওয়ার আশা নিয়ে করুণাময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা
২. রাসূলুল্লাহ সকল সৃষ্টির জন্যই অনেক বড় কল্যাণ ও করুণা
৩. সকল সৃষ্টির প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা) বিশাল করুণা ও দয়া
৪. উম্মাতের হেদায়াত লাভের প্রবল আকাঙ্খা ও এ জন্য তার কষ্ট স্বীকার
– আবুবকর রাদি আল্লাহ ‘আনহু
– উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)
– আবু যার আল-গিফারী (রা)
– মুস’আব ইবন ‘উমাইর (রা)
– যিমাম ইবন সা’লাবাহ (রা)
– আত্-তুফাইল ইবন ‘আমর আদ্-দাওসী (রা)
দা’ওয়াত ইলাল্লাহর কাফেলার শাহাদাত বরণ
৫. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ
– রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণের ক্ষেত্রে সাহাবীগণের গুরুত্ব
– সালাত ও সালাম পাঠের ফাযীলত;
ক. সালাত ও সালাম রাসূলের (সা) কাছে পৌঁছে
খ. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত পাঠ করলে আল্লাহ তার প্রতিও আর বেশি সালাত পাঠায়
গ. কিয়ামাতের দিন রাসূলের (সা) সান্নিধ্য লাভ
ঘ. জুম’আর দিনে সালাত পাঠের ফাযীলত
ঙ. রাসূলের (সা) প্রতি সালাত পাঠের দরুণ দু’আ কবুল হয়
চ. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত প্রেরণ আল্লাহর রহমত ও শাফা’য়াত লাভের উপায়
ছ. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত পাঠের দরুণ দুঃখ-কষ্ট দূর হয় এবং গুনাহ মাফ হয় রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠের ক্ষেত্রসমূহ;
১. সালাতের শেষ তাশাহ্হুদ বা বৈঠকে
২. জানাযা সালাতের দ্বিতীয় তাকবীরের পর
৩. সকল প্রকারের খুৎখাতে
৪. আযানের জবাব দেবার পর
৫. দু’আর সময়
৬. মাসজিদে প্রবেশ ও মাসজিদ থেকে বের হওয়ার সময়
৭. সা’ঈ শুরুর পূর্বে সাফা ও মারওয়াতে
৮. রাসূলুল্লাহর (সা) নাম ও তার সম্পর্কে আলোচনার সময়
৯. দিনের শুরুতে ও দিনের শেষে সালাত পাঠ করা
১০. রাসূলুল্লাহর (সা) কবরের পাশে দাঁড়িয়ে
১১. দা’ওয়াতের কাজে, বাজার-ঘাটে বের হওয়ার সময়
১২. রাতের ঘুম থেকে উঠার পর
১৩. কুরআন তিলাওয়াতের সময়
১৪. দু’আয়ে কুনূত পাঠ করার পর
১৫. জুমু’আর দিন ও রাতে
১৬. ‘ঈদের সালাতের সময়
১৭. বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট এবং মাগফিরাত কামনার সময়
১৮. গুনাহ মাফের জন্য সালাত পাঠ করা
তৃতীয় পরিচ্ছেদ: তৃতীয় নিদর্শন, রাসূলুল্লাহর (সা) নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও পরিপূর্ণ অনুসরণ করা
১. আনসার সাহাবীদের রুকু অবস্থায় কা’বার দিকে মুখ ফেরানো
২. গৃহ পালিত গাধার গোশত হারাম হওয়া মাত্র গোশত ফেলে দেওয়া
৩. মদ হারাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত মদ ঢেলে ফেলা
৪. রাসূলুল্লাহর (সা) নিষেধাজ্ঞার কারণে সফরেও বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরা-ফেরা না করা
৫. নির্দেশ পালনে সাহাবীগণের তৎপরতা
৬. পার্থিব স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ও উপকারী বিষয়ও পরিত্যাগ করা
৭. নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে সাহাবীগণের রেশম ও সিল্ক ব্যবহার বর্জন
৮. রাসূলের (সা) প্রিয় বস্তুকেও সাহাবীগণের প্রিয় বস্তু হিসেবে গ্রহণ
৯. রাসূলের (সা) নির্দেশ কার্যকরী করার জন্য শত্রুদের সঙ্গে কৃতচুক্তি পূর্ণ করা
১০. স্বর্ণের আংটি ফেলে দেওয়া এবং পুনরায় তা আর গ্রহণ না করা
১১. রাসূলের (সা) নির্দেশ পাওয়া মাত্র পরিধেয় বস্ত্র পায়ের নলা পর্যন্ত পরিধান করা
১২. রাসূলুল্লাহকে (সা) সালাতের মধ্যে জুতা খুলতে দেখে সহাবীগণের জুতা খুলে ফেলা
১৩. রাসূলুল্লাহকে (সা) শিশুদের প্রতি সালাম দেওয়া দেখে সাহাবীদেরও সালাম দেওয়া
১৪. আল্লাহর নবীর সতর্কবাণী শোনা মাত্র জনৈক মহিলার পরিধেয় গহনা দান করে দেওয়া
১৫. রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশের অনুসরণ করতে গিয়ে প্রয়োজনেও পেছনে ফিরে না তাকানো
১৬. ‘বসে যাও’ এমন নির্দেশ শোনা মাত্রই সাহাবীগণের যে যেখানে ছিলেন সেখানেই বসে যাওয়া
১৭. ভীতিকর অবস্থায়ও রাসূলের (সা) নির্দেশ লঙ্ঘন হবে ভেবে সাহাবীগের স্থান ত্যাগ না করা
১৮. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিশ্রুতি পূরণে সাহাবীগণের নিঃসংকোচ উদ্যোগ
১৯. রাসূলুল্লাহর (সা) হাতের আংটি ফেলে দেওয়া দেখে সাহাবীগণের সঙ্গে সঙ্গে আংটি ফেলে দেওয়া
২০. রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ লংঘনের আশঙ্কায় স্ত্রীর প্রতি ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদের কঠোর সিদ্ধান্তের হুমকি
২১. রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ অনুযায়ী মহিলা সাহাবীগণের রাস্তার দেওয়ালের সঙ্গে মিশে দাঁড়ানো
চতুর্থ পরিচ্ছেদ: চতুর্থ নিদর্শন, রাসূলুল্লাহর (সা) উদ্দেশ্যে জীবন ও সম্পদ ব্যয় করার জন্য পূর্ণ প্রস্তুত থাকা
১. রাসূলুল্লাহকে (সা) কাফিরদের নির্যাতন থেকে মুক্ত করতে আবু বকরের জীবনের ঝুঁকি গ্রহণ
২. রাসূলুল্লাহর (সা) জীবন নাশের ভয়ে আবু বকরের কান্না
৩. রাসূলুল্লাহকে (সা) রক্ষা করা এবং তার পক্ষে প্রতিরোধ করার প্রবল আকাঙ্খা পোষণ
৪. যুদ্ধের ময়দানসহ সর্বত্র সাহাবীগণের সর্বদা রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে থাকার অঙ্গিকার
৫. রাসূলের (সা) সাথে অসদাচরণ করার কারণে নিষ্ঠাবান পুত্র কর্তৃক মুনাফিক পিতার প্রতি অস্ত্র ধারণ
৬. সাহাবীগণের কবিতার অস্ত্র দিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলা
৭. রাসূলুল্লাহর (সা) জীবন রক্ষার জন্য ১১ জন আনসার সাহাবীর সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার
৮. আবু তালহার নিজের শরীরকে রাসূলুল্লাহর (সা) শরীরে সামনে ঢাল হিসেবে পেশ করা
৯. রাসূলুল্লাহকে (সা) রক্ষার নিমিত্তে আবু দাজানাহর নিজের দেহকে ঢাল হিসেবে পেশ করা
১০. রাসূলুল্লাহর (সা) খুনের প্রতিশোধ গ্রহণে সাহাবীগণের অঙ্গিকার
১১. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিরক্ষায় উহুদের যুদ্ধে মহিলা সাহাবীর জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ
১২. রাসূলুল্লাহর (সা) জন্য প্রচণ্ড আহত হয়ে তার পায়ের উপর মাথা রেখে জনৈক আনসার সাহাবীর মৃত্যু বরণ
১৩. সা’দ ইবনুর রাবী’ মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করা অবস্থায়ও রাসূলুল্লাহর (সা) নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত
১৪. জনৈক সাহাবী নিজেই ইসলাম কাবূল করে রাসূলুল্লাহর (সা) সাহায্যে যুদ্ধের ময়দানে শাহাদাত বরণ
১৫. রাসূলুল্লাহ যেন তার যানবাহন থেকে পড়ে না যান এ কারণে আবু কাতাদার সারারাত তার সঙ্গে পথ চলা
১৬. মহিলা সাহাবীদেরও যুদ্ধের ময়দানে ত্যাগের নমুনা স্থাপন
১৭. যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে আসা মুজাহিদগণকে মহিলা সাহাবীর তিরস্কার করা
পঞ্চম পরিচ্ছেদ : পঞ্চম নিদর্শন
রাসূলুল্লাহর (সা) উপস্থাপিত দ্বীন-শরী’য়াত ও সুন্নাতের সাহায্য, সংরক্ষণ এবং প্রতিরোধ করা
১. আল্লাহর দ্বীন ও রাসূলুল্লাহ সুন্নাতের (জীবনাদর্শ) বিজয় ও রক্ষায় ‘উমাইর ইবনুল হাম্মামের আত্মত্যাগ
২. রাসূলুল্লাহর (সা) দ্বীন, তার সুন্নাতের সুরক্ষা এবং তার শত্রুদেরকে প্রতিরোধ করতে দুই কিশোর যুবক সাহাবীর যুদ্ধে অংশগ্রহণ
৩. আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা এবং রাসূলের (সা) আদর্শেকে সমুন্নত করার অভিপ্রায়ে খোঁড়া সাহাবীর যুদ্ধে অংশগ্রহণ
৪. মুস’আব ইবন ‘উমাইরের জীবন দিয়ে রাসূলুল্লাহ প্রদত্ত ইসলাম রক্ষার জাতীয় পতাকা সমুন্নত রাখার চেষ্টা
৫. জিহাদের ডাকে সাড়া দিয়ে নব বিবাহিতা স্ত্রীর আলিঙ্গন থেকে যুদ্ধের ময়দানে অতঃপর শাহাদাত বরণ
৬. আনাস ইবনুন নাযরসহ কতিপয় সাহাবীর আল্লাহর পথে জীবন দেওয়ার আহ্বান এবং নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করে দেওয়া
৭. দ্বীনের দা’ওয়াত পৌছানো, রাসূলুল্লাহর (সা) শারী’য়াতের সংরক্ষণ এবং দ্বীনকে বিজয়ী করার নির্দেশ পালনের মাধ্যমে হয় শাহাদাত কিংবা বিজয় অর্জনের সুদৃঢ় অঙ্গিকার
৮. দ্বীন ইসলামের দা’ওয়াতের কাজে জীবন উৎসর্গ করার সময় হারাম ইবন মিলহানের আনন্দ প্রকাশ
৯. রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যু পরবর্তী মদীনার কঠিন পরিস্থিতি সত্বেও খালীফা আবু বকর সিদ্দীক কর্তৃক উসামাহ ইবন যায়েদের বাহিনীকে অভিযানে প্রেরণ
১০. কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ‘আরবের মুরতাদ ও যাকাত দিতে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে আবু বকরের সামরিক অভিযান
১১. শত্রুপক্ষের বাগান বাড়ির দরজা ভিতর থেকে খুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও আল বারা ইবন মালিকের দেওয়াল টপকানোর অনুমতি প্রার্থনা
১২. ইয়ারমুক যুদ্ধে ৪০০ মুসলিম বাহিনী কর্তৃক জীবন দিয়ে দেওয়ার জন্য বাই’য়াত গ্রহণ
১৩. মুসলিম বাহিনীর শত্রুপক্ষের দূর্গের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আয-যুবাইর কর্তৃক বিশাল দূর্গের চূড়ায় আরোহণ
১৪. নু’মান ইবন মুকাররিনের শাহাদাতের বিনিময়ে মুসলিমদের বিজয় লাভের প্রার্থনা
১৫. ইসলাম ও দ্বীনে হকের বিজয়ের পথে মুসলিমদের জীবন উৎসর্গ করার প্রবল আকাঙ্খা
তৃতীয় অধ্যায়: রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি বৈরীভাব ও অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ
১. গোপনে ও প্রকাশ্যে হাদীস ও সুন্নাহ থেকে দূরে অবস্থান করা
২. সহীহ হাদীস প্রত্যাখ্যান করা
৩. রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনী ও নীতি-আদর্শ বিষয়ে আলোচনার সময়ে সম্মানবোধ ও গুরুগাম্ভির্য ভাব না থাকা
৪. রাসূলুল্লাহর (সা) বৈশিষ্ট ও তার মু’জিযাহ সমূহ সম্পর্কে জ্ঞান না রাখা
৫. দ্বীনের মধ্যে বিদ’আত সৃষ্টি করা
৬. রাসূলুল্লাহর (সা) ব্যাপারে অতিরঞ্জন ধ্যান-ধারণা করা
৭. রাসূলুল্লাহর (সা) এর প্রতি সালাত পাঠানো পরিত্যাগ করা
৮. সাহাবায়ে কিরামগণের মান মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা
চতুর্থ অধ্যায়: রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টির উপায়
১. আল্লাহ তা’আলার প্রতি গভীর ভালোবাসা
২. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা, তার কথা ও নির্দেশসমূহকে সকল কিছুর উপর প্রাধান্য দেওয়া
৩. সাহাবায়ে কিরামদের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব পোষণ করা
৪. আহল বাইত বা রাসূলুল্লাহর (সা) পরিবার ও বংশের মানুষদেরকে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সর্বাধিক সম্মান দেওয়া
৫. আস্-সুন্নাহ, হাদীস, আ-সার এবং ওহীর প্রমাণাদিকে কথা, কাজ ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে সম্মান জানানো ও প্রাধান্য দেওয়া
৬. সাধারণভাবে হাদীস-সুন্নাহ অনযায়ী জীবনযাপনকারী ও বাস্তবায়নকারীদের সম্মান ও শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখা
৭. রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনী ও সীরাতগ্রন্থগুলো বেশি বেশি অধ্যয়ন করা
৮. রাসূলুল্লাহর (সা) সকল প্রকারের দুশমনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা
৯. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সর্বাবস্থায় সম্মান প্রদর্শন করা মান্য করা
১০. রাসূলুল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখা ও নিষেধাবলির প্রতি মনে গভীর সম্মানবোধ লালন করা
ভূমিকা
বিশ্ব জগতের একমাত্র মহান প্রতিপালক ও মহাব্যবস্থাপক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সকল স্তুতি ও প্রশংসা। সর্ব যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্ব জগতের করুণার মূর্ত প্রতীক, মানবতার মহান শিক্ষক ও পথ প্রদর্শক, যুগে যুগে স্থানে স্থানে আসা নবী ও রাসূলগণ (আ) এর ধারাবাহিকতার সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ (সা) এর উপর, তাঁর সম্মানিত পরিবার-পরিজন, বংশধর, সঙ্গী-সাথীগণ এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর একনিষ্ঠ অনুসারীদের উপর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক।
আল্লাহ তা’আলা বিশেষ অনুগ্রহ করে মানব জাতির ইহকালীন কল্যাণ, সুখ-শান্তি, নিরাপত্তা ও পরকালীন স্থায়ী মুক্তি, মহান রবের সর্বোচ্চ পুরস্কার ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভে ধৈন্য হওয়ার জন্য তাঁর পক্ষ থেকে জীবন বিধান হিসেবে হেদায়াত, ও সত্য দ্বীন ইসলাম দিয়েছেন। যারা ইসলামের বিধান অনুসরণ করবে তাদের চিন্তা ও ভয়ের কোনো কারণ থাকবে না। তাঁর দ্বীনের প্রচার, প্রসার, প্রতিষ্ঠা, বাস্তব শিক্ষা ও হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দেবার জন্য মানব জাতির মধ্য থেকেই তাঁর বিশেষ নির্বাচিত মানুষদেরকে যুগে যুগে স্থানে স্থানে সকল জাতির কাছে নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় মহান রাব্বুল ‘আলামীন তাঁর প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদ (সা) কে মানব ইতিহাসের শেষ যুগের সকল মানুষের কাছে সর্বশেষ নবী ও রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তাঁর মাধ্যমেই দ্বীন ইসলামকে মানুষের জন্য একমাত্র দ্বীন ও জীবন বিধানকে পূর্ণ করে দিয়েছেন। মনুষের পরিপূর্ণ এ জীবন বিধান একমাত্র ইসলামকেই সকল মানুষের দ্বীন ও বিধান হিসেবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন ও বিধান মহান আল্লাহর কাছে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। রাসূলুল্লাহ (সা) সকল মানুষের প্রতি রাসূল হিসেবে প্রেরীত হয়েছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
{قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا}
“আপনি বলুন! হে মানুষ! নিশ্চয় আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল।”[সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ১৫৮]
করুণাময় আল্লাহ আরও বলেন,
{ وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَايَعْلَمُونَ }
“আর আমরা তো আপনাকে সমগ্র মানুষের জন্যই সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” [সূরা সাবা, আয়াত: ২৮]
সহীহ হাদীসেও এ বিষয়ে তার ঘোষণা এসেছে। আবু দারদা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ، إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا
আমি বললাম, হে মানবমন্ডলী! আমি তোমাদের সকল মানুষের জন্য আল্লাহর রাসূল (আল বুখারী, মুহাম্মাদ বিন ইসমাঈল, সহীহুল বুখারী, সম্পাদনা, মুহাম্মদ যুহাইর আল-নাসির, দারু তাওকিন নাআত, ১ম সংস্করণ, ১৪২২ হি, ৬/৬০, নং ৪৬৪০, বাব
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ ا إِلَيْكُمْ جَمِيعًا।
আল-কুরআন ও সহীহ হাদীসের বক্তব্য থেকে স্পষ্টতঃই প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহর (সা) নবুওয়াত ও রিসালাত প্রাপ্তি বিগত নবীগণ (আ) এর মতো কোনো বিশেষ জাতি কিংবা বিশেষ এলাকা বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বরং সমগ্র বিশ্ব মানবের জন্য। বিশ্বের বর্তমান ও ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য কিয়ামতকাল পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত। তিনি সকল নবী ও রাসূলগণের শেষ নবী ও রাসূল। তার পর আর কোনো নতুন নবী ও রাসূলের (সা) আবির্ভাব হবে না এবং আগমনের কোনো প্রয়েজনীয়তাও অবশিষ্ট থাকে না ( হাফিয ইবন কাসীর, আবুল ফিদা ইসমা’ঈল ইবন ‘উমার, তাফসীরুল কুরআনিল ‘আযীম, (তাফসীর ইবন কাসীর), সম্পাদনা, সামী ইবন মুহাম্মাদ সালামাহ, রিয়াদ, প্রকাশক, দার তাইয়্যেবাহ, ২য় সংস্করণ, ১৪২০ হি. ৩/৪৮৯)।
ইসলামকে দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করার জন্য মৌলিক শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ঈমানের ছয়টি আরকান বা মৌলিক বিষয়ের প্রতি ঈমান পোষণ করা, যেমন, আল্লাহর প্রতি তাঁর ফেরেশতা, কিতাবসমূহ, নবীগণ, পরকাল ও তকদীরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। সকল নবী রাসূলের (সা) প্রতি সাধারণভাবে আর মুহাম্মাদ (সা) এর প্রতি বিশেষভাবে ঈমান পোষণ করতে হবে। একইভাবে ইসলামের পাঁচটি আরকান বা মৌলিক বিষয়, যথা; শাহাদাহ, সালাত কায়েম, যাকাত আদায়, রামাদানের সিয়াম এবং বাইতুল্লাহর হাজ্জ, এগুলোর মধ্যে প্রথম শাহাদাহ, অর্থাৎ একথার সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য মা’বুদ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দেওয়া যে মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর বান্দাহ ও রাসূল। ঈমান ও ইসলামের জন্য রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ঈমান পোষণ। তার প্রতি ঈমান ও তার রিসালাতের প্রতি সাক্ষ্য দেওয়া ছাড়া কোনো মানুষই মুসলিম হতে পারবে না, ইসলামে প্রবেশ করতে পারে না। তাই রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ঈমান পোষণ করাকে ঈমানের অপরিহার্য শর্ত করা হয়েছে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ ثُمَّ يَرْتَابُوا }
‘নিশ্চয় মু’মিন তারাই, যারা আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ঈমান পোষণ করেছে। অতঃপর কোনো প্রকার সন্দেহ সংশয়ে পতিত হয়নি’। [সূরা আল হুজরাত, আয়াত: ১৫]
মহান আল্লাহ জাল্লা জালালুহু বলেন,
آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَأَنْفِقُوا مِمَّا جَعَلَكُمْ مُسْتَخْلَفِينَ فِيهِ
‘তোমরা আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ঈমন আন আর তিনি তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন তা থেকে ব্যয় কর’, [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ৭]
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَا يَسْمَعُ بِي أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ يَهُودِيُّ، وَلَا نصْرَانِي، ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ، إِلَّا كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ
ঐ সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের জীবন! এই উম্মাতের যে কোনো ব্যক্তি; হোক সে ইয়াহুদী এবং খ্রিষ্টান, আমার (আগমন) সম্পর্কে শুনবে, অতঃপর সে এমন অবস্থায় মারা যায় যে, আমি যে রিসালাতসহ প্রেরীত হয়েছি, তার উপর সে ঈমান পোষণ করেনি, তবে সে অবশ্যই জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত’ ( ইমাম মুসলিম, মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আল-কুশাইরী, সহীহ মুসলিম, সম্পাদনা, মুহাম্মাদ ফুয়াদ ‘আব্দুল বাকী, বৈরুত, দার ইহইয়াতিত তুরাসিল ‘আরাবী, তা.বি, ১/১৩৪, নং ১৫৩।)
রাসূলল্লাল্লাহ (সা)ও আল্লাহর রাসূল হিসেবে তাকে সাক্ষ্য প্রদানকে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন
بني الإسلامُ عَلى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلا اللَّهَ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاةِ، وَإِبْنَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ وَصَوْمِ رَمَضَانَ”.
‘পাঁচটি স্তম্ভের উপর ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা।
(১) এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো মা’বুদ নেই আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল,
(২) সালাত কায়েম করা,
(৩) যাকাত আদয়া করা,
(৪) হাজ্জ করা এবং
(৫) রমযানের রোযা রাখা'( আল বুখারী, মুহাম্মাদ বিন ইসমাঈল, সহীহুল বুখারী, কিতাবুল ঈমান, সম্পাদনা, ড. মোস্তফা যীব আল-বাগা, বৈরুতঃ দার ইবনি কাছীর, ২য় সংস্করণঃ ১৯৮৭, ১/১২, নং ৮. কিতাবুল ঈমান, ইমাম মুসলিম, মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ, সহীহ মুসলিম, সম্পাদনা, মুহাম্মাদ ফুয়াদ আব্দুল বাকী, বৈরুত, দার ইহইয়াইত তুরাছিল ‘আরাবী, ১/৪৫, নং ১৬, বাবু আরকানিল ইসলাম।)
সুতরাং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ঈমান পোষণ করা, তাঁকে সত্য বলে স্বীকার করা, তিনি প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য, দৃশ্য ও অদৃশ্য, যা সম্পর্কে অবহিত করেছেন, তার সত্যায়ন করা ঈমানের বিশুদ্ধতার জন্য অপরিহার্য। আল্লাহর রাসূল হিসেবে তাকে সাক্ষ্য দেওয়া, তার আনুগত্য করা, অনুসরণ করা, তাকে ভালোবাসা, তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা, মু’মিন ও মুসলিম ব্যক্তিদের জন্য অত্যাবশ্যক বিষয়, যা কোনো অবস্থায়ই লঙ্ঘন করার সুযোগ নেই।
তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য, সুউচ্চ গুণাবলি এবং উন্নত নৈতিকতা ও চরিত্র মাধুর্য দিয়ে ভূষিত করেছেন। তার নাম করণ করেছেন ‘মুহাম্মাদ’, যার অর্থ প্রশংসিত ব্যক্তি(ইবনুল কাইয়্যেম, জালাউল আফহাম ফী ফাফলিস সালাতি ওয়াস সালাম ‘আলা খাইরিল আনাম, দারু ইবন কাছীর, ১৯৮৮ ঈ, পৃঃ ৪৯)।
কেননা তিনি (সা) মহাপবিত্র ও সম্মানিত আল্লাহর নিকট, ফেরেশতাদের নিকট, নবী ও রাসূলগণ ‘আলাইহিমুস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম এর নিকট এবং সকল দুনিয়াবাসীর নিকট প্রশংসিত ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিগত ভাবে কোনো কোনো মানুষ তাঁর রিসালাত ও আদর্শকে অস্বীকার করলেও তাঁর নৈতিক গুণাবলি, চরিত্র-মাধুর্য সকল জ্ঞানী গুণীর নিকট সমাদৃত ও প্রশংসিত। তিনি মানব গোষ্ঠীর অনুপম নেতা। তিনি একক ভাবে এমন কতিপয় বৈশিষ্টের অধিকারী, যেগুলো অন্য কোনো সৃষ্টির মধ্যে অনুপস্থিত। তাই তিনি নিজেই নিজের বৈশিষ্টের ঘোষণা দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
أنا سيدُ وَلَدِ آدَمَ يَومَ القِيامَةِ، وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُ عَنْهُ الْقَبرُ، وَأَوَّلُ شَافِعِ ، وَأَوَّلُ مُشفع
আমি কিয়ামাতের দিনে আদম সন্তানের নেতা। আমিই সর্ব প্রথম, যা থেকে কবর ফাঁক হয়ে যাবে (আমি প্রথম উঠব)। আমি প্রথম সুপারিশকারী এবং সর্ব প্রথম আমার সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে (ইমাম মুসলিম, সহীহ মুসলিম, ৪/১৭৮২, নং ২২৭৮, কিতাবুল ফাযায়িল)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানব রচিত মতবাদ, জাহিলিয়াত, শিরক, ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত মানবতাকে তাঁর মাধ্যমে উদ্ধার করেছেন। মানবতার মহান এই মুক্তিদূত ঘোর অমানিশার যবনিকা ছিন্ন করে মানবজাতির সম্মুখে আলোর মশাল জ্বালিয়েছেন। মানব জাতিকে পরিশুদ্ধ করেছেন, পরিমার্জিত করেছেন। তাই তিনি সকল মানুষের অবিসংবাদিত ইমাম ও নেতা। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ) বলেন,
هو الإمام المطلق في الهُدَى الأَوَّلِ بَنِي آدَمَ وَآخِرِهِمْ
তিনি প্রথম ও শেষ সকল আদম সন্তানের হেদায়াত ও পথ প্রদর্শনের একক ইমাম ও নেতা ( ইবনু তাইমিয়া, মাজমু’উল ফাতাওয়া, রিয়াদ, দার ‘আলামিল কুতুব, ১৪১২ হিঃ ১৯৯১৮, ১০/৭২৭)।
তিনি সৃষ্টির সেরা, সর্বত্তোম গুণের অধিকারী, সর্বাধিক আস্থাভাজন, অসাধারণ সত্যভাষী, সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল, ধৈর্যশীল, অতিশয় সহিষ্ণু এবং সৃষ্টির সেরা ক্ষমাশীল ও মার্জনা সম্পন্ন মানুষ। তাঁর অনুপম গুণাবলির বর্ণনা পূর্বের ঐশী গ্রন্থেও উল্লেখিত হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমর ইবনিল ‘আস (রা) থেকে তাওরাতে রাসূলুল্লাহর (সা) অসাধারণ গুণাবলির বর্ণনা তুলে ধরেছেন। এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমর (রা) বলেন,
وَاللَّهِ إِنَّهُ لَمَوْصُوفٌ فِي التَّوْرَاةِ بِبَعْضِ صِفْتِهِ فِي الْقُرْآنِ {يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا وَحِزْرًا لِلْأُمِّيِّينَ أَنْتَ عَبْدِي وَرَسُولِي سَميتُكَ الْمُتَوَكَّلَ لَيْسَ بِفظ وَلا غَلِيظٌ وَلا سَحاب في الأسواق وَلَا يَدْفَعُ بِالسَّيِّئَةِ السَّيِّئَة ولكن يَعْفُو وَيَغْفِرُ وَلَنْ يَقْبِضَهُ اللهُ حَتَّى يُقِيِّمَ بِه
الْمِلَّةَ الْعَوْجَاءَ بِأَنْ يَقُولُوا لَا إِلَهَ إِلا الله وَيَفْتَحَ بِمَا أَعْيُنَا عَمْيَا وَآذَانًا صَمَّا وَقُلُوبًا غُلْمًا
“আল্লাহর শপথ! কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে তাঁর (সা) সম্পর্কে যে সব গুণাবলির বর্ণনা এসেছে, তাওরাতেও সেসব গুণাবলি দ্বারা তাঁকে বিশেষায়িত করা হয়েছে, আয়াতটি হলো:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا
হে নবী! নিশ্চয় আমি আপনাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও ভীতিস্থাপনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি।” [সূরা আল আহযাব, আয়াত: ৪৫]
তাছাড়াও তিনি অশিক্ষিতদের সংরক্ষণকারী। আপনি আমার বান্দা এবং রাসূল। আপনার নাম দিয়েছি আল-মু’তাওয়াক্কিল। তিনি রুঢ় ও কঠোর আচরণকারী নন। হাট-বাজারে হৈ-হাঙ্গামাকারী নন। তিনি মন্দকে মন্দ দিয়ে মোকাবেলা করেন না। বরং তিনি মার্জনা করেন ও ক্ষমা করেন। আল্লাহ لَا إِلَهَ إِلَّا الله অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো মা’বুদ নেই, এ ঘোষণার মাধ্যমে পথচ্যুত জাতিকে তার দ্বারা সঠিক পথে ফিরিয়ে না আনা, এবং কালিমায়ে তাওহীদ বা একত্ববাদের ঘোষণার মাধ্যমে অন্ধদের চোখ, বধিরদের শ্রবণশক্তি এবং তালাবদ্ধ অন্তরগুলোকে খুলে না দেওয়া পর্যন্ত তার মৃত্যুর ফয়সালা করবেন না (সহীহুল বুখারী, ২/৭৪৭, নং ২০১৮)।
রাসূলুল্লাহর (সা) দৈহিক গঠন, আকৃতি, প্রকৃতি, আদত অভ্যাস, আচার-আচরণ, নীতি-নৈতিকতা, উন্নত গুণাবলি, অনন্য ও অনুপম চরিত্র-মাধুর্যের প্রতি গুরুত্ব দিয়েই হাদীস গ্রন্থগুলো, বিশেষ করে সাহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিমসহ সুনান গ্রন্থগুলোতে পৃথক অধ্যায় রচনা করা হয়েছে। যা ‘শামায়েল’ নামে হাদীসের জগতে পরিচিত। তাছাড়াও যুগে যুগে, কালে কালে, স্থানে স্থানে অনেক ইতিহাসবিদ, সীরাত বিশেষজ্ঞ, লেখক, গবেষক ও বিজ্ঞ মুসলিম ও অমুসলিম মনিষীগণ এ মহামানবকে নিয়ে স্বতন্ত্র বই পুস্তক ও গ্রন্থাদি রচনা করেছেন যেমনঃ
(تفضيل الرسول للعز بن عبد السلام، والخصائص الكبرى للسيوط شمائل النبي صلى الله عليه وسلم للترمذي، وسبل الهدى والرشاد، .. للصالحي، وغاية السول في خصائص الرسول لابن الملقن، وبداية السول في)
মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল (সা) এর প্রতি কেমন ঈমান পোষণ করতে হবে, তার উত্তম নমুনা ও দৃষ্টান্ত হচ্ছেন, সেসব সাহাবীগণ (রা), যাদেরকে মহান কৃপাময় আল্লাহ তাঁর রাসূলের (সা) সঙ্গী-সাথী হওয়ার জন্য পছন্দ করেছেন ও নির্বাচন করেছেন। তাদের মতো
ঈমান আনার জন্য মুনাফিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ قَالُوا أَنُؤْمِنُ كَمَا آمَنَ السُّفَهَاءُ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ السُّفَهَاءُ وَلَكِنْ لَا يَعْلَمُونَ }
আর যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা ঈমান আন যেমন লোকেরা ঈমান এনেছে। তারা বলে, নির্বোধ লোকেরা যেরূপ ঈমান এনেছে আমরাও কি সেরূপ ঈমান আনবো? সাবধান! নিশ্চয় এরাই নির্বোধ, কিন্তু তারা তা জানে না।”[সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৩]।
এখানে মুনাফিকদেরকে সম্বোধন করে লোকেরা যেমন ঈমান এনেছে, তেমন ঈমান আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর ‘আন্-নাস’ বলে সাহাবীগণকে বোঝানো হয়েছে। কেননা কুরআন নাজিলের সময় তারাই ঈমান এনেছিলেন। আর আল্লাহ তা’আলার কাছে সাহাবীগণের ঈমানের অনুরূপ ঈমানই গ্রহণযোগ্য। তাই সাহাবীগণের সমষ্টিগত ঈমানই ঈমানের সঠিক মানদণ্ড। সাহাবীগণের ঈমানের মূলনীতি ছিল আরকানুল ঈমান, জান্নাত ও জাহান্নাম সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) এর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ( আল- কুরতুবী, আল জামি’ লিআহকামিল কুরআন (তাফসীরুল কুরতুবী), সম্পাদনা, আহমাদ আল-বারদুনী ও তার সঙ্গী, কায়রো, প্রকাশক, দারুল কুতুবিল মিশরিয়্যাহ, ২য় সংস্করণ, ১৩৮৪ হি. ১/২০৫, তাফসীর ইবন কাসীর ১/৯২)।
ঈমানের অপরিহার্য দু’টি উপাদন হলো, হুব্বুল্লাহ ও হুব্বুর রাসূল, অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলাকে সবেচেয়ে বেশি ভালোবাসা, অতঃপর তাঁর রাসূল (সা) কে ভালোবাসা। পরম করুণাময় আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ }
“আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, তারা তাদেরকে ভালোবাসে আল্লাহর ভালোবাসার মতোই; পক্ষান্তরে যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহকে সর্বাধিক ভালোবাসে।”
[সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৬৫]।
অর্থাৎ মু’মিনগণ তাদের সম্পূর্ণ ভালোবাসা একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট করে। আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সা) বলেন,
ثَلَاثَ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الإِيمَانِ : أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا
তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের স্বাদ পাবে; আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সকল কিছুর চেয়ে অধিক প্রিয় হয়( সহীহুল বুখারী ১/১২, নং ১৬, সহীহ মুসলিম ১/৬৬, নং ৪৩)।
রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি এ ভালোবাসার গুরুত্ব, মাত্রা ও পরিমাপ কত? ভালোবাসার বাহ্যিক ‘আলামত ও নমুনাগুলোই বা কি? এই ভালোবাসার দাবী কি, ধরন কি? সম্মানিত সাহাবীগণ ছিলেন এ সকল জিজ্ঞাসার সঠিক উত্তরের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, উত্তম নমুনা। তারা তাদের প্রিয় রাসূল (সা) এর প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত ছিলেন। তার মুহাব্বতের সিন্ধুতে অবগাহন করেছিলেন। নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে মুসলিম উম্মাহর সবিস্তারে তা জানা অত্যাবশ্যক। কেননা রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ঈমান পোষণ, তার প্রতি ভালোবাসা, সম্মান প্রদর্শন, তার আনুগত্য ও অনুসরণ করার ক্ষেত্রে সাহাবীগণই মুসলিম উম্মাহর একমাত্র আদর্শ।
কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য যে, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার ক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বের মু’মিন-মুসলিমগণের ভূমিকা দেখে মনে হয় যে, তারা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে অথবা উদাসীন রয়েছে। একদল মুসলিম এ ক্ষেত্রে অনেক বড় ভুল করে। আরেক দল চরম অবহেলা করে। কেউ কেউ তার প্রতি ভালোবাসার অর্থকে সংকীর্ণ গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। অপর দল তাঁর প্রতি ভালোবাসার দাবীদার সেজে সত্যকে পাশ কাটিয়ে অনেক বেশি বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন করে।
আল কুরআন ও আস-সুন্নাহর প্রকৃত বিচারে এ সব বিষয় ঈমানের জন্য মারাত্মক হুমকি ও ঈমান বিধ্বংসী। তাই রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা কি? এর অর্থ কি? মাত্রা কি? এর দাবী কি? দায়-দায়িত্ব এসব কিছুর মডেল হচ্ছেন তার সাহাবায়ে কিরাম, যারা ছিলেন আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট এবং করুণাময় আল্লাহ তা’আলাও তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। তাই ‘রাসূলুল্লাহর (সা) ভালোবাসায় সিক্ত যারা’ শিরনামে লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। আমার জানা মতে এ বিষয়ের উপর বাংলা ভাষায় সঠিক তথ্য-প্রমাণ নির্ভর কোনো বই রচিত হয়নি। বিষয়টির উপর আলোচনাকে সুবিন্যস্ত করার প্রয়াসে নিম্নোক্ত অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে।
প্রথম অধ্যায়: রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার শার’য়ী মর্যাদা ও প্রতিদান।
দ্বিতীয় অধ্যায়: রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন।
তৃতীয় অধ্যায়: রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি বৈরীভাব ও অবজ্ঞা প্রদর্শনেরবহিঃপ্রকাশ।
চতুর্থ অধ্যায়: রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার সৃষ্টির উপায় আলোচ্য বিষয়গুলোকে তথ্য সমৃদ্ধ ও নির্ভুল করার লক্ষ্যে আল-কুরআন, আস্-সুন্নাহ, নির্ভরযোগ্য সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থসহ বিভিন্ন গবেষণা পত্রের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। আশা করি বিজ্ঞ পাঠক এ বইটি থেকে আলোচ্য বিষয়ের উপর তথ্য নির্ভর কিছু জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবেন। মানুষের কর্ম নির্ভুল ও পরিপূর্ণ নয়, তার দিক থেকে কেবলই নিরলস প্রচেষ্টা, পূর্ণতা কেবলমাত্র মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’লার। সতর্কতার মধ্যেও ভুল-ভ্রান্তি, ত্রুটি-বিচ্যুতি ও কমতি ইত্যাদি থাকাই স্বাভাবিক। তাই তথ্য, তত্ত্ব ও প্রমাণ ভিত্তিক যে কোনো পরামর্শ লেখকের প্রতি সুহৃদ পাঠকবৃন্দের আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ বলেই বিবেচিত হবে। সম্মানিত পাঠকগণ বইটি থেকে উপকৃত হলে বা উপকৃত হওয়ার মতো সামান্য উপাদানও পেলে সেখানেই এ লেখাটির স্বার্থকতা।
মহান করুণাময় আল্লাহ সুবহানাহু ও তা’আলার নিকট প্রার্থনা যে, তিনি যেন এ কাজটিকে তাঁর উদ্দেশ্যে কবুল করেন এবং নেক কাজের অন্তর্ভুক্ত করেন। বাংলা ভাষা-ভাষী মুসলিমগণ যেন রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা প্রদর্শন এবং তার প্রতি দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে আদায় করতে পারেন, মহান মালিকের কাছে সে তাওফীক কামনা করি। আমীন!!!
প্রফেসর শাইখ ডক্টর মুহাম্মাদ আব্দুস সামাদ
প্রথম অধ্যায় : রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার শার’য়ী মর্যাদা ও প্রতিদান
প্রথম পরিচ্ছেদ : রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা পোষণের কারণ
ঈমানের দাবী অনযায়ী রাসূলুল্লাহকে (সা) ভালোবাসতে হবে। এর পেছনেও নির্দিষ্ট কিছু কারণ আছে। নিম্নে তাকে ভালোবাসার কতিপয় কারণ উল্লেখ করা হলো:
ক. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি আল্লাহর ভালোবাসা, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর প্রিয়বন্ধু রাসূলকে (সা) কে ভালোবাসেন ও সম্মান করেন। মহান আল্লাহ যেহেতু তাঁর নবীকে ভালোবাসেন এবং তাঁকে সম্মান করেন, অতএব তার উম্মাত হিসাবে তাকে সর্বোচ্চ ভালোবাসা ও তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা একান্ত কর্তব্য। মহান করুণাময় আল্লাহ তার রাসূল (সা) কে যে ভালোবাসেন ও সম্মান করেন, তার অসংখ্য প্রমাণাদি আছে। উদাহরণ স্বরূপ তার প্রতি আল্লাহর ভালোবাসার কয়েকটি নিদর্শন তুলে ধরা হলো;
১. রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনের শপথ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নিমিত্তেই তার জীবনের কসম করেছেন।
আল্লাহ বলেন, لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ
আপনার জীবনের শপথ! নিশ্চয় তারা নেশার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকবে’,। [আল হিজর ১৫: ৭২] (মোল্লা ‘আলী কারী, শারহুশ শিফা লিল ক্বাষী ‘ইয়ায, শারহ মোল্লা ‘আলী আলকারী, মক্কা আল মুকাররমাহ, দারুল বায, প. ১/৭২, ‘আব্দুল লাতীফ ইবন মুহাম্মাদ আল হাসান, মুহাব্বাতুন নবী সাল্লাল্লাহু)
ইবন ‘আব্বাস (রা) বলেন, আল্লাহ মুহাম্মাদ (সা) এর মতো এমন কোনো আত্মা সৃষ্টি করেন নি। আমি আল্লাহকে মুহাম্মাদ (সা) ছাড়া আর কারও নামে শপথ করতে শুনিনি’ (তাফসীর ইবন কাসীর ৪/৫৪২।)।
এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহর (সা) সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে (আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওয়া তা’যীমুহু, প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে, ‘হুকুকুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ পুস্তিকায়, রিয়াদ, ১ম সংস্করণ, ২০০১২, পৃ. ৬৩, মাওসূ’আতুদ্ দিফা’ ‘আন রাসূলিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সংকলন করেছেন কুরআন ও সুন্নাহর গবেষক ‘আলী বিন নায়িত আশশুহুদ, পৃ. ৪/৪৬৮। আল মাকতাবাতুশ শামিলাহ, সীরাত অংশ।
উল্লেখ্য যে, মহান আল্লাহ তাঁর যে কোন সৃষ্টির নামে তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী কসম করতে পারেন। তবে মানুষের জন্যে মহা পরাক্রান্ত আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সৃষ্টির নামে কসম করা বৈধ নয়, হারাম। সুতরাং উম্মাতের জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে ও তার জীবনের নামে কসম করা যাবে না। বান্দা কী ভাবে কসম করবে তা কুরআন কারীমে ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহীহ হাদীসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পরিস্কার ভাষায় বলে দিয়েছেন যে, পূতঃপবিত্র মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কসম করা শিরক। ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) বলেন,আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ كَفَر أَوْ أَشْرَكَ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কসম করল, সে কুফরী করল অথবা শিরক করল’,।
[সুনানুত তিরমিযী ৩/১৬২, নং ১৫৩৫, সুনান আবিদ দাউদ ৩/৩২৩, নং ৩২৫১, মুসনাদ আহামাদ ১০/২৪৯, নং ৬০৭২, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন, আলবানী সহীহ বলেছেন, আরো দ্রষ্টব্য,’মাজমু’ ফাতওয়া, ইবন বায, ১/৪৫)।
২. রাসূলুল্লাহর (সা) উচ্ছ্বসিত প্রশংসা, অতি কৃপাময় আল্লাহ তা’আলা তার অনেক বেশি প্রশংসা করে বলেন,
{ وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ}
“নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত।” [সূরা আল-কলাম, আয়াত: ৪]
এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা) যে, উন্নত নৈতিকতা ও মহান চরিত্রের উপর ছিলেন তার স্পষ্ট ঘোষণা। ইবন ‘আব্বাস (রা) এবং আরো কতিপয় মুফাস্স্সিরের নিকট ‘খুলুক ‘আযীম’ এর অর্থ সত্য দ্বীন বা ইসলাম(তাফসীর ইবন কাসীর ৮/১৮৮।)।
এ অর্থেও তিনি সত্য দ্বীন ইসলামের উপর অবিচল ছিলেন। অর্থাৎ তিনি সত্য দ্বীন ও আল-কুরআনের সকল বিধি-বিধান এমনভাবে পালন করেছেন যে, সেগুলো তার জীবন, স্বভাব ও চরিত্রের সাথে মিশে গেছে। এজন্যই সা’দ ইবন হিশাম ইবন ‘আমির (রা) উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়েশা রাদি আল্লাহু কাছে রাসূলুল্লাহর (সা) চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তখন তিনি বলেন,
أَلَسْتَ تَقْرَأُ الْقُرْآنَ؟ قُلْتُ : بَلَى، قَالَتْ: فَإِنَّ خُلُقَ نَبِيِّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ الْقُرْآنَ
তুমি কি কুরআন পড়নি? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বলেন, নিশ্চয় আল্লাহর নবী (সা) এর চরিত্র ছিল আল-কুরআন'( সহীহ মুসলিম ১/৫১৩, নং ৭৪৬, আহমাদ ইবন হাম্বল, মুসনাদ আহমাদ, সম্পাদনা, শু’আইব আল-আরনাউত ও তার সঙ্গীগণ, তত্ত্ববধায়ন, ৬. ‘আব্দুল্লাহ আল-মুহসিন আত্-তুরকী, মুআসসাসাতুর রিসালাহ,
১ম সংস্করণ, ১৪২১ হিছ ৪০/৩১৫, নং ২৪২৬৯)।
৩. ওহীর অনুসরণ ও সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার ক্ষেত্রে প্রত্যয়ন, মহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর রাসূল (সা) কে প্রত্যয়ন করে বলেন,
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى. وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى
“তোমাদের সঙ্গী বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয়। আর তিনি মনগড়া কথা বলেন না। তাতো কেবল ওহী, যা তার প্রতি ওহীরূপে প্রেরীত হয়।” [সূরা আন্-নাজম, আয়াত: ২-৪]।
এ আয়াতে আল্লাহ তা’আলা শপথ করে তাঁর রাসূল (সা) ওহীর অনুসারী ও হকের উপর প্রতিষ্ঠিত আছেন, এই প্রত্যয়ন করছেন এবং তিনি ইয়াহুদী, খৃষ্টান ও অন্যান্যদের মতো বিপথগামী নন, সেই সাক্ষ্য দিয়েছেন (তাফসীর ইবন কাসীর ৭/৪৪৩, সাইয়্যেদ কুতুব, ফী যিলালিল কুরআন, কায়রো, দারুণ শুরুক, ১৭ম সংস্করণ, ১৪১২ হি, ৬/৩৪০৫)।
৪. রাসূলুল্লাহর (সা) সম্মানকে সমুন্নত করা, মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়বন্ধু খলীল নবী (সা) এর সম্মানকে বিশ্বময় সমুন্নত করেছেন, সর্বত্র ও সর্বমহলে তার আলোচনাকে জীবন্ত আকারে তুলে ধরেছেন ও ছড়িয়ে দিয়েছেন। এমন বার্তা দিয়ে আল্লাহ তা’আলা বলেন, }وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ { ‘আমি আপনার আলোচনাকে সর্ব ওপরে পৌঁছে দিয়েছি।” [সূরা আল-ইনশিরাহ, আয়াত: ৪]
অর্থাৎ রাসূলুল্লাহকে (সা) সর্বোচ্চ সম্মানিত করা হয়েছে; কোনো সৃষ্টিকে তার মতো প্রশংসনীয় করা হয়নি। এমনকি ইসলামে প্রবেশ, আযান, ইকামাত, খুতবাহ ইত্যাদির ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর নামের সাথেও তার নাম স্মরণ ও উল্লেখ করা হয়। এভাবে তার মর্যাদা ও স্মরণ সমুন্নত করাবহয়েছে। এ ছাড়াও তার উম্মাত ও অনুসারীদের নিকট তার সম-মর্যাদার আর কেউ নেই (আশ- শাইখ, আস- সা’দী, আব্দুর রাহমান ইবন নাসির, তাইসীরুল কারীমির রাহমান ফী তাফসীরি কালামিল মান্নান, বৈরুত, মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১৬ হি, পৃ. ৮৫৯, আর দেখুন, কুরআনুল কারীম বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর, বাদশাহ ফাহদ কুরজান মূদ্রণ কমপ্লেক্স, মদীনাহ মুনাওয়ারাহ, সৌদি ‘আরব, ২/২৮৪৮)।
৫. রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে আওয়াজ নীচু করাকে তাকওয়া আখ্যা দেওয়া, মহান আল্লাহর তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ভালোবাসার আরেকটি নমুনা হচ্ছে, রাসূলুল্লাহর (সা) এর সামনে মৃদু স্বরে কথা বলা ও আওয়াজ নীচু করাকে তাকওয়ার লক্ষণ বলে করুণাময় আল্লাহ আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু বলেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يَغُضُّونَ أَصْوَاتَهُمْ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ أُولَئِكَ الَّذِينَ امْتَحَنَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ لِلتَّقْوَى لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ }
“নিশ্চয় যারা আল্লাহর রাসূলের (সা) সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নীচু করে, আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরীক্ষা করে নিয়েছেন। তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার রয়েছে।” (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৩]
এ কারণে রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় তার সামনে উঁচু আওয়াযে কথা বলা নিষেধ ছিল তার কবরের পাশেও উঁচু গলায় কথা বলাও নিষিদ্ধ (তাফসীর ইবন কাসীর ৭/৩৬৮)।
আস-সা’য়িদ ইবন ইয়াযীদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মাসজিদে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন জনৈক ব্যক্তি আমার দিকে কঙ্কর নিক্ষেপ করল। আমি তাকিয়ে দেখি যে, ‘উমার ইবনুল খাত্তাব, তিনি বলেন, যাও!
فَأْتِنِي بِهَذَيْنِ، فَجِئْتُهُ بِهِمَا، قَالَ : مَنْ أَنْتُمَا أَوْ مِنْ أَيْنَ أَنْتُمَا؟ قَالَا: مِنْ أَهْلِ الطَّائِفِ، قَالَ: لَوْ كُنْتُمَا مِنْ أَهْلِ البَلَدِ لَأَوْجَعْتُكُمَا، تَرْفَعَانِ أَصْوَاتَكُمَا فِي مَسْجِدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
এ দু’জনকে আমার কাছে নিয়ে আস। আমি তখন তাদের দু’জনকে তার কাছে হাজির করলো। ‘উমার (রা) বলেন, তোমরা দু’জন কে? অথবা তোমরা দু’জন কোথা থেকে এসেছো? তারা বলল, তায়েফের অধিবাসী। তিনি বলেন, তোমরা যদি এই শহরের (মদীনার) বাসিন্দা হতে, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে আঘাত করতাম। তোমরা রাসূলুল্লাহর (সা) মাসজিদে উঁচু স্বরে কথা-বার্তা বলছো ( সহীহুল বুখারী ১/১০১, নং ৪৭০, আবু ‘ঈসা মুহাম্মাদ ইবন ‘ঈসা, সুনানুত তিরমিযী, সম্পাদনা, বাশশার মা’রুফ, প্রকাশক, দারুল গারবিল ইসলামী, ১৯৯৮’ই, ১/৬১৩, তাফসীর ইবন কাসীর ৭/৩৬৮)।
৬. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি আল্লাহর রহমত ও কল্যাণ বর্ষণ করা, আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূল (সা) এর প্রতি সর্বদা সালাত অর্থাৎ রহমত বর্ষণ করেন। ফেরেশতাগণও তার জন্য রহামাত কামনা করে দু’আ করেন। তাই মু’মিনদের জন্যও তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
{إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا }
“নিশ্চয় আল্লাহ নবীর প্রতি কল্যাণ বর্ষণ করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর জন্য দু’আ করেন। হে মু’মিনগণ! তোমরাও নবীর প্রতি সালাত পাঠ কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।” (আল-আহযাব, আয়াত: ৫৬) ‘সালাত’ শব্দের অর্থ রহমত, দু’আ ও প্রশংসা। আল্লাহ তা’আলার সালাতের অর্থ আল্লাহ কর্তৃক ফেরেশতাদের সামনে তাঁর রাসূলের (সা) প্রশংসা ও সম্মান করা। তার প্রতি তাঁর রহমতের বারি বর্ষণ করা (সহীহুল বুখারী ৬/১২০, সানাদ বিহীন বর্ণনা করেছেন, তাফসীর ইবন কাসীর ৬/৪৫৭)
৭. আল্লাহ তা’আলার তাকে বন্ধু (খালীল) হিসেবে গ্রহণ, পরম করুণাময় আল্লাহ তাঁর রাসূল (সা) কে একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সাহাবী জুন্দুব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (সা) কে তাঁর মৃত্যুর পাঁচ দিন পূর্বে বলতে শুনেছি যে,
إنِّي أَبْرَأُ إِلَى اللهِ أَنْ يَكُونَ لِي مِنْكُمْ خَلِيلٌ، فَإِنَّ اللَّهِ تَعَالَى قَدِ اتَّخَذَنِي خلِيلًا، كَمَا اتَّخَذَ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا، وَلَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا مِنْ أُمَّتِي خَلِيلًا لَا تَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيلًا
আমি তোমাদের মধ্য থেকে কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছি, এ বিষয় থেকে আল্লাহর নিকট আমি দায় মুক্ত। কেননা আল্লাহ তা’আলা আমাকে খালীল (বন্ধু) হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যেমন তিনি ইবরাহীমকে বন্ধু হিসেবে নিয়েছেন। আর আমি যদি আমার উম্মাতের মধ্যে কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম, তা হলে আবু বকরকে গ্রহণ করতাম’ (সহীহ মুসলিম, ১/৩৭৭, নং ৫৩২, কবরের উপর মসজিদ বানানো নিষিদ্ধ পরিচ্ছেদ, সহীহুল বুখারী ৫/৪,নং ৩৬৫৪, আবু সা’ঈদ আল-খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত।)। ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সা) বলেন,
لَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا مِنْ أَهْلِ الْأَرْضِ خَلِيلًا، لَا تَّخَذْتُ ابْنَ أَبِي قُحَافَةَ خَلِيلًا، وَلَكِنْ صَاحِبُكُمْ خَلِيلُ اللَّهِ
আমি যদি পৃথিবীর কোনো বাসিন্দাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম, তা হলে আবু কুহাফার পুত্র (আবু বকর) কে বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম। আর তোমাদের সাথী (রাসূল) হচ্ছেন আল্লাহর বন্ধু’ ( সহীহ মুসলিম ৪/১৮৫৫, নং ২৩৮৩)। উচ্চ পর্যায়ের পরিপূর্ণ ভালোবাসার বস্তুকে ‘খালীল’ বলা হয়,।
৮. রাসূলুল্লাহর (সা) শত্রুদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণের প্রস্তাব, রাসূলুল্লাহকে (সা) তার দা’ওয়াতী কার্যক্রমের জন্য তার দুশমনদের পক্ষ থেকে নানা ধরনের নির্যাতন ও নিপীড়নের কঠিন শিকার হতে হয়েছে। তন্মধ্যে তায়েফের নির্যাতন ছিল অত্যন্ত মর্মন্তুদ ও হৃদয় বিদারক। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বন্ধুর উপর এই অকথ্য নির্যাতনের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক কঠিন শাস্তির প্রস্তাবসহ জিবরীল ও পাহাড়ের ফেরেশতা (আ) কে প্রেরণ করেন। কিন্তু উম্মাতের কল্যণাকামী আল্লাহর রাসূল তায়েফের অধিবাসীদেরকে শাস্তি না দিয়ে তাদের হিদায়াতের জন্য দু’আ করেন। উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সা) তায়েফে প্রচণ্ড নির্যাতনের শিকার হয়ে অজ্ঞান হয়ে যান। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর তিনি উপরের দিকে মাথা উঠান এবং তারপরের ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন,
فَإِذَا أَنَا بِسَحَابَةٍ قَدْ أَظَلَّتْنِي، فَنَظَرْتُ فَإِذَا فِيهَا جِبْرِيلُ، فَنَادَانِي فَقَالَ: إِنَّ اللهَ قَدْ سَمِعَ قَوْلَ قَوْمِكَ لَكَ، وَمَا رَدُّوا عَلَيْكَ، وَقَدْ بَعَثَ إِلَيْكَ مَلَكَ الجبَالِ لِتَأْمُرَهُ بِمَا شِئْتَ فِيهِمْ، فَنَادَانِي مَلَكُ الجِبَالِ فَسَلَّمَ عَلَيَّ، ثُمَّ قَالَ: يَا مُحَمَّدُ، فَقَالَ، ذَلِكَ فِيمَا شِئْتَ، إِنْ شِئْتَ أَنْ أُطْبِقَ عَلَيْهِمُ الأَحْشَبَيْنِ؟
فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: بَلْ أَرْجُو أَنْ يُخْرِجَ اللَّهُ مِنْ أَصْلَابِهِمْ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ وَحْدَهُ، لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا
আমি তখন একখণ্ড মেঘ দেখলাম, যা আমাকে ছায়া দিচ্ছিল। আমি সেদিকে লক্ষ্য করে সেখানে জিবরীলকে দেখলাম। তিনি আমাকে সম্বোধন করে বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ আপনার সাথে আপনার কাওমের বলা কথা এবং তারা আপনাকে কি জবাব দিয়েছে শুনেছেন। বস্তুত: তিনি আপনার কাছে পাহাড়ারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন, যাতে তাদের ব্যাপারে আপনার ইচ্ছানুযায়ী তাকে নির্দেশ দিতে পারেন। তখন পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে সম্বোধন করেন এবং আমাকে সালাম দেন। তারপর বলেন, হে মুহাম্মাদ! তারপর বলেন, এ বিষয়ে আপনি যা চাইবেন। আপনি যদি চান আমি তাদের উপর দুই পাহাড় (আবু কুবাইস ও এর বিপরীত দিকের পাহাড়) কে একত্রে মিশিয়ে দেব। তখন নবী (সা) বলেন, বরং আমি আশা করি যে, আল্লাহ তাদের বংশ থেকে এমন কাউকে বের করে আনবেন, যে এক আল্লাহর ‘ইবাদাত করবে, তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শারীক করবে না'(সহীহুল বুখারী ৪/১১৫, নং ৩২৩১, সহীহ মুসলিম ৩/১৪২০, নং ১৭৯৫)।
খ. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন ঈমানের প্রধান শর্ত, রাসূলুল্লাহকে (সা) ভালোবাসা, তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা এবং তাকে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করা মু’মিনদের ঈমান বিশুদ্ধ হওয়ার প্রধান শর্ত। মহান আল্লাহ সুবহানাহু বলেন,
إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُوَتُوَقِّرُو
“নিশ্চয় আমরা আপনাকে সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি; যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ঈমান আন এবং তাকে শক্তি যোগাও ও তাকে সম্মান কর। “আল-ফাতহ, আয়াত: ৮-৯]
অর্থাৎ তোমরা রাসূলকে সাহায্য কর, তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন কর (মুহাম্মাদ ইবন জারীর আত-তাবারী, জামি’উল বায়ান ফী তা’বীলিল কুরআন, সম্পাদনা, আহমাদ শাকির, প্রকাশক, মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪২০ হি, ২২/২০৬-২০৭, তাফসীরুল কুরতুবী ১৬/২৬৭, তাফসীর ইবন কাসীর ৭/৩২৯)। তাকে সাহায্য করা, সম্মান করা এবং তার প্রতি নাজিল হওয়া দ্বীনের অনুসরণ করা মু’মিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট। আর এটার মধ্যে তাদের সফলতা রয়েছে। আল-কুরআনের একটি আয়াতে স্পষ্ট করে তা তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ জাল্লা ওয়া ‘আলা বলেন,
{فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ }
“অতএব যারা তার প্রতি ঈমান পোষণ করে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং যে নূর তার সাথে নাজিল হয়েছে সেটার অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম।” [সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ১৫৭]
এ আয়াতে মু’মিনদের কল্যাণ লাভের জন্য চারটি শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
১. রাসূলুল্লাহর (সা) উপর ঈমান পোষণ করা
২. তার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান করা,
৩. তাকে সাহায্য ও সহায়তা করা এবং
৪. আল-কুরআন অনুযায়ী চলা।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, রাসূলুল্লাহকে (সা) ভালোবাসা, সম্মান করা ও সাহায্য করার উপর পুরো ইসলামের অস্তিত্বই নির্ভরশীল। এ কথাটিকে ইমাম ইবন তাইমিয়া (রহ) সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন
, فَقِيامُ الْمَدْحَةِ وَالثَّنَاءِ عَلَيْهِ وَالتَّعْظِيمُ وَالتَّوْقِيرُ لَهُ قِيَامُ الدِّينِ كُلِّهِ وَسُقُوطُ ذَلِكَ سُقُوطُ الدِّينِ كُلِّهِ
নবী (সা) এর প্রশংসা ও গুণাগুণ বর্ণনা করা এবং তার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা পোষণ করার অর্থই হলো, পরিপূর্ণ দ্বীন কায়েম করা। পক্ষান্তরে এসবের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা মানেই সম্পূর্ণ দ্বীনকেই ধ্বংস করা (ইবন তাইমিয়্যাহ, আহমাদ ইবন ‘আব্দুল হালীম, আস সারিমুল মাসলুল ‘আলা শাতিমির রাসূল, সম্পাদনা, মুহাম্মাদ মুহই উদ্দীন আব্দুল হামিদ, প্রকাশক, সৌদি ন্যাশনাল গার্ড, সৌদী আরব, ৩/২০৯)।
গ. উম্মাতের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা) অসাধারণ করুণা, মুসলিম উম্মাহর প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অতিশয় মায়া-মমতা,করুণা ও ভালোবাসার কারণেও তার প্রতি উম্মাতের ভালোবাসা থাকা অপরিহার্য। মহান আল্লাহ বলেন,
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ }
“তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল এসেছেন। তোমাদের যে দুঃখ-বেদনা হয়ে থাকে তা তার জন্য বড়ই কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের হিতাকাঙ্খী, তিনি মুমিনদের প্রতি অতি সদয় ও দয়ালু।” [আত -তাওবাহ, আয়াত: ১২৮, আরো দেখুন, আল-বাকারা, আয়াত: ১২৯, আলে-‘ইমরান, আয়াত: ১৬৪]।
মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ যে, মানুষদের মধ্য থেকে তাদেরই সমগোত্রীয় এবং তাদেরই সমভাষার লোককে প্রেরণ করেছেন ( তাফসীর ইবন কাসীর ৪/২৪১, আশ-শাওকানী, মুহাম্মাদ ইবন ‘আলী, ফাতহুল কাদীর, দামেস্ক, দার ইবন কাসীর, ১ম সংস্করণ, ১৪১৪ হি. ২/৪৭৬, আশ্-শানকীতী, আদওয়াউল বায়ান ২/১৪৯)।
জা’ফর ইবন আবি তালিব (রা) তার সম্পর্কে বাদশাহ নাজাশীর কাছে একই কথা বলেছিলেন। তিনি বলেন,
فَكُنَّا عَلَى ذَلِكَ حَتَّى بَعَثَ اللَّهُ إِلَيْنَا رَسُولًا مِنَّا نَعْرِفُ نَسَبَهُ، وَصِدْقَهُ، وَأَمَانَتَهُ، وَعَفَافَهُ،
আমরা জাহিলিয়াতের অন্ধকারের মধ্যেই নিমজ্জিত ছিলাম, এমতাবস্থায় আল্লাহ আমাদের মধ্য থেকেই একজনকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন, যার বংশ, সত্যবাদিতা, আমানতদারী ও সচ্চরিত্র সম্পর্কে আমরা ভালোভাবে জ্ঞাত (মুসনাদ আহমাদ ৩/২৬৬, নং ১৭৪০, আবু বাকর ইবন খুযাইমাহ, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, সহীহ ইবন খুযাইমাহ, সম্পাদনা, ড. মুহাম্মাদ আল-আ’যুমী, বৈরুত, প্রকাশক, আল-মাকতাবুল ইসলামী, তা. বি.৪/১৩, নং ২২৬০)।
আল্লাহর রাসূল (সা) তার উম্মাতের কতটা হিতাকাঙ্খী ও কল্যাণকামী ছিলেন যে, তিনি তাদের প্রকৃত সার্বিক কল্যাণের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন। অবস্থা দৃষ্টি মনে হচ্ছিল যে, তিনি তাদের হেদায়াত ও ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য জীবন দিয়ে ফেলবেন। আল-কুরআন ও সহীহ সুন্নাতে তার এ অবস্থার কথাগুলোও উঠে এসেছে। মহাকরুণাময় আল্লাহ বলেন,
{ فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَفْسَكَ عَلَى آثَارِهِمْ إِنْ لَمْ يُؤْمِنُوا بِهَذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا}
“তারা কালিমাতে ঈমান না আনলে সম্ভবত তাদের পেছনে ঘুরে আপনি দুঃখে আত্মঘাতী হয়ে পড়বেন।” [আল-কাহফ, আয়াত ৬]। অন্য আরেকটি আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
لَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَفْسَكَ أَلَّا يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ}
“আর তারা ঈমান আনছে না বলে আপনি হয়ত মনোকষ্টে আত্ম-বিনাশী হয়ে পড়বেন।” [আশ্-শু’আরা, আয়াত: ৩)। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেন,
{ فَلَا تَذْهَبْ نَفْسُكَ عَلَيْهِمْ حَسَرَاتٍ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِمَا يَصْنَعُونَ }
“তাই আপনি তাদের জন্য আফসোস করে আপনার প্রান যেন ধ্বংস না হয়। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ৮]।
রাসূলুল্লাহ (সা)ও নিজেই তার এ মানসিক অবস্থার কথা একটি হাদীসে তুলে ধরেছেন। আবু হুরায়রা রাদি আল্লাহ ‘আনহু বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছেন যে,
إِنَّمَا مَثَلِي وَمَثَلُ النَّاسِ كَمَثَلِ رَجُلٍ اسْتَوْقَدَ نَارًا، فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ جَعَلَ الفَرَاسُ وَهَذِهِ الدَّوَابُّ الَّتِي تَقَعُ فِي النَّارِ يَفَعْنَ فِيهَا، فَجَعَلَ يَنْزِعُهُنَّ وَيَغْلِبْنَهُ فَيَقْتَحِمْنَ فِيهَا ، فَأَنَا أَخَذُ بِحُجَزِكُمْ عَنِ النَّارِ، وَهُمْ يَقْتَحِمُونَ فِيهَا
“নিশ্চয় আমার ও লোকদের দৃষ্টান্ত এমন এক ব্যক্তির ন্যায়, যে আগুন প্রজ্জ্বলিত করলো। আগুন যখন তার চারপাশ আলোকিত করল, তখন কীট-পতঙ্গরা এবং এই পঙ্গপালগুলো যেগুলো আগুনে পতিত হয়, তাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। সে ব্যক্তি এদের বাধা দিতে থাকল, কিন্তু এরা তাকে পরাভূত করে তাতে ঝাঁপিয়েই পড়ল। বস্তুত: আমি আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য তোমাদের কোমর শক্ত করে ধরে আছি আর তারা জোর করেই তাতে প্রবেশ করছে (সহীহুল বুখারী ৮/১০২, নং ৬৪৮৩, সহীহ মুসলিম ৪/১৭৮৯, নং ২২৮৪)।” সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় আছে যে, “এক্ষেত্রে আমার অবস্থাও তোমাদের অনুরূপ।”
এমনকি এক ইয়াহুদী বালককেও জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর প্রত্যাশায় তার কাছে ইসলামের দা’ওয়াত পেশ করেন। আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণিত হাদীসে সে ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন,
كَانَ غُلامٌ يَهُودِيُّ يَخْدُمُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَمَرِضَ، فَأَتَاهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعُودُهُ، فَقَعَدَ عِنْدَ رَأْسِهِ، فَقَالَ لَهُ: أَسْلِمْ، فَنَظَرَ إِلَى أَبِيهِ وَهُوَ عِنْدَهُ فَقَالَ لَهُ: أَطِعْ أَبَا القَاسِمِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَسْلَمَ، فَخَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يَقُولُ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي
أَنْقَذَهُ مِنَ النَّارِ
এক ইয়াহুদী বালক নবী (সা) এর খিদমাত করত। ছেলেটি অসুস্থ হলে নবী (সা) তার খোঁজ-খবর ও শ্রুষা করার জন্য তার কাছে আসলেন এবং তার মাথার কাছে বসলেন। তারপর তাকে বললেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ কর। বালকটি তখন তার কাছে উপস্থিত পিতার দিকে তাকাল। পিতা তাকে বলল, তুমি আবুল কাসিম (সা) এর কথা মেনে নাও। অতঃপর সে ইসলাম গ্রহণ করল। তখন নবী (সা) এ কথা বলে বের হয়ে গেলেন যে, সকল প্রশংসা ঐ আল্লাহর জন্য, যিনি তাকে আগুন থেকে রক্ষা করেছেন (সহীহুল বুখারী ২/৯৪, নং ১৩৫৬, সুনান আবিদ দাউদ ৩/১৮৫, নং ৩০৯৫)।
উম্মাতের কাছে দ্বীনের ছোট বড় সব বিষয়ে শিক্ষা দান ও তাদেরকে উপদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে তার যথেষ্ট অস্থিরতা ছিল এবং এজন্য সকল ধরনের সুযোগকে কাজে লাগাতেন। সালমান আল-ফারিসী (রা) বলেন,
قِيلَ لَهُ: قَدْ عَلَّمَكُمْ نَبِيُّكُمْ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كُلَّ شَيْءٍ حَتَّى الْحِرَاءَةَ قَالَ: فَقَالَ: أَجَل
তাকে জিজ্ঞেস করা হলো যে, তোমাদের নবী (সা) তোমাদেরকে সব বিষয়ই শিক্ষা দেন, এমন কি মলমূত্র তা্যগের আদব-শিষ্টাচারও, বর্ণনাকারী বলেন, তখন তিনি বলেন, হ্যাঁ (সহীহ মুসলিম ১/২২৩, নং ২৬২, সুনান আবি দাউদ ১/৩, নং ৭, সুনানুত তিরমিযী ১/৬৮, নং ১৬)।
বিদায় হাজ্জের ভাষণে লক্ষ জনতার উদ্দেশ্যে দ্বীনের নানা বিষয়ে শিক্ষা ও তার শেষ বাণী পৌঁছে দিয়েই তিনি তার দায়িত্ব শেষ করেননি। বরং এ সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে উপস্থিত লোকদেরকে পৃথিবীর সকল অনুপস্থিত মানুষের কাছে দ্বীনের বাণীগুলো পৌঁছানোর দায়িত্ব অর্পণ করেন। আবু বকরাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সা) বলেন,
أَلَا لِيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الغَائِبَ
সাবধান! উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে অবশ্যই পৌঁছিয়ে দেয়'(সহীহুল বুখারী ৫/১৭৭, নং ৪৪০৬, সহীহ মুসলিম ৩/১৩০৫, নং ১৬৭৯)।
এ কথার মাধ্যমে তিনি ইসলামের দা’ওয়াত নিকট ও দূরের সকল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তার উম্মাতের উপর ন্যস্ত করেন এবং দ্বীনের জ্ঞান বিতরণকে বাধ্যতামূলক করে দেন (আন-নববী, শারহ মুসলিম ৮/১৭২, ১১/১৬৯)।
অনেক হাদীসের ভাষা এরূপ দেখা যায় যে, ‘আমার উম্মাতের জন্য কষ্টকর হবে এ আশঙ্কা না থাকলে আমি বলতাম’, উম্মাতের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা) করুণা ও সহজিকরণেরই বহিঃপ্রকাশ। যেমন আবু হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
لَوْلا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي أَوْ عَلَى النَّاسِ لَأَمَرْتُهُمْ بِالسَّوَاكِ مَعَ كُلِّ صَلَاةٍ
“যদি আমার উম্মাতের অথবা লোকদের উপর কষ্টকর হবে এ আশঙ্কা না থাকত, তাহলে আমি অবশ্যই তাদেরকে প্রত্যেক সালাতের সাথে মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম (সহীহুল বুখারী ২/৪, নং ৮৮৭, সহীহ মুসলিম ১/২২০, নং ২৫২)।
” আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي مَا تَخَلَّفْتُ عَنْ سَرِيَّةٍ …
“যদি আমার উম্মাতের উপর কষ্টকর হবে এ আশঙ্কা না থাকত, তাহলে আমি কোনো যুদ্ধ থেকেই পেছনে থাকতাম না (সহীহুল বুখারী ৪/৫৩, নং ২৯৭৫, সহীহ মুসলিম ৩/১৪৯৭, নং ১৮৭৬)।
” অর্থাৎ সকল যুদ্ধেই অংশ গ্রহণ করতাম। উম্মাতের প্রতি তার করুণা ও সহানুভূতির আরেকটি উদাহরণ হলো, মালিক ইবন আল-হুওয়াইরিসের হাদীস। তিনি বলেন,
أَتَيْنَا إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَنَحْنُ شَبَبَةٌ مُتَقَارِبُونَ، فَأَقَمْنَا عِنْدَهُ عِشْرِينَ يَوْمًا وَلَيْلَةً، وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَحِيمًا رَفِيقًا، فَلَمَّا ظَنَّ أَنَّا قَدِ اشْتَهَيْنَا أَهْلَنَا أَوْ قَدِ اشْتَقْنَا سَأَلَنَا عَمَّنْ تَرَكْنَا بَعْدَنَا، فَأَحْبَرْنَاهُ، قَالَ: ارْجِعُوا إِلَى أَهْلِيكُمْ، فَأَقِيمُوا فِيهِمْ وَعَلِّمُوهُمْ وَمُرُوهُمْ
وَذَكَرَ أَشْيَاءَ أَحْفَظُهَا أَوْ لا أَحْفَظُهَا وَصَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي، فَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلاةُ فَلْيُؤَدِّنْ لَكُمْ أَحَدُكُمْ، وَلْيَؤْمَّكُمْ أَكْبَرُكُمْ
আমরা একদল সমবয়সী যুবক নবী (সা) এর কাছে আসলাম। আমরা তার নিকট ২০ দিন ও রাত অবস্থান করলাম। আর রাসূলুল্লাহ (সা) ছিলেন, দয়ালু, সহানুভূতিশীল। তিনি যখন অনুমান করলেন যে, আমরা আমাদের পরিবারের প্রতি আগ্রহী অথবা অনুরাগী হয়ে পড়েছি। তখন তিনি আামদেরকে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমরা আমাদের পেছনে কাদেরকে ছেড়ে এসেছি। আমরা তাকে অবহিত করলাম। আর তিনি তখন তিনি বলেন, ‘তোমরা তোমাদের পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে যাও, অত:পর তাদের সাথেই অবস্থান কর, তাদেরকে শিক্ষা দাও এবং নির্দেশ দাও। আর তিনি অনেক বিষয় উল্লেখ করলেন, আমি যেগুলো মনে রেখেছি বা মনে রাখিনি। আর তোমরা সেভাবে সালাত আদায় কর, যেভাবে তোমরা আমাকে সালাত আদায় করতে দেখেছ। তারপর যখন সালাতের সময় উপস্থিত হবে, তখন তোমাদের একজন যেন তোমাদের জন্য আযান দেয় এবং তোমাদের মধ্যে যে বড়, সে যেন তোমাদের ইমামতি করে (সহীহুল বুখারী ১/১২৮, নং ৬৩১, ৮/৯, নং ৬০০৮, সহীহ মুসলিম ১/৪৬৫, নং ৬৭৪)।”
নবী (সা) এতোটাই দরদী মনের মানুষ ছিলেন যে, সালাতে ইমামতীর সময় যখন বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ শুনতেন, তখন তিনি মায়েদের মনের প্রতি করুণাশীল হয়ে সালাত সংক্ষেপ করতেন। আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সা) বলেন,
إني لأَدْخُلُ فِي الصَّلاةِ، فَأُرِيدُ إِطَالَتَهَا، فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأَتَحَوَّزُ مِمَّا أَعْلَمُ مِنْ شِدَّةِ وَجْدِ أُمِّهِ مِنْ بُكَائِهِ
“বস্তুত: আমি সালাতে প্রবেশ করি, অতঃপর আমি সালাত লম্বা করতে ইচ্ছা করি। তখন আমি বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনি। তখন বাচ্চার কান্নার কারণে তার মায়ের মনের কষ্টের কথা স্মরণ করে সালাত সংক্ষেপ করি (সহীহুল বুখারী ১/১৪৩, নং ৭১০, সহীহ মুসলিম ১/৩৪৩, নং ৪৭০)।
এসব দলিল প্রমাণ রাসূলুল্লাহর (সা) উম্মাতের কল্যাণ নিয়ে তার পেরেশানী প্রমাণ করে।
উপর্যুক্ত কারণগুলোসহ আরো অনেক কারণেই মুসলিম উম্মাহকে মানবতার বন্ধু ও উম্মাতের হিতাকাঙ্খী সর্বাধিক প্রিয় রাসূলুল্লাহকে (সা) যথাযথ ভালোবাসতে হবে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার মাত্রা-পরিমাপ ও ফযীলত
রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অপরিহার্য অংশ। তার প্রতি ভালোবাসার মাত্রা ও পরিমাপ হবে সর্বোচ্চ। একজন মু’মিন ব্যক্তি আল্লাহ তা’লাকে সর্বোচ্চ ভালোবাসার পরেই তাঁর নবী (সা) কে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভালোবাসবে। তার প্রতি ভালোবাসা মহান আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের অধীন। এ প্রসঙ্গে ইবনুল কাইয়্যেম বলেন,
وَكُلُّ مَحَبَّةٍ وَتَعْظِيمِ لِلْبَشَرَ فَإِنَّمَا تَجُورُ تَبْعًا لِمَحَبَّةِ اللَّهِ وَتَعْظِيمِهِ كَمَحَبَّةِ رَسُولِهِ وَتَعْظِيمِهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَمَامٍ مَحَبَّةِ مُرْسِلِهِ وَتَعْظِيمِهِ فَإِنَّ أُمَّتَهُ يُحِبُّونَهُ لِحِبِّ اللَّهِ لَهُ وَيُعَلِّمُونَهُ وَيُجِلُّوْنَهُ لِإِجْلَالِ اللهِ لَهُ فَهِيَ مَحَبَّةٌ اللَّهِ مِنْ مُوجِبَاتِ مَحَبَّةِ اللهِ وَكَذَلِكَ مَحَبَّةُ أَهْلِ الْعِلْمِ وَالْإِيمَانِ وَمَحَبَّةُ الصَّحَابَةِ
رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَإِخْلاهُمْ تَابِعٌ لِمَحَبَّةِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ لَهُمْ
“মানুষের প্রতি সকল প্রকারের ভালোবাসা ও সম্মান আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের অধীন হওয়ার কারণেই কেবল তা বৈধ। যেমন আল্লাহর রাসূল (সা) এর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা। কেননা তাকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে তার প্রেরক, আল্লাহ তা’আলার প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর প্রতি সম্মানের পূর্ণতা। কেননা আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন বলে তার উম্মাত তাকে ভালোবাসেন। আল্লাহ তা’আলা তাকে সম্মান করেন বলে তার উম্মাত তাকে সম্মান করেন। তার প্রতি এ ভালোবাসা আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার অপরিহার্য অংশ। একইভাবে মু’মিন-মুসলিম, ‘আলিম ও সাহাবীগণকে ভালোবাসা এবং তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) এর প্রতি ভালোবাসার অধীন (ইবনুল কাইয়্যেম, জালাউল আফহাম ফী ফাক্লিস সালাতি ‘আলা মুহাম্মাদ, সম্পাদনা, শু’আইব আল-আরনাউত, আব্দুল কাদির আল-আরনাউত, আল-কুয়েত, দারুল ‘আরুবাহ, ১৯৮৭ঈ, পৃ. ১৮৭)।”
ক. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার পরিমাপ, আল্লাহর রাসূল (সা) কে প্রকৃত পক্ষে কি পরিমাণ ভালোবাসতে হবে? সে ভালোবাসার মাত্রা ও পরিমাপ কত? কুরআন কারীম ও সুন্নাতে রাসূল (সা) এর দলীল প্রমাণ থেকে তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। কুরআন কারীম ও সুন্নাতে নাবাবীর অসংখ্য বাণী এ কথাই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, আল্লাহর নবী (সা) একজন মু’মিন বান্দাহর নিকট তার জীবন, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, পরিবার-পরিজন, ধন সম্পদ এবং সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয়পাত্র হওয়া অত্যাবশ্যক। অন্যথায় সে ব্যক্তি দুনিয়াতেই মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ তা’আলার তড়িৎ শাস্তির কিংবা পরকালে তাঁর বিলম্বিত শাস্তির সম্মুখীন হবে। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার নির্দেশনা সম্পর্কে আল-কুরআন ও আস্-সুন্নাহতে অনেক প্রমাণাদি রয়েছে। যেমন;
১- নিজের জীবনের চেয়ে রাসূলুল্লাহকে (সা) অধিক ভালোবাসা, রাসূলুল্লাহকে (সা) জীবনের চেয়ে অধিক ভালোবাসতে হবে। তিনি মু’মিনদের নিকট তাদের জীবনের চেয়েও অধিক প্রিয়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ সুবহানাহু বলেন,
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنفُسِهِمْ}
“নবী মু’মিনদের নিকট নিজেদের জীবন অপেক্ষা অধিক প্রিয়।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৬]। এ প্রসঙ্গে জাবির ইবন আব্দিল্লাহ (রা) থেকে একটি হাদ্বীন বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
ثُمَّ يَقُولُ أَنَا أَوْلَى بِكُلِّ مُؤْمِنٍ من نَفْسِهِ مِن تَرَكَ مَالًا فَلِأَهْلِهِ وَمَنْ تَرَكَ دَيْنًا أَو ضَيَاعًا فَإِلَيَّ
“অতঃপর তিনি বলেন, আমি প্রত্যেক মুমিনের নিকট তার জীবনের চেয়েও অধিক প্রিয়। যে ব্যক্তি ধন-সম্পদ রেখে মারা যাবে, সেগুলো তার ওয়ারিশদের জন্য আর যে ব্যক্তি ঋণ অথবা সন্তানাদি রেখে যাবে, তার দায়িত্ব আমার উপর বর্তাবে( সহীহ মুসলিম, সালাত ও খুৎবাহ সংক্ষেপ করণ পরিচ্ছেদ, ২/৫৯৩, নং ৮৬৭। ইমাম বুখারী আবু হুরায়রা (রা) থেকে সামান্য শব্দের পার্থক্যে অনুরূপ বর্ণনা করেন। সহীহুল বুখারী, ৬/২৪৮০, হাদীছ নং ৬৩৬৪)।
” আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
ما من مُؤْمِنٍ إِلَّا وَأَنَا أَوْلَى بِهِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ اقْرَؤُوا إِنْ شِئْتُمْ { النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ}
“আমি প্রত্যেক মু’মিনের নিকট দুনিয়াতে এবং আখরাতে উভয় স্থানেই সর্বাধিক প্রিয়। তোমরা চাইলে পড়তে পার النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ }أنفُسِهِمْ ‘নবী মু’মিনদের নিকট নিজেদের জীবন অপেক্ষা অধিক প্রিয় (সহীহুল বুখারী, ২/৮৪৫, নং ২২৬৯, ঋণগ্রস্থ ব্যাক্তির সালাতুল জানাযা পরিচ্ছেদ)।”
উপর্যুক্ত আয়াতের তাফসীরে ইবন ‘আব্বাস (রা) ও ‘আতা ইবন আবি রাবাহ বলেন, এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মু’মিনদেরকে যদি কোনো কিছুর দিকে ডাকেন আবার তাদের হৃদয়-মনও যদি কোনো কিছুর ডাকতে থাকে, সেক্ষেত্রে তাদের নিজেদের মনের ডাকে সাড়া না দিয়ে রাসূলের (সা) ডাকে সাড়া দেওয়া অধিক উপযুক্ত ও উচিত( মুহইস্ সুন্নাহ, আল-বাগাভী, আবু মুহাম্মাদ আল-হুসাইন, মা’আলিমৃত তানযীল, কী তাফসীরিল কুরআন, (তাফসীরুল বাগাভী), সম্পাদনা, মুহাম্মাদ ‘আব্দুল্লাহ আল-নিমর ও তার সঙ্গীগণ, রিয়াদ, দারু তাইয়্যেবাহ, ৪থ সংস্করণ, ১৪১৭ হি. ৬/৩১৮,)।
তাছাড়াও নবী (সা) মু’মিন-মুসলিমদেরকে যেসব ফায়সাল দেবেন তা তাদের মন-মোত না হলেও সে ফায়সালা মেনে নিতে হবে এবং কার্যকর করতে হবে (আল- কুরতুবী, তাফসীরুল কুরতুবী ১৪/১২২)।
‘আব্দুল্লাহ ইবন হিশাম (রা) থেকে আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, আমরা নবী (সা) এর সাথে একত্রেই ছিলাম। তিনি ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) এর হাত ধরে ছিলেন। তখন ‘উমার (রা) তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
يا رسول الله ! لأَنتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ إِلَّا مِنْ نَفْسِي، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لا . وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ حَتَّى أَكُونَ أَحَبُّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ، فَقَالَ لَه عُمَرُ : فَإِنَّه الآن والله لأَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ نَفْسِي، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الآن يَا عُمَرُ
‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমার নিকট আমার জীবন ছাড়া অন্য সকল বস্তুর চেয়ে অধিক প্রিয়। তখন নবী (সা) বলেন, ‘না’। যার হাতে আমার জীবন, তাঁর কসম! তোমার জীবনের চেয়েও আমি যতক্ষণ অধিক প্রিয় না হবো’ (ততক্ষণ ঈমানদার হতে পারবে না)। তারপর ‘উমার (রা) তাকে বলেন, আল্লাহর শপথ! আপনি এখন আমার নিকট আমার জীবনের চেয়েও অধিক প্রিয়। তখন নবী (সা) বলেন, হে ‘উমার! এখন ঠিক আছে’ (সহীহুল বুখারী, কিতাবুল আইমান ওয়ান নুযূর, ৬/২৪৪৫, হাদীছ নং ৬২৫৭)।
ইবন হাজার আল-আসকালানী (মৃ. ৮৫২ হি) বলেন, অর্থাৎ এখন তুমি প্রকৃত বিষয় উপলব্ধি করেছ এবং সে অনুযায়ী কথা বলেছ (ইবন হাজর আল-‘আসকালানী, ফাতহুল বারী শারহ সহীহিল বুখারী, সম্পাদনা, মুহিব উদ্দীন আল খাতীব, বৈরুত, দারুল মা’রিফাহ, ১৩৭৯ হি., ১১/৫২৮, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের কসম কি রকমের ছিল পরিচ্ছেদ)।
ইবন হাজার আর বলেন, কোনো বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করাও এ হাদীসের একটি অন্যতম শিক্ষা, কেননা মু’মিন-মুসলিম প্রকৃত অর্থে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সবকিছুর চেয়ে অধিক ভালোবাসে। কিন্তু বাস্তবে সে পার্থিব বস্তুগুলোর অনুশীলন এমনভাবে করে যে, মনে হয় এগুলোই তার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) চেয়ে অধিক প্রিয়। কিন্তু সে যখন গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করে যে, আমি কি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বেশি ভালোবাসি? নাকি আমার সন্তানাদি, স্ত্রী কিংবা আমার চাকুরী ইত্যাদি।
বাস্তবতার এই পর্যায়ে এসে ব্যক্তি সঠিক ফলাফল ও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে(প্রাগুক্ত। ইবন হাজারের বক্তব্যের সারাংশ)।
হয়তঃ ‘উমার রাদি ‘আল্লাহু ‘আনহু এমনই একটি অবস্থার প্রেক্ষিতে প্রথম উক্তি করেছিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহর (সা) দৃষ্টি আকর্ষণের ফলে তার মধ্যে সেই গভীর চিন্তার সুযোগ হয়। আর তখনই তিনি নিজের প্রকৃত অবস্থা টের পান এবং নিজের জীবনের চেয়েও রাসূলকে ভালোবাসেন বলে আল্লাহর শপথের মাধ্যমে তার ঘোষণা দেন। এর মাধ্যমেই চিন্তার গুরুত্বটা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে। আর সঠিক চিন্তার মাধ্যমে ঈমানের সঠিক ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায়। এ হাদীসে আর একটি বিষয় জানা যায় যে, আল্লাহর রাসূল (সা) অত্যাধিক গুরুত্ব ও তাকীদের সাথে শপথ করে নিজ জীবনের চেয়ে রাসূলকে অধিক না ভালোবাসা পর্যন্ত ‘উমারের ঈমানের দাবীকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
২- পিতা-মাতা ও সন্তানের চেয়ে আল্লাহর রাসূলকে অধিক ভালোবাসা, রাসূলুল্লাহ (সা) মাতা-পিতা ও ছেলেমেয়েদের চেয়ে অধিক প্রিয় হওয়া অত্যাবশ্যক। মু’মিনগণ সন্তানাদি ও মাতা-পিতাকে যে পরিমাণ ভালোবাসে তার চেয়ে বেশি ভালোবাসতে হবে রাসুলুল্লাহ রাসূলুল্লাহকে (সা)। তার প্রতি সেই মাত্রার ভালোবাসা ছাড়া মু’মিন হওয়া যাবে না। আল-কুরআনসহ অনেক বিশুদ্ধ হাদীসে এর প্রমাণ রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ
“বস্তুত: ঐ সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার জীবন! তোমাদের কোনো ব্যক্তি ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা এবং সন্তান-সন্ততির চেয়ে অধিক প্রিয় না হবো (সহীহুল বুখারী, কিতাবুল ঈমান, ১/১৪)।”
উল্লেখ্য যে, হাদীসের ভাষা হলো الوالد, ‘আরবী ভাষায় এ শব্দটির সাধারণ অর্থ হচ্ছে, ‘পিতা’। এ হাদীসে এ শব্দটির অর্থ প্রসঙ্গে সহীহুল বুখারীর বিখ্যাত ভাষ্যকার হাফিয ইবন হাজর আল-আসকালানী বলেন, । শব্দটি দ্বারা ‘যার সন্তান আছে’ এ অর্থ বুঝালে, সেক্ষেত্রে তো পিতা ও মাতা উভয়কেই বুঝায়। আবার এ অর্থও হতে পারে যে, এখানে শুধু পিতার কথা উল্লেখ করে পিতা ও মাতা দুজনকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন দুটি বিপরীত শব্দের যে কোনো একটিকে উল্লেখ করে উভয়টিই ঝুঝানো হয়ে থাকে।
প্রকৃতপক্ষে এ হাদীসে যে বিষয়কে খুবই গুরুত সহকারে তুলে ধরতে চাওয়া হয়েছে, তার মাত্র উদাহরণ হিসাবেই বলা হয়েছে। আক্ষরিক অর্থে পিতা-মাতা বা যে কোনো একজনকে বুঝানো হয়নি। মূলতঃ এখানে মু’মিন ব্যক্তির সর্বাধিক প্রিয় বস্তুগুলো বুঝানোই উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, তার সর্বাধিক প্রিয় মানুষ ও বস্তুগুলোর চেয়ে আল্লাহর রাসূল (সা) অধিক প্রিয় হবে( হাফিয ইবনু হাজর, ফাতহুল বারী, ১/৫৯, মোল্লা ‘আলী আল-কারী, মিরকাতুল মাফাতীহ শারহ মিশকাতিল মাসাবীহ ১/৭৩। আর দেখুন, ড.ফাফল ইলাহী, হুদুন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওয়া ‘আলামাতুহু, পাকিস্তান: প্রকাশক, ইদারাতু তুরজুমানিল ইসলাম, ৭ম সংস্করণ, ১৪১৪ হি. পৃ. ৯)।
৩- রাসূলুল্লাহকে (সা) পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ এবং সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসা, রাসূলুল্লাহকে (সা) পরিবারের সকল সদস্য, ধন-সম্পত্তি এমনকি সব মানুষের চেয়ে অধিক মাত্রায় ভালোবাসতে হবে। আনাস বিন মালিক রাদি আল্লাহু ‘আনুহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
لا يُؤْمِنُ عَبْدٌ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ أَهْلِهِ وَمَالِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
“কোনো ব্যক্তি ততক্ষণ ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পরিবার পরিজন, ধন-সম্পদ এবং সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় না হবো ( ইমাম মুসলিম, সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, ১/৬৭, নং ৪৪)।”
এ হাদীসের দাবী হচ্ছে, নবী (সা) এর অধিকার পিতা-মাতা, সন্তানাদি, পরিবার-পরিজনের অধিকারের চেয়ে বেশি। তার অধিকারকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেননা তিনি মু’মিনগণকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচিয়েছেন এবং ভ্রষ্টতার পথ থেকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন। কাযী ‘ইয়ায (রহ) এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, পিতা-মাতা, সন্তানাদির মান-মর্যাদার উপর নবী (সা) এর সম্মান ও মর্যাদাকে বুলন্দ ও সুউচ্চে প্রতিষ্ঠিত না করলে ঈমান শুদ্ধ হবে না (আন-নবাবী, ইয়াহইয়া ইবন শারাফ, আল-মিনহাজ শারহ সহীহ মুসলিম, বৈরুত, দার ইহইয়াইত্ তুরাসিল ‘আরবী, ২য় সংস্করণ, ১৩৯২ হি. ২/১৬, আশ্ শাইখ আস্ সা’দী, তাইসীরুল কারীম, পৃ. ২৯২)।
৪- রাসূলুল্লাহর (সা) চেয়ে অন্য কোনো বস্তু অধিক প্রিয় হলে তার প্রতি কঠোর হুঁসিয়ারী, মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ তা’আলা ঐ ব্যক্তিদেরকে কঠিন শাস্তির হুমকি দিয়েছেন, যারা আল্লাহ তা’আলা, তাঁর রাসূল ও জিহাদের চেয়ে তাদের কাছে বেশি প্রিয় আট শ্রেণীর বস্তু; যেমন, বাপ-দাদা, সন্তানাদি, ভাই-বেরাদার, স্ত্রীগণ, গোত্র-গোষ্ঠী, ব্যবসা-বাজিণ্য, ধন-সম্পদ ও বাড়ি-ঘরকে অধিক ভালোবাসবে ও প্রাধান্য দেবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
قُلْ إِن كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتَجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللهُ لا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ }
“আপনি বলুন! যদি তোমাদের বাপ দাদা, তোমাদের সন্তানেরা, তোমাদের ভ্রাতৃবর্গ, তোমাদের স্ত্রীগণ, তোমাদের গোত্র-বংশ, তোমাদের পঞ্জিভূত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য; যা মন্দা হওয়ার আশঙ্কা কর, এবং তোমাদের মনোমুগ্ধকর বাড়ী-ঘর তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং তাঁর পথে জিহাদের চেয়ে অধিক প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহ তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। বস্তুত আল্লাহ ফাসিকদেরকে হেদায়াত দান করেন না।” [সূরা আত-তওবাহ, আয়াত: ২৪]।
এ আয়াতে সকল মুসলিমের প্রতি এ আদেশ রয়েছে যে, আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলের (সা) ভালোবাসাকে এমন উন্নত স্তরে রাখা ফারয, যে স্তর অন্য কারো ভালোবাসা অতিক্রম করবে না। এ প্রসঙ্গে আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখযোগ্য যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ، وَأَبْغَضَ لِلَّهِ، وَأَعْطَى لِلَّهِ، وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الْإِيمَانَ
“যে ব্যক্তি কারো সাথে শুধু আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব রেখেছে, শত্রুতা রেখেছে আল্লাহর জন্য, অর্থ ব্যয় করে আল্লাহর জন্য এবং অর্থ ব্যয় থেকে বিরত থাকে আল্লাহর জন্য, সে নিজের ঈমানকে পরিপূর্ণ করেছে (সুনান আবি দাউদ ৪/২২০, নং ৪৬৮১, সুনানুত তিরমিযীতেও কিছু শব্দ বেশীসহ অনুরূপ বর্ণনা আছে ৪/২৫১, নং ২৫২১, আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন ইমাম আত-তিরমিযী তার রেওয়ায়েতটি বর্ণনা পর ‘এটি একটি মুনকার হাদীস’ বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু আলবানী ইমাম তিরমিযী বর্ণিত হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।)।”
এ হাদীসের বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহর (সা) ভালোবাসাকে অপরাপর ভালোবাসার উর্ধ্বে স্থান দেওয়া এবং মিত্রতা ও শত্রুতায় আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলের (সা) হুকুমের অনুগত থাকা পরিপূর্ণ ঈমান লাভের পূর্বশর্ত। রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাত ও শারী’আতের সুরক্ষা করা এবং এতে ছিদ্র সৃষ্টিকারী ও ক্ষতিকারী লোকদের প্রতিরোধ করা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসার স্পষ্ট প্রমাণ (কুরআনুল কারীম, বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর ১/৯৫৩)।
এ আয়াতের তাফসীরে মুজাহিদ বলেন, এখানে }حَتَّى يَأْتِيَ اللهُ بِأَمْرِهِ{ ‘নির্দেশ বা সিদ্ধান্ত’ বলতে মাক্কা জয়ের কথা বলা হয়েছে (ইবন জারীর আত-তাবারী, তাফসীরুত তাবারী ১৪/১৭৮।)।
আল-হাসান আল-বাসরী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর এ বাণী, সম্পর্কে বলেন, এখানে ‘নির্দেশ’ অর্থ আল্লাহর ত্বড়িৎ শাস্তি বা গৌণ শাস্তির বিধান, যা থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় নেই(আল-কুরতুবী, তাফসীরুল কুরতুবী ৮/৯৫, আশ-শাইখ আস-সা’দী, তাইসীরুল কারীম, পৃ. ২৯২)।
আবুল কাসিম জারুল্লাহ আয-যামাখশারীর মতে এ আয়াতটি একটি কঠিন আয়াত। এর চেয়ে কঠোর আর কোনো আয়াত দেখা যায় না (তাফসীরুল কাশশাফ, বৈরুত, দারুল মা’রিফাহ, তা. বি. ২/১৮১)।
হাফিয ইবন কাসীর বলেন, আয়াতের মর্মার্থ হলো, এ সকল বস্তু যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে অধিক প্রিয় হয়, তাহলে অপেক্ষা করে দেখ যে, তোমাদের উপর কি ধরণের শাস্তি পতিত হয় (ইবন কাসীর, তাফসীর ইবন কাসীর ৪/১২৪)।
ইমাম আল-কুরতুবী বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) কে ভালোবাসা ফারয। এ আয়াতটি তার প্রমাণ পেশ করছে। এ বিষয়টি নিয়ে উম্মাহর কারো কোনো দ্বিমত নেই। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) কে সকল প্রিয় বস্তুর চেয়ে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভালোবাসতে হবে (তাফসীরুল কুরতুবী, ৮/৯৫, আশ-শাইখ আস্-সা’দী, তাইসীরুল কারীম, পৃ. ২৯২)।
একইভাবে মু’মিনগণ দুনিয়ার স্বার্থের প্রতি বেশি মোহগ্রস্থ হয়ে পার্থিব প্রিয় বস্তুসমূহকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ ও দ্বীন কায়েমের সর্বাত্মক ‘আমল, কার্যক্রম ও চেষ্টা-প্রচেষ্টা ছেড়ে দিলে তারও তড়িৎ শাস্তি অবধারিত। তারা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে এবং অপমান ও অপদস্থ জীবন যাপন করবে। ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) বলতে শুনেছি যে,
إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِينَةِ، وَأَخَذْتُمْ أَذْنَابَ الْبَقَرِ، وَرَضِيتُمْ بِالزَّرْعِ، وَتَرَكْتُمُ الْجِهَادَ، سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ ذُلَّا لَا يَنْزِعُهُ حَتَّى تَرْجِعُوا إِلَى دِينِكُمْ
“যদি তোমরা ‘ঈনা পদ্ধতিতে বেচাকেনা (সুদী কারবার) কর, গাভীর লেজ ধরে থাক, ক্ষেত-খামার নিয়েই সন্তুষ্ট থাক, আর জিহাদ ছেড়ে দাও, তবে আল্লাহ তোমাদের উপর এমন অপমান চাপিয়ে দেবেন যে, যতক্ষণ তোমরা তোমাদের দ্বীনের দিকে ফিরে না আসবে ততক্ষণ সে অপমান তোমাদের থেকে তিনি সরাবেন না (সুনান আবি দাউদ ৩/২৭৪, আল-বাইহাকী, আস্-সুনানুল কুবরা ৫/৫১৬, নং ১০৭০৩, আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)।
আল্লাহ ফাসিকদেরকে হেদায়াত দেন না’ বলে আয়াতটির সমাপ্তি হয়েছে। অর্থাৎ যারা আল্লাহর আদেশকে নিষেধকে অমান্য করে এবং তার বিরুদ্ধাচারণ করে উপর্যুক্ত বস্তুগুলোকে বেশি ভালোবেসেছে, দুনিয়াবী সম্পর্ককে প্রধান্য দিয়ে আত্মীয় স্বজন ও অর্থ- সম্পদকে বুকে জড়িয়ে তাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় নিজ গৃহে আরাম আয়েশ ও ভোগের আশা পোষণ করে আছে, আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জিহাদের আহ্বান আসার পরও সহায়-সম্পত্তি ও ভোগ-বিলাসের লোভে বসে আছে, তারা ফাসিক ও নাফরমান। আর আল্লাহ তা’আলার সাধারণ রীতি হলো, তিনি নাফরমান লোকদের উদ্দেশ্য পূরণ করেন না। তাদেরকে হেদায়াত করেন না। তাদেরকে সফলতা ও সৌভাগ্যের পথে পরিচালিত করেন না(আবু বাকর আল-জাযাইরী, জাবির ইবন মূসা, আইসারুত-তাফাসীর লিকালামিল ‘আলিয়ি্যল কাবীর, সৌদি ‘আরব, আল-মদীনাহ আল-মুনাওয়ারাহ, ৫ম সংস্করণ, ১৪২৪ হি. ২/৩৫৩, কুরআনুল কারীম, বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর ১/৯৫৪)।
৫- রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় তার প্রতি সাহাবীগণের ভালোবাসার নমুনা, করুণাময় মহান আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রাসূলের (সা) সঙ্গী-সাথী হিসেবে তার সাহাবীগণ (রা) কে নির্বাচন করেছেন। তাই তারা আল্লাহ তা’আলার বিশেষ অনুগ্রহে রাসূলুল্লাহর (সা) নবুওয়াত ও রিসালাতের যাবতীয় বিধি-বিধান নিজেরা গ্রহণ করেছেন ও যথাযথভাবে সেগুলোকে বাস্তবায়ন করেছেন। ঈমান ও ইসলামের সকল দাবী কাঙ্খিত মানে পরিপূর্ণভাবে পালন করেছেন। এজন্য তারা ছিলেন রাসূলুল্লাহকে (সা) সর্বক্ষেত্রে মান্য করা, আনুগত্য করা ও অনুসরণ করার ক্ষেত্রে নমুনা। মহান আল্লাহ তাদের মতো ঈমান আনার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ
“আর যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা ঈমান আন যেমন লোকেরা ঈমান এনেছে।” [সূরা আল বাকারা, আয়াত: ১৩]।
এখানে ‘নাস’ শব্দ দ্বারা সাহাবীগণকেই বোঝানো হয়েছে। কেননা আল-কুরআন নাজিলের যুগে তারাই ঈমান এনেছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি যেমন ঈমান আনা, তাকে ভালোবাসা এবং তার অনুসরণ-আনুগত্য করা প্রয়োজন, তারা তার স্বাক্ষর রেখেছেন। সাহাবীগণ রাসূলের (সা) সাক্ষাত লাভে ধন্য ছিলেন। তাই তার প্রতি তাদের ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের পরিপূর্ণ সুযোগ ছিল, তারা তার সদ্ব্যবহার করেছেন, এর পরিপূর্ণ হক আদায় করেছেন। এক্ষেত্রে তাদের কোনো প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়নি। আল্লাহ তা’আলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। আল্লাহ ‘আয্যা ও জাল্লা বলেন,
رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ
“আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট।” [সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ১১৯]।
রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় সাহাবীগণ (রা) এর কতিপয় উদাহরণ তুলে ধরা হলো,
১- ‘আলী ইবন আবি তালিব (রা) কে জিজ্ঞাসা করা হলো, রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতি আপনাদের ভালোবাসা কেমন ছিল? তিনি এ প্রশ্নের জবাবে বলেন
, كَانَ واللَّهِ أَحَبَّ إِلَيْنَا مِنْ أَمْوَالِنَا وَأَوْلادِنَا وَآبَائِنَا وَأُمَّهَاتِنَا وَمِنَ الْمَاءِ البَارِدِ عَلَى الظُّمَإِ
“আল্লাহর শপথ! তিনি আমাদের কাছে আমাদের ধন সম্পদ, আমাদের সন্তান-সন্ততি, আমাদের পিতৃবর্গ, আমাদের মায়েদের এবং পিপাসার্ত অবস্থায় ঠান্ডা পানির চেয়েও অধিক প্রিয় ছিলেন (আবুল ফাযল আল-কাযী ‘ইয়ায, আশশিফা বিতা’রীফি হুকুকিল মুস্তাফা, টিকা সংযোজন, আহমদ ইবন মুহাম্মাদ আশ্-শুম্মুনী, প্রকাশক, দারুল ফিকর, প্রকাশ কাল, ১৪০৯ হি. ২/২২। শামসুদ্দীন মুহাম্মা ইবন
الْمَجَالِسُ الوَعْظِيَّةُ فِي شَرْحِ أَحَادِيثِ خَيْرِ الْبَرِيَّةِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ – وَسَلَّمَ مِنْ صَحِيحِ الإِمَامِ الْبُخَارِي ‘ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪২৫ হি. ১/৪০৮। সম্পাদনা, আহমাদ ফাতহী, বৈরুত, প্রকাশক, দারুল কুতুবিল)”
২ -মক্কার কাফিরদের হাতে বন্দী সাহাবী যায়েদ ইবনুদ্ দাসিনা (রা) কে যখন হত্যার উদ্দেশ্যে কা’বার আঙ্গিনা থেকে বের করে নেওয়া হয়, তখন আবু সুফইয়ান ইবন হারব (রা) (তিনি তখন মুশরিক ছিলেন) তাকে জিজ্ঞাসা করেন, হে যায়েদ! আল্লাহর নামে তোমাকে বলছি, তুমি কি এটা পছন্দ কর যে, মুহাম্মাদ এ মুহূর্তে আমাদের নিকট তোমার স্থানে থাকুক, আমরা তাকে হত্যা করি, বিনিময়ে তুমি মুক্ত হয়ে তোমার পরিবারে ফিরে যাও? তিনি উত্তরে বলেন:
وَاللَّهِ مَا أُحِبُّ أَنَّ مُحَمَّدًا الآن في مَكَانِهِ الَّذِي هُوَ فِيْهِ تُصِيبُه شَوْكَةٌ تُؤْذِيهِ وَإِنِّي جَالِسٌ فِي أَهْلِي
আল্লাহর শপথ! এখন মুহাম্মাদ যেখানে আছেন, সেখানে থেকেই তার শরীরে কাঁটার আঁচর লেগে তিনি কষ্ট পাবেন, আর আমি আমার পরিবারে বসে থাকবো, আমি তা আদৌ পছন্দ করি না। তখন আবু সুফইয়ান বলেন,
مَا رَأَيْتُ مِنَ النَّاسِ أَحَدًا يُحِبُّ أَحَدًا كَحُبِّ أَصْحَابِ مُحَمَّدٍ مُحَمَّدًا
“আমি মানুষের মধ্যে কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তিকে এমন ভালোবাসতে দেখিনি, যেমন মুহাম্মাদের সাথীগণ মুহাম্মাদকে ভালোবাসে (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, সম্পাদনা, মুস্তাফা আস্-সাকা ও তার সঙ্গী, প্রকাশক, শারিকাতু মাকতাবাহ ওয়া মাতবা’আতু মুস্তাফা আল-বাবী আল-হালাবী, ২য় সংস্করণ, ১৩৭৫ হি, ২/১৭২, হাফিয ইবন কাছীর, আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, সম্পাদনা: ‘আব্দুর রহমান আল লাদকী ও তার সঙ্গী, বৈরুত, দারুল মা’রিফাহ, ১৯৯৮ ঈ, ৪/৪৪৫)।”
৩- আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আবু সুফইয়ান বাহিনীর অভিযানের কথা শুনে সাহাবীগণের সাথে পরামর্শ করেন। এ বিষয়ে সর্ব প্রথমে আবু বকর তারপর ‘উমার (রা) আলোচনা করেন। কিন্তু নবী (সা) তাদের কথার দিকে তেমন গুরুত্ব দিলেন না। তখন সা’আদ ইবন ‘উবাদাহ (রা) দাঁড়িয়ে বলেন,
إِيَّانَا تُرِيد يَا رَسُول الله ! وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ أَمَرْتَنَا أَنْ تُخيضهَا لأَحْضْنَاهَا، وَلَوْ أَمَرْتَنَا أَنْ نَضْرِبَ أَكْبَادَهَا إِلَى بَرْكِ الْعِمَادِ لَفَعَلْنَا
“হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাদের কথা শোনার আশা করছেন? যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ! আপনি যদি আমাদেরকে আমাদের ঘোড়াগুলো নিয়ে পানিতে ঝাঁপ দিতে বলেন আমরা তাই করবো। আর যদি বারকুল গিমাদ নামক স্থানে ঘোড়াগুলোকে দাবড়িয়ে নিয়ে যেতে বলেন আমরা তাই করবো (সহীহ মুসলিম ৩/১৪০৩, নং ১৭৭৯, মুসনাদ আহমাদ ২১/ ২১-২২, নং ১৩২৯৬)।”
৪- সা’আদ ইবন মু’আয (রা) বদর যুদ্ধের দিন নবী (সা) কে বলেন, হে আল্লাহর নবী! আমরা আপনার জন্য একটি উচ্চ আসন তৈরি করে দেই, সেখানে আপনি অবস্থান করবেন। আপনার জন্য বাহন প্রস্তুত করে রাখবো। তারপর আমরা দুশমনের মোকাবেলায় অবতীর্ণ হব। আল্লাহ যদি আমাদেরকে শত্রুদের উপর বিজয় দান করেন, এটাইতো আমরা চাই। আর যদি অন্য কিছু ঘটে যায়, তাহলে আপনি আপনার বাহনে করে আমাদের লোকদের সাথে মিলিত হবেন। কিছু লোক তো পেছনে রয়েছে, তাদের চেয়ে আমরা আপনাকে অধিক ভালোবাসি এ দাবী করিনা। তারা যদি ধারণাও করতো যে আপনাকে যুদ্ধের মুখোমুখী হতে হবে তাহলে তারা অবশ্যই আপনাকে ছেড়ে পেছনে পড়ে থাকতো না। আল্লাহ তাদের দ্বারা আপনাকে শত্রুর হাত থেকে হেফাযত করবেন। তারা আপনার হিতাকাঙ্খী এবং আপনার সাথে জিহাদে শরীক হবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তার প্রশংসা করেন এবং তার জন্য কল্যাণের দু’আ করেন (সীরাত ইবন হিশাম ১/৬২০-৬২১, সাফীউর রহমান মোবারকপুরী, আর রাহীকুল মাখতুম, বৈরুত, দারু মাকতাবাতিল মুতানাব্বী, তা. বি. পৃ. ১৯১-১৯২)।
৫- রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার সর্বোচ্চ নিদর্শন শুধু পুরুষ সাহাবীগণই রাখেননি, মহিলা সাহাবীগণও এক্ষেত্রে অনন্য স্বাক্ষর রেখেছেন। আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, ‘উহুদের যুদ্ধে মদীনাবাসীরা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। তারা বলেন, মুহাম্মাদ (সা) নিহত হয়েছেন। এ খবরে সারা মদীনায় কান্নার রব পড়ে যায়। তখন জনৈক আনসারী মহিলা প্রস্তুত হয়ে উহুদের দিকে বের হয়ে পড়েন। তারপর তাকে তার ছেলে, পিতা, স্বামী ও ভাইয়ের মুত্যু সংবাদ প্রদান করা হয়। বর্ণনাকারী বলেন, সর্ব প্রথম কার মৃত্যু সংবাদ দেওয়া হয়েছে তা আমার জানা নেই। তাদের কোনো একজনের কাছে গিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, কে এ ব্যক্তি? লোকেরা বলল, আপনার পিতা, আপনার ভাই, আপনার স্বামী, আপনার ছেলে। মহিলা তখন প্রশ্ন করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কেমন আছেন? তারা বলেন, তিনি আপনার সামনেই আছেন। অতঃপর আনসারী মহিলা রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে গিয়ে তার কাপড়ের এক কোণা ধরে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক! আপনি বিপদ মুক্ত অবস্থায় আছেন এটাই আমার শান্ত্বনা, আমি আর কোনো কিছুর পরওয়া করি না ( আত্-তাবারানী, আল মু’জামুল আওসাত, ৭/২৮০, আবু না’ঈম, আহমাদ বিন ‘আব্দুল্লাহ আল আসবাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া, বৈরুত, দারুল কিতাবিল ‘আরাবী, ৪র্থ সংস্করণ, ১৪০৫ হি., ২/৭৬। আল-হাইসামী তার মাজমা’উষ যাওয়াইদে ৬/১১৫ উল্লেখ করেছেন যে, এ হাদীসের সকল বর্ণনাকারীই নির্ভরযোগ্য। তবে আত-তাবারানী তার শায়খ মুহাম্মাদ বিন শু’আয়েব থেকে বর্ণনা করেছেন তিনি একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি)।
অন্য আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, তিনি বলেন,
كُلُّ مُصِيبَةٍ بَعْدَكَ جَلل
‘আপনার পরে সকল বিপদই সহজ ( সীরাত ইবন হিশাম ২/৯৯, আল-বাইহাকী, আহমাদ ইবনুল হুসাইন, দালায়িলুন নবুওয়াহ, বৈরুত, দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪০৫ হি. ৩/৩০২।) অর্থাৎ, আপনি বেঁচে আছেন এটাই বড় প্রশান্তি, অন্য সকল বিপদ-মুসীবত ও দুঃখ, কষ্ট আমার কাছে অতি তুচ্ছ।
খ. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি অসাধারণ সম্মান-মর্যাদা, সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলুল্লাহকে (সা) মর্যাদার উচ্চ আসনে রাখতেন। তারা তাকে অসাধারণ সম্মান করতেন, শ্রদ্ধা করতেন। এ ক্ষেত্রেও তারা ছিলেন অতুলনীয়।
কোনো মানুষ অন্য কোনো মানুষকে এতো ভালোবাসা দিতে পারে, শ্রদ্ধা জানাতে পারে ও সম্মান করতে পারে তা যেন কল্পনাতীত। কিন্তু আল্লাহর নবী (সা) এর সাহাবীগণ সে অসম্ভব বিষয়কে সম্ভব করেছিলেন। কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন। তারা তাকে কতটা সম্মান করতেন, তার কিছু নমুনা উদাহরণ স্বরূপ তুলে ধরা হলো,
১. মর্যাদার কারণে স্থির চোখে রসূলুল্লাহর দিকে না তাকানো, অত্যাধিক মর্যাদা-সম্মান ও শ্রদ্ধার কারণে কোনো কোনো সাহাবী রাসূলুল্লাহর (সা) দিকে চোখ তুলে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকতেন না। তাদের মধ্যে ‘আমর ইবনুল ‘আস (রা) অন্যতম। তিনি নিজেই নিজের সম্পর্কে বলেন,
وَمَا كَانَ أَحَدٌ أَحَبَّ إِلَيَّ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَا أَجَلَّ فِي عَيْنِي مِنْهُ، وَمَا كُنتُ أُطِيقُ أَنْ أَمْلأَ عَيْنَيَّ مِنْهُ إِجلالاً لَهُ، وَلَوْ سُئِلْتُ أَنْ أَصِفَهُ مَا أطفتُ؛ لأني لم أَكُنْ أَمْلأُ عَيْنَى مِنْهُ. وَلَوْ مُتُ عَلَى تِلْكَ الْحَالِ لَرَجَوْتُ أَنْ أَكُونَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ
প্রকৃত পক্ষে আমার নিকট রাসূলুল্লাহর (সা) চেয়ে আর কেউ অধিক প্রিয় ছিল না এবং আমার চোখে তার চেয়ে অধিক আর কেহ সম্মানিত ছিল না। তার প্রতি অত্যাধিক সম্মানের কারণেই আমি কখনো চোখ ভরে তার দিকে তাকাতে পারতাম না। আমাকে কেহ তার মুখমন্ডল সম্পর্কে বর্ণনা দিতে বললে আমি বর্ণনা দিতে সক্ষম নই; কারণ আমি তার দিকে দু-চোখ ভরে কখনো তাকাইনি। আমি যদি এ অবস্থায় মুত্যু বরণ করি তাহলে আশা করি আমি জান্নাতীদের একজন হব (সহীহ মুসলিম, ১/১১২, নং ১২১, বাবু কাওনিল ইসলাম ইয়াহদিমু মা কাবলাহু) । আনাস (রা) থেকে বর্ণিত যে,
كَانَ يَخْرُجُ عَلَى أَصْحَابِهِ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَهُمْ جُلُوسٌ وَفِيهِمْ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ فَلَا يَرْفَعُ إِلَيْهِ أَحَدٌ مِنْهُمْ بَصَرَهُ إِلَّا أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ فَإِنَّهُمَا كَانَا يَنْظُرَانِ إِلَيْهِ وَيَنْظُرُ إِلَيْهِمَا وَيَتَبَسَّمَانِ إِلَيْهِ وَيَتَبَسَّمُ إِلَيْهِمَا
রাসূলুল্লাহ (সা) তার মুহাজির ও আনসার সাহাবীদের কাছে তাদের বসা অবস্থায় উপস্থিত হতেন। আর তাদের মধ্যে আবু বকর ও ‘উমার আছেন। তখন আবু বকর ও ‘উমার ছাড়া তাদের মধ্যে আর কেউ তার দিকে চোখ তুলে তাকাতেন না। বস্তুত তারা দু’জনই তার দিকে তাকাতেন আর তিনিও তাদের দিকে তাকাতেন, তারা তার সাথে মুচকি হাসি দিতেন এবং তিনিও তাদের সাথে মুচকি হাসি দিতেন (সুনানুত তিরমিযী ৬/৫৩, নং ৩৬৬৮, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ১/২০৯, নং ৪১৮, ইমাম আত-তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেছেন যে, এটি একটি গরীব হাদীস, আলবানী হাদিসটিকে যা’য়ীফ বলেছেন)।
২. স্থির চিত্ত ও শরীরে রাসূলুল্লাহর (সা) কথা শোনা, রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে বসা এবং তার কথা শোনার সময় সাহাবীগণের অবস্থা এমন ছিল যে, তারা কোনো প্রকার নড়া-চড়া করতেন না, অমনোযোগী হতেন না, পরস্পর কথাবার্তা বলতেন না। আদব, শিষ্টাচার ও গুরুগাম্ভির্যভাব বজায় রাখতেন। তাদের বিস্ময়কর নিরিবিলি পরিবেশ ও অবস্থার বর্ণনা বিভিন্ন হাদীসে বিবৃত হয়েছে। আবু সা’ঈদ আল-খুদরী (রা) বলেন,
وَسَكَتَ النَّاسُ كَأَنَّ عَلَى رُؤُوسِهِمُ الطَّيْرُ
আর লোকেরা পিনপতন নীরবতা অবলম্বন করলো। মনে হয় যেন তাদের মাথার উপর পাখি বসে রয়েছে (সহীহুল বুখারী ৪/২৬, নং ২৮৪২, ফাযলুন নাফাকাহ ফী সাবীলিল্লাহ পরিচ্ছেদ )। উসামাহ ইবন শারীক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَصْحَابَهُ كَأَنَّمَا عَلَى رُءُوسِهِمُ الطَّيْرُ
আমি নবী (সা) এর কাছে এসেছি আর তার সাহাবীগ (তার কাছে) এমনভাবে আছেন, তাদের মাথার উপর যেন পাখি বসে আছে (সুনান আবি দাউদ ৩/৪, নং ৩৮৫৫, মুসনাদ আহমাদ ৩০/৩৯৫, ১৮৪৫৪, আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন )।
বুরাইদাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كُنَّا إِذَا فَعَدْنَا عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ نَرْفَعْ رُؤُوسَنَا إِلَيْهِ إِعْظَامًا لَهُ
আমরা যখন রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে বসতাম, তখন আমরা তার সম্মানে আমাদের মাথা তার দিকে উঠাতাম না ( আল- হাকিম, আল মুস্তাদরাক ১/২০৮, নং ৪১৫, আল-বাইহাকী, আহমাদ ইবনুল হুসাইন, আল-মাদখাল ইলাস-সুনানিল কুবরা, সম্পাদনা, ড. মুহাম্মাদ আল-আ’ঘুষী, আল-কুয়েত, প্রকাশক, দারুল খুলাফা লিলকিতাবিল ইসলামী, তা.বি. ১/৩৮১, নং ৬৫৮। আল- হাকিম বলেন, ইমাম আল-বুখারী ও ইমাম মুসলিমের শর্তানুযায়ী হাদীসটি সহীহ, যদিও তারা এটি বর্ণনা করেননি। আমি এ হাদীসে কোন দূর্বলতা দেখিনা। হাফিয আয-যাহাবী তার সাথে ঐকমত্য পোষণ করেছেন )।
৩. রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে অতি নীচু স্বরে কথা বলা, সাহাবায়ে কিরাম রাদি আল্লাহু আনহুম অতি মর্যাদা ও সম্মানের কারণে রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে আদবের সাথে বসে তার কথা শুনতেন। কথা বলার খুবই প্রয়োজন হলে ধীরস্থির ও শান্ত-শিষ্টভাবে কথা বলতেন। বিশেষ করে যখন এ আয়াত নাজিল হলো,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ}
“হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কন্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল তার সাথে সেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলোনা; তাহলে তোমাদের কর্ম বিনষ্ট হয়ে যাবে অথচ তোমরা অনুভব করতে পারবে না।” [সূরা আল-হুজরাত, আয়াত: ২]
এ আয়াতে আল্লাহ তা’আলা রাসূলুল্লাহর (সা) মজলিসের আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আর সাবধান করা হয়েছে যে, তার সাথে কথা বলতে গিয়ে বা তাকে সম্বোধন করতে গিয়ে কেউ যেন সাধারণ মানুষের সাথে কথাবার্তা ও সম্বোধনের মতো মনে না করে বসে। সে মতে সাহাবায়ে কিরামের অবস্থা আরো বদলে যায়। ‘আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবাইর রাদি
আল্লাহ ‘আনহুম বলেন,
فَمَا كَانَ عُمَرُ يَسْمَعُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعْدَ هَذِهِ الْآيَةِ حَتَّى يَسْتَفْهِمَهُ
এ আয়াত নাজিল হওয়ার পর ‘উমার রাসূলুল্লাহর (সা) সম্মুখে এত নীচুস্বরে কথা বলতেন যে, তিনি শুনতে পেতেন না, তাই বুঝার জন্য তিনি তাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করতেন
( সহীহুল বুখারী ৬/১৩৭, ৪৮৪৫, বাবু লা তারফা’উ আসওয়াতাকুম, তাফসীর ইবন কাসীর ৭/৩৬৫)।
সাহাবী সাবিত ইবন কায়সের গলার আওয়াজ স্বভাবগতভাবেই উঁচু ছিল। এ আয়াত শুনে তিনি ভয় পেয়ে রাসূলের (সা) সামনে আসাই বন্ধ করে দিলেন। তার সকল নেক ‘আমলের প্রতিদান নষ্ট হয়ে গেছে, অতএব তিনি জাহান্নামী হবেন ভেবে কান্না করতে লাগলেন। পরে রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে অভয় দিয়ে বলেছেন, ‘তুমি জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত’। আনাস ইবন মালিক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এই আয়াত যখন নাজিল হলো, তখন সাবিত ইবন কায়স তার ঘরে বসে রইলেন এবং বলেন,
أَنَا مِنْ أَهْلِ النَّارِ، وَاحْتَبَسَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَسَأَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَعْدَ بْنَ مُعَادٍ، فَقَالَ: يَا أَبَا عَمْرٍو، مَا شَأْنُ ثَابِتٍ؟ اشْتَكَى؟ قَالَ سَعْدٌ: إِنَّهُ لَجَارِي، وَمَا عَلِمْتُ لَهُ بِشَكْوَى، قَالَ: فَأَتَاهُ سَعْدٌ، فَذَكَرَ لَهُ قَوْلَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ ثَابِتٌ
أُنْزِلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ، وَلَقَدْ عَلِمْتُمْ أَنِّي مِنْ أَرْفَعِكُمْ صَوْتًا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَنَا مِنْ أَهْلِ النَّار فَذَكَرَ ذَلِكَ سَعْدٌ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: بَلْ هُوَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ
আমি জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত এবং নিজেকে নবী (সা) থেকে আবদ্ধ করে রাখলেন। নবী (সা) সা’আদ ইবন মু’আযকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু ‘আমর! সাবিতের কি হয়েছে, সে কি অসুস্থ? সা’আদ বলেন, সে তো আমার প্রতিবেশী। সে অসুস্থ বলে তো আমি জানি না। তারপর সা’আদ এসে রাসূলুল্লাহর (সা) কথা তাকে বললেন। তখন সাবিত বলেন, আপনারা তো জানেন যে, এই আয়াত নাজিল হয়েছে আর আমি তো আপনাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে অধিক উঁচুস্বরে কথা বলি। অতএব আমি জাহান্নামীদের মধ্যে শামিল। তখন সা’আদ বিষয়টি নবী (সা) কে অবহিত করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘বরং সে জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত’ ( সহীহ মুসলিম ১/১১০, নং ১১৯)।
এ হাদীসটির অন্য বর্ণনায় সা’আদ ইবন মু’আয’ এর নাম উল্লেখ নেই, বরং জনৈক সাহাবীর কথা উল্লেখ রয়েছে (সহীহুল বুখারী ৬/১৩৭, নং ৪৮৪৬, মুসনাদ আহমাদ ১৯/৩৯১, নং ১২৩৯৯)।
ইবন কাসীর উল্লেখ করেছেন যে, এ আয়াত নাজিলের সময় সা’আদ ইবন মু’আয (রা) জীবিত ছিলেন না। তাই তিনি না হয়ে অন্য কোনো সাহাবী হবেন (তাফসীর ইবন কাসীর ৭/৩৬৭)।
উমাইয়া শাসক আবু জা’ফর একবার মাসজিদে নববীতে ইমাম মালিকের সাথে তর্কবিতর্কে লিপ্ত হলেন। তখন ইমাম মালিক তাকে বললেন, হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনি এই মাসজিদে উঁচুস্বরে কথা বলবেন না।
কেননা আল্লাহ তা’আলা একদল মানুষকে (সাহাবীগণকে) আদাব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে বলেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ }
“তোমরা তোমাদের কণ্ঠস্বরকে নবীর কন্ঠস্বরের চেয়ে উঁ করো না।” [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ২]। আবার কিছু মানুষের প্রশংসা করে বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يَغُضُّونَ أَصْوَاتَهُمْ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ أُولَئِكَ الَّذِينَ امْتَحَنَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ لِلتَّقْوَى لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ}
নিশ্চয় যারা আল্লাহর রাসূলের (সা) সামনে তাদের আওয়াজ নীচু করে, আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরীক্ষা করে নিয়েছেন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।” [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৩]।
আর কিছু লোককে তিরস্কার করে বলেছেন,
{ إِنَّ الَّذِينَ يُنَادُونَكَ مِنْ وَرَاءِ الْحُجُرَاتِ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ }
“নিশ্চয় যারা হুজুরাসমূহের পেছনে থেকে আপনাকে উচ্চস্বরে ডাকে, তাদের অধিকাংশই মূর্খ।” [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৪]।
নিশ্চয় তার মৃত্যুর পরে তার মান-সম্মান তার জীবদ্দশায়ের মান-সম্মানের ন্যায় একই রকম। তখন আবু জা’ফর দূর্বল হয়ে গেলেন (আল-কাযী ‘ইয়ায, আশ-শিক্ষা বিতা’রীফে হুকুকিল মুস্তাফা ২/৪১)।
অনুরূপভাবে রাসূলের (সা) কোনো সুন্নাত সম্পর্কে জানার পর তা মানতে অনীহা প্রকাশ করা কিংবা সামান্যতম গড়িমসি প্রদর্শন করাও বে-আদবী এবং এ আয়াতের নিষেধাজ্ঞার অধীন। রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যুর পর তার হুজরা ও তার কবরের সামনে উঁচু গলায় কথাবার্তা ও সালাম দেওয়াও তার সাথে আদব ও শিষ্টাচার পরিপন্থী (তাফসীর ইবন কাসীর ৭/৩৬৪, ৩৬৮, ‘আশ-শিফা ২/৪১)।
৪. রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে বিনয় ও সর্বোচ্চ আদব মিশ্রিত আচরণ,
রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাহাবীগণ (রা) এর সর্বোচ্চ আদব ও বিনয়ী আচরণের কথাও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তার প্রতি আদব, বিনয়ী আচরণ ও ভালোবাসা প্রসঙ্গে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় কুরাইশ দলের বিজ্ঞ কূটনীতিবিদ ‘উরওয়াহ্ ইবন মাস’উদ আস-সাকাফী (রা) এর সাক্ষ্যদান উল্লেখযোগ্য। এ সন্ধির সময় তিনি নবী (সা) এর সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শেষ করে কুরাইশ নেতৃবর্গের নিকট প্রতিবেদন পেশ কালে বলেন,
أَي قَوْمِ وَاللَّهِ! لَقَدْ وَقَدْتُ عَلَى الْمُلُوكِ، وَوَفَدْتُ عَلَى قَيْصَرَ وَكِسْرَى وَالنَّجَاشِيِّ، وَاللَّهِ! إِنْ رَأَيْتُ مَلِكًا قَطُّ يُعَظِمُهُ أَصْحَابُهُ مَا يُعَظِمُ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُحَمَّدًا، وَاللَّهِ إِنْ تَنَخَمَ نُخَامَةً إِلَّا وَقَعَتْ فِي كَفِّ رَجُلٍ مِنْهُمْ فَدَلَكَ بِمَا وَجْهَهُ وَجِلْدَهُ، وَإِذَا أَمَرَهُمْ ابْتَدَرُوا أَمْرَهُ
، وَإِذَا تَوَضَّأَ كَادُوا يَقْتَتِلُونَ عَلَى وَضُوئِهِ، وَإِذَا تَكَلَّمَ خَفَضُوا أَصْوَاتَهُمْ عِنْدَهُ، وَمَا يُحِدُّونَ إِلَيْهِ النَّظَرَ تَعْظِيمًا لَه
“হে আমার জাতি! আল্লাহর শপথ! আমি অনেক বাদশাহর নিকট গিয়েছি। আমি কায়সার, কিসরা, ও নাজ্জাশীর নিকটও গমন করেছি। আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ (সা) এর সাথীগণ মুহাম্মাদকে যে রকম ভালোবাসে কোনো বাদশাহকে তার সাথীরা সে রকম ভালোবাসে, এমন আমি দেখিনি।
আল্লাহর শপথ! যদি তিনি থুথু ফেলেন, সে থুথু তাদের কারো না কারো হাতের মধ্যে পড়ে। আর সে ব্যক্তি হাত দিয়ে তার মুখমন্ডল এবং শরীর মালিশ করে নেয়। তিনি যদি তাদেরকে কোনো নির্দেশ দেন, তাহলে তারা তা পালন করার জন্য দ্রুত অগ্রসর হয়। আর যখন তিনি ওযু করেন তখন তো মনে হয় তারা যেন তার ওযুর পানি পাওয়ার জন্য রীতিমতো যুদ্ধ শুরু করে দেয়। তিনি যখন কথা বলেন, তারা তখন তার সামনে নিম্ন স্বরে কথা বলে। তার সম্মানার্থে তারা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায় না (সহীহুল বুখারী ২/৯৭৪, নং ২৫৮১, বাবুশ শুরুত ফিল জিহাদ ওয়াল মুসালাহাহ )।”
৫. রাসূলুল্লাহর (সা) বিছানা মুশরিক পিতার জন্য অপছন্দ করা, আবু সুফইয়ান (রা) হুদাইবিয়া সন্ধি নবায়ন উপলক্ষে মদীনায় গিয়ে তার কন্যা উম্মুল মুমিনীন উম্ম হাবীবাহ (রা)কে দেখতে তার ঘরে যান। তিনি তার গৃহে প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহর (সা) বিছানার উপর বসতে উদ্যত হন। এমন সময় তার কন্যা বিছানাটি গুটিয়ে ফেলেন। আবু সুফইয়ান বলেন, হে আমার কন্যা! তুমি কি আমার জন্য এ বিছানাকে অপছন্দ করছো? নাকি বিছানার জন্য আমাকে অপছন্দ করছো? তিনি উত্তরে বলেন,
هُوَ فِراشُ رَسولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنْتَ مُشْرِكٌ نَجَسٌ، فَلَمْ أُحِبُّ أَنْ تَجْلِسَ عَلَى فِرَاشِهِ
এটা রাসূলুল্লাহর (সা) বিছানা। আর আপনি মুশরিক, অপবিত্র। সুতরাং আপনি তাঁর বিছানায় বসুন তা আমি পছন্দ করি না (সীরাত ইবন হিশাম২/৩৯৬, ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৪/২৮০, ও ইবন হাজর আল-‘আসকালানী, আল-ইসাবাহ, সম্পাদনা, ‘আলী মুহাম্মাদ আল- বাজাবী, বৈরুত, দারুল জীল, ১ম সংস্করণ, ১৪১২ হি.), ৭/৬৫৩ )।
৬. রাসূলুল্লাহর (সা) সম্মানে পাথর, গাছ ও পাহাড়ের সাজদাহ ও সালাম প্রদান, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি শুধু তার প্রিয় সাহাবীগণ (রা)ই সম্মান প্রদর্শণ করতেন এমন নয়। বরং গাছ-পালা ও পাহাড়-পবর্ত তার সম্মানে তাকে সালাম দিতেন। জাবির ইবন সামুরাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
إلى الأَعْرِفُ حَجَرًا بِمَكَّةَ كَانَ يُسَلِّمُ عَلَى قَبْلَ أَنْ أُبْعَثَ إِنِّي لَأَعْرِفُهُ الآن
আমি মক্কায় অবস্থিত একটি পাথরকে চিনি, যে পাথরটি আমি রাসূল হিসেবে প্রেরীত হওয়ার পূর্বে আমাকে সালাম দিত। আমি এখনও নিশ্চিতভাবেই সে পাথরটিকে চিনি-জানি (সহীহ মুসলিম ৪/১৭৪২, নং ২২৭৭, মুসনাদ আহমাদ ৫/৮৯, নং ২০৮৬০, ৫/৯৫, নং ২০৯৩১, সুনানুত তিরমিযী ৫/৫৯২, নং ৩৬২৪)।
‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, বনু ‘আমির গোত্রের জনৈক ব্যক্তি নবী (সা) এর কাছে আসল। মনে হয় সে যেন তার চিকিৎসা করতে চায়, অতঃপর সে বলে, হে মুহাম্মাদ! আপনি তো অনেক কিছু বলেন, আমি কি আপনাকে চিকিৎসা করব? বর্ণনাকারী বলল, তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে আল্লাহর দিকে দা’ওয়াত দিলেন তারপর বললেন,
هَلْ لَكَ أَنْ أُرِيَكَ آيَةً؟ وَعِنْدَهُ نَخْلٌ وَشَجَرٌ، فَدَعَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِذْقًا مِنْهَا، فَأَقْبَلَ إِلَيْهِ وَهُوَ يَسْجُدُ وَيَرْفَعُ رَأْسَهُ، وَيَسْجُدُ وَيَرْفَعُ رَأْسَهُ حَتَّى انْتَهَى إِلَيْهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَامَ بَيْنَ يَدَيْهِ، ثُمَّ قَالَ لَهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ارْجِعْ إِلَى مَكَانِكَ، فَقَالَ الْعَامِرِيُّ: وَاللَّهِ، لَا
أُكَذِّبُكَ بِشَيْءٍ تَقُولُهُ أَبَدًا، ثُمَّ قَالَ : يَا آلَ عَامِرِ بْنِ صَعْصَعَةَ، وَاللَّهِ لَا أُكَذِّبُهُ بِشَيْءٍ
‘আমি কি তোমাকে নিদর্শন দেখাব’? আর তার নিকটেই খেজুর গাছসহ অন্যান্য গাছ ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) সেগুলো থেকে একটি খেজুর গাছকে ডাক দিলেন। সেটি তার দিকে একবার সাজদারত, আবার মাথা তোলা, আবার সাজদারত এবং মাথা তোলা অবস্থায় শেষ পর্যন্ত তার (সা) এর কাছে আসল এবং তার সামনে দাঁড়ালো। তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) তার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তুমি তোমার জায়গায় ফিরে যাও’।
তখন ‘আমিরী গোত্রের লোকটি বলল, আল্লাহর শপথ! আপনি যাই বলেন আর কখনই আমি সে বিষয়ে আপনাকে মিথ্যা প্রতি পন্ন করবো না। তারপর সে বলল, হে ‘আমির ইবন সা’আসা’আহ গোত্রের লোকেরা! আল্লাহর শপথ! তাকে আমি কোনো বিষয়েই মিথ্যা প্রতিপন্ন করবো না (মুহাম্মাদ ইবন হিব্বান, সহীহ ইবন হিব্বান, সম্পাদনা, শু’আইব আল- আরনাউত, বৈরুত, মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, ২য় সংস্করণ, ১৪১৪হি, ১৪/৪৫৩, নং ৬৫২৩, আহমাদ ইবন ‘আলী, মুসনাদ আবু ইয়া’লা, সম্পাদনা, হুসাইন সালীম আসাদ, দামেশক, দারুল মা’মূন, ১ম সংস্করণ, ১৪০৪হি, ৪/২৩৬, সম্পাদক শু’আইব আল-আরনাউত এবং হুসাইন সালীম হাদীসটির সানাদ সহীহ বলেছেন, আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন )।
আবু মূসা আল-আশ’আরী (রা) বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন তার চাচা আবু তালিবসহ কুরাইশদের বাণিজ্য কাফিলার সাথে সিরিয়ার দিকে বের হয়েছিলেন, পথিমধ্যে জনৈক পাদ্রী তার সম্পর্কে বলেছিলেন,
هَذَا سَيِّدُ العَالَمِينَ، هَذَا رَسُولُ رَبِّ العَالَمِينَ، يَبْعَثُهُ اللَّهُ رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ، فَقَالَ لَهُ أَشْيَاخٌ مِنْ قُرَيْشٍ مَا عِلْمُكَ، فَقَالَ: إِنَّكُمْ حِينَ أَشْرَفْتُمْ مِنَ العَقَبَةِ لَمْ يَبْقَ شَجَرٌ وَلَا حَجَرٌ إِلَّا خَرَّ سَاجِدًا وَلَا يَسْجُدَانِ إِلَّا لِنَبِي، وَإِنِّي أَعْرِفُهُ بِخَاتَمِ النُّبُوَّةِ أَسْفَلَ مِنْ غُضْرُوفِ كَيْفِهِ مِثْلَ التَّفَّاحَةِ
তিনি তো বিশ্বজগতের নেতা, তিনি তো বিশ্বজগতের রবের রাসূল, আল্লাহ তাকে বিশ্বজগতের করুণা করে প্রেরণ করেছেন। তখন কুরাইশ নেতৃবর্গ তাকে বলল, আপনি কিভাবে জানলেন? তখন তিনি বললেন, তোমরা যখন আল-‘আকাবার পথ ধরে আসছিলে, তখন প্রতিটি গাছ ও পাথরই সাজদাহ অবনত হয়েছিল। আর তারা তো নবী ছাড়া কারো উদ্দেশ্যে সাজদাহ করে না। আর আমি নিশ্চিতভাবে তাকে চিনেছি যে, তার কাঁধের নরম অস্থির স্থানে আপেলের মতো নাবুওয়াতের সিল রয়েছে (সুনানুত তিরমিযী ৬/১৯, নং ৩৬২০, আবু বাকর ইবন আবি শাইবাহ, মুসান্নাফ ইবন আবি শাইবাহ, সম্পাদনা, কামাল আলভুত, রিয়াদ, মাকতাবাতুর রুশদ, ১ম সংস্করণ, ১৪০৯ হি ৭/৩২৭, নং ৩৬৫৪১, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ২/৬৭২, নং ৪২২৯। ইমাম আত্-তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান গরীব বলেছেন, আলহাকিম ও আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন )।
জীব-জন্তু, গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদি জড়পদার্থরাও যে তাসবীহ, তাহলীল ও যিকর-আযগার করে এবং সালাম দেয় ও দু’আ করে আল-কুরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকেও তা জানা যায়। মহান আল্লাহ বলেন,
تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا
“সাত আসমান ও জমীন এবং এগুলোর অন্তর্বর্তী সব কিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং এমন কিছু নেই, যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না; কিন্তু তাদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা তোমরা বুঝতে পার না, নিশ্চয় তিনি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।” [সূরা বনু ইসরাঈল, আয়াত: ৪৪]। অর্থাৎ ইচ্ছাগত তাসবীহ তো শুধু মু’মিন জ্বিন ও মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সৃষ্টিগতভাবে আল্লাহ তা’আলা জগতের প্রত্যেকটি অণু-পরমাণুকে তাসবীহ পাঠকারী বানিয়ে রেখেছেন (তাফসীর ইবন কাসীর ৫/৭৯-৮০, আর দেখুন, কুরআনুল কারীম, বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর ২/১৪৯৭)।
এ সম্পর্কে আল- কুরআন ও সুন্নাহতে আরো প্রমাণাদি আছে (দেখুন, সূরা আল-বাকারা-২: ৭৪, মারইয়াম-১৯: ৮৮-৯২, সোয়াদ-৩৮: ১৮, আর দেখুন, সহীহুল বুখারী ৪/১৯৪, নং ৩৫৭৯, ৪/১৯৫, নং ৩৫৮৩)।
‘আলী ইবন আবি তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كُنتُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَكَّةَ فَخَرَجْنَا فِي بَعْضٍ نَوَاحِيهَا فَمَا اسْتَقْبَلَهُ جَبَلٌ وَلَا شَجَرَةٌ إِلَّا وَهُوَ يَقُولُ السَّلَامُ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ
আমি মক্কায় নবী (সা) এর সাথে ছিলাম। আমরা একবার মক্কার উপকণ্ঠে বের হলাম। পাহাড় ও বৃক্ষ যেই তাকে দেখল, সেই বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার প্রতি সালাম বর্ষিত হোক (সুনানুত তিরমিযী ৫/৫৯৩, নং ৩৬২৬, আল- হাকিম, আল- মুস্তাদরাক ২/৬৭৭, নং ৪২৩৮, সুনানুগ সারিমী, ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আব্দুর রাহমান আদ-দারিমী, সম্পাদনা, ফাওয়ায আহমান ও তার সঙ্গী, বৈরুত, দারুল কিতাবিল ‘আরাবী, ১ম সংস্করণ, ১৪০৭ খ্রি. ১/২৫, নং ২১)।
৭. রাসূলুল্লাহর (সা) সাক্ষাত লাভে পাহাড়-পর্বতের আনন্দ প্রকাশ, আল্লাহর রাসূল (সা) এর সাহাবীগণ (রা) যেমন তার সাক্ষাত ও সাহচর্য লাভে আনন্দিত ও উল্লাস প্রকাশ করতেন তেমনি পাহাড়-পর্বতও আনন্দ ও খুশী প্রকাশ করতো। আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণিত হাদীসে সে বিষয়টি ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন,
أنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَعِدَ أَحَدًا، وَأَبُو بَكْرٍ، وَعُمَرُ، وَعُثْمَانُ فَرَجَفَ بِهِمْ، فَقَالَ: اثْبُتْ أُحُدُ فَإِنَّمَا عَلَيْكَ نَبِيُّ، وَصِدِيقٌ، وَشَهِيدَانِ
নবী (সা) উহুদ পাহাড়ে উঠলেন, তার সাথে আবু বকর, ‘উমার ও ‘উসমান (রা) এর ছিলেন। পাহাড় তাদেরকে নিয়ে কাঁপতে শুরু করে। তখন নবী (সা) বলেন, ‘হে উহুদ, স্থির হও! কারণ তোমার উপরে আছেন নবী, সিদ্দীক ও দু’জন শহীদ (সহীহুল বুখারী ৫/৯, নং ৩৬৭৫, সুনানুত তিরমিযী ৬/৬৫, নং ৩৬৯৭)।
পাহাড় যখন কাঁপতে শুরু করে তখন নবী (সা) ব্যাখ্যা করলেন যে, পাহাড়ের এই নড়াচড়া বা কাঁপতে থাকাটা মূসা (আ) এর সম্প্রদায়কে নিয়ে পাহাড়ের প্রকম্পিত হওয়ার মতো নয়। কারণ আল্লাহর কিতাবকে পরিবর্তন করার অপরাধে পাহাড় তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশের জন্য প্রকম্পিত হয়েছিল। আর নবী, সিদ্দীক ও দু’জন শহীদকে নিয়ে উহুদ পাহাড়ের এ কম্পন আনন্দ ও খুশী প্রকাশের জন্য। কারন যারা পাহাড়ে উঠেছেন তাদের সকলের অবস্থান অত্যন্ত সম্মানজনক ও মর্যাদার (আল-কুসতুলানী, আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ, ইরশাদুস সারী লিশারহ সাহীহিল বুখারী, মিশর, আল-মাতবা আতুল কুবরা আল-আমীরিয়্যাহ, ৭ম সংস্করণ, ১৩২৩বি, ৬/৯৭)।
উহুদ পাহাড়ও রাসূলুল্লাহকে (সা) ভালোবাসেন এবং তিনিও উহুদ পাহাড়কে ভালোবাসেন। আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে এ সম্পর্কিত হাদীস বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে,
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، طَلَعَ لَهُ أَحَدٌ فَقَالَ: هَذَا جَبَلٌ يُحِبُّنَا وَيُحِبُّهُ
রাসূলুল্লাহ (সা), তার সামনে যখন উহুদ (পাহাড়) দৃশ্যমান হল, তখন তিনি বলেন, ‘এই পাহাড়টি, আমাদেরকে ভালোবাসে আর আমরাও তাকে ভালোবাসি ( সহীহুল বুখারী ৪/১৪৬, নং ৩৩৬৭, সহীহ মুসলিম ২/১০১১, নং ১৩৯৩ )।
এভাবে সাহাবায়ে কিরাম, মু’মিন-মুসলিম, গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত, পাথর, বালু সব কিছুই রাসূলুল্লাহকে (সা) ভালোবাসেন, তাকে সম্মান করেন ও তার সান্নিধ্য লাভে ধন্য হওয়ার প্রবল আগ্রহ ও প্রত্যাশা লালন করেন।
গ. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার ফাযীলত ও সুফল, বস্তুত: আল্লাহর রাসূল (সা) তার উম্মাতের ভালোবাসার মুখাপেক্ষী নন। তার প্রতি উম্মাতের ভালোবাসা তার সম্মান ও মর্যাদাকে যেমন বৃদ্ধি করে না, অনুরূপভাবে উম্মাতের ভালোবাসা তাঁর প্রতি না থাকলেও তার সম্মান ও মর্যাদার কোনো হানি হয় না।
কারণ তিনি বিশ্ব জগতের মহান প্রতিপালকের একান্ত বন্ধু (ড. ফাযল ইলাহী, হুরুন নবী, পৃ. ১৩)।
তবে মুসলিম উম্মাহ আল্লাহর রাসূল (সা) কে অত্যাধিক ভালোবাসে। করুণাময় আল্লাহ সুবহানাহু তাদেরকে এ ভালোবাসার উপযুক্ত পুরস্কার ও যথেষ্ট প্রতিদান দান করেন। যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহকে (সা) প্রকৃত ভালোবাসে এবং তার অনুসরণ করে, অতি দয়াময় আল্লাহ তা’আলা তাকে ভালোবাসেন, তার অপরাধ ও গুণাহগুলো ক্ষমা করে দেন।
মহিমান্বিত আল্লাহ সুবহানাহু বলেন
, قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“আপনি বলুন! তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর; তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুণাহসমূহকে ক্ষমা করে দেবেন। বস্তুত: আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু”। [সূরা আলে-‘ইমরান, আয়াত: ৩১]
এ আয়াতের আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বাহ্যিক নিদর্শ কি? তা তুলে ধরা হয়েছে। ভালোবাস একটি গোপন বিষয়। কারো প্রতি কারো ভালোবাসা আছে কিনা, অল্প আছে কি বেশি আছে, তা জানার একমাত্র মানদণ্ড হচ্ছে, বাস্তব অবস্থা ও পারস্পরিক ব্যবহার দেখে অনুমান করা কিংবা স্পষ্ট লক্ষণ দেখে জেনে নেওয়া। সে মতে যারা আল্লাহ তা’আলার ভালোবাসার দাবীদার এবং তাঁর ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্খী তাদেরকে এ আয়াতের মাধ্যমে তাঁর ভালোবাসার মাপকাঠী কি, তা বলে দিয়েছেন। আর তা হচ্ছে, আল্লাহর রাসূল (সা) এর অনুসরণের কষ্টিপাথরে তাদের ভালোবাসা যাচাই করা অত্যাবশ্যক। যার দাবী যতটুকু সত্য হবে, সে রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণে ততটুকু অগ্রগামী হবে। আর যার দাবী অসত্য ও দুর্বল হবে, তার অনুসরণে তার দুর্বলতাও সে পরিমাণ পরিলক্ষিত হবে (আদওয়াউল বায়ান ১/১৯৯- ২০০, কুরআনুল কারীম, বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর ১/২৮১।)।
বান্দাহ কর্তৃক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসার অর্থ আল্লাহ তাঁর রাসূলের (সা) আনুগত্য করা এবং তাদের আদেশ মান্য করা। এ আয়াত থেকে এটাও প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহর (সা) আনুগত্যই হুবহু আল্লাহর আনুগত্য।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا
“যে ব্যক্তি রাসূলের (সা) আনুগত্য করল সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে মুখ ফিরিয়ে নিল, আমরা তো আপনাকে তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে পাঠাইনি।” [আন-নিসা, আয়াত: ৮০]।
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ، وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ عَصَى اللَّهَ
“যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল (সহীহুল বুখারী ৪/৫০, নং ২৯৫৭, ৯/৬১, নং ৭১৩৭, সহীহ মুসলিম ৩/১৪৬৬, নং ১৮৩৫)
আর যে ব্যক্তি আমার নাফরমানী করল সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই অবাধ্যতা করল (তাফসীরুল কুরতুবী ৪/৬০, আদওয়াউল বায়ান ১/১৯৯)।”
বান্দাহকে আল্লাহ তা’আলার ভালোবাসার অর্থ তাদের প্রতি অবারিত মাগফিরাত ও অফুরন্ত ক্ষমা দ্বারা অনুগ্রহ করা।
সহীহ হাদীসে আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
إِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا دَعَا جِبْرِيلَ فَقَالَ: إِنِّي أُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبَّهُ، قَالَ: فَيُحِبُّهُ جِبْرِيلُ، ثُمَّ يُنَادِي فِي السَّمَاءِ فَيَقُولُ: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبُّوهُ، فَيُحِبُّهُ أَهْلُ السَّمَاءِ، قَالَ ثُمَّ يُوضَعُ لَهُ الْقَبُولُ فِي الْأَرْضِ، وَإِذَا أَبْغَضَ عَبْدًا دَعَا جِبْرِيلَ فَيَقُولُ إِنِّي أَبْغِضُ فُلَانًا فَأَبْغِضَهُ، قَالَ فَيُبْغِضُهُ جِبْرِيلُ، ثُمَّ
يُنَادِي فِي أَهْلِ السَّمَاءِ إِنَّ اللهَ يُبْغِضُ فُلَانًا فَأَبْغِضُوهُ، قَالَ: فَيُبْغِضُونَهُ، ثُمَّ تُوضَعُ لَهُ الْبَغْضَاءُ فِي الْأَرْضِ
“বস্তুত: আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরীলকে ডাকেন, অতঃপর তাকে বলেন, নিশ্চয় আমি অমুককে ভালোবাসি, তুমি তাকে ভালোবাস। তিনি বলেন, তখন জিবরীল তাকে ভালোবাসতে থাকে। তারপর আকাশে ঘোষণা করে বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ অমুককে ভালোবাসেন, তোমরাও তাকে ভালোবাস। তখন আকাশবাসীগণ তাকে ভালোবাসেন। তিনি বলেন, তারপর পৃথিবীতে তার গ্রহণযোগ্যতার ব্যবস্থা করা হয়। আর যদি তিনি বান্দার প্রতি অসন্তুষ্ট হন তখন জিবরীলকে ডাকেন ও বলেন, নিশ্চয় আমি অমুক বান্দাকে অপছন্দ করি তুমিও তাকে অপছন্দ কর। তিনি বলেন, তখন জিবরীল তাকে অপছন্দ করতে থাকে। তারপর আকাশবাসীর মধ্যে ঘোষণা করেন যে, নিশ্চয় আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে অপছন্দ করেন তোমরাও তাকে অপছন্দ কর। তিনি বলেন, তখন তারাও তাকে অপছন্দ করতে থাকেন। অতঃপর পৃথিবীতে তার প্রতি বিদ্বেষের ব্যবস্থা করা হয় (সহীহ মুসলিম ৪/২০৩০, নং ২৬৩৭, ইমাম আল-বুখারী হাদীসটির প্রথমাংশ শুধু বর্ণনা করেছেন, সহীহুল বুখারী ৪/১১১, নং ৩২০৯)।
অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা যাকে ভালোবাসেন তাকে সকলেই ভালোবাসেন এবং মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়, লোকেরা তাকে সম্মান করে এবং তার কথাবার্তার মূল্য দেয়। পক্ষান্তরে যাকে আল্লাহ অপছন্দ করেন তখন সকলেই তাকে ঘৃণা করে এবং লোকদের কাছে সম্মান পায় না। তার কথাবার্তার কোনো মূল্য দেওয়া হয় না।
প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা ছাড়া তার ভালোবাসা থেকে কেউ উপকৃত হতে পারবে না। মুসলিম ব্যক্তির ইহকাল ও পরকালের সফলতা ও পুরস্কার প্রাপ্তি তার প্রতি যথাযথ ভালোবাসার উপর ভিত্তি করেই নির্ণিত হবে। উভয় জগতের সুখ- শান্তি ও নিরাপত্তা কেবল এই ভালোবাসা দ্বারাই নিশ্চিত হতে পারে। রাসূলের (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার অনেক সুফল রয়েছে। নিম্নে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো;
১. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা ঈমানের স্বাদ পাওয়ার উপায়, ঈমানের মজা ও তৃপ্তি দ্বারা সিক্ত হওয়ার প্রধান উপায় হলো, আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলকে সবকিছুর চেয়ে অধিক ভালোবাসা, তাদেরকে সর্বাধিক প্রিয় জ্ঞান করা। তাহলেই সে ব্যক্তি বিশুদ্ধ ঈমানের উপর অবিচল থেকে ঈমানের দাবীগুলো পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করবে। জাগতিক কোনো স্বার্থ, মোহ, ভয়-ভীতি কোনো কিছুই তাকে ঈমান থেকে এক চুল পরিমাণও বিচ্যুত করতে পারবে না। সকল চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় ঈমানের উপর সুদৃঢ়ভাবে টিকে থাকবে। এটাই ঈমানের স্বাদ, মজা ও পরিতৃপ্তি। এ প্রসঙ্গে আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী (সা) বলেন,
ثَلَاثَ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الإِيْمَانِ أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءُ لا يُحِبُّهُ إِلا اللهِ وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ
“যে ব্যক্তির মধ্যে তিনটি গুন অর্জিত হবে, সে ঈমানের স্বাদ পাবে; আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই কেবল কোনো ব্যক্তিকে ভালোবাসা এবং কুফরী কাজে ফিরে আসাকে সে এতোটাই অপছন্দ করে, যেমন তাকে আগুনে ফেলে দেওয়াকে সে অপছন্দ করে (সহীহুল বুখারী, ১/১২, নং ১৬, সহীহ মুসলিম, ১/৬৬, নং ৪৩, বাবু হালাওয়াতিল ঈমান)।
হাদীসে উল্লেখিত ‘ঈমানের স্বাদ’ বলতে আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল (সা) এর নিরঙ্কুশ আনুগত্য প্রদর্শনের স্বাদ, দ্বীনের জন্য সকল দুঃখ-কষ্ট, নির্যাতন, বঞ্ছনাকে স্বীকার করে নেওয়া এবং দুনিয়ার সব ধরনের স্বার্থের চেয়ে দ্বীনকেই অগ্রাধিকার দেওয়াকে বুঝায় ( ইবন হাজর, ফাতহুল বারী, ১/৬১, ১২/৩১৬, আন- নববী, শারহ মুসলিম ১/১৩, আর দেখুন, ড. ফযল ইলাহী, হুজুন নবী, পৃ. ১৪)।
ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হওয়া’, এ বিষয়টি ঈমানের মৌলিক ফরয বিষয়গুলোর অন্তর্ভূক্ত, যেগুলো ছাড়া কোনো বান্দা মু’মিন হতে পারে না (ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমুউল ফাতাওয়া, সম্পাদনা, ‘আব্দুর রাহমান ইবন কাসিম, সৌদী ‘আরব, আল মদীনাহ, বাদশাহ ফহদ কুরআন মুদ্রণ কমপ্লেক্স, প্রকাশ কাল, ১৪১৬ হি. ১০/৭৫১)।
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
مِنْ أَشَدَّ أُمَّتِي لِي حُبًّا، نَاسٌ يَكُونُونَ بَعْدِي، يَوَدُّ أَحَدُهُمْ لَوْ رَآنِي بِأَهْلِهِ وَمَالِهِ
‘আমার উম্মাতের মধ্যে কিছু মানুষ আছে, যারা আমাকে কঠিনভাবে ভালোবাসে, তারা আমার পরে আসবে। তাদের কেউ কেউ গভীরভাবে আশা করে যে, তার পরিবার ও তার সম্পদের বিনিময়েও যদি সে আমাকে দেখতে পেত (সহীহ মুসলিম ৪/২১৭৮, নং ২৮৩২, মুসনাদ আহমাদ ১৫/২৩৩, নং ৯৩৯৯)।
অর্থাৎ আমার মৃত্যুর পর আমার উম্মাতের মধ্যে একদল লোক এমন আছে যারা আমার পরে আসবে, তারা তাদের সময়ের অন্যান্য লোকদের চেয়ে আমাকে কঠিনভাবে ভালোবাসবে। তাদের কেউ কেউ ভীষণভাবে চায় যে, তার পরিবার ও সম্পদের ত্যাগের বিনিময়ে হলেও যদি সে আমাকে দেখতে পেত (মুল্লা ‘আলী আল-কারী, মিরকাতুল মাফাতীহ শারহ মিশকাতিল মাসাবীহ ৯/৪০৪৬)।
২. রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গে পরকালে সহাবস্থান করার সৌভাগ্য, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে যারা রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত হবেন তারা কিয়ামাতের দিন তার সাথে অবস্থান করার সৌভাগ্য অর্জন করবেন। সহীহ হাদীসে এর যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। আনাস রাদি আল্লাহ ‘আনহু থেকে বর্ণিত যে, জনৈক ব্যক্তি নবী (সা) কে জিজ্ঞেস করলেন এবং বললেন,
مَتَى السَّاعَةُ؟ قَالَ: وَمَاذَا أَعْدَدْتَ لَهَا. قَالَ: لَا شَيْءَ، إِلَّا أَنِّي أُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ : أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ. قَالَ أَنَسٌ: فَمَا فَرِحْنَا بِشَيْءٍ، فَرَحَنَا بِقَوْلِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ. قَالَ أَنَسٌ : فَأَنَا أُحِبُّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبَا بَكْرٍ
، وَعُمَرَ، وَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ مَعَهُمْ بِحُتِي إِيَّاهُمْ، وَإِنْ لَمْ أَعْمَلْ بِمِثْلِ أَعْمَالِهِمْ
কিয়ামত কখন অনুষ্ঠিত হবে? তিনি বললেন, তুমি কিয়ামাতের জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছো? লোকটি বলল, কিছুই না, তবে আমি অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) কে ভালোবাসি। তখন তিনি বললেন, নিশ্চয় তুমি যাকে ভালোবাস তার সঙ্গেই থাকবে। আনাস বলেন, নবী (সা) এর উক্তি, ‘তুমি যাকে ভালোবাস তার সাথে থাকবে’, ইসলাম গ্রহণ করার পর এ কথার চেয়ে আর কোনো কথায় আমরা এত বেশি আনন্দিত হইনি। আনাস আরো বলেন, আমি (আল্লাহ, সহীহ মুসলিমের বর্ণনায়) নবী (সা), আবু বকর এবং ‘উমারকে ভালোবাসি। আমি আশা করি যে, তাদের প্রতি আমার ভালোবাসার কারণে আমি তাদের সাথেই থাকবো, যদিও আমি তাদের মতো ‘আমল করি না’ (সহীহুল বুখারী, ৫/১২, নং ৩৬৮৮, বাব মানাকিবে ‘উমার, সহীহ মুসলিম, ৪/২০৩২, নং ২৬৩৯, বাব আল মারউ মা’ মান আহাব্বা )।
‘আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ! كَيْفَ تَقُولُ فِي رَجُلٍ أَحَبَّ قَوْمًا وَلَمْ يَلْحَقْ بِهِمْ ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الْمَرْءُ مَعْ مَنْ أَحَبَّ
জনৈক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (সা) এর নিকট এসে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে আপনার অভিমত কি, যে ব্যক্তি এক দল মানুষকে ভালোবাসে, কিন্তু তাদের সাথে তার দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি? তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘মানুষ তার সাথে থাকবে, যাকে সে ভালোবেসেছিল (সহীহুল বুখারী, ৮/৩৯, নং ৬১৬৯, বাব ‘আলামাতিন ফী হুববিল্লাহ, সহীহ মুসলিম, ৪/২০৩৪, নং ২৬৪০, বাব আল মারউ মা’ মান আহাব্বা )।
‘আব্দুল্লাহ ইবনুস সামিত থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু যার রাদি আল্লাহ আনহু বলেন, আমি বললাম,
يَا رَسُولَ اللهِ ، الرَّجُلُ يُحِبُّ الْقَوْمَ وَلَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يَعْمَلَ كَعَمَلِهِمْ؟ قَالَ: أَنْتَ يَا أَبَا ذَرٍ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ. قُلْتُ: فَإِنِّي أُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ. قَالَ: فَأَنْتَ يَا أَبَا ذَرٍ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ
“হে আল্লাহর রাসূল! কোনো এক ব্যক্তি একদল লোককে ভালোবাসে, কিন্তু সে তাদের মতো সৎকর্ম করতে পারে না? তিনি বলেন, হে আবু যার! তুমি যাকে ভালোবাস, তার সাথেই থাকবে’। আমি বললাম, আমি তো অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি। তিনি বলেন, হে আবু যার! তুমি যাকে ভালোবাস, তার সাথেই থাকবে। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে যে, আবু যার যতবার পুনারাবৃত্তি করেছেন, রাসূলও ততবারই বলেছেন (মুসনাদ আহমাদ ৩৫/৩৬৭, নং ২১৪৬৩, সুনান আবি দাউদ ৪/৩৩৩, নং ৫১২৬)।
মানুষ তার ভালোবাসার মানুষের সাথেই থাকবে’ রাসূল (সা) এর এ উক্তির অর্থ হলো, সে ব্যক্তি জান্নাতে তার প্রিয় জনের সাথে একত্রে বসবাস করবে (বাদর উদ্দীন আল ‘আইনী, ‘উমদাতুল কারী শারহু সহীহিল বুখারী, বৈরুত, দারুল ফিকর, ২২/১৯৭, ইবন হাজর আল-‘আসকালানী ১১/৪১৩)।
এসব হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, দুনিয়াতে যারা যাদের সাথে উঠা-বসা করে, যাদের সাহচর্যে থাকে এবং যাদেরকে ভালোবাসে ও অন্তরঙ্গ বন্ধু বানিয়ে নেয়, কিয়ামাতের দিনে তারা তাদের সাথে একত্রে অবস্থান করবে। ভালো সঙ্গী-সাথী হলে তাদের সাথে সুখ-শান্তিতে থাকবে আর মন্দ হলে তাদের সাথে মন্দ অবস্থায় থাকবে ( আন্-নববী, শারহ মুসলিম ১৬/১৮৬)।
ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, এ হাদীসটি খুবই সত্য; কেননা যিনি ভালোবাসেন তিনি তার ভালোবাসার মানুষটির সাথে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। এর বিপরীত অন্য কিছু হয় না। আর তার সাথে থাকার একমাত্র কারণ হচ্ছে, সে তাকেই ভালোবাসে। সেক্ষেত্রে ভালোবাসা যদি মধ্যম মানের কিংবা তার কাছাকাছি হয়, তাহলে সে অনুপাতে তার সাথে থাকবে। আর যদি ভালোবাসা পরিপূর্ণ হয়, তাহলে পরিপূর্ণভাবেই তার সাথে অবস্থান করবে ( ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ’উল ফাতাওয়া ১০/৭৫২)।
৩. পাপের ক্ষমা এবং দুনিয়া ও আখিরাতের প্রয়োজন পূরণ, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার আরেকটি সুফল হলো, আল্লাহ তা’আলা তার পাপ ক্ষমা করে দেন এবং মনের দুঃখ-কষ্ট ও দুঃশ্চিন্তা দূর করে দেন। উবাই ইবন কা’আব (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন রাতের দুই তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হয়, তখন ঘুম থেকে উঠেন, অতঃপর বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اذْكُرُوا اللهَ اذْكُرُوا اللهَ، جَاءَتْ الرَّاجِفَةُ، تَتْبَعُهَا الرَّادِفَةُ ، جَاءَ الْمَوْتُ بِمَا فِيهِ ، جَاءَ الْمَوْتُ بِمَا فِيهِ، قَالَ أُبَيُّ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إني أكثرُ الصَّلَاةَ عَلَيْكَ فَكَمْ أَجْعَلُ لَكَ مِنْ صَلَاتِي؟ فَقَالَ: مَا شِئْتَ، قَالَ قُلْتُ : الرُّبُعَ؟ قَالَ: مَا شِئْتَ، فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ، قُلْتُ
النِّصْفَ؟ قَالَ: مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ، قَالَ قُلْتُ: فَالثُّلُثَيْنِ؟ قَالَ: مَا شِئْتَ ، فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ، قُلْتُ: أَجْعَلُ لَكَ صَلَاتِي كُلَّهَا؟ قَالَ : إِذَا تُكْفَى هَمَّكَ، وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ
“হে মানব সকল! তোমরা আল্লাহর স্মরণ কর! আল্লাহর স্মরণ কর! প্রথম প্রকম্পিতকারী (প্রথম শিংগায় ফুঁ দেওয়া) উপস্থিত হয়েছে, তাকে অনুসরণ করবে পরবর্তী কম্পনকারী (দ্বিতীয় শিংগায় ফুঁ দেওয়া)। মৃত্যু এর ভেতরে যা আছে (মৃত্যু ও কবরের সংকট ইত্যাদি), তা সহ উপস্থিত হয়েছে, মৃত্যু এর ভেতরে যা আছে (মৃত্যু ও কবরের সংকট ইত্যাদি), তাসহ উপস্থিত হয়েছে। উবাই বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার প্রতি বেশি বেশি করে সালাত পাঠ করতে চাই। তাই আপনার জন্য আমি কি পরিমাণ সালাত পাঠ করব? তখন তিনি বলেন, ‘তুমি যা চাও’। তিনি বলেন, আমি বললাম, (আমার দু’আর সময়ের) এক চতুর্থাংশ সময় পাঠ করব?। তিনি বলেন, ‘তুমি যা চাও, তবে যদি তুমি আরও বেশি কর তবে তোমার জন্য অধিক কল্যাণকর হবে’। আমি বললাম, তাহলে কি (আমার সময়ের) অর্ধেক সময়?। তিনি বলেন, ‘তুমি যা চাও, তবে যদি তুমি আরও বেশি কর তবে তোমার জন্য অধিক কল্যাণকর হবে’। তিনি বলেন, আমি বললাম, (আমার সময়ের) দুই তৃতীয়াংশ সময়?। তিনি বলেন, ‘তুমি যা চাও, তবে যদি তুমি আরও বেশি কর তবে তোমার জন্য অধিক কল্যাণকর হবে’। আমি বললাম, আমি (আমার সময়ের) পুরো সময়টি আপনার প্রতি সালাত পাঠের জন্য নির্ধারণ করব। তিনি বলেন, তাহলে তো তোমাকে (দুনিয়া ও আখেরাতের) উদ্দেশ্য পুরণ করে দেওয়া হবে এবং তোমার গুণাহ ক্ষমা করা হবে (সুনানুত তিরমিযী ৪/৬৩৬, নং ২৪৫৭, আল-বাইহাকী, শু’আবুল ঈমান ২/১৮৭, নং ১৪৯৯, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ২/৪৫৭, নং ৩৫৭৮, তিনি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, আয-যাহাবী তার সাথে একমত পোষণ করেছেন। ইমাম তিরমিযী হাসান সহীহ বলেছেন, আর আলবানী হাসান বলেছেন)।
৪. দুনিয়া ও আখিরাতে নূর ও রহমত অর্জন করা, রাসূলুল্লাহকে (সা) ভালোবাসলে আল্লাহ দুনিয়া ও পরকালের উভয় জগতে তাকে আলো দান করবেন এবং স্বীয় রহমত দ্বারা ধন্য করবেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَآمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِنْ رَحْمَتِهِ وَيَجْعَلْ لَكُمْ نُورًا تَمْشُونَ بِهِ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ}
“হে মু’মিনগণ! আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ঈমান আন। তিনি তাঁর অনুগ্রহে তোমাদেরকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন এবং তিনি তোমাদেরকে নূর দেবেন, যার সাহায্যে তোমরা চলবে এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ২৮]।
অর্থাৎ পৃথিবীতে জ্ঞান ও দূরদৃষ্টির এমন নূর দান করবেন, যার আলোতে তোমরা সঠিক পথে চলতে পারবে এবং ভ্রষ্ট ও জাহিলিয়াতের পথও চিনতে পারবে এবং তা বর্জন করবে (তাফসীরুল কুরতুবী ১৭/২৬৬, ইবন কাসীর ৮/৩২)।
৫. নবী-রাসূল, সিদ্দীক ও শহীদগণের সঙ্গ লাভ, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা পোষণের ফলে পরকালে নবী-রাসূল, সিদ্দীক ও শহীদগণের সঙ্গ লাভে ধন্য হবে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু বলেন,
{ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصَّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقًا }
“আর কেউ আল্লাহ এবং রাসূলের (সা) আনুগত্য করলে সে নবী, সিদ্দীক (সত্যনিষ্ঠ), শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী।” [সূরা আন্-নিসা, আয়াত: ৬৯]।
অর্থাৎ জান্নাতের পদমর্যাদাসমূহ আমলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। জান্নাতীদের পদমর্যাদা তাদের কৃতকর্ম অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। প্রথম শ্রেণির লোকদেরকে আল্লাহ তা’আলা নবী-রাসূলগণের সাথে জান্নাতের উচ্চতর স্থানে স্থান দেবেন এবং দ্বিতীয় শ্রেণির লোকদেরকে নবীগণের পরবর্তী মর্যাদার লোকদের সাথে জায়গা দেবেন। তাদেরকেই সিদ্দীকীন বলা হয়। অতঃপর তৃতীয় শ্রেণির লোকদেরকে শহীদদের সাথে স্থান দেবেন। আর চতুর্থ শ্রেণির লোকেরা সালিহীনদের সাথে থাকবে (তাফসীর ইবন কাসীর ২/৩৫৩, কুরআনুল কারীম, বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর ১/৪৪৫)।
৬. কিয়ামাতের দিন সুপারিশ লাভ, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার আরেকটি সুফল হলো কিয়ামাতের দিন আল্লাহর ইচ্ছায় রাসূলুল্লাহর (সা) সুপারিশ নসীব হবে। জাবির ইবন ‘আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,যে ব্যক্তি আযান শোনার সময় বলে
مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ النِّدَاءَ اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ حَلَّتْ لَهُ شَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ للَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ
অর্থাৎ, “হে আল্লাহ! এই পরিপূর্ণ আহ্বান এবং প্রতিষ্ঠিত সালাতের প্রতিপালক! আপনি মুহাম্মাদকে নৈকট্য ও মর্যাদা দান করুন এবং তাকে ঐ প্রশংসিত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করুন যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাকে দিয়েছেন’, কিয়ামাতের দিন তার জন্য আমার সুপারিশ প্রযোজ্য হবে (সহীহুল বুখারী ১/১২৬, নং ৬১৪, ৬/৮৬, নং ৪৭১৯)।”
৭. বান্দার প্রতি আল্লাহর দশবার রহমত বর্ষণ, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) মুহাব্বতে তার প্রতি একবার সালাত পাঠ করে, মহিমান্বিত করুণাময় আল্লাহ এর বিনিময়ে তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন। ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমর ইবনুল ‘আস রাদি আল্লাহ ‘আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি নবী (সা) কে বলতে শুনেছেন যে,
إِذَا سَمِعْتُمُ الْمُؤَذِّنَ فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ ثُمَّ صَلُّوا عَلَيَّ فَإِنَّهُ مَنْ صَلَّى عَلَى صَلَاةٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ بِمَا عَشْرًا ثُمَّ سَلُوا اللَّهَ لِي الْوَسِيلَةَ فَإِنَّهَا مَنْزِلَةٌ فِي الْجَنَّةِ لَا تَنْبَغِي إِلا لِعَبْدٍ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ وَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ أَنَا هُوَ فَمَنْ سَأَلَ لِي الْوَسِيلَةَ حَلَّتْ لَهُ الشَّفَاعَةُ
“তোমরা যখন মুআযযিনকে (আযান দিতে) শুনবে, তখন তোমরা তাই বলবে যা সে বলে। তারপর আমার প্রতি সালাত পাঠ করবে; কেননা যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার সালাত পাঠ করে, এর বিনিময়ে আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন। অতঃপর তোমরা আমার জন্য আল্লাহর নিকট উসীলাহ (বিশেষ মর্যাদা) চাও; কেননা এটা জান্নাতের একটি বিশেষ মর্যাদা, যা কেবল আল্লাহর বান্দাগণের মধ্য থেকে একজন বান্দার জন্যই কেবল শোভনীয়। আর আমি আশা করি, আমি সেই বান্দাহ। যে ব্যক্তি আমার জন্য উসীলাহ চাইবে তার জন্য সুপারিশ করা অপরিহার্য হবে (সহীহ মুসলিম ১/২৮৮, নং ৩৮৪)।”
৮. হাওযে কাওসার থেকে পানি পানের সৌভাগ্য অর্জন, যারা রাসূলল্লাহ (সা) কে অকৃত্রিম ভালোবেসে তার অনুসরণ করেছে, তারা কিয়ামাতের দিন হাওযে কাওসার থেকে তার হাতে পানি পানের সৌভাগ্য অর্জন করবে। আবু হুরায়রা (রা) হাদীস বর্ণনা করতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
يَرِدُ عَلَيَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ رَهْطٍ مِنْ أَصْحَابِي فَيُحَلَّفُونَ عَنْ الْحَوْضِ فَأَقُولُ يَا رَبِّ أَصْحَابِي فَيَقُولُ إِنَّكَ لَا عِلْمَ لَكَ بِمَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ إِنَّهُمْ ارْتَدُّوا عَلَى أَدْبَارِهِمْ الْقَهْقَرَى
কিয়ামাতের দিন আমার সাথীদের মধ্য থেকে একদল আমার কাছে আসবে, তখন তাদেরকে হাওযে কাওসার থেকে দূর করে দেওয়া হবে। আমি তখন বলব, হে আমার রব! এরা তো আমার সাহাবী? তখন তিনি বলবেন, নিশ্চয় আপনার এ বিষয়ে জ্ঞান নেই যে, তারা আপনার (মৃত্যুর) পরে কি নতুন ঘটনা ঘটিয়েছিল। নিশ্চয় এরা (হেদায়াত ও সত্য পথ থেকে) এদের পেছন দিকে ফিরে (মুরতাদ হয়ে) গিয়েছিল (সহীহুল বুখারী ৮/১২০, নং ৬৫৮৩)।”
৯. স্বাচ্ছন্দ্য ও লাবন্যময় উজ্জ্বল বর্ণের চেহারা অর্জন, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসাসহ তার অনুসরণের ফলে লাবন্যময় ও সমুজ্জ্বল বর্ণের চেহারার অধিকারী হবেন। ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সা) বলেন,
نَضَرَ اللهُ امْرَأَ سَمِعَ مَقَالَتِي فَوَعَاهَا ثُمَّ أَدَّاهَا إِلَى مَنْ لَمْ يَسْمَعُهَا فَرُبَّ حَامِلٍ فِقْهِ لَا فِقْهَ لَهُ وَرُبَّ حَامِلٍ فِقْهِ إِلَى مَنْ هُوَ أَفْقَهُ
“আল্লাহ ঐ ব্যক্তির মুখমন্ডল সমুজ্জ্বল করুন, যে আমার কথা শুনেছে, অতঃপর তা মুখস্থ করেছে এবং হৃদয়ঙ্গম করেছে। তারপর তা এমন ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিয়েছে, যে তা শোনেনি। জ্ঞান বহনকারী এমন অনেক ব্যক্তি আছে, যার বোঝার ক্ষমতা নেই। আর জ্ঞান বহনকারী এমন ব্যক্তি আছে, যে এমন ব্যক্তির কাছে তা পৌঁছে দেয়, যে তার চেয়ে অধিক বোধসম্পন’ (মুসনাদ আহমাদ ৪/৮০, নং ১৬৭৮৪, সুনানুত তিরমিযী ৫/৩৪, নং ২৬৫৮, আল- মুস্তাদরাক ১/১৬২, হাদীসটি জুবাইর ইবন মুতয়িম, যায়দ ইবন সাবিত ও আনাস (রা)ম থেকেও বর্ণিত আছে। ইমাম আত্-তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। আর আলবানীসহ অনেকেই হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, দেখুন, সহীহ ইবন মাজাহ ৯/৫০, নং ২৩২, সহীহ ওয়া যা’য়ীফুল জামি’ ২/৮৯, নং ৬৭৬৬)।
অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা) এমন ব্যক্তির জন্য স্বচ্ছন্দময় জীবন প্রাপ্তি, দীপ্তিময় ও উজ্জ্বল চেহারাবিশিষ্ট সুখ- শান্তিময় জীবনের জন্য দু’আ করেছেন ( ইবনুল কাইয়্যেম, মিফতাহ দারিস সা’আদাহ, বৈরুত, দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, তা.বি. ১/৭২)।
তাই মু’মিন-মুসলিমগণ যদি বিশুদ্ধ ঈমান-আকীদাহর দাবী অনুযায়ী রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা পোষণ করেন, তাদের সার্বিক জীবনে তার অনুসরণ ও অনুকরণ করতে পারেন, তাহলে উপর্যুক্ত সুফল ছাড়াও দুনিয়া ও আখেরাতে আরো অনেক কল্যাণ লাভে ধন্য হবেন।
দ্বিতীয় অধ্যায় : রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন
আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,
إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُوَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا
“নিশ্চয় আমি আপনাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদানকারী এবং ভীতি-প্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি। যাতে করে তোমরা আল্লাহর প্রতি তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ঈমান পোষণ কর। তাকে (রাসূলকে) সাহায্য কর এবং সম্মান কর। আর সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর (আল্লাহর) পবিত্রতা বর্ণনা কর।” [সূরা আল ফাতহ, আয়াত: ৮-৯]।
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তা’আলা তাঁর এবং তাঁর রাসূল (সা) এর কতিপয় হক বা অধিকারের বর্ণনা দিয়েছেন। এক. আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল (সা) এর সমন্বিত হক ঈমান। দুই. আল্লাহর একক হক, সর্বদা তাঁর তাসবীহ পাঠ ও গুণাগুণ বর্ণনা করা। তিন, রাসূলুল্লাহর (সা) একক হক, যার অর্থ ব্যাপক সাহায্য করা বুঝায়; অর্থাৎ, তার সাহায্য করা, সহযোগিতা করা এবং তাকে সকল প্রকার অনিষ্টকর ও কষ্টদায়ক বিষয় থেকে রক্ষা করা, তার পক্ষ হয়ে এ গুলোকে প্রতিহত করা। অপর দিকে সম্মান করা বুঝানোর জন্য এ আয়াতে التوفير )আত-তাওকীর) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ‘আরবী ভাষাতে সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক ও পরিপূর্ণ সম্মান বুঝানোর জন্য এ শব্দটি তাহলো তাকে সাহায্য করা ও সম্মান করা। সাহায্য করা বুঝানোর জন্য আয়াতে التغزير )আত্ তা’যীর) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। ‘আরবী ভাষায় সাধারণত ব্যবহৃত হয়। যে সম্মান প্রদর্শনের মধ্যে রয়েছে স্বস্তি ও শান্তি। আচার-আচরণে রয়েছে ভদ্রতা, শিষ্টাচার ও শ্রদ্ধা। এক কথায় সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনে সামান্যতম ত্রুটি না থাকা বুঝায় ( ইবন মানযূর, লিসানুল ‘আরব, বৈরুত, দার সাদির, তা.বি., ৫/২৯১, )وقر(, ইবন তাইমিয়্যাহ, আস সারিমুল মাসলুল ‘আলা শাতিমির রাসূল, সম্পাদনা, মুহাম্মাদ মুহই উদ্দীন আব্দুল হামীদ, প্রকাশক, সৌদি জাতীয় গার্ড, সৌদি আরব, ৫/১২৬)।
বস্তুত: শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন ভালোবাসার মর্যাদার সুউচ্চ স্তর। কেননা প্রিয়জন সর্বদাই সম্মানিত হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। যেমন, পিতার ভালোবাসা সন্তানের প্রতি। এ ভালোবাসা সন্তানের প্রতি শুধু স্নেহ ও মায়া মমতা প্রদর্শন দাবী করে, সম্মান প্রদর্শন দাবী করে না। পক্ষান্তরে সন্তানের ভালোবাসা পিতার প্রতি, এ ভালোবাসা তার প্রতি মায়া-মমতা, সম্মান ও শ্রদ্ধা উভয় প্রদর্শনের দাবী করে (আল বায়হাকী, আবু বাকর আহমাদ ইবন হুসাইন, শু’আবুল ঈমান, সম্পাদনা, মুহাম্মাদ সা’ঈদ যাগলুল,
বৈরুত, দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১০ হি. ২/১৯৩)।
প্রকৃত পক্ষে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার বাহ্যিক ‘আলামত ও নিদর্শন রয়েছে। এ বিষয়ে মুসলিম সমাজের বিজ্ঞ ‘আলিমগণ আলোচনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল-কাযী ‘ইয়ায বলেন, আল্লাহর রাসূল (সা) কে ভালোবাসার অর্থ হলো, তার সুন্নাত ও জীবন আদর্শকে ভালোবাসা। তার উপস্থাপিত শরী’য়াতের সুরক্ষা করা এবং তার উদ্দেশ্যে নিজের জান ও মাল ব্যয় করা (আল ‘আইনী, ‘উমদাতুল কারী, ১/১৪৪)।
রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা, এ প্রেক্ষিতে হাফিয ইবন হাজার বলেন, ‘ভালোবাসার নমুনা ও নিদর্শন হচ্ছে, কোনো ব্যক্তিকে যদি এ এখতিয়ার দেওয়া হয় যে, তার পার্থিব কোনো স্বার্থ হানি হবে অথবা ধরে নেওয়া যাক যে, নবী (সা) এর সাক্ষাৎ থেকে তাকে বঞ্চিত হতে হবে। এমতাবস্থায় নবী (সা) কে দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া পার্থিব স্বার্থ বিনষ্ট হওয়ার চেয়ে যদি অধিকতর কষ্টদায়ক হয়, তাহলে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ইস্পিত ভালোবাসা তার মধ্যে রয়েছে বলে প্রমাণিত হবে। অন্যথায় তার ভালোবাসার দাবী সঠিক নয়। ভালোবাসার এই মানদণ্ড ও মাত্রা কেবলমাত্র আল্লাহর রাসূল (সা) এর জীবিত থাকা না থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তার সুন্নাতের সাহায্য করা, তার উপস্থাপিত শরী’য়াতের হেফাযত করা এবং দ্বীনের দুশমনদের হাত থেকে দ্বীনকে রক্ষা করার মাধ্যমে এই ভালোবাসার প্রতিফলন থাকতে হবে’ (ইবন হাজার আল-‘আসকালানী, ফাতহুল বারী, ১/৫৯)।
বদরুদ্দীন আল-‘আইনী বলেন, “জেনে রাখুন! রাসূল ‘আলাইহিস সালাতু ওয়াস্ সালামের প্রতি ভালোবাসার অর্থ হলো, তার আনুগত্য করার ইচ্ছা করা এবং তার বিরোধিতা না করা। এটি ইসলামের একটি অপরিহার্য বিষয় (আল-কাযী ‘ইয়ায, আশ্-শিফা, ২/২৯, ‘আন-নষবী, শারহ মুসলিম ১১/১৯, আল ‘আইনী, ‘উমদাতুল কারী, ১/১৪৪)।”
আবুল ‘আব্বাস শিহাব উদ্দীন আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ আল-কুসতুলানী বলেন, রাসূলের (সা) প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন হচ্ছে, দ্বীন ইসলামকে কথা ও কাজের মাধ্যমে সাহায্য করা, পবিত্র শরী’য়াতের সুরক্ষা দেওয়া এবং এর প্রতিরক্ষায় ভূমিকা পালন করা এবং রাসূলুল্লাহর (সা) চরিত্র অনুযায়ী চরিত্র গঠন করা। যেমন, দান, ত্যাগ-কুরবানী, ধৈর্য-সহিষ্ণুতা এবং নম্রতা ও বিনয় ইত্যাদি গুণাগুণ অর্জনের চেষ্টা করা (আল-কুতুলানী, আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ, সম্পাদনায়, মুহাম্মাদ ফুয়াদ ‘আব্দুল বাকী, ইরশাদুল বারী লিশারহি সাহীহিল বুখারী, মিশর, আল-মাতবা’আতুল কুবরা আল-আমীরিয়্যাহ, ৭ম সংস্করণ, ১৩২৩ হি. ১/৯৬)।
রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ও নিদর্শন অনেকভাবেই প্রকাশিত হয়। নিম্নে কতকগুলো উল্লেখযোগ্য নিদর্শন ও ‘আলামত তুলে ধরা হলো, যেগুলোর মাধ্যমে রাসূলের (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা থাকা, না থাকা বা কোনো মাত্রায় আছে, তা নির্ণয় করা ও যাচাই করার সুযোগ হবে। নিদর্শনগুলো হলো;
প্রথম নিদর্শন, রাসূলুল্লাহকে (সা) চেনা-জানা, তার প্রতি গভীর ঈমান আনা এবং তার সাক্ষাৎ ও সাহচর্য লাভের প্রবল আগ্রহ থাকা।
দ্বিতীয় নিদর্শন, সকল সময় তার আলোচনা করা, তার জীবন থেকে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা এবং তার প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করা।
তৃতীয় নিদর্শন, রাসূলুল্লাহর (সা) পরিপূর্ণ ও নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও অনুসরণ করা।
চতুর্থ নিদর্শন, নবী (সা) এর উদ্দেশ্যে নিজের জীবন ও ধন-সম্পদ ব্যয় করার জন্য নিষ্ঠাসহ পূর্ণ প্রস্তুত থাকা।
পঞ্চম নিদর্শন, রাসূলুল্লাহর (সা) উপস্থাপিত দ্বীন, শরী’য়াত ও জীবন ব্যবস্থার সাহায্য করা, প্রতিরোধ করা এবং এর সংরক্ষণ করা।
এসব নিদর্শনের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কিরামের কেমন ভূমিকা ছিল তা জানার মাধ্যমে বর্তমান কালের মুসলিমগণ রাসূলের (সা) প্রতি নিজেদের ভালোবাসার দাবী, এর মান-মাত্রা যাচাই করতে পারবে। এ নিদর্শন ও ‘আলামাতগুলো যদি পাওয়া যায় তাহলে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা আছে বলে প্রমাণিত হবে এবং তার অনেক বড় তৃপ্তি ও স্বস্তিরও কারণ।
কেননা যাচাই-বাছাই ও তুলনায় তার প্রতি এ রকম ভালোবাসা প্রমাণিত না হলে, তা ঈমান, ‘আমল, ইহকাল ও পরকালে শান্তি, নিরাপত্তা ও মুক্তির ক্ষেত্রে ভয়ংকর অশনি সংকেত। এ জন্য নিষ্ঠাপূর্ণ ও কার্যকরী আত্মসমালোচনা করে ঈমানকে নবায়ন করা, আল্লাহ ও তার রাসূলের (সা) প্রতি সত্যিকারের ঈমান পোষণ করা ও লালন করা এবং ঈমানের আলোকে সার্বিক জীবনকে পরিচালনা করা অপরিহার্য। অন্যথায় ইহকালে অশান্তি, নিরাপত্তাহীনতা, অস্থির ও অপমানজনক জীবন যাপন করতে বাধ্য হতে হবে এবং পরকালে আরো কঠিন, আরো ভয়ংকর ও করুণ পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
বস্তুত: রাসূলুল্লাহর (সা) ভালোবাসার উপর্যুক্ত নমুনাগুলোর আলোকে সাহাবায়ে কিরামের জীবনাচার পর্যালোচনা করি এবং এসব নিদর্শন ও ভালোবাসার দাবীর প্রেক্ষিতে তাদের কি ভূমিকা ছিল, তার স্মৃতিচারণ করি, তাহলে তা হবে মুসলিমদের জন্য প্রেরণাদায়ক এবং জীবন্ত উপদেশ। সাহাবায়ে কিরাম (রা) উপর্যুক্ত নিদর্শনের ক্ষেত্রে প্রিয় রাসূল (সা) এর প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত ছিলেন। নিম্নে সাহাবায়ে কিরামের জীবনী থেকে উপর্যুক্ত বিষয়গুলোর কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো (দেখুন, ড. ফাযল ইলাহী, হুজুন নবী ওয়া ‘আলামাতুহু, পৃ. ১৭-১৯)।
প্রথম পরিচ্ছেদ : প্রথম নিদর্শন
রাসূলুল্লাহকে (সা) চেনা-জানা, তার প্রতি গভীর ঈমান আনা এবং তার সাক্ষাৎ ও সাহচর্য লাভের প্রবল আগ্রহ থাকা,
ক- রাসূলুল্লাহকে (সা) চেনা ও জানা, আল্লাহর রাসূল (সা) কে চেনা ও জানা উম্মাতের জন্য অপরিহার্য। তার নাম, পিতার নাম, তার বংশ, জীবন চরিত, তার আনীত দ্বীন ও জীবন আদর্শ, তার উপস্থাপিত শরী’য়াত, তার দেহ-শরীর, অবয়ব, গঠন-আকৃতি, স্বভাব-চরিত্র ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা আবশ্যক। যাতে করে তার সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান, স্পষ্টভাবে চেনা-জানা, তার বিস্তারিত পরিচয় জেনে সম্পূর্ণ পরিতৃপ্ত হয়ে তার প্রতি ঈমান পোষণ করা যায় এবং তিনি ওহীর জ্ঞানের মাধ্যমে যেসব দৃশ্য-অদৃশ্য, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্পর্কে তত্ত্ব ও তথ্য দিয়েছেন, তা নিঃসংকোচে সত্য বলে স্বীকার করা যায়। কাউকে ভালোভাবে জানলে ও চিনলে তার প্রতি আকুণ্ঠ সম্মান দ্বারা হৃদয়-আত্মা ভরে যায়। ফলে তার উপস্থাপিত শরী’য়াত ও বিধি-বিধানের প্রতিও সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ জন্মে। যার কারণে সেগুলো যথাযথভাবে আন্তরিকতার সাথে কার্যকরী করার বাধ্য-বাধকতাও তার মধ্যে সৃষ্টি হয়। এ জন্য প্রতিটি মানুষের তিনটি মৌলিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা অতীব জরুরী ও অত্যাবশ্যক। সেগুলো হলো; এক. মানুষকে তার রব, দুই. তার দ্বীন ও তিন. তার নবী ও রাসূল সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। রাসূলুল্লাহকে (সা) চেনা ও জানা সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{وَاعْلَمُوا أَنَّ فِيكُمْ رَسُولَ اللَّهِ لَوْ يُطِيعُكُمْ فِي كَثِيرٍ مِنَ الْأَمْرِ لَعَنِتُمْ }
“আর তোমরা জেনে রাখ যে, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রাসূল রয়েছেন; তিনি বহু বিষয়ে তোমাদের কথা শুনলে তোমরাই কষ্ট পেতে।” [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৭]।
অর্থাৎ তোমরা জেনে রাখ যে, তোমাদের মাঝে আল্লাহর রাসূল আছেন। তোমরা তাকে চেন ও জান। সুতরাং তোমরা তাকে সম্মান কর, শ্রদ্ধা কর এবং তার সাথে আদবের সাথে আচরণ কর। তার নির্দেশাবলি মেনে চল। কারণ তিনি তোমাদের স্বার্থ ও কল্যাণ সম্পর্কে অধিক অবগত। তোমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তোমাদের ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত তোমাদের নিজেদের ব্যাপারে নিজেদের সিদ্ধান্তের চেয়ে অধিক সঠিক ও কল্যাণকর (তাফসীর ইবন কাসীর ৭/৩৭২।)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
أَمْ لَمْ يَعْرِفُوا رَسُوهُمْ فَهُمْ لَهُ مُنْكِرُونَ
নাকি তারা তাদের রাসূলকে চিনে না বলে তাকে অস্বীকার করছে?” [সূরা আল-মু’মিনূন, আয়াত: ৬৯]।
অর্থাৎ তাদের অস্বীকারের এক কারণ হতে পারত এই যে, নবুওয়াতের দাবী নিয়ে যিনি আগমন করেছেন, তিনি ভিন দেশের কোনো মানুষ। তার বংশ, আচার, অনুষ্ঠান, চালচলন ও চরিত্র সম্পর্কে আমাদের জানা নেই। তাই আমরা তাকে মেনে নিতে পারছিনা। কিন্তু ঘটনা তো তা নয়, বরং তিনি তো তাদের বংশেরই লোক, তার সবকিছু তারা জানে। সুতরাং রাসূলকে তাদের অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করার কোনো কারণই নেই। মূলতঃ তারা তাকে অস্বীকার করার মাধ্যমে মহান আল্লাহ প্রদত্ত তার রিসালাত ও সত্য দ্বীনকে অস্বীকার করছে।
মক্কার কাফিরগণ রাসূলুল্লাহকে (সা) তার নবী ও রাসূল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার আগে থেকেই চল্লিশের অধিক বছর ধরে ভালোভাবেই চিনত ও জানত। সে সত্য তুলে ধরে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{ فَقَدْ لَبِثْتُ فِيكُمْ عُمُرًا مِنْ قَبْلِهِ أَفَلَا تَعْقِلُونَ }
“আমি তো এর আগে তোমাদের মাঝে দীর্ঘকাল অবস্থান করেছি; তবুও কি তোমরা বুঝতে পার না।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১৬]।
অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল (সা) হঠাৎ করেই মক্কাবাসীদের কাছে নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবী নিয়ে হাজির হননি। বরং তিনি দীর্ঘ ৪০ বছর তাদের মধ্যেই ছিলেন, তাদের সামনেই জন্মগ্রহণ করেছেন, শিশুকাল, শৈশবকাল, যৌবনকাল পেরিয়েছেন। তিনি তাদের সাথে উঠাবসা করেছেন, তার বিয়ে শাদী, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি সব ধরনের সামাজিক কাযকর্ম তাদের সাথেই ছিল। তারা তার সততা, আমানতদারী, বিশ্বস্ততা, উন্নত নৈতিকতা ও চারিত্রিক পবিত্রতা ইত্যাদি গুণাগুণের কথা ভালো করেই জানে। তাই এমন ব্যক্তি রাসূল হিসেবে এসে তাদের কাছে মিথ্যা বলবে এটা আদৌ যুক্তিসংগত হতে পারে না গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন,
بَعَثَهُ اللَّهُ عَلَى رَأْسِ أَرْبَعِينَ سَنَةً
“আল্লাহ তাকে (রাসূলুল্লাহকে (সা)) চল্লিশ বৎসরের মাথায় (নবী/রাসূল হিসেবে) প্রেরণ করেন (সহীহুল বুখারী ৪/১৮৮, নং ৩৫৪৮, সহীহ মুসলিম ৪/১৮২৪, নং ২৩৪৭)।”
সম্রাট হিরাক্লিয়াস আবু সুফইয়ানকে রাসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তোমরা কি তাকে এ ধরনের (নবুওয়াতের) দাবীর পূর্বে কখনো মিথ্যা বলার অপবাদ দিতে? আবু সুফইয়ান তখন বলেছিল, না, অথচ সে ঐ সময় কুরাইশ কাফিরদের নেতা ছিল। তারপরও সে রাসূল (সা) সম্পর্কে হক কথা বলতে বাধ্য হয়েছিল। আর শত্রুদের মুখ থেকে যে প্রশংসা বের হয় তা যথার্থ প্রশংসা। তখন সম্রাট হিরাক্লিয়াস বলেছিলেন, আমি এটা অবশ্যই বুঝি, যে ব্যক্তি মানুষের সাথে মিথ্যা কথা ত্যাগ করেছে, সে আল্লাহ তা’আলার উপর মিথ্যা কথা বলবে এটা হতে পারে না ( সহীহুল বুখারী ১/৯, নং ৭, সহীহ মুসলিম ৩/১৩৯৩, নং ১৭৭৩, ইবন কাসীর ৫/৪৮৪, আশ-শানকীর্তী, আদওয়াউল বায়ান ২/১৫৩)।
ইতোপূর্বেও উল্লেখিত হয়েছে যে, জা’ফর ইবন আবি তালিব (রা) আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাসীর কাছে মুহাম্মাদ (সা) এর পরিচয় তুলে ধরে বলেন,
أَيُّهَا الْمَلِكُ كُنَّا قَوْمًا أَهْلَ جَاهِلِيَّةٍ نَعْبُدُ الْأَصْنَامَ وَتَأْكُلُ الْمَيْتَةَ وَنَأْتِي الْفَوَاحِشَ وَنَقْطَعُ الْأَرْحَامَ وَنُسِيءُ الْحِوَارَ يَأْكُلُ الْقَوِيُّ مِنَّا الضَّعِيفَ فَكُنَّا عَلَى ذَلِكَ حَتَّى بَعَثَ اللَّهُ إِلَيْنَا رَسُولًا مِنَّا نَعْرِفُ نَسَبَهُ وَصِدْقَهُ وَأَمَانَتَهُ وَعَفَافَهُ فَدَعَانَا إِلَى اللَّهِ
“হে বাদশাহ! আমরা জাহিলী যুগের সম্প্রদায় ছিলাম, আমরা দেবতার পূজা করতাম, মৃত জন্তু খেতাম, অশ্লীলকর্ম করতাম, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতাম এবং প্রতিবেশীর সাথে দূর্ব্যবহার করতাম। আমাদের শক্তিশালী ব্যক্তি দুর্বল ব্যক্তিকে খেয়ে ফেলত। আমরা এ অবস্থার মধ্যেই ছিলাম, তখন আল্লাহ আমাদের নিকট আমাদেরই মধ্য থেকে এমন একজন রাসূলকে পাঠিয়েছেন, যার বংশ পরিচয়, তার সততা, আমানতদারী এবং তার সচ্চরিত্রতা সম্পর্কে আমাদের সবারই ভালোভাবে জানা। অতঃপর তিনি আমাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন (মুসনাদ আহমাদ, নং ১/২০১, নং ১৭৪০, ৫/২৯০, নং ২২৫৫১, ইবন খুযাইমাহ, সহীহ ইবন খুযাইমাহ ২/১৪, নং ১৪, ইবন কাসীর ৫/৪৮৪ )।
এ কারণে সাহাবীগণ (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) যাবতীয় কার্যক্রম, কথাবার্তা, আখলাক-চরিত্র ও আদব-শিষ্টাচার জানার জন্য অধিক আগ্রহী থাকতেন। রাসূল সম্পর্কে তাদের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে যার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। তারা তার সম্পর্কে জানার এতো আগ্রহ এ জন্য দেখিয়েছেন যে, তারা যেন আত্মতৃপ্তি ও প্রশান্ত চিত্তে তার পরিপূর্ণ পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারেন। আল-বারা ইবন ‘আযিব (রা) বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحْسَنَ النَّاسِ وَجْهَا وَأَحْسَنَهُ خَلْقًا لَيْسَ بِالطَّوِيلِ الْبَائِنِ وَلَا بِالْقَصِيرِ
রাসূলুল্লাহ (সা) মানুষদের মধ্যে খুব সুন্দর চেহারা, উত্তম আকৃতির ছিলেন। তিনি খুব দীর্ঘও ছিলেন না আবার খাটও ছিলেন না (সহীহুল বুখারী ৪/১৮৮, নং ৩৫৪৯, সহীহ মুসলিম ৪/১৮২৪, নং ২৩৪৭ )।
হিন্দ ইবন আবি হালাহ বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ فَحْماً مُفَخَّماً يَتَلأَلأُ وَجْهُهُ تَلأَلُقَ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ
রাসূলুল্লাহ (সা) অত্যন্ত অভিজাত, সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। চাঁদনী রাতের চাঁদের আলোর মতো তার চেহারা আলোয় ঝলমল করত (আত্-তাবারানী, আল-মু’জামুল কাবীর ২২/১৫৫, নং ৪১৪, আল-বাইহাকী, শু’আবুল ঈমান ২/১৫৪,
নং ১৪৩০, আলবানী হাদীসটিকে যা’রীফ বলেছেন, সহীহ ওয়া যা’য়ীফুল জামি’ ৩/৩৬৭, নং ৪৪৭০)।
‘আব্দুল্লাহ ইবন সালাম (রা) বলেন,
لَمَّا قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ الْجَفَلَ النَّاسُ إِلَيْهِ فَجِئْتُ فِي النَّاسِ لأَنْظُرَ إِلَيْهِ فَلَمَّا اسْتَثْبَتْ وَجْهَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَرَفْتُ أَنَّ وَجْهَهُ لَيْسَ بِوَجْهِ كَذَّابٍ وَكَانَ أَوَّلُ شَيْءٍ تَكَلَّمَ بِهِ أَنْ قَالَ: أَيُّهَا النَّاسُ أَفْشُوا السَّلامَ وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ وَصَلُّوا وَالنَّاسُ نِيَامٌ
تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ بِسَلَامٍ
যখন রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় আগমন করেন, তখন লোকেরা খুব দ্রুত তার কাছে পৌঁছে গেলেন। আমিও তাদের সাথে তাকে দেখার জন্য আসলাম।
আমি যখন রাসূলুল্লাহর (সা) চেহারা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলাম তখন বুঝলাম যে, তার চেহারা কোনো মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। আর তিনি সর্বপ্রথম যে বিষয় নিয়ে কথা বললেন, তিনি বললেন যে, হে মানব সকল! তোমরা সালামের প্রসার কর, তোমরা খাদ্য দান কর, আর লোকেরা যখন নিদ্রায় মগ্ন থাকে তখন তোমরা সালাত আদায় কর, তাহলে তোমরা নিরাপত্তার সাথে জান্নাতে প্রবেশ করবে (সুনানুত তিরমিযী ৪/৬৫২, নং ২৪৮৫, সুনান ইবন মাজাহ ১/৪২৩, নং ১৩৩৪, আল-বাইহাকী ২/২৫৯, নং ৪৮৩১, ইমাম তিরমিযী ও আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, সহীহ ইবন মাজাহ ৪/২৮, নং ৩২৪২)।
এভাবে রাসূলুল্লাহকে (সা) চেনা ও জানার অনেক বর্ণনা সাহাবায়ে কিরামগণ থেকে বর্ণিত আছে। যা তাদেরকে রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণে পরিপূর্ণতার মানদন্ডে উন্নত হওয়ার পথে উৎসাহ যুগিয়েছে। ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, বান্দা যখন তার প্রতি বিশ্বাসে সত্যবাদী হয় তখন তাকে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা দান করা হয় এবং তার আধ্যাত্মিকতা তার অন্তরে প্রভাব বিস্তার করে। সে তখন তাকে তার ইমাম, শিক্ষক, প্রশিক্ষক, শাইখ এবং কুদওয়াহ (উত্তম নমুনা) হিসেবে গ্রহণ করে।
যেমন আল্লাহ তাকে তার নবী, রাসূল এবং তার দিকে পথপ্রদর্শনকারী করেছেন। তাই বান্দার তার জীবন চরিত, তার দ্বীনের আদর্শ, কিভাবে ওহীর সূচনা হল, তার গুণাগুণ, আখলাক-চরিত্র, তার নড়াচড়া, চলাফেরা, নিদ্রা, জাগরণ, তার ইবাদাত, পরিবার ও সাহাবীদের প্রতি তার আচার-আচরণ ইত্যাদি বিষয়ে তার আদাব ও শিষ্টাচার জানা আবশ্যক হয়ে পড়ে। যাতে করে সে রাসূলের (সা) সাথে সকল দিক থেকে তার সাহাবীদের মত একিভূত হয়ে উঠতে পারে (ইবনুল কাইয়্যেম, মুহাম্মাদ ইবন আবু বাকর, মাদারিজুস সালিকীন, সম্পাদনা, মুহাম্মাদ হামিদ আল-ফিকী, বৈরুত, দারুল কিতাবিল ‘আরাবী, ২য় সংস্করণ, ১৩৯৩ হি. ৩/২৬৮ )।
জাবির ইবন সামুরাহ (রা) বলেন,
رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي لَيْلَةٍ إِضْحِيَانٍ فَجَعَلْتُ أَنْظُرُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَإِلَى الْقَمَرِ وَعَلَيْهِ حُلَّةٌ حَمْرَاءُ فَإِذَا هُوَ عِنْدِي أَحْسَنُ مِنْ الْقَمَرِ
আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) এক উজ্জ্বল আলোকিত রাতে দেখেছি। আমি তখন একবার রাসূলুল্লাহর (সা) দিকে তাকাতে লাগলাম আরেকবার চাঁদের দিকে, আর তার গায়ে লাল চাদর ছিল। আমার কাছে তাকেই চাঁদের চেয়ে অধিক সুন্দর বলে মনে হয়েছে (সুনানুত তিরমিযী ৫/১১৮, নং ২৮১১, সুনানুদ দারিমী ১/৪৪, নং ৫৭, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান গরীব বলেছেন, আলবানী সহীহ বলেছেন )।
ইবন রাজাব বলেন, রাসূলের (সা) ভালোবাসা সৃষ্টি হয় তাকে চেনা ও জানার মাধ্যমে। তার পরিপূর্ণ গুণাগুণ, ও অনন্য বৈশিষ্টসমূহ এবং তিনি যে দ্বীন নিয়ে এসেছেন তার মহত্ব, বড়ত্ব ও বিশালত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট জানা ও জ্ঞান সমৃদ্ধ হওয়ার মাধ্যমেই কেবল তার প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। রাসূলের (সা) ভালোবাসার দু’টি স্তর রয়েছে, এক, ফরয, অর্থাৎ ফরয, ওয়াজিবাত ও তার যাবতীয় আবশ্যকীয় নির্দেশকে মান্য করা, নিষিদ্ধ সম্পর্কিত তার সকল নিষেধাজ্ঞা অনুসরণ করে তা থেকে বিরত থাকা, এবং তিনি যে কোনো বিষয়ে যে বিধি বিধান ও সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং এ ব্যাপারে মনের মধ্যে কোনো প্রকার সংকীর্ণতা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব লালন না করা, তার হিদায়াতের আলো ছাড়া অন্য কোথা থেকে সঠিক পথ পাওয়া ও তার আনিত বিধানের বাইরে কল্যাণ কামনা না করা। এসব বিষয়ে তার প্রতি ভালোবাসা ফরয ও অত্যাবশ্যক। দুই. উত্তম ও সুন্নাত, অর্থাৎ প্রথমোক্ত পর্যায়ের হক যথাযথ আদায় করার পর ভালোবাসার স্তরকে আরো উন্নত পর্যায়ে সমৃদ্ধ করা। এক্ষেত্রে রাসূলের (সা) নিজস্ব জীবনাচার, আদব-শিষ্টাচার, স্বভাব-চরিত্র, পরিবারের সদস্যদের সাথে তার আচার-আচরণ, উঠাবসা, দুনিয়ার প্রতি তার বিরাগ ভাব, পরকালের প্রতি প্রবল আকাঙ্খা, তার দান-সাদাকাত, আত্মত্যাগ, ক্ষমা, সহিষ্ণুতা, বিনয় ইত্যাদি প্রকারের বাহ্যিক চরিত্রের অনুসরণ করা এবং আল্লাহর ভয়, তাঁর প্রতি তার ভালোবাসা, তাঁর সঙ্গে তার সাক্ষাত লাভের ব্যাকুলতা ইত্যাদি প্রকারের অপ্রকাশ্য চারিত্রিক গুণাবলির অনুকরণ করা ব্যক্তির জন্য উত্তম এবং কল্যাণকর। এসব ক্ষেত্রে তার প্রতি ভালোবাসা প্রথম পর্যায়ের মতো অপরিহার্য ও ফরয নয় বরং উত্তম ও সুন্নাত পর্যায়ের (ইবন রাজাব, যাইনুদ্দীন, আব্দুর রাহমান ইবন শিহাব আদ- দিমাশকী, ফাতহুল বারী, সম্পাদনা, আবু মু’আয তারিক, সৌদি ‘আরব-দাম্মাম, দার ইবনুল জাওযী, ২য় সংস্করণ, ১৪২২ হি. ১/৪৮-৪৯ )।
খ- রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ঈমান পোষণ করা এবং তার পেশকৃত সকল বিষয়কে সত্য বলে স্বীকার করা, তার প্রতি ঈমান পোষণ ও তার উপস্থাপিত সকল তথ্য ও তত্বকে সত্য বলে ঘোষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে সাহাবীগণ ছিলেন মানদণ্ড। মহান আল্লাহ সাহাবীগণের ঈমানের মতো ঈমান আনার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
{وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ }
“আর যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা ঈমান আন যেমন লোকেরা ঈমান এনেছে।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৩)। এ আয়াতে উল্লেখিত ‘নাস’ শব্দ দ্বারা সাহাবীগণকেই বোঝানো হয়েছে। কেননা আল-কুরআন নাজিলের যুগে তারাই ঈমান এনেছিলেন। সঠিক ঈমানের মানদণ্ড ছিলেন সাহাবায়ে কিরাম, এ আয়াতে সে প্রত্যয়নই করা হয়েছে। অন্য আরেকটি আয়াতে সাহাবীগণের ঈমানকে হেদায়াত লাভের মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরেছেন। আল্লাহ ‘আয্যা ওয়া জাল্লা বলেন,
{فَإِنْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنْتُمْ بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوْا وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ }
“অতঃপর তোমরা যেরূপ ঈমান এনেছ তারাও যদি সেরূপ ঈমান আনে, তবে নিশ্চয় তারা হেদায়াত পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারা বিরোধিতায় লিপ্ত, সুতরাং তাদের বিপক্ষে আপনার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৩৭)
এ আয়াতে সাহাবীগণের ঈমানকে প্রকৃত হেদায়াত লাভের মানদণ্ড করে দেওয়া হয়েছে। কেননা তারা এমন ঈমানেরই প্রশিক্ষণ রাসূলুল্লাহর (সা) কাছ থেকে পেয়েছেন। তাই যারা সাহাবীগণের ঈমানের বিপরীত ঈমানের কথা চিন্তা করবে, এ চিন্তা-বিশ্বাস তাদেরকে বিভেদ, অনৈক্য ও বিরোধের গর্তে পতিত করবে (তাফসীর ইবন কাসীর ১/৪৫০, আশ- শাইখ আস- সা’দী, তাইসীরুল কারীমির রাহমান ফী তাফসীরি কালামিল মান্নান, পৃ. ৯৭ )।
বস্তুত: সাহাবায়ে কিরাম (রা) সাধারণ কোনো মানুষ ছিলেন না। তাদের ঈমান ও আনুগত্যের সাক্ষ্য স্বয়ং মহিমান্বিত আল্লাহ তা’আলা দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ آوَوْا وَنَصَرُوا أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ }
“আর যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, আর যারা আশ্রয় দান করেছে এবং সাহায্য করেছে, তারাই প্রকৃত মু’মিন; তাদের জন্য ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা রয়েছে।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৭৪)। এ আয়াতে মহিমান্বিত আল্লাহ সাহাবায়ে কিরামগণের প্রকৃত ঈমান সম্পর্কে অবহিত করছেন এবং দুনিয়াতে তাদের জন্য কি করণীয় রয়েছে তার নির্দেশনা দেবার পর পরকালে তাদের জন্য কি পুরস্কার রয়েছে, তা তুলে ধরেছেন। সেখানে তারা আল্লাহ তা’আলার নিকট ক্ষমা পাবে, ভুল-ত্রুটি থাকলে তা মার্জনা করা হবে এবং এমন উত্তম রিযিক ও পুরস্কারে ভূষিত করা হবে, যা হবে তাদের জন্য স্থায়ী। কখনো তারা তা থেকে বঞ্চিত হবে না, সে পুরস্কার নিঃশেষ হবে না। এমনকি তা রকমারি হওয়ার কারণে তাদের কাছে তা বিরক্তিকর বা একঘুঁয়েমীপূর্ণ বলেও মনে হবে না (তাফসীর ইবন কাসীর ৪/৯৯)।
আল্লাহ তা’আলা তাদের অন্তরে ঈমান ও ‘আমলের গভীর ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছেন এবং কুফরী, পাপাচার এবং অবাধ্যতার প্রতি চরম ঘৃণা ও বিদ্বেষকে স্বভাবগত করে দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু বলেন,
وَلَكِنَّ اللَّهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ الْإِيمَانَ وَزَيَّنَهُ فِي قُلُوبِكُمْ وَكَرَّهَ إِلَيْكُمُ الْكُفْرَ وَالْفُسُوقَ وَالْعِصْيَانَ أُولَئِكَ هُمُ الرَّاشِدُونَ }
“কিন্তু আল্লাহ তোমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং সেটাকে তোমাদের হৃদয়গ্রাহী করেছেন। আর কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে তোমাদের কাছে অপছন্দনীয় করেছেন। তারাই তো সত্য পথপ্রাপ্ত।” [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৭]। এ আয়াতেও আল্লাহ তা’আলা সাহাবীগণকে সত্য পথপ্রাপ্ত বলে প্রত্যয়ন করেছেন। আর সত্য পথপ্রাপ্তদের বৈশিষ্ট হচ্ছে, তাদের কাছে ঈমান ও ইসলাম সবচেয়ে প্রিয় হবে। ঈমান ও ইসলামের কর্ম দ্বারা অন্তর-আত্মা ও জীবনকে সাজাবে এবং ঈমানের পরিপন্থী কুফরী ও শিরকী ব্যবস্থা, পাপাচার এবং আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলের (সা) অবাধ্যতাকে কঠিনভাবে ঘৃণা করবে ও তা প্রত্যাখ্যান করবে ( তাফসীর ইবন কাসীর ৭/৩৭২, ফাতহুল কাদীর ৭/১০, আত্- তাফীরুল মুয়াস্স্সার, কতিপয় বিশিষ্ট আলিম কর্তৃক লিখিত, তত্ত্বাবধান, ড. ‘আব্দুল্লাহ আল- মুহসিন আত্ তুরকী, প্রকাশ, বাদশাহ ফাহদ লাইব্রেরী, রিয়াদ, আল মাকতাবাতুশ শামিলাহ, ৯/২২৮)।
রাসূলুল্লাহর (সা) কথা, তত্ত্ব, তথ্য ও সংবাদকে নিঃসংকোচে সত্য বলে। স্বীকার করা এবং তার সামনে সত্য উচ্চারণ করার ক্ষেত্রেও সাহাবায়ে কিরাম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন। এ বিষয়ে নিম্নে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো;
১- ইসরা ও মি’রাজের ঘটনা শোনামাত্র সত্য বলে স্বীকার করা, আবু বকর (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহর (সা) একটি মাত্র রাতে বাইতুল্লাহ থেকে সুদূর মসজিদে আকসা হয়ে উর্ধ্বাকাশে মি’রাজ সম্পন্ন করে আবার মক্কায় ফিরে আসার কথা যখন শোনানো হল, তখন তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা সত্য বলে স্বীকার করে নিলেন। এ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়েশা (রা) বলেন, নবী (সা) কে যখন আল-মাসজিদুল আকসাতে এক রাতের মধ্যেই ভ্রমণ করিয়ে আনা হলো, তখন লোকেরা এ ঘটনা নিয়ে মুখরোচক আলোচনা করতে লাগল। এমন কি কিছু মানুষ, যারা তার প্রতি ঈমান এনেছিল, তাকে সত্য বলে স্বীকার করত তারা মুরতাদ হয়ে গেল। তারা বিষয়টি আবু বকর (রা) কে শুনিয়ে বলল, তুমি কে জান যে, তোমার সাথী দাবী করছে যে, তাকে এক রাতের মধ্যেই বাইতুল মাকদিসে ভ্রমণ করানো হয়েছে? তখন তিনি বলেন,
أَوْ قَالَ ذَلِكَ؟ قَالُوا: نَعَمْ، قَالَ: لَئِنْ كَانَ قَالَ ذَلِكَ لَقَدْ صَدَقَ، قَالُوا: أَوَ تُصَدِّقُهُ أَنَّهُ ذَهَبَ اللَّيْلَةَ إِلَى بَيْتِ الْمَقْدِسِ وَجَاءَ قَبْلَ أَنْ يُصْبِحَ؟ قَالَ: نَعَمْ، إِنِّي لَأُصَدِّقُهُ فِيمَا هُوَ أَبْعَدُ مِنْ ذَلِكَ أُصَدِّقُهُ بِخَيْرِ السَّمَاءِ فِي غُدْوَةٍ أَوْ رَوْحَةٍ فَلِذَلِكَ سُمِّيَ أَبُو بَكْرِ الصِّدِّيقَ
তিনি (রাসূলুল্লাহ) কি এমনটি বলেছেন? তারা বলল, হ্যাঁ। তিনি বলেন, যদি তিনি তা বলে থাকেন, তাহলে তিনি তো সত্যই বলেছেন। তারা বলল, তুমি তাহলে তাকে সত্যবাদী বলে স্বীকার করছো যে, তিনি এক রাতে বাইতুল মুকাদ্দিসে গিয়ে সকাল হওয়ার আগেই আবার ফিরে এসেছে? তিনি বলেন, হ্যাঁ; কেননা আমি তাকে এর চাইতে আর দূরবর্তী স্থানের খবরকে সত্য বলে স্বীকার করি, তিনি সকালবেলা ও বিকালবেলায় আকাশের খবর পরিবেশন করেন, আমি তা সত্য বলে স্বীকার করি। আর এ কারণে আবু বকরকে ‘আস্-সিদ্দীক’, নামে নামকরণ করা হয় (আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ‘আলাস সহীহাইন ৩/৬৫, নং ৪৪০৭, ৩/৮১, নং ৪৪৫৮, ‘আব্দুর রায্যাক আস্-সান’আনী, আল-মুসান্নাফ ৫/৩২১, নং ৯৭১৯, আল-বাইহাকী, দালাইলুন-নাবুওয়াহ ২/২৪৬, নং ৬৫২, আল-হাকিম হাদীসটিকে সহীহুল ইসনাদ বলেছেন, আয-যাহাবীও তার অনুসরণে সহীহ বলেছেন, আলবানীও সহীহ বলেছেন, সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহাহ ১/২৩, নং ৩০৬ )।
আবু বকর (রা) যে রাসূলের (সা) সব কথা নিঃসংকোচে সত্য বলে স্বীকার করে নিতেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) সে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আবু দারদা (রা) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন,
كُنتُ جَالِسًا عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ أَقْبَلَ أَبُو بَكْرٍ آخِذًا بِطَرَفِ ثَوْبِهِ حَتَّى أَبْدَى عَنْ رَكْبَتِهِ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَّا صَاحِبُكُمْ فَقَدْ غَامَرَ فَسَلَّمَ وَقَالَ إِنِّي كَانَ بَيْنِي وَبَيْنَ ابْنِ الْخَطَّابِ شَيْءٌ فَأَسْرَعْتُ إِلَيْهِ ثُمَّ نَدِمْتُ فَسَأَلْتُهُ أَنْ يَغْفِرَ لِي فَأَبَى عَلَيَّ فَأَقْبَلْتُ إِلَيْكَ فَقَالَ
يَغْفِرُ اللهُ لَكَ يَا أَبَا بَكْرٍ ثَلَاثًا ثُمَّ إِنَّ عُمَرَ نَدِمَ فَأَتَى مَنْزِلَ أَبِي بَكْرٍ فَسَأَلَ أَثْمَ أَبُو بَكْرٍ فَقَالُوا لَا فَأَتَى إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَلَّمَ فَجَعَلَ وَجْهُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَمَقَّرُ حَتَّى أَشْفَقَ أَبُو بَكْرٍ فَجَنَا عَلَى رُكْبَتَيْهِ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَاللَّهِ أَنَا كُنْتُ أَظْلَمَ مَرَّتَيْنِ فَقَالَ النَّبِيُّ
صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ اللَّهَ بَعَثَنِي إِلَيْكُمْ فَقُلْتُمْ كَذَبْتَ وَقَالَ أَبُو بَكْرٍ صَدَقَ وَوَاسَانِي بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَهَلْ أَنْتُمْ تَارِكُوا لِي صَاحِبِي مَرَّتَيْنِ فَمَا أُوذِيَ بَعْدَهَا
“আমি নবী (সা) এর কাছে বসা ছিলাম। এমন সময় আবু বকর তার পরনের কাপড়ের এক কোণা ধরায় তার হাঁটু পর্যন্ত বের হয়ে পড়েছে, এমতাবস্থায় আসলেন। তখন নবী (সা) বলেন, তোমাদের সাথী তো অবশ্যই ঝগড়া-ঝাটিতে জড়িয়ে পড়েছে। অতঃপর তিনি (আবু বকর) সালাম দিলেন এবং বললেন, আমার ও ইবনুল খাত্তাবের মধ্যে একটা কিছু ঘটেছে। তারপর আমি খুব দ্রুতই তার কাছে গিয়েছি, আমি লজ্জিত হয়েছি এবং আমাকে ক্ষমা করে দিন বলেছি। কিন্তু সে আমাকে ক্ষমা করতে অস্বীকার করেছে। তাই আপনার কাছে এসেছি। তখন তিনি বলেন, হে আবু বকর! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করবেন, তিনবার বললেন। তারপর ‘উমার তার ভুল বুঝতে পেরে আবু বকরের বাড়িতে যান এবং জিজ্ঞেস করেন যে, আবু বকর কি বাড়িতে আছেন? তারা বলল, না। তারপর তিনি নবী (সা) এর কাছে হাযির হলেন।
তখন নবী (সা) এর চেহারায় ক্ষোভ প্রকাশ পায়। তাতে আবু বকর শংকিত হয়ে হাঁটুর উপর ভর করেন, অতঃপর বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর শপথ! আমি তার প্রতি অন্যায় করেছি, দু’বার বলেন। তখন নবী (সা) বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ আমাকে তোমাদের কাছে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তোমরা বলেছ, তুমি মিথ্যা বলছ। আর আবু বকর বলেছে, আপনি সত্য বলেছেন। আর তিনি তার জীবন ও সম্পদ দিয়ে আমাকে শান্ত্বনা দিয়েছেন ও সমবেদনা জানিয়েছেন। তোমরা কি আমার সাথীকে আমার জন্য ছেড়ে দেবে? কথাটি দু’বার বলেন। এ ঘটনার পর তাকে আর কোনো দিন কষ্ট দেওয়া হয়নি (সহীহুল বুখারী ৫/৫, নং ৩৬৬১)।
২- রাসূলুল্লাহর (সা) সম্মুখে কা’আব ইবন মালিকের সত্য উচ্চারণ, রাসূলুল্লাহ (সা) ওহীর মাধ্যমে সবকিছু জেনে যেতে পারেন, তার প্রতি গভীর বিশ্বাস থেকে কা’আব ইবন মালিক (রা) তাবুক যুদ্ধ থেকে পেছনে থাকার কারণ অন্যান্যদের মতো মিথ্যা অজুহাত না দিয়ে নিজের প্রকৃত অবস্থা ও সত্যটা তুলে ধরেন এ বিশ্বাসে যে, তার এখন কোনো মিথ্যা বলে এবং সত্য গোপন করে এখন হয়ত পার পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু আল্লাহর রাসূল (সা) এর কাছে নিশ্চিতভাবে আসল সত্য প্রকাশিত হবে। কা’আব (রা) নিজেই এ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন,
فَجِئْتُهُ فَلَمَّا سَلَّمْتُ عَلَيْهِ تَبَسَّمَ تَبَسُّمَ الْمُغْضَبِ ثُمَّ قَالَ تَعَالَ فَجِئْتُ أَمْشِي حَتَّى جَلَسْتُ بَيْنَ يَدَيْهِ فَقَالَ لِي مَا خَلَّفَكَ أَلَمْ تَكُنْ قَدْ ابْتَعْتَ ظَهْرَكَ فَقُلْتُ بَلَى إِنِّي وَاللَّهِ لَوْ جَلَسْتُ عِنْدَ غَيْرِكَ مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا لَرَأَيْتُ أَنْ سَأَخْرُجُ مِنْ سَخَطِهِ بِعُذْرٍ وَلَقَدْ أُعْطِيتُ جَدَلًا وَلَكِنِّي وَاللَّهِ لَقَدْ عَلِمْتُ لَئِنْ
حَدَّثْتُكَ الْيَوْمَ حَدِيثَ كَذِبٍ تَرْضَى بِهِ عَنِّي لَيُوشِكَنَّ اللَّهُ أَنْ يُسْخِطَكَ عَلَيَّ وَلَئِنْ حَدَّثْتُكَ حَدِيثَ صِدْقٍ تَجِدُ عَلَيَّ فِيهِ إِنِّي لَأَرْجُو فِيهِ عَفْوَ اللَّهِ لَا وَاللَّهِ مَا كَانَ لِي مِنْ عُذْرٍ وَاللَّهِ مَا كُنْتُ قَطُّ أَقْوَى وَلَا أَيْسَرَ مِنِّي حِينَ تَخَلَّفْتُ عَنْكَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَّا هَذَا فَقَدْ صَدَقَ
فَقُمْ حَتَّى يَقْضِيَ اللَّهُ فِيكَ
অতঃপর আমি তার (রাসূলুল্লাহর (সা)) কাছে উপস্থিত হলাম এবং তাকে সালাম দিলাম। তিনি ক্ষুব্ধ লোকের মুচকি হাসির মতো হাসি দিলেন, তারপর বললেন, আস। আমি তখন হাটতে হাটতে তার সামনে গিয়ে বসে পড়লাম। তখন তিনি আমাকে বলেন, কি কারণ তোমাকে পেছনে রেখেছিল? তুমি (সফরে যাওয়ার জন্য) তোমার বাহন ক্রয় করেছিলে না? আমি বললাম, হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় আমি যদি আপনি ছাড়া দুনিয়াবাসীদের অন্য কারো সামনে বসতাম, তাহলে ভাবতাম যে, আমি কোনো অজুহাত পেশ করে তার ক্রোধ থেকে মুক্ত হতাম। তাছাড়াও আমি খুব ভালো যুক্তি-তর্ক জানি। আল্লাহর শপথ! কিন্তু আমি নিশ্চিতভাবে জানি যে, আমি যদি আজকে আপনার সামনে মিথ্যা কথা বলি আপনি তাতে আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন, আল্লাহ অচিরেই অবশ্যই (আপনার কাছে সত্য তুলে ধরে) আমার উপরে আপনাকে ক্রোধান্বিত করবেন। আর যদি আমি আপনার কাছে সত্য কথা বলি, তাহলে আপনি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু আমি তাতে আল্লাহর কাছে অবশ্যই ক্ষমা পাওয়ার আশা করি। আল্লাহর শপথ! না, আমার কোনো অসুবিধা ছিলনা। আমি যখন আপনার পেছনে পড়ে ছিলাম তখন যে পরিমাণ শক্তিশালী ও সামর্থবান ছিলাম, তার চেয়ে বেশি আর কখনো ছিলাম না। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আর এ ব্যক্তি, সে তো সত্যই বলেছে। সুতরাং তুমি চলে যাও, যতদিন না আল্লাহ তোমার ব্যাপারে ফায়সালা করেন’ (সহীহুল বুখারী ৬/৬, নং ৪৪১৮, সহীহ মুসলিম ৪/২১২০, নং ২৭৬৯ )।
অর্থাৎ কা’আব ইবন মালিক রাদি ‘আল্লাহ ‘আনহু গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূলকে তার মনের মিথ্যা কথাটি তাকে জানিয়ে দেবেন। তাই সত্য কথা বলাই নিরাপদ। সত্য বলাতে অপরাধ হলেও করুণাময় আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন।
গ. রাসূলুল্লাহর (সা) সাক্ষাত ও তার সঙ্গ লাভের প্রবল আকাঙ্খা,
রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীগণ ঈমানের দাবী অনুযায়ী তাকে গভীর ও অকৃত্রিম ভালোবাসতেন। তাই স্বভাবতঃই তারা তাকে দেখা ও তার সাক্ষাত লাভের প্রবল আশা পোষণ করতেন। তার সঙ্গ ও সাহচর্য লাভে ধন্য হওয়ার খুব ইচ্ছা করতেন। দুনিয়ার জীবনে তো বটেই এমনকি পরকালেও তার সান্নিধ্যে লাভের জন্য মনে প্রানে ব্যাকুল ও অস্থির থাকেন। পার্থিব কোনো স্বার্থের বিনিময়ে তাদেরকে রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গ লাভের বাসনা-কামনা থেকে বিরত রাখা সম্ভব ছিল না। তার নূরানী চেহারা ও চাঁদ বদন এক নজর দেখার জন্য তারা পাগলপরা হতেন। তারা তাকে দেখে পরম সুখ অনুভব করেন এবং যারপর নাই আনন্দিত হন। তার সাক্ষাৎ ও সঙ্গ লাভের এতোটুকু সুযোগ হারানোর আশঙ্কা তাদেরকে অস্থির করে তুলত। বিরহ-বিচ্ছেদের কোনো পরিস্থিতি তাদের নিকট ছিল অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্খিত। মানবতার বন্ধু বিশ্বজগতের করুণার মূর্ত প্রতিক, বিশ্বনবী (সা) এর নন্দিত সাহাবায়ে কিরামগণ (রা) এর এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট ছিল। জীবন ও সম্পদের চেয়ে অধিক প্রিয় আল্লাহর রাসূল (সা) এর দর্শন ও সঙ্গ লাভের জন্য তারা অত্যাধিক আগ্রহী ছিলেন। তার চোখের আড়াল হওয়া, তার দর্শন লাভের সুয়োগ ও সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তাদেরকে ব্যাকুল করে তুলতো। এ ভয়ে তারা সর্বক্ষণ অস্থির থাকতেন (ড. ফাযল ইলাহী, হুদুন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ‘আলামাতুহু, পৃ. ২০)।
সাহাবায়ে কিরামের জীবনে এর অসংখ্য উজ্জ্বল উদাহরণ রয়েছে। নিম্নে কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো:
১- সাহাবীগণের নিকট রাসূলুল্লাহর (সা) সাক্ষাত লাভ ছিল সর্বাধিক প্রিয় বস্তু, সাহাবীগণ (রা) এর নিকট রাসূলুল্লাহর (সা) দর্শন সবচেয়ে বেশি আকাঙ্খার বস্তু। পৃথিবীর কোনো কিছু দেখার প্রতি তাদের এতবেশী আগ্রহ ছিল। তার দর্শন লাভই ছিল তাদের কাছে অধিক প্রিয়। আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
مَا كَانَ شَحْصٌ أَحَبَّ إِلَيْهِمْ رُؤْيَةً مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَكَانُوا إِذَا رَأَوْهُ لَمْ يَقُومُوا لِمَا يَعْلَمُونَ مِنْ كَرَاهِيَتِهِ لِذَلِكَ
সাহাবীগণের নিকট রাসূলুল্লাহর (সা) দর্শন লাভের চেয়ে (পৃথিবীতে) আর কোনো ব্যক্তির দর্শন লাভ অধিক প্রিয় ছিল না। আর তারা যখন তাকে দেখতেন, তার (সম্মানের) জন্য দাঁড়াতেন না। কেননা তারা জানতেন যে, তিনি এটাকে অপছন্দ করতেন (মুসনাদ আহমাদ ৩/২৫০, নং ১৩৬৪৮, সুনানুত তিরমিযী ৫/৯০, নং ২৭৫৪, আল-বুখারী, সহীহুল আদাবিল মুফরাদ, সম্পাদনা, নাসির উদ্দীন আলবানী, প্রকাশক, দারুস-সিদ্দীক, ১ম সংস্করণ, ১৪২১ হি ১/৩৬৭, নং ৯৪৬ )।
২- আল-আশ’আরী গোত্রের লোকদের রাসূলুল্লাহর (সা) দর্শন লাভের ব্যাকুলতা, একথা সর্বজন বিদিত যে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার প্রিয়জনের দর্শন ও সাক্ষাত লাভের গভীর আকাঙ্খা পোষণ করে। সাক্ষাতের সেই শুভক্ষণ যতই নিকটবর্তী হয়, ততই তার মনের অস্থিরতা বেড়ে যায়। আর যেন তর সইছেনা, কখন তার প্রিয়জনের সাথে মিলিত হবে। এমনটি ঘটেছিল বিশিষ্ট সাহাবী আবু মূসা আল-আশ’আরী (রা) এর গোত্র আল-আশ’আরীর মু’মিন-মুসলিমদের ক্ষেত্রে। তারা সুদূর ইয়ামেন দেশ থেকে মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) দর্শন ও সাক্ষাত লাভের গভীর অভিপ্রায় নিয়ে রওয়ানা হয়েছেন। মদীনায় পৌঁছানোর পূর্বেই সাক্ষাতের জন্য তাদের মনের ব্যাকুলতা ও আনন্দের অস্থিরতা কবিতার মাধ্যমে ব্যক্ত করেছিলেন। আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
يَقْدَمُ عَلَيْكُمْ غَدًا أَقْوَامٌ هُمْ أَرَقُ قُلُوبًا لِلْإِسْلَامِ مِنْكُمْ قَالَ فَقَدِمَ الْأَشْعَرِيُّونَ فِيهِمْ أَبُو مُوسَى الْأَشْعَرِيُّ فَلَمَّا دَنَوْا مِنَ الْمَدِينَةِ جَعَلُوا يَرْتَحِزُونَ يَقُولُونَ: غَدًا نَلْقَى الْأَحِبَّهُ مُحَمَّدًا وَحِزْبَهُ فَلَمَّا أَنْ قَدِمُوا تَصَافَحُوا فَكَانُوا هُمْ أَوَّلَ مَنْ أَحْدَثَ الْمُصَافَحَةَ
‘আগামীকাল তোমাদের নিকট একদল লোক আসবে, যারা ইসলামের জন্য তোমাদের চেয়ে অধিক কোমল হৃদয়ের’। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আল-আশ’আরীগণ, যাদের মধ্যে আবু মূসা আল-আশ’আরী ছিলেন আগমন করলেন। তারা যখন মদীনার নিকটবর্তী হলেন, তখন এই বলে কবিতা আবৃত্তি করছিলেন যে, ‘আমরা কাল সাক্ষাত করব সর্বাধিক প্রিয়জনের মুহাম্মাদের সাথে ও তার দলের’।
তারা যখন আগমন করেন, তখন পরস্পরের সাথে মুসাফাহা (করমর্দন) করেন। আর তারাই সর্বপ্রথম মুসাফাহার প্রচলন শুরু করেছিলেন (মুসনাদ ইমাম আহমাদ ৩/১৫৫, নং ১২৬০৪, সহীহ ইবন হিব্বান ১৬/১৬৫, নং ৭১৯৩, আন্-নাসাঈ, আহমাদ ইবন শু’আইব, আস্-সুনানুল কুবরা, সম্পাদনা, ড. ‘আব্দুল গাফ্ফার সুলাইমান ও তার সঙ্গী, বৈরুত, দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১১ হি. ৫/৯২, নং ৮৩৫২, মুসনাদ আহমাদ ও সহীহ ইবন হিব্বানের সম্পাদক শু’আইব আল-আরনাউতসহ অন্যান্য গবেষকগণ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)।
৩- হিজরাতের সাথী হওয়ার সুসংবাদে আনন্দ-অশ্রু, রাসূলুল্লাহর (সা) খাস সাথী ও সর্বাধিক প্রিয় মানুষ আবু বকর (রা) প্রায় সবসময়ই আল্লাহর রাসূলের (সা) কাছাকাছি থাকতেন। কখনো তার সঙ্গ ছাড়তেন না। রাসূলুল্লাহ (সা) হিজরাত করতে পারেন এমন পূর্বাভাস পেয়ে তিনি তার সঙ্গী হওয়ার আশাবাদ ব্যাক্তি করেন। যখন সত্যই হিজরাতের সময় ঘনিয়ে এল এবং তিনি সাথী হিসেবে রাসূলের (সা) সঙ্গে থাকছেন, এমন সুসংবাদে তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ কান্না কষ্টের কান্না নয়, এ অশ্রু বিরহ-বেদনার কোনো অশ্রু নয়। এ কান্না আনন্দের, তৃপ্তির, এ অশ্রু সুখের ও উৎফুল্ল মনের উষ্ণু চোখের শিতল ঝরনাধারা। উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রা) ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, একদিন আমরা আবু বকর (রা) এর বাড়িতে দ্বি-প্রহরের সময় বসা ছিলাম। তখন কোনো এক ব্যক্তি আবু বকরকে খবর দিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) চেহারা আবৃত করে উপস্থিত হয়েছেন। সাধারণত তিনি এমন সময় কখনো আসতেন না। আবু বকর বলেন, আমার পিতা-মাতা তার জন্য উৎসর্গ হোক! আল্লাহর শপথ! তিনি এ সময়ে নিশ্চয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে এসেছেন। আয়েশা (রা) বলেন,
فَجَاءَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاسْتَأْذَنَ، فَأُذِنَ لَهُ فَدَخَلَ، فَقَالَ: حِينَ دَخلَ لِأَبِي بَكْرٍ أَخْرِجْ مَنْ عِنْدَكَ، قَالَ: إِنَّمَا هُمْ أَهْلُكَ بِأَبِي أَنْتَ يَا رَسُولَ اللَّهِ! قَالَ: فَإِنِّي قَدْ أُذِنَ لِي فِي الْخُرُوجِ، قَالَ: فَالصُّحْبَةَ بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ! قَالَ: نَعَمْ
অতঃপর নবী (সা) আসেন এবং অনুমতি প্রার্থনা করেন। তাকে অনুমতি দেওয়া হলে তিনি প্রবেশ করেন। তারপর তিনি প্রবেশ করে আবু বকরকে বলেন, ‘আপনার নিকটে যারা আছে তাদেরকে বের করে দিন’। আবু বকর বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জন্য আমার পিতা উৎসর্গ হোক! এখানে যারা আছে তারা তো আমার পরিবারের সদস্য। তিনি বলেন, ‘আমাকে বাইরে চলে যাওয়ার (হিজরত করার) অনুমতি প্রদান করা হয়েছে’। আবু বকর বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা ও আমার মা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক! আমি আপনার সঙ্গী হওয়ার আশা করছি। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ ( সহীহুল বুখারী, ৫/৫৯, নং ৩৯০৫, ৭/১৪৫, নং ৫৮০০৭, বাবু হিজরাতিন নবী )।
হাফিয ইবন হাজর আল-‘আসকালানী এ বর্ণনার সাথে সংযোজন করে বলেন, ইবন ইসহাক উপর্যুক্ত বর্ণনার সাথে আরো অতিরিক্ত যোগ করে উল্লেখ করেছেন যে, তখন আয়েশা (রা) বলেন,
فَرَأَيْتُ أَبَا بَكْرٍ يَبْكِي وَمَا كُنْتُ أَحْسِبُ أَنَّ أَحَدًا يَبْكِيْ مِنَ الْفَرَحِ
“আমি সে সময় আবু বকরকে কাঁদতে দেখেছি। বস্তুত: মানুষ যে খুশীতে ও আনন্দেও কান্না করে, আমি ইতোপূর্বে তা চিন্তাও করতে পারিনি (ফাতহুল বারী, ৭/২৩৫, ইসহাক ইবন ইবরাহীম রাহওয়াইহ, মুসনাদ ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ,
সম্পাদন, ড. ‘আব্দুল গাফুর আল-বালুশী, আল-মদীনাহ আল-মুনাওয়ারাহ, মাকতাবাতুল ঈমান, ১ম সংস্করণ, ১৪১২ হি, ২/৫৮৪, ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ২/৬৯)। এ ঘটনাটি এমন সময়, যখন মক্কার কুরাইশ কাফির নেতৃবর্গ ও সাধারণ জনগণ তার জীবনের চরম শত্রু হিসেবে তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই কঠিন মুহূর্তে রাসলুল্লাহ (সা) এর সাথে দেশ ত্যাগের সফরটি কতটা বিপদ সংকুল ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল তা আবু বকর (রা) এর মোটেও অজানা ছিল না। এতোদ্ব সত্বেও তিনি তার সফরসঙ্গী ও সাহচর্য লাভের প্রবল আকাঙ্খায় এতোটুকুন ভাটা পড়েনি। জীবন, সম্পদ ও পরিবারের চেয়ে আল্লাহর রাসূলকে অধিক ভালোবেসেছেন বলেই এমন অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। নিজের সবকিছুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে তার সান্নিধ্যকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। শুধু তাই নয় বরং রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট থেকে সঙ্গী হওয়ার সম্মতি পাওয়ার পর তিনি এতোটাই আনন্দিত হয়েছেন যে, আনন্দের আতিশয্যে কেঁদেই ফেলেছেন (, ড. ফাযল ইলাহী, হুজুন নবী, পৃ. ২২)।
৪- রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় আগমনের বার্তা শুনে আনসার সাহাবীগণের আনন্দ উৎসব: ‘রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় হিজরত করবেন’ এমন খবর শুনে মদীনার আনসার সাহাবীগণ তাকে স্বাগত জানানোর জন্য এবং নিজেদের মধ্যে তাকে পাওয়ার প্রবল আকাঙ্খা নিয়ে অধীর আগ্রহে মদীনার প্রবেশ পথে প্রচণ্ড রোদ উপেক্ষা করে অপেক্ষা করতে থাকেন। হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থগুলো বিশ্বজগত শ্রেষ্ঠ মেহমানকে মদীনাতে স্বাগত জানানোর জন্য মদীনাবাসীদের মনের কি যে আকুতি, আগ্রহ, আকাঙ্খা ও আন্তরিক প্রস্তুতি, সে সব বর্ণনা তুলে ধরেছে। ইমাম আল-বুখারী বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহকে (সা) অভিনন্দন ও সুস্বাগতম জানানোর নিমিত্তে সাহাবায়ে কিরামগণ মদীনার উপকণ্ঠে ‘হাররাহ’ (কঙ্করময় স্থান) নামক স্থানে অপেক্ষা করতেন। ‘উরওয়া ইবনু যুবাইর (রা) সে ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন: ‘মদীনার মুসলিমগণ শুনতে পেলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মাক্কা থেকে বের হয়ে পড়েছেন। তাই তারা প্রতিদিন অতি প্রত্যুষে ‘হাররাহ’ নামক স্থানে হাযির হয়ে পথ চেয়ে থাকতেন। গরম তীব্র আকার ধারণ না করা পর্যন্ত তারা সেখানেই অপেক্ষা করতেন। একদিন দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর তারা যখন বাড়িতে ফিরে এসেছেন, এমন সময় জনৈক ইহুদী কোনো কিছু দেখার জন্য তাদের দূর্গের উপরে উঠেন। তখন সে আল্লাহর রাসূল (সা) ও তার সঙ্গীগণকে ধবধবে সাদা পোষাকে মরুভূমির মরিচিকার জাল ছিন্ন করে প্রতিভাত হতে দেখলো। ইহুদী নিজেকে সংবরন করতে না পেরে উচ্চ স্বরে বলে উঠলো,
يَا مَعَاشِرَ الْعَرَبِ هَذَا جَدُّكُمْ الَّذِي تَنْتَظِرُونَ فَثَارَ الْمُسْلِمُونَ إِلَى السَّلَاحِ فَتَلَقَّوْا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِظَهْرِ الْحَرَّةِ فَعَدَلَ بِهِمْ ذَاتَ الْيَمِينِ حَتَّى نَزَلَ بِهِمْ فِي بَنِي عَمْرِو بْنِ عَوْفٍ وَذَلِكَ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ مِنْ شَهْرِ رَبِيعٍ الْأَوَّلِ فَقَامَ أَبُو بَكْرٍ لِلنَّاسِ وَجَلَسَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ
وَسَلَّمَ صَامِنًا
“হে ‘আরবের লোকেরা! তোমাদের প্রতিক্ষিত নেতা এসে পড়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম জন-সাধারণ অস্ত্র সজ্জিত হয়ে ‘হাররাহ’ নামক স্থানে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে মিলিত হলেন। তিনি তাদেরকে সাথে নিয়ে ডান দিকের পথ ধরে বনু ‘আমর ইবন ‘আউফের বসতি এলাকায় অবতরণ করেন। দিনটি ছিল রবী’উল আওয়াল মাসের সোমবার। আবু বকর লোকদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে যান আর রাসূলুল্লাহ (সা) চুপ করে বসে থাকেন.. (সহীহুল বুখারী, ৫/৫৮-৬০, নং ৩৯০৫, বাব হিজরাতিন- নবী)। ইবন সা’আদের বর্ণনায় আছে যে, সূর্যের তীব্র তাপ দাহে ঝলসে যাওয়ার উপক্রম হলেই কেবল মদীনাবাসীরা অপেক্ষার যবনিক টেনে ফিরে যেতেন ( ইবন সা’আদ, মুহাম্মাদ ইবন, আত তাবাকাতুল কুবরা, সম্পাদনা, ইহসান ‘আব্বাস, বৈরুত, দার সাদির, ১ম সংস্করণ, ১৯৬৮ ৭, ১/২০৩)
মদীনার আনসার সাহাবীগণ আল্লাহর রাসূল (সা) কে কিভাবে স্বাগত জানিয়েছেন, আনাস ইবন মালিক (রা) এর বর্ণনা থেকে সে সম্পর্কে জানা যায়। আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ‘হাররাহ’ নামক স্থানে অবতরণ করেন এবং আনসারদের নিকট সংবাদ প্রেরণ করেন। তারা নবী (সা) ও আবু বকরের নিকট আসেন এবং সালাম দিয়ে আরজ করেন যে,
اركَبَا آمِنَيْنِ مُطَاعَيْنِ فَرَكِبَ نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبُو بَكْرٍ وَحَقُوا دُونَهُمَا بِالسَّلَاحِ فَقِيلَ فِي الْمَدِينَةِ جَاءَ نَبِيُّ اللَّهِ جَاءَ نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَشْرَفُوا يَنْظُرُونَ وَيَقُولُونَ جَاءَ نَبِيُّ اللَّهِ جَاءَ نَبِيُّ اللَّهِ فَأَقْبَلَ يَسِيرُ حَتَّى نَزَلَ جَانِبَ دَارٍ أَبِي أَيُّوبَ
‘আপনারা মহাসম্মানিত অতিথির মর্যাদায় পরিপূর্ণ নিরাপত্তার সাথে বাহনে উঠে বসুন’। তখন রাসূল (সা) ও আবু বকর অস্ত্র সজ্জিত আনসার সাহাবীগণের বেষ্টনীতে বাহনে আরোহণ করেন। মদীনার আকাশ বাতাস তখন এই ধ্বনিতে মুখরিত হচ্ছিল যে, ‘আল্লাহর নবীর আগমন হয়েছে, আল্লাহর নবীর আগমন হয়েছে’। সর্বস্তরের জনসাধারণ ঘরের বাইরে এসে বলেন, ‘আল্লাহর নবী (সা) এর শুভাগমন হয়েছে’। এমনি অবস্থার মধ্য দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা) সামনের দিকে এগিয়ে চলেন এবং আবু আইউবের বাড়ির পাশে অবতরণ করেন’ (সহীহুল বুখারী, বাবু হিজরাতিন নবী, ৫/৬২, নং ৩৯১১)।
রাসূলুল্লাহ (সা) ও আবু বকর (রা) কে মদীনাবাসীদের স্বাগত জানানো ও তাদেরকে বরণ করে নেওয়ার কি অভূতপূর্ব দৃশ্য ছিল তা হাদীসের বর্ণনা থেকে জানা যায়। আল-বারা (রা) আবু বকর (রা) এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আবু বকর বলেন,
وَمَضَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا مَعَهُ حَتَّى قَدِمْنَا الْمَدِينَةَ فَتَلَقَّاهُ النَّاسُ فَخَرَجُوا فِي الطَّرِيقِ وَعَلَى الْأَجَاجِيرِ فَاشْتَدَّ الْخَدَمُ وَالصَّبْيَانُ في الطَّرِيقِ يَقُولُونَ اللَّهُ أَكْبَرُ جَاءَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَاءَ مُحَمَّدٌ قَالَ وَتَنَازَعَ الْقَوْمُ أَيُّهُمْ يَنْزِلُ عَلَيْهِ قَالَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ
صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْزِلُ اللَّيْلَةَ عَلَى بَنِي النَّجَّارِ
রাসূলুল্লাহ (সা) রওয়ানা হলেন আর আমি তার সাথে ছিলাম। এমতাবস্থায় আমরা মদীনায় আগমন করলাম। লোকেরা তার সাথে মিলিত হলেন। তাই তারা রাস্তা-ঘাট এবং বাড়ি-ঘরের ছাদে বেরিয়ে পড়ল। খাদিম, সেবক আর বাচ্চাদের দিয়ে রাস্তা-ঘাট ভরে গেল। তারা বলতে থাকল, আল্লাহু আকবার! রাসূলুল্লাহ (সা) এসেছেন, মুহাম্মাদ এসেছেন। আর লোকেরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া শুরু করে দিল যে, তিনি তাদের মদ্য কার বাড়িতে অবতরণ করবেন। তিনি বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আজ রাতে আমি বনু নাজ্জারের নিকটে অতিথী হব’ (মুসনাদ আহমাদ ১/২, নং ৩)।
আনাস ইবন মালিক (রা) এর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, কতো মানুষ তাদের দু’জনকে স্বাগতম জানানোর জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি বলেন,
فَاسْتَقْبَلَهُمَا زُهَاءَ خَمْسِ مِائَةٍ مِنْ الْأَنْصَارِ حَتَّى انْتَهَوْا إِلَيْهِمَا فَقَالَتْ الْأَنْصَارُ انْطَلِقَا آمِنَيْنِ مُطَاعَيْنِ
প্রায় ৫০০ আনসার সাহাবী তাদের দু’জনকে স্বাগতম জানানোর জন্য সমবেত হয়েছিলেন। এমতাবস্থায় তারা তাদের দু’জনের কছে পৌঁছে যান। তখন আনসারগণ বলেন, আপনারা মর্যাদাবান ও নিরাপদ অবস্থায় সামনে চলুন’ (আহমাদ বিন হাম্বল, মুসনাদে ইমাম আহমাদ, ৩/২২২, নং ১৩৩৪২, আবু মুহাম্মাদ আল-কাসী, ‘আব্দ ইবন হুমাইদ, আল-মুনতাখাব মিন মুসনাদ ‘আব্দ ইবন হুমাইদ, সম্পাদনা, সুবহী আল-বাদরী ও তার সঙ্গী, কায়রো, মাকতাবাতুস্ সুন্নাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪০৮ হি. ১/৩৭৮, নং ১২৬)।
এই দিনে মদীনাবাসীদের আনন্দের চিত্র কেমন ছিল তা আল-বারা ইবন ‘আযিব (রা) এর বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবেই পাওয়া যায়। আল-বারা ইবন ‘আযিব (রা) বলেন
, فَمَا رَأَيْتُ أَهْلَ الْمَدِينَةِ فَرِحُوا بِشَيْءٍ فَرْحَهُمْ بِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
রাসূলুল্লাহর (সা) আগমনে মদীনাবাসীগণ যত আনন্দিত হয়েছিল, আর কোনো বিষয়ে তাদেরকে এত আনন্দিত হতে আমি আর দেখিনি (সহীহুল বুখারী, ৫/৬৬, নং ৩৯২৫, বাবু মাকদামিন নবী, ৬/১৬৮, নং ৪৯৪১)।
অপরদিকে আনাস ইবন মালিক (রা) এই মোবারাক দিনের আনন্দের দৃশ্য বর্ণনা করে বলেন,
فَمَا رَأَيْتُ يَوْماً قَطُّ أَنْوَرَ وَلَا أَحْسَنَ مِنْ يَوْمِ دَخَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَأَبُو بَكْرِ المَدِينَةَ
প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ (সা) ও আবু বকর যেদিন মদীনায় প্রবেশ করেন, সেদিনের চেয়ে অধিক জ্যোতির্ময় ও উত্তম আর কোনো দিন আমি দেখিনি’ (মুসনাদে ইমাম আহমাদ, ৩/১২২, নং ১২২৫৬, হাদীসটির সানাদ সহীহ)।
৫- জনৈক সাহাবীর জান্নাতে রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গী হওয়ার প্রার্থনা, একবার রাসূলুল্লাহ (সা) তার সেবক সাহাবী রাবী’আহ ইবন কা’আব আল-আসলামী (রা) কে কিছু চাওয়ার সুযোগ দিলেন। বিস্ময়করভাবে তিনি দুনিয়ার কোনো স্বার্থ প্রার্থনা না করে জান্নাতে রাসুলুল্লাহ (সা) এর সঙ্গী হওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। আল্লাহর রাসূল পুনরায় তাকে অন্যকিছু চাওয়ার সুযোগ দিলে তিনি আবার জান্নাতে তার সঙ্গী হতেই চাইলেন। সাহাবী রাবী’আহ (রা) নিজেই সে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন,
كُنتُ أَبِيتُ مَعَ رَسولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَتَيْتُه بِوَضُونِهِ وَحَاجَتِهِ، فَقَالَ لِي: سَلْ فَقُلْتُ: أَسْأَلُكَ مُرَافَقَتَكَ فِي الْجَنَّةِ. قَالَ: أَوْ غَيْرُ ذَلِكَ؟. قُلْتُ : هُوَ ذَاكَ. قَالَ: فَأَعِنِّي عَلَى نَفْسِكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ
‘আমি আল্লাহর রাসূল (সা) এর সাথে রাত্রি যাপন করি। আমি তার জন্য ওযুর পানি এবং প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে আসি। অতঃপর তিনি আমাকে কিছু চাইতে বললেন। আমি বললাম, আমি জান্নাতে আপনার সাথী হতে চাই। তিনি বলেন, এ ছাড়া আর কিছু কি চাও?। আমি বললাম, এটাই চাই। তিনি বলেন, ‘তাহলে তোমার নিজের জন্যই তুমি বেশি বেশি সাজদাহ (সালাত আদায়) করে আমাকে সাহায্য কর (ইমাম মুসলিম, সহীহ মুসলিম, ১/৩৫৩, নং ৪৮৯, সালাত অধ্যায়, সুনান আবি দাউদ ১/৫০৭,নং ১৩২২)।
এ ভাবেই রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার মানুষটি তার কাছে কিছু চাওয়ার সুযোগ পেয়েই তার সঙ্গী হওয়ার আবেদনই করলেন। পার্থিব কোনো স্বার্থ হাসিলের আকাঙ্খা পেশ করেননি। এমনকি দ্বিতীয়বার চাওয়ার সুযোগ পেয়েও এই নিবেদিত প্রাণ সাহাবী রাবী’আহ (রা) পুনরায় জান্নাতে তার সঙ্গী হওয়ার আবেদনই করেন ( ড. ফাফল ইলাহী, হুব্বুন নবী, পৃ. ৩৩)।
৬- রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গ লাভ থেকে বিচ্ছেদের আশঙ্কায় আনসার সাহাবীগণের অস্থিরতা, মদীনার আনসার সাহাবীগণ করুণাময় আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহে তাদের দেশেই তাদের প্রিয় রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গ লাভে ধন্য হয়েছেন। তাই তারা সর্বদাই তার প্রতি অত্যাধিক আগ্রহী ছিলেন এবং তাকে আগলে রাখতে চাইতেন। তাদের মনে এ আশঙ্কা ছিল যে, না জানি কখন তারা এই বিশাল নে’য়ামত ও মহা সম্মান থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। একান্ত প্রিয় ব্যক্তির বিরহ-বেদনা তাদেরকে জর্জরিত করে ফেলে।
মাক্কা বিজয়ের পরে মক্কাবাসীদের সাথে রাসূলের (সা) বিনম্র ও উদার আচরণে আনসার সাহাবীদের মধ্যে এই আশঙ্কাই দেখা দিয়েছিল। তাদের অনেকেই মুখ ফুটে সে প্রতিক্রিয়া ব্যক্তও করেছিল। মাক্কা বিজয় সম্পর্কিত একটি সহীহ হাদীসের বর্ণনা থেকে এ বিষয়টির প্রমাণ পাওয়া যায়। আবু হুরায়রা (রা) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় এসে পৌঁছলেন। অতঃপর যুবাইর (রা) কে সেনাবাহিনীর ডান বা বাম দিকের কোনো এক দলের এবং খালিদ রাদি আল্লাহু আনহুকে বিপরীত দলের দায়িত্বশীল নিয়োগ করলেন।
অপরদিকে আবু ‘উবায়দাহ (রা) কে বর্মবিহীন দলের কমান্ডার নিয়োগ করেন। তারা সকলেই বানুল ওয়াদীর পথ ধরে মক্কার দিকে এগিয়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কাতেই অবস্থান করেন। আবু হুরায়রা বলেন, তিনি আমাকে দেখে বলেন, আবু হুরায়রা! আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি উপস্থিত আছি। তারপর তিনি বলেন, ‘আমার নিকট আনসারী সাহাবী ছাড়া অন্য কেউ যেন না আসে’। তারপর তিনি বলেন, ‘আমাকে সাফা পাহাড়ের নিকটে পাওয়া পর্যন্ত এ নির্দেশ বলবৎ থাকবে’। আবু হুরায়রা বলেন, আমরা সামনে অগ্রসর হলাম এবং আমাদের লোকেরা যার যার ইচ্ছা অনুযায়ী শত্রু পক্ষের যাকে হত্যা করতে চাইলো হত্যা করলো। তাদের পক্ষ থেকে কেউ আমাদের প্রতিরোধ করলো না। তিনি আরো বলেন, অতঃপর আবু সুফইয়ান এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কুরাইশ বংশকে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। আজকের পরে কুরাইশ বংশের আর কোনো অস্তিত্ব রইবে না। তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
مَنْ دَخلَ دَارَ قَرَيْشٍ فَهُوَ آمِنٌ
‘যে ব্যক্তি আবু সুফইয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা পাবে’। তখন আনসারগণ বলতে শুরু করেন যে, এই ব্যক্তিকে নিজ দেশের প্রতি আগ্রহ এবং স্বীয় গোষ্ঠীর প্রতি অনুকম্পা পেয়ে বসেছে। আবু হুরায়রা (রা) বলেন, এমতাবস্থায় ওহী আসলো। ওহী নাজিল হওয়া সম্পন্ন হলে আল্লাহর রাসূল (সা) বলেন, ‘হে আনসারগণ! তারা বলেন, হে আল্লাহর রাসূল। উপস্থিত আছি। তিনি বলেন, ‘তোমরা বলেছো যে, এই ব্যক্তিকে নিজ দেশের প্রতি আগ্রহ পেয়ে বসেছে? তারা বলেন, কথাটি এমনই ছিল। তিনি বলেন
كلاً إنِّي عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ، هَاجَرْتُ إِلَى اللَّهِ وَإِلَيْكُمْ، وَالْمَحْيَا مَحْيَاكُمْ وَالْمَمَاتُ تَمَاتُكُمْ
‘
কখনও নয়। আমি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল। আমি আল্লাহর কাছে এবং তোমাদের কাছে হিজরত করেছি। আমার জীবন তোমাদের জীবনের সাথে আর আমার মৃত্যু তোমাদের মৃত্যুর সাথে’।
আনসার সাহাবীগণ কাঁদতে কাঁদতে তার দিকে অগ্রসর হলেন এবং বললেন, আল্লাহর শপথ! আমরা যা বলেছি তা শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি অতিশয় আগ্রহ ও ভালোবাসার কারণেই বলেছি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমাদেরকে সত্যবাদী বলে স্বীকৃতি দিচ্ছেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন’ ( ইমাম মুসলিম, সহীহ মুসলিম, ৩/১৪০৫, মক্কা বিজয় পরিচ্ছেদ )।
ইমাম নববী এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘মদীনার আনসার সাহাবীগণ আল্লাহর রাসূল (সা) কে মক্কাবাসীদের প্রতি অনুগ্রহশীল এবং তাদেরকে হত্যা করা থেকে বিরত দেখে মনে করেছিলেন যে, তিনি বোধহয় মক্কায় পুনরায় স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন এবং মদীনায় ফিরে যাবেন না। এ বিষয়টি তাদের জন্য ভীষণ কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা’আলা নবী (সা) কে ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন। তখন তিনি তাদেরকে বিষয়টি খোলাসা করেন যে, বস্তুত: আমি আল্লাহর দিকে হিজরত করেছি এবং তোমাদের দেশে বসবাস করার জন্য এসেছি। সুতরাং এ দেশটিকে আমি পরিত্যাগ করবো না এবং আল্লাহ তা’আলার উদ্দেশ্যে যে হিজরত করা হয়েছে তা থেকে প্রত্যাবর্তন করবোনা। আমি সর্বাবস্থায় তোমাদের সাথে আছি। তোমাদের জীবন মরণের সাথে আমার জীবন মরণ। বাঁচতে হলে তোমাদের সাথেই বাঁচবো আর মরলে তোমাদের নিকটেই মরবো। আল্লাহর রাসূল (সা) এর মুখ থেকে এমন কথা শুনে আনসার সাহাবীগণ আবেগ আপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেললেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। তারা বললেন, আমরা আপনার সার্বক্ষণিক সঙ্গ লাভ থেকে বঞ্চিত হই কিনা এমন আশঙ্কা থেকেই কেবল এমন মন্তব্য করেছি। বস্তুত: আমরা আপনার নিকট থেকে লাভবান হতে চাই, আপনার মাধ্যমে বরকত লাভকরতে চাই এবং আপনার নিকট থেকে হেদায়াত পেতে চাই। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
{وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ }
আর নিশ্চয় আপনি সরল পথ দেখাবেন” [আশুরা -৪২ঃ ৫২]।
আপনার প্রতি অতিশয় আগ্রহের কারণেই আমরা এমনটি বলেছি’, তাদের এ কথার অর্থ ছিল এটাই যে, আপনি আমাদেরকে ছেড়ে যাবেন এবং অন্যরা আপনার সাহচর্য লাভে ধন্য হবে এটা আমরা মেনে নিতে পারিনি। রাসূলুল্লাহর (সা) কথা শুনে তারা একদিকে আনন্দিত হয়, অপরদিকে তাদের উক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) কান পর্যন্ত পৌছে গেছে এ লজ্জার কারণে তারা কেঁদেও ফেলে ছিলেন(ইমাম নববী, শারহু মুসলিম ১২/ ১২৮-১২৯, আর দেখুন, ড. ফাযল ইলাহী, হুজুন নবী, পৃ. ৩০-৩১)।
৭- পরকালে রাসূলুল্লাহকে (সা) দেখা সম্ভব হবে না, বিরহের এমন আশঙ্কায় জনৈক সাহাবীর অস্থিরতা, সাহাবায়ে কিরাম (রা) তাদের প্রিয় রাসূল (সা) কে অসাধারণ ভালোবাসতেন। জনৈক সাহাবী তাকে কি পরিমাণ ভালোবাসেন যে, মৃত্যুর পর আর রাসূলের (সা) সাক্ষাত হবেনা। তার চেহারা মোবারক দেখার সৌভাগ্য হবে না, বিরহের এমন আশঙ্কায় সেই সাহাবী উদ্বিগ্ন। এমন কি এই সাহাবীর জান্নাত যদি নাসীবও হয়, তবুও রাসূলুল্লাহ (সা) যেহেতু উচ্চ মর্যাদার জান্নাতে অবস্থান করবেন যেখানে যাওয়ার সুযোগ তার হবে না, এ দুঃশ্চিন্তায় তিনি অস্থির। উম্মুল মুমিনীন ‘আয়েশা (রা) এমনি একটি ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। ‘আয়েশা (রা) বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী (সা) এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমার নিকট আমার জীবনের চেয়েও অধিক প্রিয়। আপনি আমার নিকট আমার সন্তানের চেয়েও অধিক প্রিয়। আমি নিজ বাড়িতে অবস্থান করার সময় আপনার কথা স্মরণ হলে অস্থির হয়ে উঠি। তাই তৎক্ষণাৎ আপনাকে দেখার জন্য ছুটে আসি। কিন্তু আমি যখন আমার ও আপনার মৃত্যুর কথা স্মরণ করি তখন বুঝি যে, আপনি তো জান্নাতে প্রবেশ করবেন এবং নবীগণের সাথে উচ্চ মর্যাদার জান্নাতে থাকবেন। আমি যদি জান্নাত লাভ করিও তবুও ভয় হয় যে, আমি আপনার সাক্ষাত লাভের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হবো। নবী (সা) তার কথার তখনই কোনো উত্তর দিলেন না।
এমতাবস্থায় জিবরীল (আ) এই আয়াত নিয়ে নাজিল হলেন।
{وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُوْلَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ النَّبِيِّينَ وَالصَّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاء وَالصَّالِحِينَ }
“যারা আল্লাহ ও রাসূলের (সা) আনুগত্য করবে তারা আল্লাহর অনুগ্রহ প্রাপ্ত নবীগণ, সত্যবাদীগণ, শহীদগণ এবং সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে থাকবেন।” {সূরা আন নিসাঃ ৬৯} ( বৈষয়িক স্বার্থ অর্জনের পরিবর্তে আনসারগণের রাসূলুল্লাহকে (সা) গ্রহণ, মদীনার আনসার সাহাবীগণ (রা) রাসূলুল্লাহকে (সা) এতোটাই ভালোবাসতেন যে, তার বিনিময়ে তারা পার্থিব সকল স্বার্থকে পদদলিত ১০০, মাজমাউয যাওয়াইদ ওয়া মানবা’ইল ফাওয়াইদ, তাফসীর অধ্যায়, সূরা আন নিসা, ৭/৬৩, নং ১০৯৭৩। হাফিয হাইসুমী এ বর্ণনা সম্পর্কে বলেন, আত-তাবারানী এ হাদীসটিকে তার আল-মু’জামুস্ সাগীর ১/৫৩, নং ৫২ এবং আল-মু’জামুল আওসাত’ ১/ ১৫২, নং ৪৭৭ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবন ‘ইমরান আল ‘আবিদী ব্যতিত এর সকল বর্ণনাকারী এবং সহীহুল বুখারীর বর্ণনাকারী একই। তবে তিনিও নির্ভরযোগ্য। আর দেখুন, তাফসীর ইবন কাসীর ২/৩৫৪, ড. ফাযল ইলাহী, হুকব্বুন নবী, পৃ. ৩২)।
করতে ও ত্যাগ করতে দ্বিধাগ্রস্থ হতেন না। এমতাবস্থায় তারা বৈষয়িক কোনো স্বার্থ ও অর্থ-সম্পদ অর্জনের চেয়ে রাসূলুল্লাহকে (সা) কাছে পেতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। হুনাইনের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের ফলে গনীমতের অনেক সম্পদ অর্জিত হয়। এমতাবস্থায় মদীনার আনসার সাহাবীগণকে রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গ ও সাহচর্য লাভ অথবা উট, ভেড়া-ছাগল অর্জন; এ দু’টার যে কোনো একটিকে গ্রহণ করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়। তখন তারা সন্তুষ্ট চিত্তে দুনিয়ার স্বার্থ ত্যাগ করে রাসূলুল্লাহকে (সা) সঙ্গে নিয়ে নিজেদের ঘরে ফিরে যাওয়াটাকে পছন্দ করেন। আর অন্যান্য লোকেরা দুনিয়ার নগদ অর্থ- সম্পদ নিয়ে তাদের বাড়ি-ঘরে ফিরে যায় (ড. ফাযল ইলাহী, হুকল্গুন নবী, পৃ. ৩৩-৩৪)। ‘
আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ ইবন ‘আসিম (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
لَمَّا أَفَاءَ اللهُ عَلَى رَسُولِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَومَ حُنَيْنٍ قُسِمَ فِي النَّاسِ فِي الْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَلَمْ يُعْطَ الأَنْصَارُ شَيْئًا، فَكَأَنَّهُمْ وَجَدُوا إِذْ لَمْ يُصِبْهُمْ مَا أَصَابَ النَّاسَ، فَخَطَبَهُمْ، فَقَالَ: يَا مَعْشَرَ الأَنْصَارِ أَلَمْ أَجِدُكُمْ ضَلالاً فَهَدَاكُمُ اللهُ بِي وَكُنْتُمْ مُتَفَرِّقِينَ فَأَلَّفَكُمُ اللهُ بِي، وَعَالَةً فَأَغْنَاكُمُ اللهُ
بِي؟ كُلَّما قَالَ شَيْئًا ، قَالُوا : اللهُ وَرَسُولُهُ أَمَنُ ، قَالَ: مَا يَمْنَعُكُمْ أَنْ تُحِيبُوا رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟، قَالَ: كُلَّمَا قَالَ شَيْئًا، قَالُوا، اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمَنُ قَالَ: لَوْ شِئْتُمْ قُلْتُمْ: جِفْتَنَا كَذَا وَكَذَا أَلَا تَرْضَوْنَ أَنْ يَذْهَبَ النَّاسُ بالشَّاةِ وَالْبَعِيرِ، وَتَذْهَبُونَ بِالنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى
رِحَالِكُمْ؟ لَوْلَا الهِجْرَةُ لَكُنْتُ امْرَءًا مِنَ الأَنْصَارِ، وَلَوْ سَلَكَ النَّاسُ وَادِيًا وَشِعَبًا لَسَلَكُتُ وَادِيَ الأَنْصَارِ وَشِعَبَهَا الأَنْصَارُ شِعَارٌ، وَالنَّاسُ دِثَارٌ، إِنَّكُمْ سَتَلْقَوْنَ بَعْدِي أَثَرَةً، فَاصْبِرُوا حَتَّى تَلْقَوْنِي عَلَى الْحَوْضِ
যখন আল্লাহ তাঁর রাসূল (সা) কে হুনাইনের যুদ্ধে গনীমতের সম্পদ দান করলেন, তখন তিনি সেগুলোকে কতিপয় মানুষের মন জয় করার জন্য তাদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। মদীনার আনসার সাহাবীগণকে কিছুই দিলেন না। অন্য মানুষেরা যা পেল তারা তা না পেয়ে মনে হয় কষ্ট পেলেন। তাই তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, ‘হে আনসারগণ! আমি কি তোমারদেরকে পথভ্রষ্ট পাইনি? অতঃপর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে হেদায়াত দান করেছেন। তোমরা পরস্পর দ্বিধা বিভক্ত ছিলে, আল্লাহ আমার দ্বারা তোমাদের মধ্যে ভালোবাসার বন্ধন সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
তোমরা অভাবী ছিলে আমার কারণে আল্লাহ তোমাদেরকে স্বচ্ছল করেছেন’। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি যখনই কোনো কিছু বলেন, তখন আনসারগণ বলেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সর্বাধিক অনুগ্রহকারী। তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহর (সা) কথার উত্তর দিতে তোমাদেরকে কোনো বিষয় বাধা দিচ্ছে?’। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি যখনই কোনো কিছু বলেন তখনই আনসারগণ বলেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সর্বাধিক অনুগ্রহকারী। তিনি বলেন, ‘তোমরা চাইলে বলতে পার যে, আপনি তো এমন অবস্থায় ও এমন ভাবে আমাদের নিকট এসেছেন। তোমরা কি এ কথায় সন্তুষ্ট হতে পারো না যে, লোকেরা ছাগল ও উট নিয়ে চলে যাবে আর তোমরা নবী (সা) কে সঙ্গে করে তোমাদের বাড়ি-ঘরে নিয়ে যাবে? হিজরাত যদি সংঘটিত না হতো তবুও আমি আনসারদের একজন হয়ে থাকতাম। সকল লোক যদি এক উপত্যকা ও গলিতে চলে, আমি আনসারগণ যে গলি ও উপত্যকায় চলে, সেখান দিয়ে চলবো। আনসারগণ আমার শরীরের সাথে মিশানো পোশাকের মতো, আর অন্য লোকেরা উপরের পোশাকের মতো। আমার পরে তোমরা আত্মঅহংকারী ও স্বার্থপরের সম্মুখীন হবে, তখন ধৈর্য ধারণ করো। এ অবস্থায় তোমরা আমার সাথে হাওযে কাওছারের নিকট মিলিত হবে’ (সহীহুল বুখারী, ৫/১৫৭, নং ৪৩৩০, কিতাবুল মাগাযী, সহীহ মুসলিম ২/৭৩৮, নং ১০৬১)। অর্থাৎ সমস্ত মানুষের মধ্যে আনসার সাহাবীগণ হচ্ছে, আমার অন্তরঙ্গ ঘনিষ্টজন, খাস ও অকৃত্রিম সঙ্গী ও সাথী ( শারহ সহীহ মুসলিম ১৬/১৬৩)।
সুতরাং আমি তাদের জীবন-মরণের সাথে আছি। আবু সা’ঈদ (রা) এর বর্ণনায় অতিরিক্ত আরো বর্ণিত হয়েছে যে, “হে আল্লাহ! তুমি আনসারদের প্রতি, তাদের সন্তানদের প্রতি এবং তাদের সন্তানদের প্রতি রহম করুন’। বর্ণনাকারী (‘আব্দুল্লাহ ইবন যায়েদ) বলেন, আনসার সাহাবীগণ তখন কান্নাকাটি করে তাদের দাঁড়ি ভিজিয়ে ফেললেন এবং বললেন, গনীমতের অংশের পরিবর্তে আমরা রাসূলুল্লাহকে (সা) পেয়ে সন্তুষ্ট হয়েছি (মুসনাদ আহমাদ ৩/৭৬, নং ১১৭৪৮, আল-হাইসুমী, মাজমা’উয যাওয়ায়িদ ৯/৭৬২, নং ১৬৪৭৫, ইবন হাজর, ফাতহুল বারী ৮/৫২)।”
৯- রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যুর সময় অতি নিকটবর্তী, এমনটা অনুভব করেই আবু বকরের কান্না, একবার রাসূলুল্লাহর (সা) এক বক্তৃতা শুনে তার খলীফা এবং সর্বাধিক প্রিয় সাহাবী আবু বকর (রা) বুঝতে পারলেন যে, রাসূলের (সা) মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে। তারা তার সাহচার্য থেকে বঞ্চিত হবে। তার বিদায় এবং বিরহের কথা ভেবেই তিনি নিজেকে সংবরন করতে না পেরে কান্না করতে শুরু করেন। এমন দৃশ্য দেখে অন্যান্য সাহাবী বিস্মিত হলেন। বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর সাহাবীগণ রাসূলের (সা) প্রতি আবু বকরের ভালোবাসা এবং তার জ্ঞানের গভীরতায় মুগ্ধ হন। আবু সা’ঈদ আল-খুদরী রাদি আল্লাহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
خَطَبَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ النَّاسَ وَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ خَيْرَ عِبدًا بَيْنَ الدُّنْيَا وَبَيْنَ مَا عِنْدَهُ، فَاخْتَارَ ذَلِكَ الْعَبْدُ مَا عِنْدَ اللَّهِ، قَالَ: فَبَكَى أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، فَعَجِبْنَا لِبُكَائِهِ أَنْ يُخَبِرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ عَبْدِ خَيْرَ، فَكَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هُوَ
الْمُخَيَّرُ، وَكَانَ أَبُو بَكْرٍ أَعْلَمُنا
রাসূলুল্লাহ (সা) লোকদের সামনে বক্তৃতা করেন এবং বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ জনৈক ব্যক্তিকে দুনিয়া এবং তাঁর নিকট যা আছে, তার মধ্যে যে কোনো একটিকে গ্রহণ করে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন। সে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট যা আছে তাই গ্রহণ করেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তখন আবু বকর (রা) কাঁদতে শুরু করেন। আমরা তার কান্না দেখে বিস্মিত হলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সা) জনৈক ব্যক্তি সম্পর্কে অবহিত করেছেন যে, তাকে ইখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। বস্তুত: সে ব্যক্তিটিই যে রাসূলুল্লাহ (সা) ছিলেন আবু বকর (রা) তা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি আমাদের চেয়ে অধিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন (সহীহুল বুখারী ৫/৪, নং ৩৬৪৫, সহীহ মুসলিম ৪/১৮৫৪, নং২৩৮২)।
১০- রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যুর পর তার কথা স্মরণ হওয়ায় আবু বকরের কান্না, রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যু ছিল সাহাবায়ে কিরামের নিকট অসহ্য বিষয়। তাই তার কথা স্মরণ হলে তাদের মধ্যে এক আবেগঘন অবস্থার সৃষ্টি হতো। রাসূলুল্লাহর (সা) হিজরত ও গুহার সাথী আবু বকর (রা) এর তার কথা স্মরণ হলে রীতিমত কান্নাকাটি করতেন। এ বিষয়ে আবু হুরায়রা (রা) থেকে একটি হাদীস বর্ণিত আছে। আবু হুরায়রা (রা) বলেন, আবু বকর সিদ্দীক রাদি আল্লাহ ‘আনহুকে এই মেম্বারের উপর বলতে শুনেছি। তিনি বলেন, ‘আমি গত বছরের আজকের দিনে রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি। তারপর আবু বকরের চোখ অশ্রু সজল হয়ে উঠল, তিনি কেঁদে ফেললেন। অতঃপর তিনি বলেন যে, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি,
لم تُؤْتَوا شيئًا بَعْدَ كَلِمَةِ الإِخْلاصِ مِثْلَ العَافِيَةِ، فَاسْأَلُوا اللَّهَ العَافِيَةَ
“তোমাদেরকে স্বস্তি ও শান্তির ক্ষেত্রে কালিমায়ে তাওহীদের পরে আর কোনো বস্তুকে দেওয়া হয়নি। অতএব তোমরা আল্লাহর নিকট শান্তি প্রার্থনা কর( ইমাম আহমাদ, আল মুসনাদ ১/১৮৯, নং ১০, আল- বাইহাকী, শু’আবুল ঈমান ১২/৪১৯, নং ৯৬৭১’,
মুসনাদ আহমাদের সম্পাদক শায়খ আল-আরনাউত ও তার সঙ্গীগণ হাদীসটিকে সহীহ লিগাইরিহী অন্যরা সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন )।”
১১- সাওয়াদ ইবন গাযিয়্যাহর অন্তিম ইচ্ছা রাসূলের (সা) শরীরের সাথে নিজের শরীরের স্পর্শ লাগানো, ইবন ইসহাক থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বদর যুদ্ধের দিন সাহাবীদের কাতারগুলোকে সোজা করেন। তার হাতে একটি তীর ছিল, তা দিয়ে লোকদের কাতার ঠিক করছিলেন। তিনি যখন বনু ‘আলী ইবনুন নাজ্জার গোত্রের মিত্র সাওয়াদ ইবন গাযিয়্যাহ (রা) এর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সাওয়াদ কাতার থেকে বের হয়ে ছিলেন। তিনি তীর দিয়ে তার পেটে স্পর্শ করে বললেন, হে সাওয়াদ! সমান হয়ে হও। সাওয়াদ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে আঘাত করেছেন? অথচ আল্লাহ আপনাকে সত্যসহকারে পাঠিয়েছেন। আমি তো ইনসাফ থেকে বঞ্চিত হলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) নিজের পেট বের করে দিয়ে বললেন, প্রতিশোধ নাও! সাওয়াদ তখন তার সাথে আলিঙ্গন করলেন এবং তার পেটে চুম্বন দিলেন।
তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
مَا حَمَلَكَ عَلَى هَذَا يَا سَوادُ؟ قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، حَضَرَ مَا تَرَى، فَأَرَدْتُ أَنْ يَكُونَ آخِرُ الْعَهْدِ بِكَ أَنْ يَمَسَّ جِلْدِي جِلْدَكَ. فَدَعَا لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِخَيْرِ،
“হে সাওয়াদ! কি কারণে তুমি এমন করলে? তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! পরিস্থিতি কি তা তো আপনি দেখছেন, আমি ইচ্ছা করেছি যে, এখানে আপনার সাথে আমার শেষ লেনদেন যেন হয় যে, আমার দেহের চামড়া আপনার দেহের চামড়াকে স্পর্শ করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তার জন্য কল্যাণের দু’আ করেন (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ, সম্পাদনা, শাইখ মুহাম্মাদ ‘আলী ও তার সঙ্গী, বৈরুত, আল-মাকতাবাতুল ‘আসরিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১৮হি, ২/২৪৩-২৪৪, আল-মোবারাকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম, অনুবাদ, ‘আব্দুল খালেক রাহমানী, তাওহীদ প্রকাশনী, বংশাল-ঢাকা-১১০০, ৪র্থ সংস্করণ, ১৪৩৪হি, পৃ. ২৫৯- ২৬০)।”
১২- রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে আবু বকরের অতিশীঘ্র মিলিত হওয়ার প্রবল আকাঙ্খা, রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যুর পর আবু বকর সিদ্দীক (রা) তার সর্বাধিক প্রিয় হাবীবের সাথে অতিদ্রুত মিলিত হওয়ার প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ বিষয়ে উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
إِنَّ أَبَا بَكْرٍ لَمَّا حَضَرَتْهُ الْوَفَاةُ، قَالَ: أَيُّ يوم هَذَا؟ قَالُوا: يَوْمُ الاثنين، قَالَ: فَإِنْ مُتْ مِنْ لَيْلَتِي، فَلَا تَنْتَظِرُوا فِي الغَدِّ؛ فَإِنَّ أَحَبَّ الْأَيَّامِ وَاللَّيَالِي إِليَّ أَقْرَبُها مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
“আবু বকর (রা) এর মৃত্যু ঘনিয়ে আসলে তিনি বলেন, আজ কোনো দিন? লোকেরা বললো, সোমবার। তখন তিনি বলেন, ‘যদি আমার আজকের রাতে মৃত্যু হয় তাহলে আগামী কাল পর্যন্ত বিলম্ব করবে না। কেননা আমার নিকট ঐ দিন-রাত অধিক প্রিয় যে দিন-রাত রাসূলুল্লাহর (সা) অধিক নিকটবর্তী( মুসনাদ আহমাদ ১/২১৮, নং ৪৫। আল-মুসনাদের সম্পাদক শাইখ গুআইন জারনাউত হাদীসের সানাদকে যা’য়ীফ বলেছেন। অপর সম্পাদক শাইখ আহমাদ শাকির হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, টীকা, আল- মুসনাদ ১/১৭৩, আর দেখুন, ড. ফাফল ইলাহী, হুলুন নবী, পৃ. ৪০)।” অর্থাৎ তোমরা আমাকে দাফন করতে বিলম্ব করবে না। কারণ আমি অতি দ্রুত রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে মিলিত হতে চাই।
১৩- রাসূলুল্লাহর (সা) কবরের পাশে সমাধিস্থ হতে উমার ফারুকের প্রবল আকাঙ্খা, খুলাফায়ে রাশিদ্বীনের দ্বিতীয় খলীফা ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) যখন মুত্যু পথযাত্রী, তখন তিনি খুবই চিন্তিত ছিলেন যে, কিভাবে রাসূলুল্লাহর (সা) কবরের পাশে সমাধিস্থ হবেন। এ জন্য তিনি তার ছেলে ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) কে উম্মুল মু’মিনী ‘আয়েশা (রা) এর কাছে অনুমতির জন্য পাঠান। তিনি তার নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে আসেন। ‘আমর ইবন মাইমূন থেকে বর্ণিত আছে যে, ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন, হে ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার! তুমি উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়েশা (রা) এর কাছে যাও এবং তাকে বলো যে, ‘উমার আপনাকে সালাম দিয়েছেন। ‘আমীরুল মু’মিনীন’ বলবে না; কেননা আমি আজ আর মু’মিনগণের আমীর নই। তাকে বলবে যে, ‘উমার ইবনুল খাত্তাব তার দুই সাথীর পাশে সমাধিস্থ হতে আগ্রহী। ‘আব্দুল্লাহ গিয়ে তাকে সালাম দিয়ে অনুমতি প্রর্থনা করেন। তারপর তার নিকটে প্রবেশ করে দেখেন, তিনি বসে বসে কাঁদছেন। অতঃপর ‘আব্দুল্লাহ বলেন যে, ‘উমার ইবনুল খাত্তাব আপনাকে সালাম বলেছেন এবং তার দুই সাথীর পাশে সমাধিস্থ হওয়ার জন্য আপনার অনুমতি প্রার্থনা করছেন। তিনি বলেন, ‘আমি এ স্থানটি নিজের জন্য পছন্দ করেছিলাম। তবে আজকে আমি নিজের উপর তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। ‘আব্দুল্লাহ ফিরে আসার পর বলা হলো যে, ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার এসেছেন। তখন তিনি (‘উমার) বলেন যে, আমাকে উঠাও। এক ব্যক্তি তাকে নিজের দিকে হেলিয়ে রাখলেন। তিনি বলেন, তুমি কি নিয়ে এসেছো? ‘আব্দুল্লাহ বলেন, হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে, তিনি অনুমতি দিয়েছেন। তিনি বলেন,
الْحَمْدُ لِلَّهِ مَا كَانَ مِنْ شَيْءٍ أَهَمُّ إِلَيَّ مِنْ ذَلِكَ فَإِذَا أَنَا قَضَيْتُ فَاحْمِلُونِي ثُمَّ سَلَّمْ فَقُلْ يَسْتَأْذِنُ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ فَإِنْ أَذِنَتْ لِي فَأَدْخِلُونِي وَإِنْ رَدَّتْنِي رُدُّونِي إِلَى مَقَابِرِ الْمُسْلِمِينَ
‘সকল প্রশংসা আল্লাহর! এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো বিষয় আমার ছিল না। সুতরাং আমার মৃত্যু হলে তোমরা আমাকে তার কাছে নিয়ে যাবে। সালাম দিয়ে বলবে, যে, ‘উমার ইবনুল খাত্তাব আপনার অনুমতি প্রার্থনা করছে। যদি তিনি আমাকে অনুমতি দেন তাহলেই কেবল আমাকে প্রবেশ করাবে। আর যদি ফিরিয়ে দেন তাহলে আমাকে মুসলিমদের কবরস্থানে সমাধিত করবে। তারপর তার মৃত্যু হলে আমরা তাকে নিয়ে গেলাম।
আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার অনুমতি প্রার্থনা করেন। তখন তিনি (‘আয়েশা (রা)) বলেন, তাকে (হুজরাতে) প্রবেশ করাও। তাকে প্রবেশ করিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে তার দু’সাথীর সাথে দাফন করা হয়’ ( সহীহুল বুখারী, ৫/১৫- ১৭, নং ৩৭০০, কিতাব ফাযায়িলিস সাহাবাহ )।
১৪- মৃত্যু পথযাত্রী বিলালের রাসূলুল্লাহর (সা) সাক্ষাত লাভের সুযোগ হচ্ছে মর্মে আনন্দ প্রকাশ, রাসূলুল্লাহর (সা) মুআযযিন বিলাল ইবন রাবাহ রাদি আল্লাহু তা’আলা ‘আনহু যখন মৃত্যুপথযাত্রী, তখন তার স্ত্রী দুঃখ ও বেদনায় ভরাক্রান্ত হয়ে কাঁদছেন আর বলছেন, হায় কষ্ট! হায় দুশ্চিন্তা! তখন বিলাল (রা) স্ত্রীর দুঃখ-বেদনা প্রকাশের প্রেক্ষিতে নিজের মনের কথা তুলে ধরে বলেন,
بَلْ وَا طَرَبَاهُ غَدًا تَلْقَى الأَحِبَّةَ مُحَمَّدًا وَصَحِبَه
বরং খুশী ও আনন্দের কথা যে, কালকেই আমরা আমাদের সর্বাধিক প্রিয় মুহাম্মাদ এবং তার সাথীদের সাথে মিলিত হব (ইবন আবিদ-দুনইয়া, আবু বকর ‘আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ, আল-মুহতাবারীন, সম্পাদনা, মুহাম্মাদ খাইর, বৈরুত, দার ইবন হাযম, ১ম সংস্করণ, ১৪১ হি. ১/২০৭, আল-মুল্লা আল-কারী, মিরকাতুল মাফাতীহ ৪/১৩২৫, আল-কুশাইয়ী, ‘আব্দুল কারীম ইবন হাওয়াযিন, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ, সম্পাদনা, ড. ‘আব্দুল হালীম ও তার সঙ্গী, কায়রো, দারুল মা’আরিফ, তা. বি. ২/৪৬৯, ইবনুল জাওযী, আবুল ফারাজ ‘আব্দুর রাহমান ইবন ‘আলী, আস্ সাবাত ‘ইনদাল মামাত, সম্পাদনা, ‘আব্দুল্লাহ আল- আনসারী, বৈরুত, মুআসাসাতুল কুতুবিস সাকাফিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪০৬ হি. ১/১০৮ )।
অর্থাৎ তিনি স্ত্রীকে শান্ত্বনা দিচ্ছেন যে, তার মৃত্যু তার স্ত্রীর জন্য দুঃখ ও বেদনার বিষয় হলেও এই মৃত্যুর মাধ্যমেই আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাক্ষাত লাভে ধন্য হবো। এটা আমার জন্য পরম আনন্দের। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তার সাক্ষাত লাভ হবে, মনের এমন তীব্র বাসনা নিয়ে বিলাল (রা) মৃত্যুর তিক্ততা ও কষ্ট ভুলে তৃপ্তি, সুখ ও আনন্দ অনুভব করেছেন এবং স্ত্রীকেও শান্ত্বনা দিয়েছেন।
১৫. রাসূলুল্লাহর (সা) বিরহে খেজুর গাছের কাণ্ডের গুমরে গুমরে কান্না করা, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সাহাবীগণের অগাধ ভালোবাসার কারণে তারা কখনো তার বিরহকে মেনে নিতে পারতেন না। এমনকি মরা গাছ পর্যন্ত তার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে বিরহ-ব্যথায় অনুচ্চ স্বরে কান্না করতো। এমন অনেক ঘটনা সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে। জাবির ইবন ‘আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন,
كَانَ الْمَسْجِدُ مَسْقُوفًا عَلَى جُذُوعِ مِنْ نَخْلٍ، فَكَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا خَطَبَ يَقُومُ إِلَى جِذْعٍ مِنْهَا، فَلَمَّا صُنِعَ لَهُ الْمِنْبَرُ وَكَانَ عَلَيْهِ، فَسَمِعْنَا لِذَلِكَ الْجِذْعِ صَوْتًا كَصَوْتِ العِشَارِ، حَتَّى جَاءَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَوَضَعَ يَدَهُ عَلَيْهَا فَسَكَنَتْ
খেজুর গাছের কাণ্ডের উপর মসজিদের ছাদ নির্মিত ছিল। নবী (সা) যখন খুৎবাহ দিতেন তখন সেগুলোর মধ্য থেকে একটি কাণ্ডের পাশে দাঁড়াতেন। যখন তার জন্য মেম্বার তৈরি করা হলো আর তিনি তার উপরে চড়লেন। আমরা সেই খেজুর গাছের কাণ্ডটির গর্ভবতী উটনীর আওয়াযের মত আওয়াজ শুনতে পেলাম। শেষ পর্যন্ত নবী (সা) আসলেন এবং তার উপর হাত রাখলেন, তখন সেটি চুপ হয়ে গেল (১৯১, সহীহুল বুখারী ৪/১৯৬, নং ৩৫৮৫)।
জাবির ইবন ‘আব্দুল্লাহ (রা) থেকে আর বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كَانَ يَقُومُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِلَى شَجَرَةٍ أَوْ نَخْلَةٍ، فَقَالَتِ امْرَأَةٌ مِنَ الأَنْصَارِ، أَوْ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَلَا تَجْعَلُ لَكَ مِنْبَرًا؟ قَالَ: إِنْ شِئْتُمْ، فَجَعَلُوا لَهُ مِنْبَرًا ، فَلَمَّا كَانَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ دُفِعَ إِلَى الْمِنْبَرِ، فَصَاحَتِ النَّحْلَةُ صِيَاحَ الصَّبِيِّ، ثُمَّ نَزَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ
عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَضَمَّهُ إِلَيْهِ، تَئِنُ أَنِينَ الصَّبِيِّ الَّذِي يُسَكِّنُ. قَالَ: كَانَتْ تَبْكِي عَلَى مَا كَانَتْ تَسْمَعُ مِنَ الذِّكْرِ عِنْدَهَا
নবী (সা) জুমু’আর দিনে একটি গাছ অথবা খেজুর গাছের কাছে দাঁড়াতেন। তখন আনসারদের জনৈক মহিলা বা জনৈক পুরুষ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জন্য কি মেম্বার তৈরি করে দেব? তিনি বলেন, তোমরা যদি চাও। তারা তার জন্য একটি মেম্বার বানিয়ে দিলেন। যখন জুমু’আর দিন আসে তখন মেম্বারের উপরেই ঠেলে দেওয়া হয়। তখন খেজুর গাছটি শিশুর ন্যায় কাঁদতে থাকে। অতঃপর নবী (সা) নেমে যান এবং গাছটি জড়িয়ে ধরেন। এটি শিশুর মতো ফুঁফিয়ে কাঁদছিল, যাকে চুপ করানোর চেষ্টা করা হয়। তিনি বলেন, গাছটি এ (বিরহের) জন্য কাঁদছিল যে, এত দিন তার কাছে থেকেই দ্বীনী আলোচনা শুনে আসছিল (এখন বঞ্চিত হলো) { সহীহুল বুখারী ৪/১৯৫, নং ৩৫৮৪ }।
অন্য একটি বর্ণনায় অতিরিক্ত রয়েছে যে,
أَمَا وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَوْ لَمْ أَلْتَزِمُهُ ، لَمَا زَالَ هَكَذَا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ حُزْنًا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَمَرَ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَدُفِنَ
সাবধান! ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন! আমি যদি এটাকে জড়িয়ে না ধরতাম, তাহলে এভাবে কিয়ামাত পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর (সা) চিন্তায় কান্না করত। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) এ কাণ্ডটিকে দাফন করার নির্দেশ দিলেন (আবু মুহাম্মাদ ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আব্দুর রাহমান, সুনানুদ দারিমী, সম্পাদনা, হুসাইন সেলিম আসাদ, সৌদি ‘আরব, দারুল মুগনী, ১ম সংস্করণ, ১৪১২ছি, ১/১৮৪, নং ৪২। সম্পাদক হাদীসের সানাদটিকে সহীহ বলেছেন)।
খেজুর গাছের কাণ্ডের কান্না বিষয়ক ঘটনা ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) থেকেও বর্ণিত আছে (সহীহুল বুখারী ৪/১৯৫, নং ৩৫৮৩)।
১৬- রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যুর দিন মদীনা মুনাওয়ারা যেন অন্ধকারে নিমজ্জিত, রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় আগমনের প্রথম দিনে মদীনাতে আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল; মানুষ-জন, নারী, শিশু, আকাশ-বাতাস, গাছ-বৃক্ষ, বালু-পাথর সব কিছুই মহা খুশিতে বিভোর ছিল। মদীনার সকল কিছু আলোয় আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। চারদিকে যেন আলো আর আলো। সর্বত্র খুশী আর তৃপ্তির আমেজ ছড়িয়ে পড়েছিল। পক্ষান্তরে যেদিন তিনি মৃত্যু বরণ করেছেন, সেদিনের চিত্র ছিল প্রথম দিনের চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসূলুল্লাহর (সা) বিয়োগে ও শোকে সেদিন মদীনার চারদিকে ঘোর অন্ধকার নেমে এসেছিল। আমাবশ্যার জমকালো অন্ধারের অমানিশার চাদরে যেন গোটা মদীনা ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। চারদিকে শুধুই অন্ধকার আর অন্ধকার। সে বাস্তব দৃশ্যই তুলে ধরেছেন আনাস ইবন মালিক (রা)। তিনি বলেন,
لَمَّا كَانَ الْيَوْمُ الَّذِي قَدِمَ فِيهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ أَضَاءَ مِنْهَا كُلُّ شَيْءٍ فَلَمَّا كَانَ الْيَوْمُ الَّذِي مَاتَ فِيهِ أَظْلَمَ مِنْهَا كُلُّ شَيْءٍ. وَقَالَ: مَا نَفَضْنَا عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْأَيْدِي حَتَّى أَنْكَرْنَا قُلُوبَنَا
রাসূলুল্লাহ (সা) যেদিন মদীনাতে প্রথম আগমন করলেন সেদিন মদীনার সবকিছু আলোয় আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। অতঃপর তিনি যেদিন মৃত্যু বরণ করেন সেদিন মদীনার সবকিছুই অন্ধকার হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহকে (সা) মাটি দিয়ে আমাদের হাত ঝেড়ে নিতে না নিতেই আমাদের হৃদয়-মনের অবস্থা এমন পরিবর্তন হয়ে যায় যে, আমরা তা মেনে নিতে পারিনা (সুনানুত তিরমিযী ৫/৫৮৮, নং ৩৬১৮, মুসনাদ আহমাদ ৩/২৬৮, নং ১৩৩৮৫৭। ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি গরীব সহীহ। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, সহীহ ইবন মাজাহ ৫/৩৭, নং ১৩২২)।
অর্থাৎ রাসূলুল্লাহর (সা) সান্নিধ্যে থাকার কারণে আমাদের মনের যে পরিচ্ছন্নতা, নম্রতা, হৃদ্যতা ও ভালোবাসার ভাব ছিল, তার মৃত্যুর কারণে পূর্বের সে অবস্থা যেন পরিবর্তন হতে শুরু করে (আল-মুল্লা আল-কারী, মিরকাতুল মাফাতীহ ৯/৩৮৪৮, আল-মোবারাকপুরী, আবুল ‘আলা মুহাম্মাদ ‘আব্দুর রাহমান, তুহফাতুল আহওয়াযী বি শারহ জামি’ইত তিরমিযী, বৈরুত, দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, তা. বি. ১০/৬২)।
বস্তুত: রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীগণ তাকে সাত্যিকারের ভালোবেসে ছিলেন বলে তারা তাকে দেখতে, তাঁর সঙ্গ লাভ করতে ব্যাকুল ছিলেন। যে কোনো কিছুর বিনিময়ে তারা তা অর্জনের জন্য অব্যাহতভাবে চেষ্টা করেছেন। নিজেদের জান মাল ছেলে সন্তান, পরিবার-পরিজন সকলের চেয়ে তাকে যে অধিক পরিমাণ ভালোবাসতেন তার স্বাক্ষর রেখেছেন। অথচ আমরাও তাকে ভালোবাসি বলে দাবী করি। কিন্তু আমরা তার প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ কতটুকু পেশ করতে পারছি? জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনার্দশকে উপেক্ষা করছি। তার সকল কর্মকাণ্ডের বিপরীত ধারায় জীবন পরিচালনা করছি। তার নীতি-আদর্শ, বিধি-বিধান ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, বিচার-আচার, অনুষ্ঠানাদি সব কিছুতেই উপেক্ষিত। এমনকি নিছক ‘ইবাদত-বন্দেগীতে পর্যন্ত তার সুন্নাতের বিপরীতে নিজেরা অথবা অন্য কারো নিয়ম নীতিকে অহরহ মেনে চলছি। নানা অজুহাত, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মার প্যাচে সেখানেও রাসূলুল্লাহর (সা) রীতি-নীতি ও পথ-পদ্ধতি চরমভাবে উপেক্ষিত। অথচ ইখলাস এবং রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাত ও শেখানো পদ্ধতি ছাড়া কোনো শরী’আহ সম্মত ইবাদাতও গ্রহণযোগ্য হয় না। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার নমুনা এমন হতে পারে না। উম্মাতকে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রকৃত ভালোবাসার অধিকারী হতে হবে। তার সুন্নাতের প্রকৃত অনুসারী হতে হবে। তাছাড়া আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি এবং পরকালীন মুক্তি অর্জন করা সম্ভব হবে না।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : দ্বিতীয় নিদর্শন
সকল সময় রাসূলুল্লাহর (সা) আলোচনা করা, তার জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং তার প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করা রাসূলুল্লাহর (সা) গোটা জীবন মানবতার জন্য উত্তম আদর্শ। তাই তার জীবনের সকল বিষয় নিয়ে সর্বদা আলোচনা করা, তা থেকে শিক্ষা ও জীবন চলার নির্দেশনা ও গাইড নেওয়া উম্মাতের দায়িত্ব। নিম্নে আমরা উদাহরণ স্বরূপ কতিপয় উল্লেখযোগ্য বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করব, যেগুলো নিয়ে সবসময় আলোচনা হওয়া প্রয়োজন, যেগুলো সর্বদা স্মরণ করা এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজের ঈমান ও ‘আমল বৃদ্ধি করা অতীব জরুরী। যদিও ইতঃপূর্বে বিভিন্ন প্রসঙ্গে কিছু বিষয় উল্লিখিত হয়েছে। তবে তার সম্পর্কে উম্মাতের যে বিষয়গুলো স্মরণ করা ও আলোচনা করা উচিত, সেগুলোর অন্যতম হলো;
১- রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে মিলিত হওয়ার আশা নিয়ে করুণাময় আল্লাহর কাছে প্রার্থণা করা, রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাক্ষাতৎ ও মিলিত হওয়ার প্রবল আকাঙ্খা নিয়ে করুণাময় মহান আল্লাহর কাছে চাইতে থাকা। প্রত্যেক মুসলিমের তার বাস্তব জীবনের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রমাণ করা উচিত, যাদের সুসংবাদ দিয়ে আল্লাহর রাসূল বলেছেন যে, আমার উম্মাতের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা আমাকে কঠিনভাবে ভালোবাসে। আমার যুগের পরে পৃথিবীতে তাদের আগমন হবে। তাদের কেউ কেউ কামনা করবে যে, তার পরিবার এবং সম্পদের বিনিময়ে হলেও যদি আমাকে দেখতে পেত (সহীহ মুসলিম ৪/২১৭৮, নছ ২৮৩২, আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত )।
রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীগণ (রা) এ ক্ষেত্রে বাস্তব স্বাক্ষর রেখেছেন। আবু মূসা আল-আশ’আরী (রা) সহ তার গোত্র আল-আশ’আরীগণ, আবু বকর, ‘ওমর ও বিলাল (রা) সহ অন্যান্য সাহাবীগণের উদাহরণ উপরে বর্ণনা করা হয়েছে (আর দেখুন, আল-কাযী ‘ইয়ায, আশ-শিফা ২/৫৮ )।
এমনকি তাদের পরবর্তী যুগের লোকেরাও এই অনন্য কর্মে স্বাক্ষর রেখেছেন। ‘আব্দুর রহমান ইবন ইয়াযীদ ইবন জাবির থেকে বর্ণিত যে, ‘আব্দুল্লাহ ইবন আবু যাকারিয়া আল-খুযা’য়ী বলতেন যে,
لَوْ حُيِّرْتُ بَيْنَ أَنْ أُعَمَّرَ مِائَةَ سَنَةٍ فِي طَاعَةِ اللَّهِ أَوْ أَنْ أَقْبَضَ فِي يَوْمَي هَذَا أَوْ فِي سَاعَتِي هَذِهِ لَاخْتَرْتُ أَنْ أَقْبَضَ شَوْقًا إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَإِلَى رَسُولِهِ وَإِلَى الصَّالِحِيْنَ مِنْ عِبَادِهِ
‘
আমাকে যদি এ স্বাধীনতা দেওয়া হত যে, আল্লাহর আনুগত্যের মধ্য দিয়ে একশত বছর বেঁচে থাকব, অথবা আজকেই বা এখনই আমার মৃত্যু ঘটানো হবে। তাহলে আমি অবশ্যই মহিমন্বিত আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং তাঁর সৎ বান্দাদের সাথে মিলিত হওয়া প্রবল আকাঙ্খা নিয়ে তৎক্ষণাৎ মুত্যুকে পছন্দ করতাম (ইবনুল জাওযী, ‘আব্দুর রহমান ইবন ‘আলী, সাফওয়াতুস সাফওয়াহ, সম্পাদনা, আহমাদ ইবন ‘আলী, কায়রো, দারুল হাদীস, সংস্করণ-১৪২১হি, ২/৩৭৫, নং ৭৫০, শাইয়ি’ মুহাম্মাদ আল-গুবাইশী, আরওয়া’উ কিসাসিল হুব্বি, প্রবন্ধ, পৃ. ১৯, http: //www.saaid.net)।
আব্দাহ বিনত খালিদ ইবন মি’দান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
مَا كَانَ خَالِدٌ يَأْوِي إِلَى فِرَاشٍ إِلَّا هُوَ يَذْكُرُ مِنْ شَوْقِهِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَإِلَى أَصْحَابِهِ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ يُسَمِّيهِمْ وَيَقُولُ: هُمْ أَصْلِي وَفَصْلِي وَإِلَيْهِمْ يَحِنُّ قَلْبِي، طَالَ شَوْقِي إِلَيْهِمْ، فَعَجَلْ رَبِّ اقبض إِلَيْكَ حَتَّى يَغْلِبَهُ النَّوْمُ
‘খালিদ যখনই বিছানায় যেতেন তখনই অতি আগ্রহের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তার মুহাজির ও আনসার সাহাবীদের কথা স্মরণ করে তাদের নাম ধরে ধরে বলতেন, তারাই আমার আসল ও শাখা-প্রশাখা (অর্থাৎ পিতা ও সন্তান)। তাদের প্রতি আমার হৃদয়-মন আকৃষ্ট হয়। তাদের প্রতি আমার প্রবল আবেগ দীর্ঘায়িত হয়েছে’। হে আমার রব! আপনি আমাকে দ্রুত আপনার কাছে নিয়ে নিন! এভাবে ঘুম আসা পর্যন্ত বলতে থাকতেন (আশ্- শিফা ২/৫০, আর দেখুন, আরওয়া’উ কিসাসিল হুব্বি, প্রবন্ধ, পৃ. ১৯,)।
জুবাইর ইবন নুফায়ের তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমরা একদিন আল-মিকদাদ ইবনুল-আসওয়াদের নিকট বসা ছিলাম। তখন সেখান দিয়ে একজন মানুষ অতিক্রম করে। লোকটি তখন বলল,
طُوبَى لِهَاتَيْنِ الْعَيْنَيْنِ اللَّتَيْنِ رَأَنَا رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَاللَّهِ لَوَدِدْنَا أَنَّا رَأَيْنَا مَا رَأَيْتَ، وَشَهِدْنَا مَا شَهِدْتَ
এই দু’ চোখের জন্য আনন্দের সুসংবাদ, যে দু’টা চোখ রাসূলুল্লাহকে (সা) দেখেছে। আল্লাহর শপথ! আমাদের কত যে আকাঙ্খা হয় যে, আমরাও দেখি যা আপনি দেখেছেন এবং আমরা প্রত্যক্ষ করি, যা আপনি প্রত্যক্ষ করেছেন (মুসনাদ আহমাদ ৩৯/২৩০, নং ২৩৮১০, আল-বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ ১/৪৪, নং ৮৭, সহীহ ইবন হিব্বান ১৪/৪৮৯, নং ৬৫৫২। সম্পাদক শু’আইব আল-আরনাউত ও আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, আসিলসিলাতুস সহীহাহ, নং ২৮২৩)।
ইসহাক আত্-তুজীবী বলেন, নবী (সা) এর সাহাবীগণ তার মৃত্যুর পর তার কথা যখনই স্মরণ করতেন, তখনই তারা খুব বিনম্র ও বিনয়ী হয়ে পড়তেন এবং শরীরে কম্পন শুরু হতো এবং তারা কাঁদতেন। এমনকি তাদের অনসরণে তাবি’য়ীগণও এমন করতেন ( আল-কাযী, ‘ইয়ায, আশ-শিফা ২/২৬, আর দেখুন, মুহাম্মাদ ইবন খালীফাহ আত্-তামিমী, হুকুকুন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘আলা উম্মাতিহী, রিয়াদ-সৌদি ‘আরব, প্রকাশক, আদওয়াউস সালাফ, ১ম সংস্করণ ১৪১৮ হি. ১/৩২৮ )।
মুস’আব ইবন ‘আব্দুল্লাহ বলেন, ইমাম মালিক যখন নবী (সা) এর কথা স্মরণ করতেন, তখন তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে যেত এবং নীচের দিকে ঝুঁকে পড়তেন এমনকি তা তার সঙ্গীদের জন্য মর্ম পীড়ার কারণ হতো। একদিন তাকে এ প্রসঙ্গে বলা হলো, তখন তিনি বলেন, আমি যা দেখি তোমরাও যদি তা দেখতে, তাহলে আমার যে অবস্থা তোমরা দেখো, তা অস্বীকার করতে পারতে না। আমি মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদিরকে দেখতাম, আর তিনি তো হাদীস কারীদের নেতা ছিলেন। তাকে যখনই কোনো হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম, তখনই তিনি কাঁদতে শুরুত করতেন। এমনকি আমরা তার প্রতি করুণা করতাম (আশ- শিফা ২/৪২, ৯৩, ইবন তাইমিয়্যাহ, কার্ণিয়াদাহ জালীলাহ ফীত-তাওয়াসুল ওয়াল ওয়াসীলাহ, সম্পাদনা, রাবী’ ইবন হাদা আল-মাদখালী, ‘আজমান, মাকতাবাতুল ফুরকান, ১ম সংস্করণ, ১৪২২ হি. পৃ. )।
ইমাম মালিককে যখন একজন বড় মাপের তাবিয়ী আইউব আস্-সুখতিয়ানী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তখন তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের কাছে যার থেকেই হাদীস বর্ণনা করিনা কেন আইউব তার চেয়ে উত্তম। আর তিনি দু’বার হাজ্জ করেছেন। আমি তাকে চোখে চোখে রেখে পর্যবেক্ষণ করতাম, কিন্তু তার কাছ থেকে হাদীস শুনতাম না। এমতাবস্থায় তার সামনে যখন নবী (সা) এর কথা স্মরণ করা হয় তিনি কান্না শুরু করেন এমনকি আমি তার প্রতি করুণা করি। আমি যখন তার কাছে রাসূলের (সা) স্মরণে কান্না করা এবং তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দেখলাম তখন তার কাছ হাদীস লিখে নিতাম ও সংগ্রহ করতাম (ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ’উল ফাতাওয়া ১/২২৬, কার্টিয়াদাহ জালীলাহ ফীত-তাওয়াসুল ওয়াল ওয়াসীলাহ, পৃ. ১২৯)।
২- রাসূলুল্লাহ (সা) সকল সৃষ্টির জন্যই অনেক বড় কল্যাণ ও করুণা,
রাসুলুল্লাহ (সা) জন্মটাই ছিল সারা সৃষ্টি জগতের জন্য কল্যাণ, জ্যোতি ও আলোর সুসংবাদ হিসেবে। নিজের জন্ম বৃত্তান্ত বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমার মা স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, তার থেকে একটি আলো বের হল, যে আলোতে সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আবু উমামা (রা) বলেন,
قُلْتُ : يَا نَبِيَّ اللَّهِ ، مَا كَانَ أَوَّلُ بَدْءٍ أَمْرِكَ؟ قَالَ: دَعْوَةُ أَبِي إِبْرَاهِيمَ وَبُشْرَى عيسَى، وَرَأَتْ أُمِّي أَنَّهُ يَخْرُجُ مِنْهَا نُورٌ أَضَاءَتْ مِنْهُ قُصُورُ الشَّامِ.
আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী। আপনার বিষয়টির প্রথম সূচনা কি ছিল? তিনি বলেন, ‘আমার পিতা ইবরাহীমের দু’আ আর ‘ঈসার সুসংবাদ এবং আমার মা স্বপ্ন দেখেছিলেন যে, তার থেকে একটি আলো বের হচ্ছে, যে আলোতে সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত হয়েছে’ (মুসনাদ আহমাদ ৩৬/৫৯৬, নং ২২২৬১, শু’আইব আল-আরনাউত ও অন্যান্য গবেষক হাদীসটিকে সহীহ লি গায়রিহী বলেছেন )। ‘
ইরবায ইবন সারিয়া (রা) থেকে অনুরূপ আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
إِنِّي عَبْدُ اللهِ لَخَاتَمُ النَّبِيِّينَ، وَإِنَّ آدَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ لَمُنْجَدِلٌ فِي طِينَتِهِ، وَسَأُنَبِّئُكُمْ بِأَوَّلِ ذَلِكَ دَعْوَةُ أَبِي إِبْرَاهِيمَ وَبِشَارَةُ عِيسَى بِي، وَرُؤْيَا أُمِي الَّتِي رات
নিশ্চয় আমি আল্লাহর বান্দা, নবীদের সমাপ্তি, আর আদম (আ) তখন তার কাদামাটির মধ্যে মাটিতে ফেলানো ছিল। আর আমি তোমাদেরকে এর প্রথম সূচনা সম্পর্কে অবহিত করছি। তা হলো, আমার পিতা ইবরাহীমের দু’আ, আমার ব্যাপারে ‘ঈসার সুসংবাদ এবং আমার মায়ের স্বপ্ন, যা তিনি দেখেছিলেন (মুসনাদ আহমাদ ২৮/৩৭৯-৩৮০, নং ১৭১৫০, শু’আইব আল-আরনাউত ও অন্যান্য গবেষক হাদীসটিকে সহীহ লি গায়রিহী বলেছেন )।
অর্থাৎ রাসূলুল্লাহর (সা) নাম সর্বপ্রথম উচ্চারণ করেন ইবরাহীম (আ) এবং তিনিই মানুষের মধ্যে তা প্রচার করেন। এভাবে তার প্রচার পৃথিবী ব্যাপী চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত বনু ইসরাঈলের শেষ নবী ‘ঈসা ইবন মারইয়াম (আ) তার নাম উল্লেখ করে তার আগমনের সুসংবাদ দেন। তারপর তার মা গর্ভাবস্থায় স্বপ্নে দেখে তা তার কাওমের লোকদের মধ্যে প্রচার করে দেন। সে কথাগুলোই রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন (তাফসীর ইবন কাসীর ১/৪৪৪ )।
রাসূলুল্লাহ (সা) এমন দ্বীন নিয়ে আগমন করেছেন, যে দ্বীন মানুষ ও সমাজ জীবনে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সাথে সাথে আকাশ থেকে বারাকাত নাজিল হবে এবং পৃথিবী ও মাটি তার যাবতীয় কল্যাণ ও খাইরাত উৎপন্ন করবে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু সে তথ্য তুলে ধরে বলেন,
{وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ }
“আর যদি সে সব জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে অবশ্যই আমরা তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বারকাতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম, কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল; তাই আমরা তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদেরকে পাকড়াও করেছি।” [সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ৯৬]।
রাসূলুল্লাহর (সা) অফুরন্ত বারাকাত, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি দ্বারা পৃথিবী ভরপুর। তার দ্বারা পশু-পাখি, জীব-জন্তু, উদ্ভিদ, মানুষ ও জিন সকলেই সমৃদ্ধি লাভ করে। তাই সকল সৃষ্টির কমপক্ষে এতোটুকু দায়িত্ব তো আছে যে, তারা উপঢৌকন হিসেবে তার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ঢেলে দেবে।
৩- সকল সৃষ্টির প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা) বিশাল করুণা ও দয়া, উম্মাতের স্মরণ করা উচিত যে, রাসুলুল্লাহ (সা) সকল সৃষ্টির জন্য করুণ ও দয়া হিসেবে প্রেরীত হয়েছেন। তার এ দয়া ও করুণা তার স্বভাবে, আচরণে এবং বিধি-বিধানে এক কথায় সর্বত্রের জন্য অবারিত। তিনি মানুষ, পশু-পাখি, জীব-জন্তু, গাছ-পালা, পাথর, পহাড়-পর্বত সবার প্রতি ভালোবাসা পোষণ করেন ও সদয় আচরণ করেন। তিনি পাহাড়কে ভালোবেসেছেন, উটের কান্নায় আপ্লুত হয়ে মালিককে তিরস্কার করেছেন। গাছের কান্নায় তাকে জড়িয়ে ধরেছেন। পাখির ছানা নিয়ে আসার কারণে মা পাখির প্রতি সদয় হয়ে দ্রুত সে ছানা দু’টি ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সন্তানের মৃত্যুতে কেঁদেছেন। কন্যার প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করতে গিয়ে কন্যাকে নিজের কলিজার টুকরা হিসেবে অভিহিত করেছেন। কন্যাকে যে কষ্ট দেয় সে তাকে কষ্ট দেয় বলেছেন। পিঁপড়া পোড়াতে নিষেধ করেছেন। বাহনে অতিরিক্ত বোঝা চাপাতে নিষেধ করেছেন। এমন যেসব জন্তুর গোশত হালাল তা জবাই করার সময় যেন অনুগ্রহ দেখানো হয়, সে নির্দেশনা দিয়েছেন ইত্যাদি। এমনকি তিনি বড় বড় পাপী ও অপরাধী, যার প্রতি হদ কায়েম হয়েছে এমন ব্যক্তিকেও কেউ গালি, ভর্ৎসনা বা অভিসম্পাত দিলে, তিনি তার প্রতি করুণা দেখিয়ে তাদেরকে নিষেধ করতেন। নবাবী যুগে ‘আব্দুল্লাহ নামক একজন রসিক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহকে (সা)ও হাসাতেন। লোকটি বাজারে গিয়ে পছন্দনীয় জিনিস পেলে তা বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রয় করে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে নিয়ে আসতেন। তারপর বলতেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ সুন্দর বস্তুটি আপনাকে গিফ্ট দিচ্ছি। রাসূলুল্লাহ (সা) খুশী হতেন। একটু পরেই বিক্রেতা রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে এসে দাম চাইত। ‘আব্দুল্লাহ তখন বলত, আমি এটা পছন্দ করে নিয়ে এসেছি এবং আপনাকে হাদিয়া দিয়েছি আর লোকটিকে আপনার কাছে পাঠিয়েছি যে, আপনি দামটা দিয়ে দেবেন। সেই ব্যক্তিকে মদ্য পানের অপরাধে বেত্রাঘাত করা হয়। তখন কেউ কেউ তাকে ভর্ৎসনা ও লা’নত করলে রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে নিষেধ করেন। ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন, তিনি বলেন,
أَنَّ رَجُلًا عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ اسْمُهُ عَبْدَ اللَّهِ، وَكَانَ يُلَقَّبُ حِمَارًا، وَكَانَ يُضْحِكُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَكَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ جَلَدَهُ فِي الشَّرَابِ، فَأُتِيَ بِهِ يَوْمًا فَأَمَرَ بِهِ فَجُلِدَ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ القَوْمِ: اللَّهُمَّ العَنْهُ مَا أَكْثَرَ مَا يُؤْتَى بِهِ؟
فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا تَلْعَنُوهُ، فَوَاللَّهِ مَا عَلِمْتُ إِنَّهُ يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ
নবী (সা) এর যুগে একজন ব্যক্তি ছিলেন, যার নাম ছিল ‘আব্দুল্লাহ, তাকে ‘হিমার’ নামে ডাকা হতো। তিনি রাসূলুল্লাহকে (সা)ও হাসাতেন। একবার নবী (সা) তাকে মদ পানের অপরাধে চাবুক মেরে ছিলেন। একদিন তাকে আবার আনা হলো, অতঃপর তিনি তাকে চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন এবং চাবুক মারা হলো। লোকজনের মধ্য থেকে জনৈক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহ! তার প্রতি লা’নত বর্ষণ করুন! লোকটিকে কতবার হাজির করা হলো? তখন নবী (সা) বলেন, তোমরা তাকে লা’নত করো না। আল্লাহর শপথ! আমি তার সম্পর্কে যা জানি তা হচ্ছে, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে ( সহীহুল বুখারী ৮/১৫৮, নং ৬৭৮১, আল-বাগাভী, শারহুস সুন্নাহ ১০/৩৩৭-৩৩৮, নং ২৬০৬ )।
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
أتِي النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِسَكْرَانَ، فَأَمَرَ بِضَرْبِهِ. فَمِنَّا مَنْ يَضْرِبُهُ بِيَدِهِ وَمِنَّا مَنْ يَضْرِبُهُ بِنَعْلِهِ وَمِنَّا مَنْ يَضْرِبُهُ بِثَوْبِهِ، فَلَمَّا انْصَرَفَ قَالَ رَجُلٌ: مَا لَهُ أَحْزَاهُ اللَّهُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا تَكُونُوا عَوْنَ الشَّيْطَانِ عَلَى أَخِيكُمْ
নবী (সা) এর কাছে এক মদ্যপ ব্যক্তিকে আনা হলো। তিনি তখন তাকে মারার নির্দেশ দিলেন। তখন আমাদের মধ্য থেকে কেউ তাকে তার হাত দিয়ে মারতে লাগল, আবার কেউ তার জুতা দিয়ে মারতে লাগল এবং কেউ তার কাপড় দিয়ে তাকে মারতে থাকল। সে যখন চলে গেল তখন কোনো এক ব্যক্তি বলল, তার কি হয়েছে! আল্লাহ তাকে অপদস্থ করুন! তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের উপরে শইতানের সাহায্যকারী হয়ো না (সহীহুল বুখারী ৮/১৫৯, নং ৬৭৮১, আল-বাগাভী, শারহুস সুন্নাহ ১০/৩৩৮, নং ২৬০৭)। রাসূলুল্লাহর (সা) করুণা ও দয়ার এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।
৪- উম্মাতের হেদায়াত লাভের প্রবল আকাঙ্খা ও এ জন্য তার কষ্ট স্বীকার, পূর্বেও উল্লিখিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) উম্মাতের হিদায়াতের জন্য কি পরিমাণ আন্তরিক ছিলেন, তা ভাষায় প্রকার করার মতো নয়। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ তার গুণাগুণের বর্ণনা সূরা আত্-তাওবার ১২৮ নং আয়াতে দিয়েছেন, তিনি মু’মিনদের প্রতি খুবই আন্তরিক, তাদের প্রতি করুণাশীল ও সহানুভূতিশীল। মহান দয়াময় আল্লাহ সুবহানাহু তাঁর বান্দাদের প্রতি এমন সুহৃদ রাসূল প্রেরণ করে অনেক বড় করুণা ও অনুগ্রহ করেছেন। তার মাধ্যমে মহিমান্বিত আল্লাহ তাদেরকে পথভ্রষ্টতা ও ধ্বংস থেকে রক্ষা করেছেন। ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমর ইবনুল ‘আস (রা) থেকে বর্ণিত যে,
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: تَلَا قَوْلَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فِي إِبْرَاهِيمَ: { رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي، وَقَالَ عِيسَى عَلَيْهِ السَّلامُ: {إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الحَكِيمُ، فَرَفَعَ يَدَيْهِ وَقَالَ: اللهمَّ أُمَّتِي أُمَّتِي، وَبَكَى، فَقَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ
: يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ إِلَى مُحَمَّدٍ، وَرَبُّكَ أَعْلَمُ، فَسَلْهُ مَا يُبْكِيكَ؟ فَأَتَاهُ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ، فَسَأَلَهُ فَأَخْبَرَهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَا قَالَ، وَهُوَ أَعْلَمُ، فَقَالَ اللهُ: يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ إِلَى مُحَمَّدٍ، فَقُلْ إِنَّا سَنُرْضِيكَ فِي أُمَّتِكَ، وَلَا نَسُوءُكَ
রাসূল (সা) ইবরাহীম (আ) সম্পর্কে মহিমান্বিত আল্লাহর বাণী পাঠ করেন,
رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي}
“হে আমার রব! এ সব মূর্তি তো অনেক মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে, কাজেই যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত।” [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৩৬)।
আর (আল্লাহর ভাষায়) ‘ঈসা (আ) এর উক্তি,
{إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ }
“আপনি যদি তাদেরক শাস্তি দেন তবে তারা তো আপনারই বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করেন তবে আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ১১৮] তিলাওয়াত করেন। তারপর তার দু’হাত উপরে তোলেন এবং বলেন, হে আল্লাহ! আমার উম্মাত! আমার উম্মাত! এবং কাঁদতে থাকেন। তখন মহাপরাক্রান্ত ও মহিমান্বিত আল্লাহ বলেন, হে জিবরীল! তুমি মুহাম্মাদের কাছে যাও, আর তোমার রব অধিক অবগত, তাকে জিজ্ঞেস কর, আপনাকে কিসে কাঁদাচ্ছে? জিবরীল (আ) তার কাছে আসেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে তিনি যা বলেছেন তা অবহিত করেন। আর তিনি অধিক অবগত। আল্লাহ বলেন, হে জিবরীল! তুমি মুহাম্মাদের কাছে যাও এবং তাকে বল, নিশ্চয় আমরা আপনাকে আপনার উম্মাতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করব আপনার প্রতি খারাপ কিছু করব না ( সহীহ মুসলিম ১/১৯১, নং ২০২, সহীহ ইবন হিব্বান ১৬/২১৭, নং ৭২৩৫ )।
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
لِكُلِّ نَبِي دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ، فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِي دَعْوَتَهُ، وَإِنِّي احْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةٌ لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكْ بِاللَّهِ شَيْئًا
‘সকল নবীরই নিশ্চিত কবুল হওয়া দু’আ আছে। প্রত্যেক নবী তার দু’আ দ্রুত (দুনিয়াতেই) করেছেন। আর আমি অবশ্য আমার দু’আটি কিয়ামাতের দিন আমার উম্মাতের সুপারিশের জন্য গোপন করে রেখেছি। আল্লাহর ইচ্ছায় তা আমার উম্মাতের এমন প্রত্যেক ব্যক্তি লাভ করবে, যে আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরীক না করে মৃত্যু বরণ করেছে (সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম ১/১৮৯, নং ১৯৯, মুসনাদ আহমাদ ১৫/ ৩০৯, নং ৯৫০৪, সহীহুল বুখারীতেও হাদীসটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে ৮/৬৭, নং ৩৬০৪)।
কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ না করলে তিনি যারপর নাই অস্থির হয়ে উঠতেন। মহান আল্লাহ সুবহানাহু তাকে শান্ত্বনা দিয়েছেন যে, আপনি যতো আগ্রহীই হোন না কেন অধিকাংশ মানুষ হিদায়াতের পথে আসবে না, ইসলাম গ্রহণ করবে না। করুণাময় আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ }
“আর আপনি যতই চান না কেন, অধিকাংশ মানুষই ঈমান গ্রহণকারী নয়।” [সূরা ইউসূফ, আয়াত: ১০৩]।
আল্লাহর রাসূলকে স্মরণ করা ও তাকে আলোচনা করার আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মানুষের সার্বিক কল্যাণের নিশ্চয়তা দানকারী ব্যবস্থা দ্বীন ইসলামের প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠার পথে তিনি কতো রকমের কষ্ট ও নির্যাতন ভোগ করেছেন। কতো বড় ত্যাগ স্বীকার করেছেন। মহান আল্লাহ যখন তাঁর রাসূলকে (সা) উম্মাতের কল্যাণে মাঠে নামার নির্দেশ দিয়ে বলেন,
{يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِرُ. قُمْ فَأَنْذِرُ. وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ }
“হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠুন, অতঃপর সাবধান করুন, আর আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন।” [সূরা আল-মুদ্দাসসির, আয়াত: ১-৩]।
আল্লাহ তা’আলার এই নির্দেশের পর রাসূলুল্লাহ (সা) দা’ওয়াতের মিশন নিয়ে সেই যে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আর বিরত হননি, বসে পড়েননি, নিষ্কৃয় হননি। মানুষের কল্যাণ, মুক্তি, দায়িত্ব, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও উপদেশ দিতে দিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
‘আপনি উঠুন!’ এর ব্যাখ্যায় সাইয়্যেদ কুতুব বলেন, এই আহ্বান আকাশ থেকে আসা আহ্বান, সুউচ্চ মহান রবের আওয়াজ, তিনি বলছেন, উঠুন! উঠুন! বহুল প্রতিক্ষিত সেই বিশাল কর্মের জন্য দাঁড়িয়ে যান। আপনার জন্য প্রস্তুত করা সেই ভারী বোঝা বহনের জন্য উঠে পড়ুন। উঠুন কর্মের জন্য, কষ্ট, ক্লান্তি, শ্রান্তি ও চেষ্টা-প্রচেষ্টার জন্য উঠুন। আপনার ঘুম ও আরামের সময় শেষ। এই মহান কাজের জন্য প্রস্তুত হোন! তাওহীদের এই ভয়ানক ও বিশাল বাণীর এই দায়িত্ব রাসূলুল্লাহকে (সা) তার উষ্ণ বিছানা থেকে টেনে তুলেছে। তাকে নীরব নিস্তব্দ স্নিগ্ধ বাড়ির নীরব পরিবেশ এবং উষ্ণ কোল থেকে বের করে এনেছে।
বিশাল এ দায়িত্বের মুখে কিসের ঘুম, কিসের আরাম? কী হবে আরামের বিছানা, আয়েশী ও সুখের জীবন দিয়ে? রাসূলুল্লাহ (সা) তার উপর ন্যস্ত এই বিশাল দায়িত্বের মর্ম এর প্রকৃতি ও মর্যাদা গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন। তার এমন অস্থিরতা ও পেরেশানী দেখে প্রিয়তম স্ত্রী খাদিজা (রা) যখন তাকে স্থির ও শান্ত হয়ে ঘুমানোর জন্য আহ্বান করেন, তখন তিনি বলেন, مَضَى عَهْدُ النَّوْمِ يَا حَدِيجه খাদিজা! ঘুমের সময় শেষ হয়ে গিয়েছে! সত্যিই তো, তার ঘুমের সময় শেষ হয়ে গেছে। ঐ দিনের পর থেকে তার জীবনে রয়েছে শুধু নিদ্রাহীনতা, ক্লান্তি- শ্রান্তি আর সুদীর্ঘ কঠিন যুদ্ধের দুঃসহ বোঝা ( সাইয়্যেদ কুতুব (রহ), ফী যিলালিল কুরআন ২/৩৭৪৪। খাদীজা রাদি আল্লাহু ‘আনহার উক্তি সম্পর্কে আর দেখুন, রাগিব আল- হানাফী ও রাগিব আস-সারজানী, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, অন লাইন সংস্করণ,৪/১০, ৪৬ নং পাঠ, http://www.islamweb net)।
রিসালাতের মহান দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে দুঃখ-কষ্ট, কঠোর পরিশ্রম, অকথ্য নির্যাতন-নিপীড়ন সইবার ফলে শেষ বয়সে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতেও পারতেন না। ‘আব্দুল্লাহ ইবন শাকীক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ‘আয়েশা (রা) কে বললাম,
هَلْ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي وَهُوَ قَاعِدٌ؟ قَالَتْ: نَعَمْ، بَعْدَ مَا حَطَمَهُ النَّاسُ
‘
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বসা অবস্থায় সালাত আদায় করতেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ, লোকেরা তাকে ভেঙে চুরমার করে দেবার পর ( সহীহ মুসলিম ১/৫০৬, নং ৭৩২, মুসনাদ আহমাদ ৪২/২৩৭, নং ২৫৩৮৫, সুনান আবি দাউদ ১/২৫১, নং ৯৫৬)।
অর্থাৎ মানুষের কল্যাণে রিসালাতের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মানুষের প্রতি যে পরিমাণ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তাদের দায়-দায়িত্ব ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় এতো পরিশ্রম করেছেন যে, শেষ বয়সে তিনি বসে বসে সালাত আদায় করতেন (ইমান আন-নববী, শারহ মুসলিম ৬/১৩ )।
তাছাড়াও তো দুষ্টু লোকেরা তাকে নানাবিধ মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করেও তার শরীর-স্বাস্থ্য ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। দ্বীনের দা’ওয়াত ও তাবলীগের দায়িত্ব পালনকালে অনেক কঠিন ও বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তায়েফের মাটিতে ঘটে যাওয়া বর্বর নির্যাতনের কাহিনী তার অন্যতম (সহীহুল বুখারী ৪/১১৫, ৩২৩১, সহীহ মুসলিম ৩/১৪২০, নং ১৭৯৫ )।
রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণে তার সাহাবীগণ (রা) এর ইসলামের দা’ওয়াতের মিশনে আত্মনিয়োগ করেন এবং নানাবিধ যুলম-নির্যাতন ও অত্যাচারের মোকাবেলা করেন। এমনকি দা’ওয়াতের পথে জীবন দিয়ে দেওয়ার মধ্যেই নিজেদের সফলতা খুঁজে পেয়েছেন।
আবু বকর রাদি আল্লাহ ‘আনহু, সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে ইসলামের পথে যার অবদান সবচেয়ে বেশি। যেদিন ইসলাম গ্রহণ করেন, সেদিনই কাল বিলম্ব না করে দ্বীনের দা’ওয়াতের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়, কোমল-স্বভাব, পছন্দনীয় অভ্যাসের অধিকারী, সচ্চরিত্র এবং উদার মনের মানুষ ছিলেন। তার দানশীলতা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সৎ সাহচর্যের কারণে তার কাছে লোকেরা বেশি আসা-যাওয়া করত। তিনি উপযুক্ততা বিচার করে তাদের কাছে ইসলামের দা’ওয়াত পেশ করতেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ‘উসমান ইবন ‘আফ্ফান, আয- যুবাইর ইবনুল ‘আউওয়াম, সা’আদ ইবন আবি ওক্কাস, তালহাহ ইবন ‘উবাইদুল্লাহ এবং ‘আব্দুর রহমান ইবন ‘আওফ (রা) এই পাঁচজন কুরাইশ নেতৃবর্গ ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা তার দা’ওয়াতে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় প্রবেশ করেন। তারাই ছিলেন বিশিষ্ট মুসলিম, সুনাম ধন্য সাহাবী এবং বিশ্ববিখ্যাত মুজাহিদ, যারা প্রথম দিন থেকেই রিসালাত, দা’ওয়াত ও তাবলীগের আমানত নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তারাই পৃথিবীর বাসিন্দাদেরকে ইসলাম শিখিয়েছেন ( ইবন জারীর আত্-তাবারী, তারিখুত তাবারী, বৈরুত, দারুত তুরাস, ২য় সংস্করণ, ১৩৮৭হি, ২/৩১৭, ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়াল নিহায়াহ ৩/৩৯, সাফিউর রাহমান মোবারাকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম,
পৃ. ১০২, (বাংলা সংস্করণ )।
দ্বিতীয় দিনে হাজির করেন আরো কয়েকজন বিশিষ্টজনকে, তাদের অন্যতম হলেন, আবু ‘উবাইদা ইবনুল জাররাহ, ‘উসমান ইবন মায’উন এবং আল-আরকাম ইবন আবিল আরকাম এবং আবু সালামাহ ইবন ‘আব্দুল আসাদ (রা)। তারা সকলেই আবু বকরের দা’ওয়াতে ইসলাম গ্রহণ করেন (ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়াল নিহায়াহ ৩/৪০, আর দেখুন, http://iswy.co/e12afj)।
‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রা), যে দিন তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন, সে দিনই কুরাইশদের মধ্যে প্রচার করার জন্য প্রখ্যাত খবর রটনাকারী জামিল ইবন মা’মারের কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণের কথা বলে দেন। তখন জামিল চাদর টানতে টানতে খুব দ্রুত কা’বা ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চ আওয়াযে বলতে থাকে, ওহে কুরাইশের লোকেরা! কোনো, ‘উমার ইবনুল খাত্তাব বিধর্মী হয়ে গিয়েছে। তখন ‘উমার দাঁড়িয়ে বলেন, না, সে মিথ্যা বলছে। বরং আমি কালিমায়ে শাহাদাতের ঘোষণা দিয়ে ইসলামে প্রবেশ করেছি। তখন সকলে মিলে তার উপর আক্রমণ করে, তিনি তাদেরকে প্রতিহত করতে গিয়ে এক পর্যায় ক্লান্ত হয়ে তাদের হাতে নিজেকে সপর্দ করে দেন। লোকেরা তাকে মারতে উদ্যত হলে ‘আল-আস ইবন ওয়ায়িল আস্-সাহমী এসে তাকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে (সহীহুল বুখারী ৫/৪৮, নং ৩৮৬৪, সীরাত ইবন হিশাম ১/২৬০ ২৬১, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ.১৪২)।
আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) এর আরেকটি বর্ণনায় রয়েছে, তিনি বলেন,
لَمَّا أَسْلَمَ عُمَرُ اجْتَمَعَ النَّاسُ عِنْدَ دَارِهِ، وَقَالُوا: صَبَا عُمَرُ وَأَنَا غُلَامٌ، فَوْقَ ظَهْرِ بَيْتِي، فَجَاءَ رَجُلٌ عَلَيْهِ قَبَاءٌ مِنْ دِينَاجٍ، فَقَالَ: قَدْ صَبَا عُمَرُ فَمَا ذَاكَ، فَأَنَا لَهُ جَارٌ، قَالَ : فَرَأَيْتُ النَّاسَ تَصَدَّعُوا عَنْهُ فَقُلْتُ: مَنْ هَذَا؟قَالُوا: العَاصِ بْنُ وَائِلٍ
‘উমার যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন লোকেরা তার বাড়ির সামনে জমায়েত হলো এবং বলতে লাগল যে, ‘উমার বেদ্বীন হয়ে গেছে। আর আমি সেদিন কিশোর বয়সের ছিলাম, আমার পিঠের উপর ছিল আমার ঘর। তখন জনৈক ব্যক্তি আসল, যার গায়ে রেশমের চাদর জড়ানো ছিল। তিনি তখন বলেন, ‘উমার বেদ্বীন হয়েছে, তাতে কি হয়েছে? আমি তার আশ্রয়দাতা। ‘আব্দুল্লাহ বলেন, আমি তখন দেখলাম, লোকেরা তার কাছ থেকে চলে গেল। তখন আমি বললাম, এই ব্যক্তি কে? তারা বলল, ইনি হলেন, আল-‘আস ইবন ওয়ায়িল (সহীহুল বুখারী ৫/৪৮, নং ৩৮৬৫)।
উমার (রা) এর ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়। তার মাধ্যমে ইসলামের মর্যাদা এবং মুসলিমদের শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধি পায়। তখন সাহাবায়ে কিরাম কা’বা ঘরে প্রকাশ্যে সালাত আদায় করতেন। কুরাইশের লোকেরা তা চেয়ে চেয়ে দেখত, ক্ষুব্ধ হতো, কিন্তু বাধা দেওয়ার সাহস করতো না ( ইবনুল জাওযী, তারীখ ‘উমার ইবনুল খাত্তাব, প. ১৩, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১৪৩)।
আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) বলেন,
مَازِلْنَا أَعِزَّةٌ مُنْذُ أَسْلَمَ عُمَرُ
উমার যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন থেকেই আমরা সম্মানিত ও প্রভাবশালী হয়েছিলাম ( সহীহুল বুখারী, ৫/১১, নং ৩৬৮৪, ৫/৪৮, নং ৩৮৩৬)। ‘
আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) আর বলেন,
كَانَ إِسْلَامُ عُمَرَ عِزّاً وَهِجْرَتُهُ نَصْرًا وَإِمَارَتُهُ رَحْمَةً وَاللَّهِ مَا اسْتَطَعْنَا أَنْ نُصَلِّي حَوْلَ الْبَيْتِ ظَاهِرِينَ حَتَّى أَسْلَمَ عُمَرُ
উমারের ইসলাম গ্রহণ সম্মানের কারণ ছিল, তার হিজরাত ছিল বিজয় এবং তার আমীর হওয়া ছিল রহমত। আল্লাহর শপথ! আমরা বাইতুল্লাহর পাশে প্রকাশ্যে সালাত আদায় করতে পারতাম না, যতক্ষণ না ‘উমার ইসলাম গ্রহণ করেন (আবু যায়দ, ‘উমার ইবন শুবাহ, তারীখুল মদীনাহ, সম্পাদন, ফাহীম শালতুত, জিদ্দাহ, প্রকাশকাল, ১৩৯৯ হি. ২/৬৬১, আত্-তাবারানী, আল-মু’জামুল কাবীর ৯/১৬৫, নং ৮৮২০, আল-আজুররী আল-বাগদাদী, আবু বাকর মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন, আশ্-শারী’য়াহ, সম্পাদনা, ড. ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমা আদ-দুমাইজী, সৌদী ‘আরব-রিয়াদ, দারুল ওয়াতান, ২য় সংস্করণ, ১৪২০ হি, ৪/১৭৩৬, ইবন হাজার আল-‘আসকালানী, ফাতহুল বারী ৭/৪৮, আস্-সুয়ূতী, জালাল উদ্দীন, তারীখুল খুলাফা, সম্পাদনা, হামদী আদ-দামারদাশ, প্রকাশক, মাকতাবাতু নিষার মুস্তফা আল-বায, ১ম সংস্করণ, ১৪২৫ হি. পৃ. ৯৩ ৯৪)।
‘আলী ইবন আবু তালিব (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমার জানা মতে সকলেই গোপনে মদীনায় হিজরাত করেছেন। তবে ‘উমার ইবনুল খাত্তাব ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি হিজরাত করার দিনে অস্ত্রে- শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বাইতুল্লাতে গিয়ে কুরাইশ নেতৃবৃন্দের সামনে প্রথমে সাতবার তাওয়াফ করেন। তারপর মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দু’রাক’আত সালাত আদায় করেন। অতঃপর কুরাইশদের বৈঠক স্থলে এসে ঘোষণা দেন, কেউ যদি তার মাকে শোকগ্রস্ত, সন্তানদেরকে ইয়াতীম এবং স্ত্রীকে বিধবা করতে চায়, সে যেন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে বাধা দেবার চেষ্টা করে (মুহাম্মাদ ইউসূফ আল-শামী, সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ ফী সীরাতি খাইরিল ‘ইবাদ, সম্পাদনা, শাইখ ‘আদিল আহমাদ ও তার সঙ্গীগণ, বৈরুত, দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১৪ হি. ৩/২২৫, আবু যাহরাহ, মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ, খাতামুন নাবিয়্যীন সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কায়রো, দারুল ফিকরিল ‘আরাবী, প্রকাশকাল, ১৪২৫, ১/৪৫০)।
রাসূলুল্লাহর (সা) সবচেয়ে ঘনিষ্ট এই দুই সাহাবী (রা) সমাজে যথেষ্ট প্রভাবশালী হওয়া সত্বেও ইসলাম গ্রহণের দায়ে নির্যাতন ও মানসিক নিপীড়নের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তদুপরি তারা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে প্রিয় রাসূলের (সা) অনুসরণে নিরলসভাবে ঝুঁকি নিয়েও ইসলামের ঘোষণা ও দা’ওয়াত দানের কাজ করেছেন, এক মুহূর্তের জন্যও বিলম্ব করেননি।
আবু যার আল-গিফারী, মাক্কী জীবনে আরো যিনি ইসলাম গ্রহণ করে সঙ্গে সঙ্গে কাফির-মুশরিকদের মাঝে নিজেকে মুসলিম হিসেবে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, অপরদিকে কালিমায়ে শাহাদাতের উচ্চারণের মাধ্যমে তাওহীদের বাণী অন্যদের সামনে তুলে ধরে তাদেরকেও ইসলামের দিকে আহ্বান করেছেন, এবং এ জন্য তাকে অনেক কঠিন মূল্যও দিতে হয়েছে; এমন একজন বিশিষ্ট সাহাবী আবু যার আল-গিফারী রাদি আল্লাহু আনহু। ইবন ‘আব্বাস (রা) তার ইসলাম গ্রহণের বিবরণ আবু যার (রা) এর ভাষায় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। আবু যার (রা) বলেন যে, আমি গিফার গোত্র থেকে বের হয়ে মক্কায় আসি এবং নানা কৌশল অবলম্বন করে শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাক্ষাত করে ইসলাম গ্রহণ করি। তখন তিনি আমাকে বলেন,
يَا أَبَا ذَرٍ، أَكْتُمْ هَذَا الأَمْرَ، وَارْجِعْ إِلَى بَلَدِكَ، فَإِذَا بَلَغَكَ ظُهُورُنَا فَأَقْبِلْ، فَقُلْتُ: وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ، لَأَصْرُحَنَّ بِمَا بَيْنَ أَظْهُرِهِمْ، فَجَاءَ إِلَى المسجدِ وَقُرَيْشٍ فِيهِ ، فَقَالَ: يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ، إِنِّي أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، فَقَالُوا : قُومُوا إِلَى هَذَا الصَّابِئِ
فَقَامُوا فَضْرِبْتُ لِأَمُوتَ، فَأَدْرَكَنِي العَبَّاسُ فَأَكَبَ عَلَيَّ، ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَيْهِمْ، فَقَالَ: وَيْلَكُمْ، تَقْتُلُونَ رَجُلًا مِنْ غِفَارَ، وَمَنْجَرُكُمْ وَتَمَرَّكُمْ عَلَى غِفَارَ، فَأَقْلَعُوا عَنِّي، فَلَمَّا أَنْ أَصْبَحْتُ الغَدَ رَجَعْتُ فَقُلْتُ مِثْلَ مَا قُلْتُ بِالْأَمْسِ، فَقَالُوا: قُومُوا إِلَى هَذَا الصَّابِي فَصُنِعَ بِي مِثْلَ مَا صُنِعَ بِالْأَمْسِ
، وَأَدْرَكَنِي العَبَّاسُ فَأَكَبَّ عَلَيَّ، وَقَالَ مِثْلَ مَقَالَتِهِ بِالْأَمْسِ
হে আবু যার! তুমি এ বিষয়টি গোপন রাখো, এবং নিজ শহরে চলে যাও। যখন আমার বিজয়ের সংবাদ অবগত হবে তখন চলে আসবে। আমি বললাম, ঐ মহান সত্তার শপথ! যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন। আমি তাদের মাঝে উচ্চ কন্ঠে এ সত্য প্রচার করব। এরপর তিনি মাসজিদে হারামে আসেন। সেখানে কুরাইশের লোকজন ছিল। তিনি বলেন, হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং আর সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সা) তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তখন তারা বলল, তোমরা উঠ! এ ধর্মত্যাগীকে শায়েস্তা কর। তারা আমাকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে মারতে থাকল। এমন অবস্থায় আল-‘আব্বাস আমাকে পেলেন এবং আমার উপর ঝুঁকে পড়েন। তারপর কুরাইশদের সম্বোধন করে বললেন, তোমরা ধ্বংস হও! তোমরা গিফার গোত্রের একজন লোককে হত্যা করছো? অথচ তোমাদের ব্যবসা ও সফরের জন্য যাতায়াতের পথই হচ্ছে গিফার গোত্রের মধ্য দিয়ে। তখন তারা আমাকে ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। পরের দিন সকাল বেলায় আমি আবারও সেখানে যাই এবং গতকাল যা বলেছিলাম আজও তাই বলি। তখন তারা বলল, তোমরা উঠ! এ ধর্মত্যাগীকে শায়েস্তা কর। আর তারা আমার সাথে সে আচরণই শুরু করে, যা গতকাল করেছিল, অর্থাৎ আমাকে মারতে শুরু করে। এমতাবস্থায় (আজও) ‘আল-‘আব্বাস আমার কাছে আসলেন ও আমার দিকে ঝুঁকে পড়লেন এবং গতকালের মতো উক্তি করলেন ( সহীহুল বুখারী ৪/৪৮৪, যমযম পরিচ্ছেদ, এ ঘটনাটি শব্দের পার্থক্যসহ ‘ইসালামু আবি জার’ পরিচ্ছেদেও বর্ণিত হয়েছে, ৫/৪৭, নং ৩৮৬১ )।
মুস’আব ইবন ‘উমাইর, মক্কায় হাজ্জের সময় সংঘটিত মদীনাবাসীদের সাথে ‘আকাবার বাই’আতের পর মদীনায় ইসলামের দা’ওয়াতের প্রতিনিধি দল প্রেরণ করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল, নতুন মুসলিমদেরকে দ্বীনের বিধি-বিধান ও নিয়ম-কানুনের তা’লীম দেওয়া এবং মদীনার অবশিষ্ট কাফির মুশরিকদের কাছে ইসলামের দা’ওয়াত পেশ করা। ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামীদের মধ্যে অন্যতম মুস’আব ইবন ‘উমাইর আল-‘আবদারী (রা) আল্লাহর রাসূলের (সা) পক্ষ থেকে ইসলামের সর্বপ্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে মদীনায় গমন করেন। সেখানে তিনি আস’আদ ইবন যুরারাহ (রা) এর বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং তাকে সাথে করে ইয়াসরিববাসীদের নিকট প্রবল উদ্যোম ও উদ্দীপনা নিয়ে ইসলামের প্রচার-প্রসারের কাজ আরম্ভ করেন। তাকে শিক্ষক হিসেবে ‘মুকরিউ’ বলা হতো। তাদের দা’ওয়াতে দু’জন প্রভাবশালী নেতা সা’দ ইবন মু’আয এবং উসাইদ ইবন হুযায়ির ইসলাম গ্রহণ করলে মদীনার প্রায় সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। এমনকি তিনি মদীনার প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে ইসলামের দা’ওয়াত দেন। মদীনাতে এমন কোনো ঘর অবশিষ্ট ছিল না, যে বাড়িতে নারী ও পুরুষগণ ইসলাম গ্রহণ করেনি, কতিপয় ব্যতিক্রম ছাড়া। এভাবে মুস’আব (রা) পরবর্তী হাজ্জ মৌসুম আসার পূর্বেই তার সাফল্যের সংবাদ মক্কায় রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে নিয়ে আসেন। তিনি তাকে ইয়াসরিব গোত্রগুলোর অবস্থা, তাদের রণকৌশল ও প্রতিরক্ষামূলক দক্ষতার উৎকর্ষতা সম্পর্কে অবগত করেন (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ২/৭১-৭৪, ইবনুল কাইয়্যেম, যাদুল মা’আদ ৩/৪২-৪৩, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১৯০-১৯২)।
যিমাম ইবন সা’লাবাহ, সাহাবীদের মধ্যে আরেকজন সাহাবী, যিনি ইসলাম গ্রহণ করা মাত্র নিজ গোত্রে ফিরে গিয়েই সর্বপ্রথম ইসলামের দা’ওয়াত পেশ করেন তিনি হচ্ছেন, যিমাম ইবন সা’লাবাহ (রা)। তার ইসলাম গ্রহণ ও ইসলামের দিকে দা’ওয়াত দানের ঘটনা বিভিন্ন হাদীস ও সীরাত গ্রন্থে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। বনু সা’দ গোত্র যিমাম ইবন সা’লাবাহ (রা) কে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে প্রেরণ করেন। তিনি আল-মদীনায় এসে মাসজিদের আঙ্গিনায় তার উটটি বসিয়ে ভালো করে বেঁধে মাসজিদে প্রবেশ করেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) তখন সাহাবীদের সাথে বসা ছিলেন। যিমাম (রা) জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ কে? তারপর তিনি ইসলামের মৌলিক বিষয়াদি সম্পর্কে প্রশ্ন করেন আর রাসূলুল্লাহ (সা) তার জবাব দেন। তখন তিনি বলেন,
آمَنْتُ بِمَا جِئْتَ بِهِ، وَأَنَا رَسُولُ مَنْ وَرَائِي مِنْ قَوْمِي، وَأَنَا ضِمَامُ بْنُ ثَعْلَبَةَ أَخُو بَنِي سَعْدِ بْنِ بَكْرٍ
‘
আপনি যে দ্বীনসহ এসেছেন আমি তার প্রতি ঈমান পোষণ করলাম। আর আমি আমার পেছনে রেখে আসা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। আমি বনু সা’দ ইবন বকর গোত্রের একজন ভাই যিমাম ইবন সা’লাবাহ ( সহীহুল বুখারী ১/২৩, নং ৬৩, সহীহ মুসলিম ১/৪১, নং ১২, মুসনাদ আহমাদ ২০/১৩৮-১৩৯, নং ১২৭১৯, আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত)।
অন্য বর্ণনায় আছে, লোকটি এ কথা বলতে বলতে চলে গেল যে,
وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ، لَا أَزِيدُ عَلَيْهِنَّ، وَلَا أَنْقُصُ مِنْهُنَّ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَئِنْ صَدَقَ لَيَدْخُلَنَّ الْجَنَّةَ
ঐ সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে দ্বীনে হকসহ প্রেরণ করেছেন! আমি এই বিষয়গুলোর চেয়ে অতিরিক্ত করবো না এবং এগুলো থেকে কমও করবো না। তখন নবী (সা) বলেন, ‘লোকটি যদি সত্য বলে থাকে, তাহলে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে (সহীহ মুসলিম ১/৪১, নং ১২, মুসনাদ আহমাদ ২০/১৩৮-১৩৯, নং ১২৭১৯)।
তারপর যিমাম (রা) তার উটের কাছে এসে বাঁধন খুলে তাতে আরোহন করে নিজ কাওমের কাছে ফিরে আসেন এবং তাদের সাথে মিলিত হয়ে সর্বপ্রথম বলেন, আল্-লাত এবং আল-‘উয্যা ধ্বংস হোক! লোকেরা বলল, হে যিমাম! আস্তে, তুমি শ্বেত ও কুষ্ঠ রোগ এবং পাগল হওয়ার ভয় কর। তখন তিনি বলেন, তোমাদের অমঙ্গল হোক! এরা কোনো ক্ষতিও করতে পারে না, কোনো উপকারও করতে পারে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলা রাসূল (সা) পাঠিয়েছেন এবং তার উপর কিতাব নাজিল করেছেন, যার দ্বারা তিনি তোমাদেরকে তোমরা যে অবস্থার মধ্যে আছো তা থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আমি এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য আর কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আর মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল (সা)। আমি তার কাছ থেকেই তোমাদের নিকটে, তিনি যা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং যা করতে নিষেধ করেছেন, সে বার্তা নিয়ে এসেছি। ঘটনার বর্ণনাকারী বলেন, ঐ দিন সন্ধ্যা হওয়ার আগেই ঐ গ্রামের সকল নারী ও পুরুষই ইসলাম গ্রহণ করেন। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে যিমাম ইবন সা’লাবাহর চেয়ে উত্তম আর কোনো প্রতিনিধি কোথাও আগমন করেছে, এমন কথা আর শোনা যায়নি (মুসনাদ আহমাদ ৪/২১১, নং ২৩৮০, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ৩/৫৫, নং ৪৩৮০, ইবন হিশাম, আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ৪/১৮৭-১৮৮, ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, বৈরুত, দারুল মা’রিফাহ, ৪র্থ সংস্করণ, ১৪১৯ছি, ৫/৬৫-৬৭ )।
আত্-তুফাইল ইবন ‘আমর আদ্-দাওসী, আল্লাহর রাসূল (সা) এর একজন সাহাবী, যিনি ইসলাম গ্রহণ করেই তার কাওমের কাছে ফিরে গিয়ে ইসলামের দা’ওয়াত পেশ করেন এবং তার দা’ওয়াতে সে গোত্রের প্রায় সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন, তিনি হলেন, আত্-তুফাইল ইবন ‘আমর (রা), তিনি ছিলেন আদ-দাওসী গোত্রের লোক, যারা ইয়ামান দেশে বসবাস করতেন। তার দা’ওয়াতেই তার পিতা-মাতা, স্ত্রী-পরিবার এবং গোত্রের লোকেরা ইসলামে প্রবেশ করেন। প্রসিদ্ধ সাহাবী আবু হুরায়রা (রা) এর তার হাতেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হাদীসে রাসূলের (সা) বিশাল ভান্ডার তার মাধ্যমেই উম্মাত লাভ করেছে। তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সম্পর্কে ইবন ইসহাক বলেন, আত্-তুফাইল (রা) নাবুওয়াতের দশম বছরে মক্কায় আগমন করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কাতেই ছিলেন। কুরাইশের লোকজন তাকে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে দেখা করতে নিষেধ করে এবং তার ব্যাপারে সাবধান করে যে, এই ব্যক্তি আমাদের সমাজে ভাঙ্গন সৃষ্টি করেছে, তার কথা যাদুর মতো; পিতা পুত্রে, ভাই ভাইয়ে এবং স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিরহ ও বিচ্ছেদ তৈরি করে দেয়। তারা আমার প্রতি অনবরত চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। এক পর্যায় আমার মনে হয়, আমি তার সাথে কথাও বলবো না এবং তার কোনো কথাও কোনোব না। আমি মাসজিদে গেলেও কানে তুলা দিয়ে যেতাম।
এক পর্যায়ে আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) কা’বার পাশে সালাত আদায় করতে দেখে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম এবং তিলাওয়াত শুনতে থাকলাম। তিনি সালাত আদায় শেষে বাড়িতে গেলেন। আমি তাকে অনুসরণ করে তার বাড়ি পর্যন্ত গেলাম এবং তাকে বললাম, হে মুহাম্মাদ! আপনার লোকেরা তো আমাকে কঠিনভাবে সাবধান করেছে যে, আমি যেন আপনার কোনো কথা না শুনি। কিন্তু আল্লাহর সাহায্যে আমি আপনার মুখে অতি উত্তম কথা শুনেছি। আপনি আমার কাছে আপনার কথা পেশ করুন! তখন রাসূলুল্লাহ (সা) আমার কাছে ইসলাম পেশ করলেন এবং কুরআন তিলাওয়াত করলেন। আল্লাহর কসম! এর চেয়ে উত্তম কথা এবং ন্যায়-নিষ্ঠ বিষয় আর কোনো দিন শুনিনি। তখনই আমি ইসলাম গ্রহণ করি এবং কালিমায়ে শাহাদাতের সাক্ষ্য দেই। আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! আমি আমার সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, আমার কথা মান্য করা হয়। আমি তাদের কাছে ফিরে যাচ্ছি এবং তাদেরকে ইসলামের দা’ওয়াত দেব। আপনি দু’আ করুন। বাড়িতে ফিরে গিয়ে আমার পিতা ও স্ত্রীকে ইসলামের দা’ওয়াত দেই, তারা ইসলাম কবুল করেন। এরপর আমার গোত্রের লোকদেরকে ইসলামের দা’ওয়াত দেই, কিন্তু তারা আমার দা’ওয়াত গ্রহণ করেনা। তখন আমি পুনরায় রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে এসে দাওস গোত্রের অবাধ্যতা ও যিনার অপকর্মের কথা বলি এবং তাদের প্রতি বদ-দু’আ করার আবেদন করি। তিনি দু’হাত তুলে দু’আ করলেন। আবু হুরায়রা (রা) থেকেও হাদীসটি এভাবে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
جَاءَ الطَّفَيْلُ بْنُ عَمْرٍو إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِنَّ دَوْسًا قَدْ هَلَكَتْ عَصَتْ وَأَبَتْ فَادْعُ اللَّهَ عَلَيْهِمْ، وَفِي رِوَايَةٍ: فَظَنَّ النَّاسُ أَنَّهُ يَدْعُو nعَلَيْهِمْ، فَقَالَ: اللَّهُمَّ اهْدِ دَوْسًا وَأْتِ بِهِمْ
আত্-তুফায়েল ইবন ‘আমর নবী (সা) এর কাছে এলেন এবং বলেন, দাওস গোত্র অবশ্যই ধ্বংস হয়েছে, তারা অবাধ্য হয়েছে এবং (ইসলাম গ্রহণে) অস্বীকার করছে। আপনি তাদের প্রতি বদ-দু’আ করুন, অন্য বর্ণনায় আছে যে, লোকেরা ধারণা করতে লাগল যে, তিনি বোধহয় তাদের প্রতি বদ-দু’আ করবেন। তখন নবী (সা) বলেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি দাওস গোত্রকে হেদায়াত দান করুন এবং তাদেরকে নিয়ে আসুন! (সহীহুল বুখারী ৫/১৭৪, নং ৪৩৯২, ৮/৮৪, নং ৬৩৯৭, সহীহ মুসলিম ৪/১৯৫৭, নং ২৫২৪ )।
তারপর আত্-তুফাইলকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তুমি তোমার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে যাও এবং তাদের সাথে বিনম্র আচরণ কর’। আত্-তুফাইল (রা) বলেন, তখন থেকে আমি দাওস গোত্রের সাথেই ছিলাম, তাদেরকে ইসলামের দা’ওয়াত দিতে থাকি। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা) আল-মদীনায় হিজরাত করেন। বদ্র, উহুদ, খন্দক যুদ্ধগুলো সংঘটিত হয়ে গেল। তারপর আমি এবং আমার গোত্রের যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদেরকে সাথে নিয়ে রওয়ানা হলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) খাইবারে অবস্থান করছিলেন। আমরা দাওস গোত্রের সত্তর কিংবা আশি ঘর লোকসহ আল-মদীনাতে আগমন করলাম। তারপর রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে খাইবারে মিলিত হলাম। অতঃপর তিনি আমাদেরকেও মুসলিমদের সাথে যুদ্ধের প্রাপ্য অংশে শামিল করলেন। এভাবে আত্-তুফাইল (রা) ইসলামের দা’ওয়াত ও গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবালী সম্পন্ন করে ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন (আড়-তুফাইল ইবন ‘আমরের পুরা ঘটনাটি দেখুন, ইবন হিশাম, আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ২/২৯-৩২, আবু না’ঈম আল-আসবাহানী, দালাইলুন নাবুওয়াহ, সম্পাদনা, ড. মুহাম্মাদ রাওয়াস কাল’আজী, বৈরুত, দারুন নাফাইস, ২য় সংস্করণ, ১৪০৬ হি, ১/২৩৮, আল-বাইহাকী, দালাইলুন নানুওয়াহ, সম্পাদনা, ড. ‘আব্দুল মু’তী কাল’আজী, দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪০৮ হি, ৫/৩৬০, আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১৮০- ১৮১ (বাংলা সয়স্করণ )।
আত্-তুফাইল (রা) ইসলাম গ্রহণ করে নিজ দেশ ইয়ামানে ফিরে গিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে বসে সময় নষ্ট করেছিলেন? যে সময় সাহাবীগণ (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে জীবন ও সম্পদ ব্যয় করে জিহাদ করছেন। বদ্র, উহুদ, খন্দক প্রভৃতি বড় বড় যুদ্ধ? না তা নয় বরং তিনি তার দেশে তার গোত্রের মাঝে দা’ওয়াত ইলাল্লাহ ও তাদেরকে ঈমান-‘আকীদাহ ও সার্বিক কল্যাণের তা’লীমের মতো অনেক বড় দায়িত্ব যথাযথভাবে নিষ্ঠার সাথে পালন করেছিলেন। তারপর সপ্তম হিজরী সনে তার গোত্রের এক বিরাট মুসলিম দল নিয়ে আল-মদীনাতে উপস্থিত হন। তিনি তার গোত্রে কমপক্ষে দশ বছর ইসলামের দা’ওয়াতের দায়িত্ব নিরবচ্ছিন্ন ভাবে পালন করে তাদেরকে ইসলামের পতাকাতলে শামিল করেন।
দা’ওয়াত ইলাল্লাহর কাফেলার শাহাদাত বরণ, (বি’রে মা’উনার ট্রাজেডি), আবু বারা ‘আমির ইবন মালিক, যিনি ‘মুলা’য়িবুল আসিন্নাহ’ (বর্শা নিয়ে খেলাকারী) উপাধিতে খ্যাত ছিলেন। তিনি একবার আল-মদীনায় আসলে রাসূলুল্লাহ (সা) তার কাছে ইসলামের দা’ওয়াত পেশ করেন। তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করলেন না এবং প্রত্যাখ্যানও করলেন না। তবে তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি বরং দ্বীনের দা’ওয়াত দেওয়ার জন্য একদল সাহাবীকে নাজদবাসীর নিকট প্রেরণ করুণ। তারা তাদের কাছে ইসলামের দা’ওয়াত পেশ করবেন। আমি আশা করি তারা ইসলাম কবুল করবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আমি নাজদবাসীকে তাদের ব্যাপারে ভয় করি। আবু বারা বললেন, তারা আমার আশ্রয়ে থাকবেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) সত্তর জন কুরআনের হাফিযদেরক সেখানে পাঠালেন। তারা অত্যন্ত পরিশ্রমী ও রাতে ‘ইবাদাতকারী ছিলেন, আর দিবা ভাগে জঙ্গল থেকে কাঠ সংগ্রহ করে তার মূল্য দিয়ে আহলুস সুফ্ফার জন্য খাদ্য ক্রয় করতেন। তারা কুরআন শিক্ষা দিতেন ও কুরআন চর্চা করতেন। দা’ওয়াতের এই কাফেলা মা’উনাহ কূপের নিকট গিয়ে পৌঁছলেন এবং সেখানেই শিবির স্থাপন করেন। উম্মু সুলাইমের ভাই আনাস (রা) এর মামা হারাম ইবন মিলহান (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) বার্তা নিয়ে ‘আমির ইবন তুফাইলের নিকট গমন করেন। সে দা’ওয়াতের চিঠিটি তো গ্রহণ করেই না, বরং তার ইঙ্গিতে এক ব্যক্তি হারাম (রা) এর পেছন থেকে এমন জোরে বর্ণা দ্বারা আঘাত করে যে, তা দেহের অপর দিক দিয়ে ফুটা হয়ে বের হয়ে যয়। বর্শা-বিদ্ধ রক্তাক্তদেহী হারাম (রা) বলে উঠলেন, কা’বার রবের কসম! আমি সফল হয়েছি।
এরপর আল্লাহর দুশমন ‘আমির ইবনুত তুফাইল অবশিষ্ট সাহাবীদেরকে হত্যার জন্য ‘আমির গোত্রকে আহ্বান জানালে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। তারপর সে বনু সুলাইম গোত্রকে আহ্বান জানায়। বনু সুলাইমের তিনটি গোত্র; ‘উসাইয়্যাহ, রি’ল ও যাকওয়ান তার ডাকে সাড়া দিয়ে সাহাবীগণ (রা) কে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলে। সাহাবীগণ সাহসের সাথে যুদ্ধ করতে করতে একজন বাদে সকলেই শাহাদাত বরণ করেন। কেবলমাত্র কা’ব ইবন যায়দ (রা) জীবিত ছিলেন। তাকে শহীদগণের মধ্য থেকে কোনো মতে নিশ্বাস আছে এমন অবস্থায় উঠিয়ে আনা হয়। খন্দাকের যুদ্ধ পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাষাবিয়্যাহ ৩/১৬৭-১৬৮, আবু না’ঈম, দালাইলুন নাবুওয়াহ ১/৫১২, নং ৪৪০, আল-বাইহাকী, দালাইলুন নাবুওয়াহ ৩/৩৩৮, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৩৫-৩৩৬)।
বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থেও বি’রে মা’উনার হৃদয়-বিদারক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। যেমন আনাস ইবন মালিক (রা) সে ঘটনা সম্পর্কে বর্ণনা দিয়ে বলেন,
بَعَثَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَقْوَامًا مِنْ بَنِي سُلَيْمٍ إِلَى بَنِي عَامِرٍ فِي سَبْعِينَ، فَلَمَّا قَدِمُوا قَالَ لَهُمْ خَالِي : أَتَقَدَّمُكُمْ فَإِنْ أَمَّنُونِي حَتَّى أُبَلِّغَهُمْ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَإِلَّا كُنْتُمْ مِنِّي قَرِيبًا، فَتَقَدَّمَ فَأَمَّنُوهُ، فَبَيْنَمَا يُحَدِّثُهُمْ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ أَوْمَنُوا إِلَى رَجُلٍ
مِنْهُمْ فَطَعَنَهُ، فَأَنْفَذَهُ، فَقَالَ: اللَّهُ أَكْبَرُ، فُرْتُ وَرَبِّ الكَعْبَةِ، ثُمَّ مَالُوا عَلَى بَقِيَّةِ أَصْحَابِهِ، فَقَتَلُوهُمْ إِلَّا رَجُلًا أَعْرَجَ صَعِدَ الجَبَلَ، قَالَ هَمَّامٌ: فَأَرَاهُ آخَرَ مَعَهُ، فَأَخْبَرَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُمْ قَدْ لَقُوا رَبَّهُمْ، فَرَضِيَ عَنْهُمْ، وَأَرْضَاهُمْ، فَكُنَّا نَقْرَأُ : أَنْ بَلِّغُوا قَوْمَنَا
أَنْ قَدْ لَقِينَا رَبَّنَا فَرَضِيَ عَنَّا، وَأَرْضَانَا ثُمَّ نُسِخَ بَعْدُ، فَدَعَا عَلَيْهِمْ أَرْبَعِينَ صَبَاحًا عَلَى رِعْلٍ وَذَكْوَانَ وَبَنِي لَحَيَانَ وَبَنِي عُصَيَّةَ الَّذِينَ عَصَوُا اللَّهَ وَرَسُولَهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
নবী (সা) বনু সুলাইম থেকে সত্তর জনের একদলকে বনু ‘আমির গোত্রের কাছে পাঠালেন। তারা যখন সেখানে গমন করলেন, তখন আমার মামা (হারাম ইবন মিলহান) তাদেরকে বললেন, আমি তোমাদের আগে তাদের কাছে যাচ্ছি, যদি তারা আমাকে রাসূলুল্লাহর (সা) বার্তা তাদেরকে পৌছিয়ে দেওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা দেয় (তাহলে ভাল)। অন্যথায় তোমরা তো আমার নিকটেই আছো। তখন তিনি অগ্রসর হন, তারা অবশ্য তাকে নিরাপত্তা দিল। তিনি যখন তাদের সাথে নবী (সা) এর ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করছিলেন, তখন তাদের মধ্যকার একজন ব্যক্তিকে ইশারা করে। সে তাকে আঘাত করল এবং বর্শা বিদ্ধ করে দিল। তখন তিনি বলে উঠলেন, আল্লাহু আকবার! আল-কা’বার রবের কসম! আমি সফল হয়েছি। তারপর কাফিরগণ তার অবশিষ্ট সঙ্গীদের কাছে প্রত্যাবর্তন করল এবং তাদের সবাইকে হত্যা করল। তবে জনৈক খোঁড়া ব্যক্তি ছাড়া, যিনি পাহাড়ে আরোহণ করেছিলেন। বর্ণনাকারী হাম্মাম বলেন, আমার মনে হয়, তার সাথে আরো একজন ছিলেন। অতঃপর জিবরীল (আ) নবী (সা) কে অবহিত করেন যে, তারা তার রবের সাথে মিলিত হয়েছেন। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তাদেরকেও সন্তুষ্ট করেছেন। (আনাস (রা) বলেন,) আমরা (কুরআনের আয়াত হিসেবে) পাঠ করতাম,
بَلِّغُوا قَوْمَنَا أَنْ قَدْ لَقِينَا رَبَّنَا فَرَضِيَ عَنَّا، وَأَرْضَانَا
আমাদের সম্প্রদায়কে এ খবর পৌছে দাও যে, আমরা আমাদের রবের সাথে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তিনি আমাদেরকেও সন্তুষ্ট করেছেন’। পরবর্তিকালে অবশ্য আমাদের কথিত আয়াতটি মানসূখ হয়ে যায়। এরপর তিনি রাসূল (সা) চল্লিশ সকাল রি’ল, যাকওয়ান, বনু লিহইয়ান এবং বনু ‘উসাইয়্যাহ, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) এর অবাধ্যতা করেছিল, তাদের উপর বদ-দু’আ করেন (সহীহুল বুখারী ৪/১৮, নং ২৮০১, ৪/২১, নং ২৮১৪, ৪/৭৩ নং ৩০৬৪, সহীহ মুসলিম ১/৪৬৮, নং ৬৭৭ )। হৃদয় বিদারক এই ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (সা) অত্যন্ত মর্মাহত ও গভীর চিন্তিত হয়ে ছিলেন যে, যে সকল গোত্র ও সম্প্রদায় বিশ্বাসঘাতকতা করে এই কুররা ও দা’ওয়াতের কাফেলার সদস্য এবং বিশিষ্ট সাহাবীগণকে হত্যা করে তাদের প্রতি মাসাধিক কাল বদ-দু’আ করেছেন। এভাবে আল্লাহর নবীর সাহাবীগণ তাদের প্রিয় রাসূল (সা) মানুষের কল্যাণে দা’ওয়াত ইলাল্লাহকে যেভাবে নিয়েছিলেন, তারাও সেভাবেই ইসলামের প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠার মহান কর্ম ও দায়িত্বকে গ্রহণ করে এ পথে জীবন দিয়ে দেওয়াকে মহান সফলতা বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন। এক্ষেত্রেও তারা ছিলেন উম্মাতের জন্য উদাহরণ।
৫- রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ, রাসূলুল্লাহকে (সা) স্মরণ করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করা। মহান আল্লাহ সুবহানাহু এ নির্দেশনা দিয়ে বলেন,
{إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا}
‘নিশ্চয় আল্লাহ নবীর উপর রহমত করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণ তার জন্য দু’আ- ইসতিগফার করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও নবীর প্রতি সালাত পাঠ কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও’, [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৬]। ‘আরবী ভাষায় ‘সালাত’ শব্দের অর্থ, রহমত, দু’আ এবং প্রশংসা। আল- কুরআনের অধিকাংশ আয়াতে যেখানে ‘সালাত’ শব্দটিকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, তার অর্থ, আল্লাহু তা’আলা তার রাসূলের (সা) প্রশংসা করেন, তার নাম উচ্চে উঠিয়ে দেন এবং তার কাজে কল্যাণ ও বারকাত দান করেন। তার অবারিত রহমত বর্ষণ করেন। আর ফেরেশতাদের সাথে যখন ‘সালাত’ শব্দটি সম্পৃক্ত হয় এবং তারা তার প্রতি সালাত পাঠ করেন তখন তার অর্থ হচ্ছে, তারা তার জন্য দু’আ করেন, আল্লাহ যেন তাকে সুউচ্চ মর্যাদায় ভূষিত করেন, তার দ্বীন ও শরী’য়াতের প্রসারতা ও বিস্তৃতি দান করেন এবং তাকে সর্বোচ্চ প্রশংসিত স্থানে পৌঁছিয়ে দেন। তার প্রতি রহমত নাজিল করেন। আর সাধারণ মু’মিনদের পক্ষ থেকে তার প্রতি সালাতের অর্থ দু’আ ও প্রশংসার সমষ্টি। আবুল ‘আলিয়াহ বলেন, আল্লাহ তা’আলার সালাতের অর্থ আল্লাহ কর্তৃক ফেরেশতাদের সামনে রাসূলুল্লাহর (সা) সম্মান ও প্রশংসা করা। আর ফেরেশতাদের সালাত অর্থ দু’আ করা। ইবন ‘আব্বাস বলেন, সালাত পাঠ করেন অর্থ বারাকাত নাজিল করেন (সহীহুল বুখারী ৬/১২০, তাফসীর অধ্যায়, তাফসীর ইবন কাসীর ৬/৪৫৭, আর দেখুন, কুরআনুল কারীম বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর ২/ ২১৬৪ )।
তবে রাসূলের (সা) প্রতি সালাত প্রেরণের ক্ষেত্রে ‘সালাত’ শব্দ দ্বারা একই সময় একাধিক অর্থ, রহমত, দু’আ ও প্রশংসা নেওয়ার পরিবর্তে এক অর্থ নেওয়াই সঙ্গত। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহর (সা) সম্মান ও প্রশংসা (ইবনুল কাইয়্যেম, মুহাম্মাদ ইবন আবু বাকর, জালাউল আফহাম ফী ফাযলিস সালাত ‘আলা মুহাম্মাদ খাইরিল আনাম, সম্পাদনা, শু’আইব ও ‘আব্দুল কাদির আল- আরনাউত, কুয়েত, দারুল ‘আরবাহ, ২য় সংস্করণ, ১৪০৭ হি, পৃ. ১৬০)।
এ আয়াতে মহিমান্বিত আল্লাহ মু’মিন-মুসলিমদেরকে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। মু’মিনদেরকে আদেশ দেবার পূর্বে স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা এবং তাঁর ফেরেশতাগণ তার প্রতি সালাত পাঠান। অতঃপর মু’মিনদেরকে সালাত ও সালাম পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ এবং ফেরেশতাদের দু’আর অনুসরণে মু’মিনগণেরও তার প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করা উচিত। তাছাড়াও উম্মাতের প্রতি রাসূলের (সা) হকের কিছুটা প্রতিদান দেওয়া, তাদের ঈমানের পূর্ণতা দান এবং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন, তাদের পূণ্য বেশি হওয়া এবং তাদের ত্রুটি-গুনাহ মাফ হওয়া ইত্যাদি কারণে তার প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করা অপরিহার্য (শাইখ আস- সা’দী, পৃ. ৬১৮ )।
এরই প্রেক্ষিতে উম্মাতের জন্য রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণের শার’য়ী মার্যাদা কি? তা নিয়ে বিজ্ঞ ‘আলিমগণের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। অধিকাংশ ইমাম ও ‘আলিম এ বিষয়ে একমত যে, কোনো ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) নাম উল্লেখ করলে কিংবা তার নাম শুনলে সালাত ও সালাম পাঠ করা ওয়াজিব হয়ে যায় (তাফসীরুল কুরতুবী ১৪/২৩৩-২৩৪, ফাতহুল কাদীর ৪/৩৪৬)।
কেননা হাদীসে এরূপ ক্ষেত্রে সালাত ও সালাত পাঠ করা ওয়াজিব হওয়ার শক্ত সমর্থন রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
رَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ
সেই ব্যক্তি অপমানিত হোক, যার সামনে আমার কথা উল্লেখ করা হয় তখন সে আমার প্রতি সালাত পাঠ করে না (সুনানুত তিরমিযী ৫/৪৪২, নং ৩৫৪৫, মুসনাদ আহমাদ১২/৪২১, নং ৭৪৫১, ইমাম তিরমিযী হাসান গারীব এবং শাইখ শু’আইব আল- আরনাউত সহীহ ও আলবানী হাসান সহীহ বলেছেন)।
আল-হুসাইন ইবন ‘আলী (রা) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু (সা) বলেন,
البَخِيلُ الَّذِي مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ.
সেই ব্যক্তি কৃপণ, যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হলে, সে আমার প্রতি সালাত পাঠ করে না (সুনানুত তিরমিযী ৫/৪৪৩, ৩৫৪৬, মুসনাদ আহমাদ ৩/২৫৮, নং ১৭৩৬, ইমাম তিরমিযী হাসান সহীহ গারীব এবং শাইখ শু’আইব আল- আরনাউত ও আলবানী সহীহ বলেছেন। এ প্রসঙ্গে ‘আলী ইবন আবি তালিব ও জাবির প্রমুখ (রা)ম থেকে বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত আছে )।
সুতরাং সব সময়ই তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ ও প্রেরণ করা বিধিবদ্ধ। তবে অনেক বিজ্ঞ ‘আলিম দৈনিন্দন সালাতের মধ্যে শেষ তাশাহহুদে সালাত পাঠ করাকে অপরিহার্য বলেছেন (শাইখ আস-সা’দী, পৃ. ৬১৮ )।
মনে রাখতে হবে যে, নবী (সা) এর প্রতি আমাদের সালাত পাঠ তার জন্য আমাদের সুপারিশ নয়। কেননা আমাদের মতো লোকদের তার মতো মহান ব্যক্তিত্ব শ্রেষ্ট মানুষ ও রাসূলের (সা) জন্য সুপারিশ শোভনীয় নয়। বরং মানুষের প্রতি আল্লাহর নবী যে বিশাল অনুগ্রহ করেছেন, তার কিছু প্রতিদান দেওয়ার জন্য আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা তার প্রতিদান দিতে অক্ষম হলেও দু’আ করার মাধ্যমে যেন কিছুটা হলেও প্রতিদান দেই। আমাদের অক্ষমতার পরিদৃষ্টে আল্লাহ সুবহানাহু প্রতিদান স্বরূপ তার প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন (ইবন হাজার, ফাতহুল বারী ১১/১৬৮ )।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, নবী (সা) ছাড়া অন্য কোনো মু’মিন-মুসলিমদের প্রতি সালাত পেশ করা যায়, এ মর্মে কুরআন কারীম ও সহীহ হাদীসে অনেক প্রমাণ আছে। এর আলোকে একদল বিশেষজ্ঞ ‘আলিম এ মত পোষণ করেন (তাফসীর ইবন কাসীর ৬/৪৫৭-৪৫৮ )।
তবে মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশের মতে সাধারণ মু’মিনদের জন্য সালাত পাঠ করা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) এর জন্য তো ঠিক ছিল, কিন্তু সাধারণ মুসলিমদের জন্য সঠিক নয়। কেননা সালাত ও সালামকে মুসলিম উম্মাহ নবী-রাসূলগণ ‘আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালামের জন্য নির্দিষ্ট করে নিয়েছেন। এটি পূর্ব কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মুসলিমদের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। তাই নবীদের ছাড়া অন্যদের জন্য
সালাত ও সালাম ব্যবহার না করাই উচিত ( তাফসীর ইবন কাসীর ৬/৪৭৮-৪৭৯, আর দেখুন, কুরআনুল কারীম, বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর ২/২১৬৫-২১৬৬)।
উল্লেখ্য যে, ইমাম নাবাবী বলেছেন, যখন নবী (সা) এর প্রতি সালাত পাঠ করা হয় তখন উপযুক্ত আয়াতের আলোকে ‘সালাত’ ও ‘সালাম’ একত্রে এভাবে বলতে হবে, ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’, বা ‘আলাইহিস সালাম’। শুধু ‘সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি’ বা ‘আলাইহিস সালাত’ বলা ঠিক নয় ( আন-নববী, শারহ সহীহ মুসলিম ১/৪৪, তাফসীর ইবন কাসীর ৬/৪৭৯ )।
রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণের ক্ষেত্রে সাহাবীগণের গুরুত্ব, উপর্যুক্ত আয়াতে মহিমান্বিত আল্লাহ সুবহানাহু যখন রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণের নির্দেশ নাজিল করেন তখন সাহাবীগণ তা বাস্তবায়ন করার জন্য ভীষণ আগ্রহী হয়ে উঠেন। তারা রাসূলের (সা) প্রতি সালাম কিভাবে পাঠাতে হয় তাতো তারা শিখেছেন। কিন্তু কিভাবে সালাত প্রেরণ করতে হয় তা তাদের বোধগম্য হচ্ছিল না। তাই অনেক সাহাবী রাসূলুল্লাহকে (সা) জিজ্ঞেস করেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! সালামের পদ্ধতি তো আপনি আমাদেরকে বলে দিয়েছেন। (অর্থাৎ তাশাহ্হুদে ‘আস্সালামু ‘আলাইকা আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রহমতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ’, এবং দেখা-সাক্ষাত হলে “আস্সালামু ‘আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলা) কিন্তু আপনার প্রতি সালাত প্রেরণের পদ্ধতি কেমন? (ইবন জারীর, তাফসীরুত তাবারী, তাফসীরুল কুরতুবী, ইবন ‘আনূর, আত্-তাহরীর ওয়ান-তানভীর )।
তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বিভিন্ন ব্যক্তিকে বিভিন্ন সময় ‘সালাত’ পাঠ ও এর শব্দগুলো শিখিয়েছেন। যেসব সাহাবীদের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন শব্দে সালাত শিখিয়েছেন, অনেক হাদীসে তার বর্ণনা রয়েছে। যেমন,
এক. আবু হুমাইদ আস্-সা’ঈদী (রা) বলেন যে, সাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার প্রতি কিভাবে সালাত প্রেরণ করব? তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, তোমরা বল,
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَأَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَأَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مجيد
হে আল্লাহ। আপনি মুহাম্মাদ ও তার স্ত্রীগণ এবং তার বংশধরের প্রতি রহমত নাজিল করুন, যেমন আপনি ইবরাহীমের বংশধরের প্রতি রহমত করেছেন। আর আপনি মুহাম্মাদ ও তার স্ত্রীগণ এবং তার বংশধরের প্রতি বারাকাত দান করুন, যেমন আপনি ইবরাহীমের বংশধরের প্রতি বারাকাত দান করেছেন। নিশ্চয় আপনি মহা প্রশংসিত, সম্মানিত (সহীহুল বুন্ধরী ৪/১৪৬, নং ০০৬৯, ৮/৭৭, বং ৬০৬০, সুনান আনি দাউদ ১/২৫৭, নং ১৭৯ )।
দুই, কা’আব ইবন ‘উজরাহ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার প্রতি, আহল বাইতের প্রতি কিভাবে সালাত প্রেরণ করব? তখন তিনি বলেন, তোমরা বল,
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ এবং মুহাম্মাদের বংশধরের প্রতি রহমত নাজিল করুন, যেমন আপনি ইবরাহীম এবং ইবরাহীমের বংশধরের প্রতি রহমত করেছেন। নিশ্চয় আপনি মহা প্রশংসিত, সম্মানিত। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ এবং তার বংশধরের প্রতি বারাকাত দান করুন, যেমন আপনি ইবরাহীম ও ইবরাহীমের বংশধরের প্রতি বারাকাত দান করেছেন। নিশ্চয় আপনি মহা প্রশংসিত, সম্মানিত (সহীহুল বুখারী ৪/১৪৬, নং ৩০৭০, সহীহ মুসলিম ১/৩০৫, নং ৪০৬, সুনাবৃত তিরমিযী ১/৬১০, নং ৪৮৩)।
তিন. আবু সা’ঈদ আল-খুদরী (রা) এর একই ধরনের প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, তোমরা বল,
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ وَرَسُولِكَ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَآلِ إِبْرَاهِيمَ
হে আল্লাহ! আপনি আপনার বান্দা এবং আপনার রাসূল মুহাম্মাদের প্রতি রহমত নাজিল করুন, যেমন আপনি ইবরাহীমের বংশধরের প্রতি রহমত করেছেন। আর আপনি মুহাম্মাদ এবং মুহাম্মাদের বংশধরের প্রতি বারকাত দান করুন, যেমন আপনি ইবরাহীম ও ইবরাহীমের বংশধরের প্রতি বারকাত দান করেছেন ( সহীহুল বুখারী ৬/১২১, নং ৪৭৯৮, ৮/৭৭, নং ৬৩৫৮, মুসনাদ আহযান ১৮/২৪, নং ১১৪৩৩ )।
চার. আবু মাস’উদ ‘উকবাহ ইবন ‘আমর (রা) থেকে বর্ণিত যে, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহকে (সা) প্রশ্ন করেন, কিভাবে আপনার প্রতি সালাত প্রেরণ করব, উত্তরে তিনি বলেন, তোমরা বল
اللهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَآلِ إِبْرَاهِيمَ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
হে আল্লাহ! আপনি উম্মী নবী মুহাম্মাদ এবং মুহাম্মাদের বংশের প্রতি রহমত নাজিল করুন, যেমন আপনি ইবরাহীম ও ইবরাহীমের বংশধরের প্রতি রহমত করেছেন। আর আপনি উম্মী নবী মুহাম্মাদের প্রতি বারাকাত দান করুন, যেমন আপনি ইবরাহীম ও ইবরাহীমের বংশধরের প্রতি বারাকাত দান করেছেন। নিশ্চয় আপনি মহা প্রশংসিত, সম্মানিত ( মুসনাদ আহমাদ ২৮/৩০৪, নং ১৭০৭২, সহীহ ইবন খুযাইমাহ ১/৩৫১, নং ৭১১, সহীহ ইবন হিব্বান ৫/২৮৯, নং ১৯৫৬, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ১/৪০১, নং ৯৮৮, কেউ কেউ হাদীসটিকে সহীহ আবার কেউ হাসান বলেছেন )।
রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠের নির্দেশ আসার পর তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে সাহাবীগণের আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ এসব হাদীসে ফুটে উঠেছে। তারা সালাত ও সালাম পাঠের সঠিক কথা ও পদ্ধতি কি হবে তা রাসূলুল্লাহকে (সা) প্রশ্ন করে জেনে নিয়েছেন এবং সে ভাবে ‘আমল করেছেন।
সালাত ও সালাম পাঠের ফযীলত, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠের নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা দিয়েছেন। তাছাড়াও তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠের অনেক ফযীলাতের কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। যেমন,
১- সালাত ও সালাম রাসূলের (সা) কাছে পৌঁছে, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করা হলে তা তার কাছে পৌছে এবং তিনি তার জবাব প্রদান করেন। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন
, مَا مِنْ أَحَدٍ يُسَلِّمُ عَلَيَّ إِلَّا رَدَّ اللَّهُ عَلَيَّ رُوحِي حَتَّى أَرُدَّ عَلَيْهِ السَّلَامَ
যে কোনো ব্যক্তিই আমার প্রতি সালাম পাঠায় আল্লাহ আমার রুহকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেন; যাতে আমি তার সালামের জবাব দিতে পারি (সুনান আবি দাউদ ২/২১৮, নং ২০৪১, মুসানাদ আহমাদ ১৬/৪৭৭, নং ১০৮১৫, আত্-তাবারানী, আল-মু’জামুল আওসাত ৩/২৬২, নং ৩০৯২। ইমাম নববী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, দেখুন, আল-আযকার, সম্পাদনা, ‘আব্দুল কাদির আরনাউত, বৈরুত, দারুল ফিকর, ১৪১৪ হি, পৃ. ১১৫, নং ৩৩৪, আল-মাজমূ’ শারহুল মুহায্যাব, দারুল ফিকর, ৮/২৭২, আলবানীসহ অন্যান্য গবেষক হাদীসটিকে হাসান বলেছেন )।
আবু হুরায়রা (রা) থেকে আর বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন
لَا تَتَّخِذُوا قَبْرِي عِيدًا، وَلَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قُبُورًا، وَحَيْثُمَا كُنتُمْ فَصَلُّوا عَلَيَّ، فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ تَبْلُغُنِي
তোমরা আমার কবরকে উৎসবস্থল বানাবে না এবং তোমাদের গৃহগুলোকে কবর করে রেখো না। আর তোমরা যেখানেই থাকো আমার প্রতি সালাত প্রেরণ কর; কেননা তোমাদের সালাত আমার কাছে পৌঁছে (মুসনাদ আহমাদ ১৪/৪০৩, নং ৮৮০৪, সুনান আবি দাউদ ২/২১৮, নং ২০৪২। ‘আলী ইবন আবি তালিব থেকে, মুসান্নাফ ইবন আবি শাইবাহ ২/১৫০, নং ৭৫৪২। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, কারো কারো মতে এর সানাদ হাসান )।
আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
إِنَّ لِلَّهِ فِي الْأَرْضِ مَلَائِكَةُ سَيَّاحِينَ، يُبَلِّغُونِي مِنْ أُمَّتِي السَّلَامَ
নিশ্চয় পৃথিবীতে আল্লাহর এক দল বিচরণশীল ফেরেশতা আছেন, যারা আমার কাছে আমার উম্মাতের পক্ষ থেকে সালাম পৌঁছে দেন (মুসনাদ আহমাদ ৬/১৮৩, নং ৩৬৬৬, সুনানুন নাসাঈ (আল-মুজতাবা) ৩/৪৩, নং ১২৮২। আলবানীসহ অন্য গবেষকগণ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন )।
২- রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত পাঠ করলে আল্লাহ তার প্রতিও আর বেশি সালাত পাঠায়, যে ব্যক্তি একবার রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাম পাঠ করে পরম করুণাময় আল্লাহ এর বিনিময়ে তার প্রতি দশবার শান্তি ও রহমত নাজিল করেন। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সা) বলেন
مَنْ صَلَّى عَلَيَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا
যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার সালাত প্রেরণ করে আল্লাহ তার উপর দশবার সালাত (রহমত) প্রেরণ করেন (সহীহ মুসলিম ১/৩০৬, নং ৪০৮, ১/২৮৮, নং ৩৮৪, সুনান আবি দাউদ ২/৮৮, নং ১৫৩০ )।
আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন
مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً وَاحِدَةً، صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ عَشْرَ صَلَوَاتٍ، وَحُطَّتْ عَنْهُ عَشْرُ خَطِيئَاتٍ، وَرُفِعَتْ لَهُ عَشْرُ دَرَجَاتٍ
যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার সালাত প্রেরণ করে আল্লাহ তার উপর দশবার সালাত (রহমত) প্রেরণ করেন। আর তার থেকে দশটি গুনাহ মিটিয়ে দেন এবং তার জন্য দশগুণ মর্যাদা সমুন্নত করেন (ইমাম আন-নাসাঈ, আস্-সুফনুল কুবরা ২/৭৭, নং ১২২১, সুনানুন নাসাঈ ৩/৫০, নং ১২৯৭, আল-বাইহাকী, শু’আবুল ঈমান ৩/১২৪, নং ১৫৫। ফিয়াউদ্দীন আল-মাকদিসী ও আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, দেখুন, আল-আজাদীসুল মুখতারাহ ৪/৩৯৭, নং ১৫৬৮ )।
৩- কিয়ামাতের দিন রাসূলের (সা) সান্নিধ্য লাভ, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি বেশি বেশি সালাত ও সালাম প্রেরণের বিনিময়ে সে ব্যক্তি কিয়ামাতের দিন তার অধিকতর নিকবর্তী অবস্থান করবে। ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ عَلَيَّ صَلَاةٌ
কিয়ামাতের দিন মানুষদের মধ্যে তারাই আমার অধিক নিকটবর্তী হবে, যারা আমার প্রতি অধিক সালাত পাঠকারী হবে (সুনানুত তিরমিযী ১/৬১২, নং ৪৮৪, সহীহ ইবন হিব্বান ৩/১৯২, নং ৯১১, মুসান্নাফ ইবন আবি শাইবাহ ৬/০২৫, নং ৩১৭৮৭, মুসনাদ আবু ইয়া’লা আল-মুসিলী ৮/৪২৭, নং ৫০ ১১, আল-বাইহাকী, শু’আবুল ঈমান ৩/১২৯, নং ১৪৬২। ইমাম ভিরসিফী হাদীসটিকে হাসান পারীব বলেছেন। আল-মুনফিরী বলেন, আল-বাইহাকী হাসান সানাদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, আত্-তারগীব ওয়াত তারহীব ৩/৩০৩, ইবন হাজারও সানাদটিতে কোন অসুবিধা নেই বলেছেন, ফাতহুল বারী ১১/১৬৭, আলবানী হাসান লিখাইরিউ বলেছেন )।
৪- জুম’আর দিনে সালাত পাঠের ফযীলত, কিয়ামাতের দিন ঐ ব্যক্তি অধিক ভাগ্যবান হবে, যে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সর্বদা সালাত ও সালাম প্রেরণ করে। কেননা তার প্রতি সালাত পাঠ করা তার নেকীর পাল্লা ভারি হওয়া এবং মর্যাদা বৃদ্ধি লাভ করা এবং গুনাহ মাফের কারণ। আওস ইবন আওস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা) বলেন,
إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، فَأَكْثِرُوا عَلَيَّ مِنَ الصَّلَاةِ فِيهِ، فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ مَعْرُوضَةٌ عَلَيَّ
তোমাদের শ্রেষ্ঠতম দিনগুলোর মধ্যে জুমু’আর দিন একটি। অতএব তোমরা সেদিনে আমার প্রতি বেশি বেশি সালাত পাঠ কর; কেননা তোমাদের সালাত পাঠ আমার কাছে পেশ করা হয় ( সুনান আবি দাউদ ২/৮৮, নং ১৫৩১, মুসনাদ আহমাদ ২৬/৮৪, নং ১৬১৬২, সুনান ইবন মাজাহ ১/৩৪৫, নং ১০৮৫, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ১/৪১৩, নং ১০২৯, সহীহ ইবন খুযাইমাহ ৩/১১৮, নং ১৭০০। আলবানীসহ অনেক গবেষক হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)।
৫- রাসূলের (সা) প্রতি সালাত পাঠের দরুণ দু’আ কবুল হয়, মহান করুণাময় আল্লাহর প্রশংসা, গুণাগুণ এবং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠের মাধ্যমে দু’আ করলে সে দু’আ কবুল হয়। ফাযালাহ ইবন ‘উবাইদ (রা) বলেন,
بَيْنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَاعِدٌ إِذْ دَخَلَ رَجُلٌ فَصَلَّى فَقَالَ: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: عَجِلْتَ أَيُّهَا الْمُصَلِّي، إِذَا صَلَّيْتَ فَفَعَدْتَ فَاحْمَدِ اللَّهَ بِمَا هُوَ أَهْلُهُ، وَصَلِّ عَلَيَّ ثُمَّ ادْعُهُ. قَالَ : ثُمَّ
صَلَّى رَجُلٌ آخَرُ بَعْدَ ذَلِكَ فَحَمِدَ اللَّهَ وَصَلَّى عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّهَا الْمُصَلِّي ادْعُ تُحَبِّ، وَفِي رِوايَةٍ : وَسَلْ تُعْطَ.
একদিন আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সা) বসা ছিলেন, তখন একজন ব্যক্তি প্রবেশ করে। তারপর সে সালাত আদায় করে অতঃপর বলে, اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي ‘হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুণ! এবং আমাকে দয়া করুণ!
তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, হে সালাত আদায়কারী ব্যক্তি! তুমি তাড়াহুড়ো করছো। যখন তুমি সালাত আদায় করবে, তারপর বসবে, তখন আল্লাহর যা তাঁর জন্য প্রযোজ্য তা দিয়ে প্রশংসা কর এবং আমার প্রতি সালাত পাঠ কর, তারপর দু’আ কর। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর আরেকজন লোক সালাত আদায় করল, অতঃপর আল্লাহর প্রশংসা করল এবং নবী (সা) এর প্রতি সালাত পাঠ করল। তখন নবী (সা) তাকে বললেন, হে সালাত আদায়কারী! দু’আ কর! তোমার দু’আ কবুল করা হবে। অন্য বর্ণনায় আছে, ‘তুমি চাও, তোমাকে দেওয়া হবে (সুনানুত তিরমিযী ৫/৩৯৩, নং ৩৪৭৬, সুনানুন নাসাঈ ৩/৪৪, নং ১২৮৪, সহীহ ইবন খুযাইমাহ ১/৩৫১, নং ৭০৯, আত্-তাবারানী, আল-মু’জামুল কাবীর ১৮/৩০৯, নং ৭৯৫। ইমাম তিরমিযী হাসান হাদীস বলেছেন, আলবানীসহ অনেকেই সহীহ বলেছেন )।
আবু হুরায়রা (রা) থেকে আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, নবী (সা) বলেন,
مَا جَلَسَ قَوْمٌ تَجْلِسًا لَمْ يَذْكُرُوا اللهَ فِيهِ، وَلَمْ يُصَلُّوا عَلَى نَبِيِّهِمْ، إِلَّا كَانَ عَلَيْهِمْ تِرَةً، فَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُمْ وَإِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُمْ.
একদল মানুষ যখন কোনো বৈঠকে বসে সেখানে আল্লাহর কথা আলোচনা করে না এবং তাদের নবীর প্রতি সালাত পাঠ করে না, তাদের প্রতি অবশ্যই ক্ষতি ও আক্ষেপ বর্ষিত হয়। আল্লাহ চাইলে তাদেরকে শাস্তি দেবেন আর তিনি চাইলে তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন ( সুনানুত তিরমিযী ৫/৩২৩, নং ৩৩৮০, মুসনাদ আহমাদ ১৫/৫২৪, নং ৯৮৪৩, আল-বাইহাকী, আস্-সুনানুল কুবরা ৩/২৯৭, নং ৫৭৭২। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। আলবানীসহ অন্য গবেষক সহীহ বলেছেন)।
তাহলে যেসব বৈঠকে আল্লাহর হামদ এবং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করা হয় না সে বৈঠক ও সমাবেশের লোকদের জন্য কিয়ামাতের দিন লজ্জা ও আক্ষেপের মুখোমুখী হবে। আল্লাহ তা’আলা ইচ্ছা করলে তাদেরকে শাস্তি দেবেন আবার ক্ষমাও করতে পারেন। তাহলে যেসব বৈঠক, সভা-সমাবেশ আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর দ্বীন এবং দ্বীনের ধারক-বাহকদের বিরুদ্ধে আলোচনা হয়, ষড়যন্ত্র হয়, তাদের সাথে আল্লাহ তা’আলার আচরণ কেমন হবে, তা সহজেই অনুমেয়।
৬- রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত প্রেরণ আল্লাহর রহমত ও শাফা’য়াত লাভের উপায়, পূর্বোল্লিখিত ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমরের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, মুআযয্যিনের আযানের জবাব দেওয়ার পর রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করে; কেননা রাসূলের (সা) প্রতি একবার সালাত পাঠ করলে তার বিনিময়ে আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত দান করেন, এবং তার জন্য উসীলাহর দু’আ করে, তার জন্য তার শাফা’য়াত বৈধ হয়ে যায় (সহীহ মুসলিম ১/২৮৮, নং ৩৮৪, সুনানুত তিরমিযী ৬/১৩, নং ৩৬১৪, সুনান আবি দাউদ ১/১৪৪, নং ৫২৩)।
আব্দুর রহমান ইবন ‘আওফ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (সা) এর কাছে এসে তাকে সাজদাহরত অবস্থায় পেলাম। তিনি অনেক লম্বা সাজদা করলেন। তার মৃত্যু হয়ে গেল কিনা এমন ভেবে আমি ভীত হয়ে তার নিকটে গিয়ে বসলাম। তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, কে? আমি বললাম, ‘আব্দুর রহমান। তিনি বললেন, তোমার কি হয়েছে? আমি তার লম্বা সিজদায় মৃত্যুর ভয় করেছি, তা বললাম। তখন তিনি বলেন
إِنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلامُ، أَتَانِي فَبَشَّرَنِي، فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَقُولُ: مَنْ صَلَّى عَلَيْكَ صَلَّيْتُ عَلَيْهِ، وَمَنْ سَلَّمَ عَلَيْكَ سَلَّمْتُ عَلَيْهِ، فَسَجَدْتُ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ شُكْرًا
আমার কাছে জিবরীল (আ) এসেছেন, অতঃপর আমাকে সুসংবাদ দিয়ে বললেন, মহাক্রান্ত মহিমান্বিত আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি আপনার প্রতি সালাত পাঠ করে আমি তার প্রতি সালাত পাঠাই আর যে ব্যক্তি আপনার প্রতি সালাম প্রেরণ করে আমি তার উপর সালাম প্রেরণ করি। তাই আমি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আল্লাহ ‘আয্যা ওয়া জাল্লার উদ্দেশ্যে সাজদাহ করেছি (মুসনাদ আহমাদ ৩/২০০, নং ১৬৬২, ৩/২০১, নং ১৬৬৪, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ১/৭৩৫, নং ২০১৯, আল-বাইহাকী, আস্ সুনানুল কুবরা ২/৫১৮, নং ৩৯৩৭। আল-হাকিম হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, যিয়া উদ্দীন আল-মাকদিসী এর সানাদ হাসান বলেছেন, আল-আহাদীসুল মুখতারাহ ৩/১২৬, নং ৯২৬, মুসনাদ আহমাদের সম্পাদ শাইখ শু’আইব আল-আরনাউত ও তার সঙ্গীগণ হাদীসটিকে হাসান লিগাইরিহী বলেছেন )।
৭- রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত পাঠের দরুণ দুঃখ-কষ্ট দূর হয় এবং গুনাহ মাফ হয়, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাত প্রেরণের ফলে ব্যক্তির দুঃশ্চিন্তা ও অস্থিরতা দূর হয়ে প্রশান্তি আসে এবং তার গুনাহ ও পাপ ক্ষমা করা হয়। ইতঃপূর্বে উবাই ইবন কা’আব (রা) বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি শেষ পর্যন্ত তার দু’আ ও যিকরের জন্য নির্ধারিত পূরো সময়টি রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করার সিদ্ধান্ত রাসূলকে (সা) জানিয়ে দেন। তিনি তখন বলেন,
قُلْتُ: أَجْعَلُ لَكَ صَلَاتِي كُلَّهَا قَالَ: إِذَا تُكْفَى هَمَّكَ، وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ
আমি বললাম, আমার পুরা সময়টি আপনার প্রতি সালাত প্রেরণের জন্য নির্ধারিত করলাম। তখন তিনি (নবী (সা)) বলেন, ‘তাহলে তোমার সমস্ত চিন্তা-ভাবনা দুর হওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে (সুনানুত তিরমিযী ৪/২১৮, নং ২৪৫৭, মুসনাদ আহমাদ ৩৫/১৬৬, নং ২১২৪২, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ২/৪৫৭, নং ৩৫৭৮। ইমাম তিরমিযী, আলবানী ও অন্য গবেষক হাদীসটিকে হাসান বলেছেন, ইমাম আয-যাহাবী সহীহ বলেছেন )।
রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠের ক্ষেত্রসমূহ, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠের অত্যাধিক গুরুত্ব, এর মর্যাদা ও ফযীলাতের প্রেক্ষিতে সর্বদাই তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করা উচিত। এতদসত্তেও নির্ধারিত অনেক স্থান ও ক্ষেত্র রয়েছে, যেসব স্থানে তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করা শারী’য়াহ কর্তৃক নির্ধারিত। উপর্যুক্ত বর্ণিত হাদীসগুলো এবং আরো বিভিন্ন হাদীসের দলীল-প্রমাণ দ্বারা এসব স্থান ও ক্ষেত্র সাব্যস্ত আছে। ইবনুল কাইয়্যেম ৪১টি স্থান ও প্রসঙ্গের কথা উল্লেখ করেছেন
( ইবনুল কাইয়্যেম, জালাউল আফগ্রাম, পৃ. ৩২৭-৪৪৩ )।
নিম্নে কতিপয় স্থানের কথা উল্লেখ করা হলো;
এক. সালাতের শেষ তাশাহহুদ বা বৈঠকে, সালাতের শেষ বৈঠকে সালাত (দরুদ) পাঠ করা বিষয়ে বিজ্ঞ ‘আলিমগণের সর্বসম্মত ঐকমত্য রয়েছে। যদিও পাঠ ফরয/ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। ইমাম শাফি’য়ীসহ আর কতিপয় বিজ্ঞ ‘আলিমের নিকট সালাতের প্রথম তাশাহ্হুদেও সালাত (দরুদ) পাঠ করা উত্তম।
দুই. জানাযা সালাতের দ্বিতীয় তাকবীরের পর, ইমাম মালিক ও আবু হানীফা মুস্তাহাব বলেছেন। ইমাম আশ্-শাফি’য়ী ও ইমাম আহমাদ এ স্থানে সালাত পাঠ করাকে ওয়াজিব বলেছেন।
তিন. সকল প্রকারের খুৎবাতে, যেমন, জুমু’আর খুৎবাহ, দু’ঈদ ও ইসতিস্কা সালাতের খুৎবাহসহ অন্যান্য খুৎবাহ দেবার সময় রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করা। ইমাম শাফি’য়ী ও আহমাদ ইবন হাম্বালের প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী রাসূলের (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ ছাড়া বুবাই শুদ্ধ নয়। ইমাম আবু হানীফা ও মালিকের মতে খুৎবা জায়িয হবে। রাসূলের (সা) প্রতি সালাত পাঠ শারী’য়া সম্মত হওয়ার প্রমাণ হলো, ‘আওন ইবন আবি জুহাইফাহ বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেন, আমার পিতা ‘আলী (রা) এর খিলাফাত কালে পুলিশে কর্মরত ছিলেন এবং তিনি মিম্বারের নীচেই দায়িত্ব পালন করতেন। তিনে আমাকে বলেছেন যে, ‘আলী যখন মিম্বারে উঠতেন তখন তিনি,
فَحَمِدَ اللهَ تَعَالَى وَأَثْنَى عَلَيْهِ، وَصَلَّى عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَقَالَ: خَيْرُ هَذِهِ الْأُمَّةِ بَعْدَ نَبِيْهَا أَبُو بَكْرٍ، وَالثَّانِي عُمَرُ، وَقَالَ: يَجْعَلُ اللَّهُ تَعَالَى الْخَيْرَ حَيْثُ أَحَبُّ
আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করেন এবং নবী (সা) এর প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করেন। আর বলেন, এই উম্মাতের সর্বোত্তম ব্যক্তি হলেন তার নবীর পরে, আবু বকর এবং দ্বিতীয় হলেন ‘উমার। তিনি আর বলেন, আল্লাহ তা’আলা যেখানে চান কল্যাণ নির্ধারণ করেন (মুসনাদ আহমাদ ২/২০২, নং ৮৩৭, আহমাদ ইবন হাফল, ফাযায়িলুস সাহাবাহ, সম্পাদনা, ড. ওয়াসীউল্লাহ ‘আব্বাস, বৈরুত-মুআস্-সাসাতুর রিসালাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪০৩ হি. ১/৩০৬, নং ৪১৩ )।
চার. আযানের জবাব দেবার পর, যেমন হাদীসে রয়েছে যে, আযানের জবাব দেবার পর সালাত পাঠ করে রাসূলের (সা) জন্য উসীলার দু’আ করলে তার জন্য সুপারিশ বৈধ হয়ে যায়।
পাঁচ. দু’আর সময়, এ স্থানে সালাত ও সালাম পাঠের তিনটি পর্যায় রয়েছে।
(১) আল্লাহর প্রশংসার পর দু’আ শুরু করার আগে সালাত পাঠ করা
(২) দু’আর শুরু, মাঝখানে এবং শেষে সালাত পাঠ করা এবং
(৩) দু’আর শুরু ও শেষে সালাত পাঠ করা (ইবনুল কাইয়্যেম, জালাউল আফহাম, পৃ. ৩৭৫ )।
আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
كُنتُ أُصَلِّي وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَأَبُو بَكْرٍ، وَعُمَرُ مَعَهُ، فَلَمَّا جَلَسْتُ بَدَأْتُ بِالثَّنَاءِ عَلَى اللهِ، ثُمَّ الصَّلَاةِ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثُمَّ دَعَوْتُ لِنَفْسِي، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: سَلْ تُعْطَهُ، سَلْ تُعْطَهُ
আমি সালাত আদায় করছিলাম আর নবী (সা) আর আবু বকর এবং ‘উমার তার সাথে ছিলেন। আমি বসার পর আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে শুরু করলাম, অতঃপর নবী (সা) এর সালাত ও সালাম পাঠ করলাম। তারপর নিজের জন্য দু’আ করলাম। তখন নবী (সা) বলেন, ‘তুমি চাও, তোমাকে দেওয়া হবে, তুমি চাও তোমাকে দেওয়া হবে (সুনানুত ভিরমিযী ১/৭৩২, নং ৫৯৩, আল-বাগাভী, শারহুস সুন্নাহ ৫/২০৫, নং ১৪০১। ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি সহীহ, আলবানীও সহীহ বলেছেন)।
ছয়. মাসজিদে প্রবেশ ও মাসজিদ থেকে বের হওয়ার সময়, এ প্রসঙ্গে ফাতিমা বিনতুন নবী (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন মাসজিদে প্রবেশ করতেন তখন বলতেন,
بِسْمِ اللَّهِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ، رَبِّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي، وَافْتَحْ لي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ
আল্লাহর নামে শুরু এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক রাসূলুল্লাহর (সা) উপর। হে আল্লাহ! আমার গুনাহগুলো ক্ষমা করুন এবং আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন’। আর বের হওয়ার সময়ও একইরূপ বলতেন,
بِسْمِ اللَّهِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ، رَبِّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي، وَافْتَحْ لي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ
আল্লাহর নামে শুরু এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক রাসূলুল্লাহর (সা) উপর। হে আল্লাহ! আমার গুনাহগুলো ক্ষমা করু এবং আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন ( সুনানুত তিরমিযী ১/৪১৪, নং ৩১৪, সুনান ইবন মাজাহ ১/২৫৩, নং ৭৭১, মুসনাদ আহমাদ ৪৪/১৩, নং ২৬৪১৬, মুসান্নাফ ইবন আবি শাইবাহ ১/২৯৮, নং ৩৪১২। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন, তবে মুত্তাসিল নয়। আলবানী সহীহ বলেছেন কেউ কেউ সহীহ লিগাইরিহী বলেছেন )।
আবু হুমাইদ আস্-সা’ইদী বা আবু উসাইদ আল-আনসারী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, যখন তোমাদের কেউ মাসজিদে প্রবেশ করে তখন সে যেন নবী (সা) এর প্রতি সালাম প্রেরণ করে তারপর বলে,
اللهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ
হে আল্লাহ! আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন। আর যখন বের হয়, তখন যেন বলে,
اللهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ
হে আল্লাহ! আমি তো আপনার অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি’ (সহীহ মুসলিম ১/৪৯৪, নং ৭১৩, সুনান আবি দাউদ ১/১২৬, নং ৪৬৫, সুনান ইবন মাজাহ ১/২৫৪, নং ৭৭২)।
সাত. সা’ঈ শুরুর পূর্বে সাফা ও মারওয়াতে, হাজ্জ ও ‘উমরার সা’ঈ শুরুর পূর্বে সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের উপর আরোহণ করার পর সালাত ও সালাম পাঠ করে লম্বা দু’আ করা। ইবনুল কাইয়্যেম নাফি’ থেকে বর্ণিত ইবন ‘উমার (রা) এর আমল সম্পর্কিত হাদীস থেকে এর প্রমাণ পেশ করেছেন। তিনি সাফাতে উঠে তিনবার তাকবীর বলার পর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু’ পাঠ করতেন। তারপর সালাত ও সালাম পাঠ করে লম্বা দু’আ করতেন। মারওয়াতেও অনুরূপ করতেন (আল-কাযী আবু ইসহাক ইসমা’ঈল আল-জাহমাযী, ফাযলুস সালাত ‘আলান নবী, সম্পাদনা, শাইখ আলবানী, বৈরুত, আল-মাকতাবুল ইসলামী, ৩য় সংস্করণ, ১৩৯৭হি, পৃ. ৭৬, নং ৮৭। দেখুন, জালাউল আফহাম, পৃ. ৩৭৯ )।
আট. রাসূলুল্লাহর (সা) নাম ও তার সম্পর্কে আলোচনার সময়, রাসূলুল্লাহর (সা) নাম এবং তার সম্পর্কে আলোচনার সময় তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করা আরো একটি উল্লেখযোগ্য স্থান। যখন যেখানেই তার নাম উচ্চারিত হবে এবং তার জীবন ও সীরাত নিয়ে আলোচনা হবে, তখনই তার প্রতি সালাত পাঠ করা শরী’য়াতের নির্দেশনা। ইতঃপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে যে, রাসূলের (সা) নাম শুনে বা তার কথা যেখানেই উচ্চারণ হোক না কেন, যদি তার প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করা না হয়, তাহলে বিভিন্ন সহীহ হাদীসে তাদের প্রতি লা’নত, আল্লাহ তা’আলার রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং অপমানিত হওয়ার হুঁসিয়ারি দেওয়া হয়েছে ও এ বিষয়ে উম্মাতকে সাবধান করা হয়েছে।
নয়. দিনের শুরুতে ও দিনের শেষে সালাত পাঠ করা, আবু দারদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
مَنْ صَلَّى عَلَيَّ حِينَ يُصْبِحُ عَشْرًا وَحِينَ يُمْسِي عَشْرًا أَدْرَكَتْهُ شَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ
যে ব্যক্তি সকালে দশবার এবং সন্ধ্যায় দশবার আমার উপর সালাত পাঠ করবে, কিয়ামাতের দিন আমার সুপারিশ তাকে পাবে (ইবন কাসীর, জামি’উল আসানীদ ওয়াস্- সুনান, সম্পাদনা, ড. ‘আব্দুল মালিক আদ্-দুহাইশ, বৈরুত, দার খিষর, ২য় সংস্করণ, ১৪১৯ হি, ৯/২৯৬, নং ১১৮৮৫, মাজমা’উম্-যাওয়ায়িদ ১০/১২০, নং ১৭০২২। আল-হাইসুমী বলেন, ইমাম আত্-তাবারানী দু’টি সানাদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে একটির সানাদ ভাল, এর সকল রাবী নির্ভরযোগ্য। সকলেই হাদীসটি আত্-তাবারানীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন )।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম উপর্যুক্ত হাদীস দ্বারা এ বিষয়টি প্রমাণ করেছেন (জালাউল আফহাম, পৃ. ৪১৮ )।
দশ. রাসূলুল্লাহর (সা) কবরের পাশে দাঁড়িয়ে, মাসজিদে নববীতে গেলে তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তার প্রতি সালাত ও সালাম দেওয়া। ‘আব্দুল্লাহ ইবন দ্বীনার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি
رَأَيْتُ عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ يَقِفُ عَلَى قَبْرِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَيُصَلِّي عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ويدعو لأَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا
আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) কে নবী (সা) এর কবরের পাশে দাঁড়াতে দেখেছি। তখন তিনি নবী (সা) এর প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করেন। অতঃপর আবু বকর ও ‘উমার (রা) এর জন্য দু’আ করতেন ( ইমাম মালিক, মুআত্তা মালিক, সম্পাদনা, বাশশার ‘আউওয়াদ মা’রূফ ও তার সঙ্গী, মুআস্-সাসাতুর রিসালাহ, প্রকাশকাল, ১৪১২ হি, ১/১৯৬, নং ৫০৬, আল- বাইহাকী, আস সুনানুল কুবরা ৫/৪০৩, নং ১০২৭২)।
নাফি’ থেকে বর্ণিত আছে যে, ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার রাদি আল্লাহু আনহুম যখন সফর থেকে ফিরে আসতেন, তিনি নবী (সা) এর কবর দিয়ে শুরু করতেন। তিনি তার প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করতেন, তবে কবর স্পর্শ করতেন না। অতঃপর আবু বকর (রা) কে সালাম দিতেন। তারপর বলতেন, হে পিতা! আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক! ((আল-বাইহাকী, শু’আবুল ঈমান ৬/৪৫, নং ৩৮৫৪। অনুরূপ একটি দুআত্তা মালিক (মুহাম্মদ ইবনুল হাসান এর রিওয়ারাত), সম্পাদনা, ‘আব্দুল ওয়াহ্হাব, প্রকাশক, আল-মাকতাবাতুল ‘ইলমিয়্যাহ, ২য় সংস্করণ, ১/৩০৪, নং ১৪৮ )।
এগার, দা’ওয়াতের কাজে, বাজার-ঘাটে বের হওয়ার সময়, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণের আরেকটি স্থান হচ্ছে দা’ওয়াতের কাজ, বাজারে এবং অন্য কোনো প্রয়োজনে বের হওয়ার সময়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম এর প্রমাণ স্বরূপ নিম্নোক্ত আসার পেশ করেন (জালাউল আফহ্যম, পৃ. ৪০০ ) ।
আবু ওয়ায়েল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) কে খাবারে, জানাযাতে এবং অন্যান্য কাজের জন্য বসে, আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তণ এবং নবী (সা) এর প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করা ছাড়া উঠতে দেখিনি। আর তিনি অনেক দু’আ করতেন। একইভাবে যখন বাজারে যাওয়ার জন্য বের হতেন, তখন বাজারের আড়াল জায়গাতে আসতেন এবং সেখানে বসে আল্লাহর হামদ পড়তেন আর নবী (সা) এর প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করতেন এবং অনেক দু’আ করতেন (তাকী উদ্দীন আল-মাকরিযী, ইমতা’উল আসমা’, সম্পাদনা, মুহাম্মদ আন-নুমাইসী, বৈরুত, দারুল কুণ্ডুবিল “ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪২০ হি, পৃ. ১১/১০২ )।
বার, রাতের ঘুম থেকে উঠার পর, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠের আরেকটি স্থান হচ্ছে, মধ্য রাতে ঘুম থেকে উঠে ওষু করে আল্লাহর নামে হামদ ও সানা পেশের পরে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করা। আবু ‘উবাইদা থেকে বর্ণিত, তিনি তখন ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) এর কাছে ছিলেন, তিনি বলেন, আল্লাহ ‘আয্যা ওয়া জাল্লা এমন দুই ব্যক্তিকে দেখে হাসেন, যার একজন হচ্ছে, যার বন্ধুদের উৎকৃষ্ট ঘোড়ার মধ্য থেকে একটি ঘোড়ার উপর আরোহণ করে দুশমনের মোকাবেলা করে। দুশমনেরা পরাজয় বরণ আর সে সুদৃঢ় থাকে। সে যদি নিহত হয় তাহলে তো শহীদ হয়ে যায় আর যদি বেঁচে যায়, তাহলে এই ব্যক্তির সামনে আল্লাহ হাসেন। আর দ্বিতীয়জন হলো,
وَرَجُلٍ قَامَ فِي جَوْفِ اللَّيْلِ لَا يَعْلَمُ بِهِ أَحَدٌ، فَتَوَضَّأَ فَأَسْبَغَ الْوُضُوءَ، ثُمَّ حَمِدَ الله وَتَجَدَهُ، وَصَلَّى عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَاسْتَفْتَحَ الْقُرْآنَ، فَذَلِكَ الَّذِي يَضْحَكُ اللهُ إِلَيْهِ يَقُولُ: انْظُرُوا إِلَى عَبْدِي قَائِمًا لَا يَرَاهُ أَحَدٌ غَيْرِي
ঐ ব্যক্তি, যে মধ্য রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে, তার এ বিষয়টি (জেগে উঠা) কেউ জানে না। অতঃপর সে ওযু করে এবং পরিপূর্ণ ওষু করে। তারপর আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর মহত্ব-বড়ত্ব বর্ণনা করে এবং আল্লাহর নবীর প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করে ও কুরআন পাঠ শুরু করে। এই ব্যক্তির সামনেও আল্লাহ হাসি দেন আর বলেন, তোমরা সালাতরত অবস্থায় দাঁড়ানো আমার বান্দাকে দেখ, তাকে আমি ছাড়া আর কেউ দেখে না (আন্ নাসাঈ, আস্-সুনানুল কুবরা ৯/৩২০, নং ১০৬৩৭, আন্-নাসাঈ, ‘আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলাহ, সম্পাদনা, ড. ফারুক হামাদাহ, বৈরুত, মুআস্-সাসাকুর রিসালাহ, ২য় সংস্করণ, ১৪০৬ হি. পৃ. ৪৯৬, ইবনুস সুন্নী, আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ আব্দু-দিনাওরী, সম্পাদনা, কাওসার আল-বারুনী, জেদ্দা, দারুল কিবলাহ, পৃ. ৬৮৮)।
তের. কুরআন তিলাওয়াতের সময়, রাসূলুল্লাহ (সা) সংশ্লিষ্ট আয়াত পাঠের সময় ব্যক্তি সালাতের বাইরে থাকুক বা নফল সালাতের মধ্যে থাকুক কিরাআত থামিয়ে নবী (সা) এর উপরে সালাত ও সালাম পাঠ করবে। ইসমা’ঈল ইবন ইসহাক থেকে বর্ণিত আছে যে, আল-হাসান বলেন, কোনো ব্যক্তি যখন তিলাওয়াতের সময় নবী (সা) এর উপরে সালাতের স্থান অতিক্রম করবে তখন সে অবশ্যই থামবে এবং নফল সালাতে তার প্রতি সালাত পাঠ করবে। ইমাম আহমাদ স্পষ্টভাবেই বলেছেন যে, মুসল্লী যখন এমন আয়াত পাঠ করবে, যাতে নবী (সা) এর কথা উল্লেখ আছে, তখন সে নফল সালাতে থাকলে তার প্রতি সালাত পাঠ করবে, তার উপর সালাত ও সালাম পাঠ করবে (জালাউল আফহাম, পৃ. ৪৩৭)।
চৌদ্দ, দু’আয়ে কুনুত পাঠ করার পর, দু’আয়ে কুনূতের পর রাসূলল্লাহর প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করা। ইমাম আশ্-শাফি’য়ী এবং তাকে যারা সমর্থন করেন সেসব আলিমের নিকট দু’আয়ে কুনূতের পর রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করা উত্তম। এজন্য তারা আল-হাসান ইবন ‘আলী (রা) বর্ণিত হাদীসটিকে দলীল হিসেবে পেশ করেন (ইমাম আন্-নববী, আল-মাজম্’ শারহুল মুহায্যাব ৩/৪৯৩, ইবনুল কাইয়্যেম, জালাউন আফহাম ১/০৬১)।
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বিতরের সালাতে পড়ার জন্য এই দু’আটি শেখান,
اللهمَّ اهْدِنِي فِيمَنْ هَدَيْتَ، وَبَارِكْ لِي فِيمَا أَعْطَيْتَ، وَتَوَلَّنِي فِيمَنْ تَوَلَّيْتَ، وَقِنِي شَرَّ مَا قَضَيْتَ، فَإِنَّكَ تَقْضِي وَلَا يُقْضَى عَلَيْكَ، وَإِنَّهُ لَا يَذِلُّ مَنْ وَالَيْتَ، تَبَارَكْتَ رَبَّنَا وَتَعَالَيْتَ، وَصَلَّى اللهُ عَلَى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ
হে আল্লাহ! আপনি যাদেরকে হেদায়াত দিয়েছেন আমাকেও তাদের মধ্যে হেদায়াত দিন! আপনি আমাকে যা দিয়েছেন, তাতে বারকাত দান করুন!
আপনি যাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে আমারও অভিভাবকত্ব গ্রহণ করুন! আপনি যে অনিষ্টের ফায়সালা করেছেন তা থেকে আমাকে রক্ষা করুন! কেননা আপনিই তো ফায়সালাকারী। আপনার উপর ফায়সালা করার সাধ্য কারো নেই। আপনি যার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছেন, সে তো অপমানিত হবে না। হে আমাদের রব। আপনি বারকাতময় সুমহান এবং নবী মুহাম্মাদের উপর আল্লাহ শাস্তি বর্ষণ করুন (আন-নাসাঈ, আস্-সুনানুল কুবরা ২/১৭২, নং ১৪৪৭, সুনানুন-নাসাঈ ৩/২৪৮, নং ১৭৪৬। ইমাম আন্-নাসাঈ ‘নবীর প্রতি সালাত পাঠ’ অংশটি অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন। আলবানী যা’য়ীফ বলেছেন, তবে ইমাম নববী এর সানাদকে সহীহ বা হাসান বলেছেন, আল-মাজমূ’ শারহুল মুহাযযাব ৩/৪৯৯। অন্যান্য গবেষকগণও হাসান বলেছেন, ইবন হাজার, আত-তালম্বীস ১/৬০৫, আল-হাসান ইবন আহমাদ আস্-সান’আনী, ফাতহুল গিফারিল জামি’ লিআহকামিস সুন্নাহ, ১/৪৬২ )।
ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, বিশেষ করে রমযান মাসের কুনূতের পর সালাত ও সালাম পাঠ করা উত্তম। এর সমর্থনে তিনি ‘আব্দুর রহমান ইবন ‘আব্দিল কারী বর্ণিত ‘উমার ইবনুল খাত্তাব কর্তৃক সালাতুত তারাবীহ এক ইমামের পেছনে পড়ার প্রচলন করার হাদীসটিকে উল্লেখ করেন। সেখানে কুনূতে কাফিরদের বিরুদ্ধে দু’আর পর বলতেন,
ثُمَّ يُصَلِّي عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ يَدْعُو لِلْمُسْلِمِينَ مَا اسْتَطَاعَ مِنْ خَيْرٍ ثُمَّ يَسْتَغْفِرُ الْمُؤْمِنِينَ
তারপর নবী (সা) এর প্রতি সালাত ও সালাম পড়তেন। তারপর মুসলিমদের জন্য সাধ্যমত কল্যাণের দু’আ করতেন। অতঃপর মু’মিনদের জন্য মাগফিরাত কামনা করতেন (জাহাউল আফহাম, পৃ. ৩৬২ )।
পনের, জুমু’আর দিন ও রাতে, যেমন উপর্যুক্ত ‘আব্দুর রহমান ইবন ‘আওফ বর্ণিত হাদীসসহ অন্যান্য হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম এ প্রসঙ্গে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) হলেন সকল সৃষ্টির নেতা আর জুমু’আর দিন হলো দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাই এ দিনে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করার বিশেষত্ব একটি ব্যতিক্রম ধরনের বিশেষত্ব, এর সাথে অন্য কোনো বৈশিষ্টের তুলনাই চলে না। সর্বোপরি বৈশিষ্ট ও সর্বোচ্চ বিবেচনার বিষয় যে, উম্মাতে মুহাম্মাদী যত কল্যাণ লাভ করেছে তার সবই তার হাত ধরেই করেছে। তার কারণেই আল্লাহ তার উম্মাতের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় কল্যাণকে একত্রিত করেছেন। তাদের বড় বড় প্রাপ্তি ও সম্মানের বস্তুগুলো এই জুমু’আর দিনেই অর্জিত হয়। এ দিনেই তাদেরকে জান্নাতের মধ্যে মনোমুগ্ধকর বালাখানা ও বিলাসবহুল অট্টালিকা দান করা হবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করার পর এ দিনটিই তাদের জন্য বাড়তি দিন, যে দিন হবে আর আনন্দের, আর খুশীর। দুনিয়ার জীবনেও তো জুমু’আর দিন তাদের জন্য খুশীর দিন। এ দিনেই আল্লাহ তাদের সকল আবেদন ও প্রয়োজন পূরণ করেন। এ দিনে কোনো প্রার্থীকেই তিনি ফিরিয়ে দেন না। উম্মাত এসব নি’য়ামাতের কথা আল্লাহর রাসূলের (সা) কাছ থেকেই জেনেছে, এবং তার কারণেই ও তার হাতেই তাদের জন্য এগুলো অর্জিত হয়েছে।
সুতরাং তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং সামান্য হলেও তার অধিকার ও হক থেকে কিছু আদায় করতে চাইলে এই জুমু’আর দিনে তার প্রতি বেশি বেশি সালাত ও সালাম পাঠ করা উচিত ( ইবনুল কাইয়্যেম, যাদুল মা’আদ, বৈরুত, মুআস্-সাসাতুর রিসালাহ, ২৭তম সংস্করণ, ১৪১৫ হি, ১/৩৬৪)।
ষোল, ‘ঈদের সালাতের সময়, ‘ঈদের সালাতের সময় সালাত ও সালাম পাঠ করা আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্থান। ‘আলকামাহ থেকে বর্ণিত যে, আল-ওয়ালীদ ইবন ‘উকবাহ ‘ঈদের সালাতের একদিন আগে ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ, আবু মূসা এবং হুযাইফা (রা) এর কাছে আসলেন এবং তাদেরকে বললেন, ‘ঈদের দিন তো ঘনিয়ে এল, তাতে কিভাবে তাকবীর পড়া হবে? তখন ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ বলেন,
تَبْدَأُ فَتُكَبِّرُ تَكْبِيرَةً تَفْتَتِحُ بِمَا الصَّلَاةَ، وَتَحْمَدُ رَبَّكَ، وَتُصَلِّي عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ, ثُمَّ تَدْعُو وَتُكَبِّرُ، وَتَفْعَلُ مِثْلَ ذَلِكَ
তুমি তাকবীরের মাধ্যমে সালাত শুরু করবে এবং তোমার রবের হামদ ও সানা পাঠ করবে। আর নবী (সা) এর প্রতি সালাত পাঠ করবে। তারপর দু’আ করবে এবং তাকবীর বলবে আর এ রকমই তুমি করবে…।
তখন হুযাইফাহ ও আবু মূসা বলেন, আবু ‘আব্দুর রহমান সত্য বলেছেন’ (আল্-বাইহাকী, আস্-সুনানুল কুবরা ৩/৪১০, নং ৬১৮৬, তাফসীর ইবন কাসীর ৬/৪৭১, জালাউল আফহাম, পৃ. ৪৪২, ইবনুল কাইয়্যেম বলেন হাদীসটির সানাদ সহীহ আর ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, সানাদ সহীহ)।
সতের, বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট এবং মাগফিরাত কামনার সময়, বিপদ-মুসীবত, দুঃশ্চিন্তা এবং মহান আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করার সময় সালাত ও সালাম পাঠ করার আরেকটি ক্ষেত্র। আমরা ইতঃপূর্বে উল্লিখিত উবাই ইবন কা’আব (রা) বর্ণিত হাদীসে দেখেছি যে, তিনি যখন নবী (সা) কে বলেন, أَجْعَلُ لَكَ صَلَاتِي كُلَّهَا ‘আমি আমার পুরা সময়টি আপনার প্রতি সালাত প্রেরণের জন্য নির্ধারিত করলাম’, অর্থাৎ হে আল্লাহর রাসূল! আমার দু’আর জন্য নির্দিষ্ট পুরো সময়টি আপনার প্রতি সালাত পাঠের জন্য নির্দিষ্ট করব। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ،إِذَا تُكْفَى هَمَّكَ وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ ‘তাহলে তা তোমার সমস্ত চিন্তা-ভাবনা দুর হওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে’ ( সুনানুত তিরমিযী ৪/২১৮, নং ২৪৫৭, মুসনাদ আহমাদ ৩৫/১৬৬, নং ২১২৪২, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ২/৪৫৭, নং ৩৫৭৮। ইমাম তিরমিযী, আলবানী ও অন্য গবেষক হাদীসটিকে হাসান বলেছেন, ইমাম আয-যাহাবী সহীহ বলেছেন )।
আঠার, গুনাহ মাফের জন্য সালাত পাঠ করা, যেসব স্থানে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করতে হয়, তন্মধ্যে বান্দা যখন কোনো গুনাহে জড়িয়ে যায় তার কাফ্ফারার জন্য সালাত পাঠ করা। আনাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
صَلُّوا عَلَيَّ فَإِنَّ الصَّلَاةَ عَلَيَّ كَفَّارَةً لَكُمْ
তোমরা আমার প্রতি সালাত পাঠ কর; কেননা আমার প্রতি সালাত পাঠ তোমাদের জন্য কাফ্ফারা স্বরূপ (আশ-শাজারী, ইয়াহইয়া ইবনুল হুসাইন আল-জুরজানী, তারতীবুল আমালী, সম্পাদনা-মুহাম্মাদ হাসান ইসমা’ঈল, বৈরুত, দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪২২ হি. ১/১৬২, নং ৬০৪, আর দেখুন, জালাউল আফহাম, পৃ. ৪১৯)।
অর্থাৎ সালাত ও সালাম পাঠ করে আল্লাহ তা’আর কাছে গুনাহ মাফের প্রার্থনা করবে ও কবুলের আশা করবে। উপর্যুক্ত ক্ষেত্রগুলো ছাড়াও ইসলামী বিশেষজ্ঞগণ আরও অনেক স্থান ও
ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করেছেন, সেসব স্থানেও নবী (সা) এর প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করা বাঞ্ছনীয়। তন্মধ্যে আরও রয়েছে, হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করার সময়, কুরআন খতম করার পর, কোনো বৈঠক থেকে উঠার সময়, দা’ওয়াত দান ও ‘ইলম প্রচারের সময়, কোনো ব্যক্তি কর্তৃক কোনো মহিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সময় এবং যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সময় ইত্যাদি ( দেখুন, জালাউল আফহাম, পৃ. ৩২৭-৪৪৪ পর্যন্ত )।
আমরা সালাত ও সালাম পাঠের উপর্যুক্ত স্থান সমূহের সমর্থনে বিভিন্ন হাদীস, আসার দ্বারা প্রমাণ করার চেষ্টা করিছি।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেমসহ অন্যান্য ‘আলিম সালাত ও সালাম পাঠের এ সব স্থান নির্ধারিত করার সমর্থনে হাদীস, আসার এবং বিভিন্ন যুগে বিতর্ক ও প্রশ্ন ছাড়াই প্রচলিত ‘আমল কিংবা যিকর- আযকার করা উত্তম এর পক্ষে যেসব সাধারণ দলীল-প্রমাণ রয়েছে সেসব প্রমাণাদির উপর নির্ভর করেছেন। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ অন্যতম যিকর। এ সম্পর্কে অনেক হাদীস কিংবা সাহাবায়ে কিরাম এবং তাবি’য়ীগণের অনেক আসার বর্ণিত আছে, যেগুলো প্রামাণিক দলীল হিসেবে প্রযোজ্য। বিশেষ করে
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেমের মতো বিচক্ষণ সহীহ দলীল ভিত্তিক বিধান সাব্যস্তকারী ব্যক্তির ন্যায় মহান ব্যক্তিত্ব সালাত ও সালাম পাঠের জন্য এ স্থানসমূহকে সাব্যস্ত করেছেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি মুসলিমদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে দুঃখ-কষ্ট ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ এবং প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে, সব সময়ই তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করা। এমনটা হওয়া আদৌ উচিত নয় যে, বিপদের সময় তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করবে আর ভালো অবস্থায় তা পরিত্যাগ করবে। মুসলিমদেরকে সকল সময় ভালোভাবে মনে রাখতে হবে যে, রাসূলুল্লাহর (সা) হক ও অধিকারের ক্ষেত্রে তারা সব সময়ই ত্রুটিপূর্ণ থাকবে। তারা তার হক পুরোপুরি কখনো আদায় করতে সক্ষম হবে না। যদিও তারা সারা জীবন তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করে, তবুও তার হক পরিপূর্ণভাবে আদায় হবে না। কেননা করুণাময় মহান আল্লাহ সুবহানাহু তাকে মানব জাতির হেদায়াত, কল্যাণ ও জান্নাত লাভ এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের কারণ বানিয়ে দিয়েছেন। এই বিশাল নি’য়ামাতের কৃতজ্ঞতা তো প্রথমেই আল্লাহ তা’আলার প্রাপ্য অতঃপর তার রাসূল (সা) এর।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ : তৃতীয় নিদর্শন
রাসূলুল্লাহর (সা) নিরংঙ্কুশ আনুগত্য ও পরিপূর্ণ অনুসরণ করা
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন; উভয় জীবনের সার্বিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। মানবতার দায়িত্ব হচ্ছে, নবী-রাসূলগণের আনুগত্য করা ও তাদের আদেশ- নিষেধ মান্য করা এবং তাদেরকে পরিপূর্ণরূপে অনুসরণ করা। মহান আল্লাহ বলেন,
{وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ }
‘আল্লাহর অনুমতিক্রমে কেবলমাত্র আনুগত্য করার জন্যই আমরা রাসূলদের প্রেরণ করেছি’, [সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬৪]। পৃথিবীতে আসা নবী ও রাসূলগণের সর্বশেষ রাসূল হলেন, মুহাম্মাদ ইবন ‘আব্দুল্লাহ (সা), যিনি কিয়ামাত পর্যন্ত পৃথিবীর সকল মানুষের রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তার পরে আর কোনো নবী ও রাসূলের (সা) আগমন হবে না। তাই তার নিরংঙ্কুশ আনুগত্য করা এবং তার পরিপূর্ণ অনুসরণ করা অপরিহার্য। আল-কুরআনের অসংখ্য আয়াতে তার আনুগত্যের নির্দেশটি মহিমান্বিত আল্লাহর আনুগত্যের নির্দেশের সাথে মিলিয়ে এসেছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَوَلَّوْا عَنْهُ وَأَنْتُمْ تَسْمَعُونَ }
“হে তোমরা যারা ঈমান এনেছো! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) আনুগত্য কর এবং তোমরা যখন তার কথা কোনো তখন তা হলে মুখ ফিরিয়ে নিও না।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত ২০, আল-‘ইমরান, আয়াত: ৩২, ১৩২, সূরা আন-নিসা, আয়াত ৫৯, সূরা আন্-নূর, আয়াত: ৫৪]।
করুণাময় আল্লাহ সুবহানাহু আর বলেন,
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا }
“কোনো ব্যক্তি রাসূলের (সা) আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল, আর কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে আপনাকে তো আমরা তাদের উপর তত্ত্ববধায়ক করে পাঠাইনি।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮০]।
রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ }
“আপনি বলুন! তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহগুলো ক্ষাম করবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।” [সূরা আল-‘ইমরান, আয়াত: ৩১]। আল্লাহ জাল্লা ওয়া ‘আলা বলেন,
{وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا }
“রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাক।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৭]।
আনুগত্যের মাত্রা কেমন হবে সে সম্পর্কেও আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলের (সা) নির্দেশনা রয়েছে। আবু সা’ঈদ ইবনুল মু’আল্লা বলেন, আমি মাসজিদে সালাত আদায় করছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে ডাকলেন, আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম না। অতঃপর আমি বললাম,
يَا رَسُولَ اللَّهِ ، إِنِّي كُنْتُ أُصَلِّي، فَقَالَ : أَلَمْ يَقُلِ اللَّهُ: { يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ}
হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো সালাত আদায় করছিলাম। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ কি বলেননি, “হে মু’মিনগণ! রাসূল যখন তোমাদেরকে এমন কিছুর দিকে ডাকে যা তোমাদেরকে প্রাণবন্ত করে, তখন তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) ডাকে সাড়া দেবে।”[সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ২৪/২৫৪। (সহীহুল বুখারী ৬/১৭, নং ৪৪৭৪, সুনান আবি দাউদ ২/৭১, নং ১৪৫৮)।
আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বিদায়ী হাজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ (সা) নির্দেশ দিলেন, যেসব হাজীদের সাথে হাদী (পশু) নেই তারা যেন ইহরাম থেকে মুক্ত হয়ে যায় এবং তাদের হাজ্জকে ‘উমরাতে রূপান্তরিত করে। তখন কেউ কেউ তা পালন করতে গড়িমসি করছিলেন। ‘আয়েশা (রা) বলেন,
فَدَخَلَ عَلَيَّ وَهُوَ غَضَبَانُ فَقُلْتُ: مَنْ أَغْضَبَكَ، يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ أَدْخَلَهُ اللَّهُ النَّارَ، قَالَ: أَوَمَا شَعَرْتِ أَنِّي أَمَرْتُ النَّاسَ بِأَمْرِ، فَإِذَا هُمْ يَتَرَدَّدُونَ ؟
তখন তিনি আমার কাছে রাগান্বিত অবস্থায় প্রবেশ করলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে কে রাগান্বিত করলো? আল্লাহ যেন তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করান। তিনি বললেন, তুমি কি বুঝতে পারনি যে, আমি লোকদেরকে একটি নির্দেশ দিয়েছি। অথচ তারা (তা পরিপালনে) দ্বিধা-সংকোচ করছে? (সহীহ মুসলিম ২/৮৭৯, নং ১২১১)।
এসব সাহাবী শুধুমাত্র দ্বিধা করছিলেন, তাতেই রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হলেন; কেননা তিনি এ আশঙ্কা করেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) নাফরমানীর কারণে তাদের উপর আল্লাহর শান্তি নেমে আসে কিনা।
রাসূলুল্লাহর (সা) আনুগত্য ও অনুসরণ করলে তার প্রতিদান কি তাও কুরআন কারীম ও সুন্নাতে রাসূলে স্পষ্টভাবেই বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصَّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقًا
“আর কেউ আল্লাহ এবং রাসূলের (সা) আনুগত্য করলে সে নবী, সিদ্দীক (সত্যনিষ্ঠ), শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন-তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৯]। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
كل أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبَى، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَمَنْ يَأْتِي؟ قَالَ: مَنْ أَطَاعَنِي دَخلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى
আমার সকল উম্মাত জান্নাতে প্রবেশ করবে, শুধুমাত্র যে অস্বীকার করে। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আর কে অস্বীকার করে? তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল সে জান্নাতে প্রবেশ করল আর যে আমার অবাধ্য হল সে অবশ্যই অস্বীকার করল (সহীহুল বুখারী ৯/৯২, নং ৭২৮০, মুসনাদ আহমাদ ১৪/৩৪২-৩৪৩, নং ৮৭২৮ )।
সুতরাং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার দাবী হল তার নিরঙ্কুশ আনুগত্য করা এবং তার পরিপূর্ণ অনুসরণ ও অনুকরণ করা। মানব সমাজেও এ কথাটি খুবই সাধারণ রীতি হিসেবে প্রচলিত যে, যে যাকে ভালোবাসে সে তাকে অনুসরণ করতেও ভালোবাসে। তার সবকিছু তার কাছে ভালো লাগে। তাই মানুষ তারপ্রিয় ব্যক্তিত্বের অনুসরণ করে। জনৈক কবি বলেছেন
تَعْصِي الإِلهَ وَأَنتَ تَزْعُمُ حُبَّهُ فَإِنَّ ذَاكَ فِي القِيَاسِ بَدِيعُ إِنْ كَانَ حُبُّكَ صَادِقاً لأَطَعْتَهُ فَإِنَّ الْمُحِبَّ لِمَنْ يُحِبُّ مُطِيْعُ
তুমি মা’বুদের অবাধ্য হয়ে, আবার দাবী কর তার ভালোবাসার, বিবেকের আদালতে তা সত্যই বড় তামাশা! সত্যি হলে তোমার ভালোবাসা, অবশ্যই হবে তুমি অনুগত তার, কেননা প্রিয়জনের অনুগত হওয়াই প্রেমিকের সাধ ( আবু ‘উসমান আল-জাহিয কবি যুর রুম্মাহর দিকে সম্বোধিত করেছেন, দেখুন, আল-মাহাসিন ওয়াল আবদাদ, বৈরুত, দারুল হিলাল, প্রকাশকাল, ১৪২৩হি, পৃ. ১৬৮, আল মুবাররিদ মাহমূদ আল ওয়াররাকের দিকে সম্বোধিত করেছেন, দেখুন, মুহাম্মাদ ইবন ইয়াযীদ আল-মুবাররিদ, আল-কামিল ফীল লুগাহ ওয়াল আদব, সম্পাদনা, মুহাম্মাদ আবু ফাযল, কায়রো, দারুল ফিকরিল ‘আরাবী, ২য় সংস্করণ, ১৪১৭হি, ২/৪, কেউ কেউ ইমাম শাফি’য়ী, কেউ ইবনুল মুবারাকের দিকে সম্বোধিত করেন, দেখুন, মুহাম্মাদ ইবন মুফলিহ, আল-আদাবুশ শার’ঈয়্যাহ, ‘আলামুল কুতুব, তা.বি, পৃ. ১/১৫৪, আবু হামিদ আল-গাযালী, ইহইয়া ‘উলূমিদ দীন, বৈরুত, দারুল মা’রিফাহ ৪/৩৩১)।
আল্লাহর রাসূলের (সা) সাহাবীগণ তাকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন; তাই স্বাভাবিকভাবেই তারা তার নিরঙ্কুশ আনুগত্য করেছেন এবং হক আদায় করে তার অনুসরণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে তারা প্রথমতঃ আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছেন অপর দিকে তাদের অন্তরে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি যে অকৃত্রিম ভালোবাসা বদ্ধমূল হয়েছে, তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তার পরিপূর্ণ অনুসরণ করেছেন, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার হুবহু অনুকরণ করেছেন। নিচে কতিপয় উদাহরণ তুলে ধরা হলো;
১- আনসার সাহাবীদের রুকু অবস্থায় কা’বার দিকে মুখ ফেরানো, কিবলা পরিবর্তনের ঘটনার সময় আল্লাহর রাসূলসহ (সা) সাহাবীগণ কা’বাকে পুনরায় কিবলার করার প্রতিক্ষায় ছিলেন। এমনি অবস্থায় একদিন কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ নাজিল হলো। কা’বাকেই পুনরায় কিবলা নির্ধারন করা হলো। রাসূলুল্লাহর (সা) এ নির্দেশ শোনা মাত্রই একদল আনসার সাহাবী তা মেনে নিলেন এবং সালাতের মধ্যেই কিবলা পরিবর্তন করেন ও কা’বার দিকে মুখ করে অবশিষ্ট সালাত সম্পন্ন করেন। আল বারা ইবন ‘আযিব (রা) সে ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন, তিনি বলেন,
لَمَّا قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ صَلَّى نَحْوَ بَيْتِ الْمَقْدِسِ سِتَّةَ عَشَرَ أَوْ سَبْعَةَ عَشَرَ شَهْرًا وَكَانَ يُحِبُّ أَنْ يُوَجَّهَ إِلَى الْكَعْبَةِ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى: { قَدْ نَرَى تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِي السَّمَاءِ فَلَنُوَلِّيَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضَاهَا } فَوُجَّهَ نَحْوَ الْكَعْبَةِ وَصَلَّى مَعَهُ رَجُلٌ الْعَصْرَ ثُمَّ خَرَجَ فَمَرَّ عَلَى
قَوْمٍ مِنْ الْأَنْصَارِ فَقَالَ هُوَ يَشْهَدُ أَنَّهُ صَلَّى مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَّهُ قَدْ وُجْهَ إِلَى الْكَعْبَةِ فَالْحَرَفُوا وَهُمْ رُكُوعٌ فِي صَلَاةِ الْعَصْرِ
‘রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় এসে ১৬ বা ১৭ মাস বায়তুল মুকদিসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেন। আর তিনি কা’বার দিকে মুখ ফিরিয়ে সালাত আদায় করতে চাইতেন। তখন আল্লাহ তা’আলা আয়াত নাজিল করেন,
قَدْ نَرَى تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِي السَّمَاءِ فَلَنُوَلِّيَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضَاهَا
‘আপনার বারবার আকাশের দিকে মুখ ফেরানোকে আমি দেখি। আমি অবশ্যই আপনাকে কিবলার দিকে প্রত্যাবর্তন করে দেব, যা আপনি পছন্দ করেন’। [সূরা আল বাকারা, আয়াত: ১৪৪] অতঃপর কা’বার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হলো। জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে আসরের সালাত আদায় করার পর আনসারদের কতিপয় লোকদের নিকট গিয়ে বললেন যে, ‘তিনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তিনি নবী (সা) এর সাথে সালাত আদায় করেছেন এবং তাকে কা’বার দিকে মুখ ফেরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে’। তখন তারা আসরের সালাতে রুকু অবস্থায়ই কা’বার দিকে ঘুরে যান’ (সহীহুল বুখারী, ৬/২৬৪৮, হা. নং ৬৮২৫, ইমাম মুসলিম শব্দের পার্থক্য সহকারে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। সহীহ মুসলিম ২/৬৬, হা. নং ১২০৪)।
সাহাবায়ে কিরাম কত দ্রুত নবী (সা) এর অনুকরণে অগ্রগামী ছিলেন যে, রুকু অবস্থায় মুখ ফিরিয়ে নিলেন। রুকু থেকে মাথা উত্তোলন করা পর্যন্তও অপেক্ষা করেননি। শোনা মাত্রই তারা রাসূল (সা) এর অনুসরণ করে কা’বার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন
( ড. ফাযল ইলাহী, হুজুন নবী.. ওয়া ‘আলামাতুহু, পৃ. ৬১)।
২- গৃহ পালিত গাধার গোশত হারাম হওয়া মাত্র গোশত ফেলে দেওয়া, সাহাবীগণ (রা) এর দীর্ঘ দিনের পছন্দনীয় কোনো বস্তু রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক নিষিদ্ধ হলে সঙ্গে সঙ্গে তা পালন করতেন। এমনি একটি ঘটনা হচ্ছে, গৃহ পালিত গাধার গোশত যখন হারাম ঘোষিত হলো, তখন পাতিলভর্তি গোশত তারা ফেলে দিলেন। এ ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন আনাস ইবন মালিক (রা), তিনি বলেন,
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَاءَهُ جَاءٍ فَقَالَ أُكِلَتْ الْحُمُرُ فَسَكَتَ ثُمَّ أَتَاهُ الثَّانِيَةَ فَقَالَ أُكِلَتْ الْحُمُرُ فَسَكَتَ ثُمَّ أَتَاهُ الثَّالِثَةَ فَقَالَ أُغْنِيَتْ الْحُمُرُ فَأَمَرَ مُنَادِيًا فَنَادَى فِي النَّاسِ إِنَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يَنْهَيَانِكُمْ عَنْ لحُومِ الْحُمُرِ الْأَهْلِيَّةِ فَأُكْفِتَتْ الْقُدُورُ وَإِنَّهَا لَتَفُورُ بِاللَّحْمِ
‘রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে বলেন, গাধার গোশত খাওয়া হচ্ছে। তখন তিনি চুপ থাকেন। অতঃপর দ্বিতীয় ব্যক্তি এসে বলেন যে, গাধার গোশত খাওয়া হচ্ছে। তখনও তিনি নীরব থাকলেন। এরপর তৃতীয় ব্যক্তি এসে বলেন, গাধাগুলো তো শেষ হয়ে গেল। তখন তিনি একজন ঘোষককে নির্দেশ দিলেন, তিনি তখনই জনগণের মধ্যে ঘোষণা দিলেন যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল গৃহ পালিত গাধার গোশত ভক্ষণ করতে নিষেধ করছেন। তখন রান্নারত গোশতভর্তি পাতিলগুলোকে ঢেলে ফেলা হলো’ (সহীহুল বুখারী, ৪/১৫৩৯, নং ৩৯৬৩, সহীহ মুসলিম ৬/৬৩, নং ৫১৩৩ (শব্দের কিছু পার্থক্য সহ )।
৩- মদ হারাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত মদ ঢেলে ফেলা, চূড়ান্ত পর্যায়ে যখন মদ হারাম ঘোষিত হয়, তখন সাহাবীগণ কাল বিলম্ব না করে সাথে সাথে তাদের বাড়ী ঘরে রক্ষিত সব মদ ঢেলে ফেলে দেন। ফলে সে দিন মদীনার রাস্তা-ঘাট ও অলি-গলিতে মদের স্রোত বয়ে যায়। অথচ এই মদ তাদের দীর্ঘ দিনের অভ্যাসের বস্তু ছিল, আভিজাত্যের প্রতীক ছিল। বংশানুক্রমিক ভাবে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা প্রিয় বস্তু নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরও তারা ততক্ষণাৎ তা পরিত্যাগ করেছেন। সামাজিক প্রথা কিংবা অভ্যাসের যুক্তি দেখিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) অবাধ্য হওয়ার দুঃসাহস তারা দেখাননি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমান সময়ে এ ধরনের যুক্তির অবতারণা করে আল্লাহর রাসূলের (সা) নীতি-আদর্শকে কত উপেক্ষা করা হচ্ছে তার হিসেব করে শেষ করা যাবে না। সাহাবীগণের আনুগত্যের এই অনন্য দৃষ্টান্ত সম্পর্কিত বিবরণ আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেন,
كُنتُ سَاقِيَ الْقَوْمِ فِي مَنْزِلِ أَبِي طَلْحَةَ وَكَانَ خَمْرُهُمْ يَوْمَئِذٍ الْفَضِيخَ فَأَمَرَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُنَادِيًا يُنَادِي أَلَا إِنَّ الْخَمْرَ قَدْ حُرِّمَتْ قَالَ فَقَالَ لِي أَبُو طَلْحَةَ اخْرُجْ فَأَهْرِقْهَا فَخَرَجْتُ فَهَرَفْتُهَا فَجَرَتْ فِي سِكَكِ الْمَدِينَةِ
আমি আবু তালহার বাড়িতে অতিথিদেরকে শরাব সরবরাহ করছিলাম। ঐ দিন তারা ‘ফাদীখ’ (বুসার জাতীয় খেজুর থেকে তৈরি) নামক মদ পান করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) একজন ঘোষককে ঘোষণা দিতে বলেন যে, সাবধান! মদকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। তখন আবু তালহা আমাকে বললেন, বাইরে গিয়ে এগুলো ফেলে দিয়ে আস। আমি সেগুলো বাইরে নিয়ে ফেলে দিলাম। সে দিন মদীনার রাস্তা-ঘাটে মদ প্রবাহিত হয়েছিল’ (সহীহুল বুখারী, ৪/১৬৮৮, নং ৪৩৪৪)।
নবী (সা) এর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসার প্রেক্ষিতেই সাহাবীগণ তাঁর নির্দেশ কার্যকরী করার জন্য মদ ফেলে দিয়েছিলেন। ফলে মদীনার রাস্তা-ঘাট ও অলি-গলিতে মদের স্রোত প্রবাহিত হয়েছিল। হাফিয ইবন হাজার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এ ঘটনা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশে সেদিন সকল মুসলিম রাস্তায় পর্যাপ্ত মদ ঢেলে ফেলাতে মদের স্রোত বয়ে যায়’ (ফাতহুল বারী, ১০/৩৯ )।
সাহাবীগণ (রা) নবী (সা) এর নির্দেশ শোনা মাত্র বিনা প্রশ্নে ও নির্দ্বিধায় বাস্তবায়ন করেছেন। তাদের দীর্ঘ দিনের এ অভ্যাস মুহূর্তে পরিত্যাগ করতে কোনো দ্বিধাই করেননি। কোনো যুক্তির আশ্রয় গ্রহণ করেননি। এমনকি ঘোষকের কথা যাচাই বাছাই করার চেষ্টাও করেননি (ড. ফাফল ইলাহী, হুবহুন নবী, পৃ. ৬৫ )।
এ প্রসঙ্গেও আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন যে,
فَإِنِّي لَقَائمٌ أَسْقِي أَبا طَلْحَةَ وفلانا وفلانًا إِذْ جَاءَ رَجُلٌ فَقَالَ: وَهَلْ بَلَغَكُمُ الْخَبَرُ ؟ فَقَالُوا: وَمَا ذَاكَ ؟ قَالَ : حُرِّمَتِ الْخَمْرُ، قَالُوا: أَهْرِقْ هَذِهِ القلال يَا أَنَسُ قَالَ: فَمَا سَأَلُوا عَنْهَا وَلَا رَاجَعُوهَا بَعْدَ خَيْرِ الرَّجُلِ
আমি দাঁড়িয়ে আবু তালহা এবং অমুক অমুক ব্যক্তিকে মদ সরবরাহ করছিলাম। তখন একজন লোক এসে বললেন, তোমাদের নিকট কি খবর পৌঁছেছে? তারা বললেন, কোনো খবর? লোকটি বলেন, মদ হারাম করা হয়েছে। তারা বললেন, হে আনাস! মদের এই হাঁড়িগুলো ঢেলে ফেলে দাও। তিনি বলেন, লোকটির খবরের পর তারা মদ সম্পর্কে আর কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করেননি এবং পুনরায় মদের দিকে ফিরেও যাননি (সহীহুল বুখারী, ৪/১৬৮৮, নং ৪৩৪১)।
বস্তুত: এ সকল সত্যবাদী ও নিষ্ঠাবান লোকদের ক্ষেত্রেই মহান আল্লাহর এ বাণী সত্যে পরিণত হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন:
{إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَن يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ }
যখন মুমিনদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) দিকে ডাকা হয় তাদের মাঝে ফায়সালা করার জন্য, তখন তারা বলে আমরা শুনলাম এবং মানলাম। প্রকৃত অর্থে তারাই সফল’, [সূরা আন নূর, আয়াত: ৫১]।
সুতরাং নিরঙ্কুশভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) আনুগত্য করলে তারাই সফলকাম হবে। বিনা বাক্য ব্যয়ে যারা তার কথা মান্য করে, কোনো দ্বিধা-দ্বন্ধে নিমজ্জিত হয়ে কার্যকরী করতে বিলম্ব করে না, তারা কৃতকার্য। এ আয়াতের পরের আয়াতেও সে কথাগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
৪- রাসূলুল্লাহর (সা) নিষেধাজ্ঞার কারণে সফরেও বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরা-ফেরা না করা, রাসূলুল্লাহর (সা) আদেশ-নিষেধ পরিপালনে সাহাবীগণ খুবই আন্তরিক ছিলেন। যে কোনো পরিস্থিতিতেও তারা তা মান্য করতেন হোক ভালো অবস্থায়, বা প্রতিকূল অবস্থায়, হোক তা নিজ বাড়ীতে থাকা অবস্থায় বা সফর অবস্থায়। সফরের আদব বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) সফরেও বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরা-ফেরা করতে নিষেধ করেন। সহাবীগণ সফরের সময়ও তাঁর নির্দেশকে যথাযথভাবে মান্য করতেন। অবাধ্য হতেন না। নির্দেশ পালনে কোনো প্রকার শিথিলতা প্রদর্শন করতেন না। কাজটি কতটা যুক্তি সঙ্গত তা নিয়েও মাথা ঘামাতেন না। সফরে যাত্রা বিরতি দেওয়া হলে তার নিয়ম ও শিষ্টাচার বিষয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ অনুসরণ করার ক্ষেত্রে তারা কতটা যত্নবান ছিলেন সে সম্পর্কে আবু ছা’লাবাহ আল-খুশানী (রা) বর্ণিত একটি হাদীস থেকে জানা যায় (হুরুন নবী, পৃ. ৬১- ৬২ )।
তিনি বলেন,
كَانَ النَّاسُ إِذَا نَزَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْزِلاً تَفَرَّقُوا فِي الشِّعَابِ وَالْأَوْدِيَةِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ – صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ تَفَرُّقَكُمْ فِي هَذِهِ الشَّعَابِ وَالْأَوْدِيَةِ إِنَّمَا ذَلِكُمْ مِنَ الشَّيْطَانِ. فَلَمْ يَنْزِلْ بَعْدَ ذَلِكَ مَنْزِلاً إِلا انْضَمَّ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ حَتَّى يُقَالُ لَوْ بُسِطَ عَلَيْهِمْ ثَوْبٌ
لَعَمَّهُم
রাসূলুল্লাহ (সা) কোনো স্থানে যাত্রা বিরতি করলে তখন সাহাবীগণ পাহাড়ী পথ ও উপত্যাকায় ইতস্ত-বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়তেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘এ সব পাহাড়ী পথ ও উপত্যাকায় তোমাদের বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়া নিঃসন্দেহে শয়তানের কাজ’। এ কথা শোনার পর তারা যখন কোনো স্থানে যাত্রা বিরতী করতেন, তখন পরস্পর এমনভাবে মিলিত হয়ে একত্রে থাকতেন। মনে হতো একটি কাপড় তাদের উপর ছড়িয়ে দিলে তা তাদের সকলকে ঢেকে ফেলবে’ ( সহীহ সুনানে আবী দাউদ, শায়খ মুহাম্মাদ নাসির উদ্দীন আল আলবানী, রিয়াদ, মাকতাবাতুত তারবিয়াতিল ‘আরাবী লি দূআলিল খালীজ, ১ম সংস্করণ, ১৪০৯ হি, কিতাবুল জিহাদ, ২/৪৯৮, সুনান আবী দাউদ, ২/৩৪৫, নং ২৬৩০, আল মুসতাদরাক, ২/১২৬, নং ২৫৪০, আস সুনানুল কুবরা, ইমাম আন-নাসাঈ, ৬/২৯০, নং ৮৮৫৬, হাদীসটি সহীহ )।
৫- নির্দেশ পালনে সাহাবীগণের তৎপরতা, রাসূলুল্লাহর (সা) আদেশ পালনে বিলাল (রা) কি পরিমাণ তৎপর ছিলেন আবু ‘আব্দুর রহমান আল-ফিহরী (রা) এর বর্ণনায় তা জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে হুনাইনের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলাম। আমরা প্রচণ্ড গরমের মধ্যে পথ চলছিলাম। অতঃপর আমরা গাছের ছায়ার নিচে যাত্রা বিরতি দিলাম। সূর্য যখন গড়িয়ে গেল তখন আমি আমার পাগড়ী পরিধান করে আমার ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে আসলাম। তিনি তার তাঁবুতে ছিলেন। আমি বললাম, আস্সালামু ‘আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ ওয়া রহমতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু অর্থাৎ, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার প্রতি শান্তি, আল্লাহর রহমত ও তাঁর বারাকাত বর্ষণ হোক! রওয়ানা করার সময় কি হয়ে গেল?।
قَالَ: أَجَلْ ثُمَّ قَالَ: يَا بِلَالُ قُمْ، فَنَارَ مِنْ تَحْتِ سَمُرَةٍ كَأَنَّ ظِلَّهُ ظِلُّ طَائِرٍ فَقَالَ : لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ وَأَنَا فِدَاؤُكَ
তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’। তারপর বলেন, হে বিলাল, উঠ! সঙ্গে সঙ্গে বিলাল সামুরা গাছের নিচ দিয়ে এতো ক্ষিপ্র গতিতে চলতে লাগলেন, তার ছায়া যেন পাখির ছায়ার মতো। আর বলেন, আপনার সামনে উপস্থিত আছি, আমি নিজেকে আপনার জন্য উৎসর্গ করছি (সুনান আবি দাউদ ৪/৩৫৯, নং ৫২৩৩, মুসনাদ আহমাদ ৩৭/১৩৪, নং ২২৪৬৭, আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন )।
বিলাল (রা) কর্তৃক রাসূলুল্লাহর (সা) আনুগত্য করার এক অনন্য ও জীবন্ত একটি চিত্র এই বর্ণনায় তুলে ধরা হয়েছে যে, তার আওয়াজ শোনা মাত্র বিলাল (রা) সাড়া দিয়েছেন এবং ক্ষিপ্র গতিতে তার দিকে ছুটে গিয়েছেন। উড়ন্ত পাখির ছায়ার প্রতি চোখ যেমন আটকায় না ঠিক বিলাল (রা) এর পা যেন মাটিতেই পড়ছেনা, মনে হয় যেন তিনি উড়ে গিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে হাজির হয়ে বলছেন, লাব্বাইকা।
৬- পার্থিব স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ও উপকারী বিষয়ও পরিত্যাগ করা, উসাইদ ইবন যুহাইর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের কাছে রাফি’ ইবন খাদীজ (রা) এসে বললেন,
إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْهَاكُمْ عَنْ أَمْرٍ كَانَ لَكُمْ نَافِعًا، وَطَاعَةُ اللَّهِ، وَطَاعَةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْفَعُ لَكُمْ
রাসূলুল্লাহ (সা) তো তোমাদেরকে এমন বিষয় নিষেধ করেছেন, যাতে তোমাদের উপকার ছিল। বস্তুত: আল্লাহর আনুগত্য এবং রাসূলুল্লাহর (সা) আনুগত্যই তো তোমাদের জন্য অধিক উপকারী (সহীহ মুসলিম ৩/১১৮১, নং ১৫৪৮, মুসনাদ আহমাদ ২৫/১২৮, নং১৫৮১৫, সুনান আবি দাউদ ৩/২৬০, নং ৩৩৯৮, সুনানুন নাসাঈ ৭/৩৫, নং ৩৮৬৯, সুনান ইবন মাজাহ ২/৮২২, নং ২৪৬০ )।
এখানেও লক্ষ্যণীয় যে, রাফি’ (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ কার্যকরী করার ক্ষেত্রে এতোটুকু দ্বিধা-সংকোচন দেখাননি। কারণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) আনুগত্য করাই অধিক উপকারী বলে বিশ্বাস করেন। এ ঘটনাটি ছিল ক্ষেত ও জামির ফসল উৎপাদন সংক্রান্ত।
৭- নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে সাহাবীগণের রেশম ও সিল্ক ব্যবহার বর্জন, রাসূলুল্লাহ (সা) তার উম্মাতের পুরুষদের জন্য রেশম বা সিল্ক কাপড় ব্যবহার করাকে হারাম এবং নারীদের জন্য জায়েয ঘোষণা করেছেন।
হুযাইফা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
هَانَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نَشْرَبَ فِي آنِيَةِ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَأَنْ تَأْكُلَ فِيهَا وَعَنْ لُبْسِ الْحَرِيرِ وَالدِّيبَاجِ وَأَنْ نَجْلِسَ عَلَيْهِ
নবী রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে স্বর্ণ ও রূপার পাত্রে পান করতে আর এতে খেতে এবং রেশম ও সিল্ক পরিধান করতে ও এর উপর বসতে নিষেধ করেছেন (সহীহুল বুখারী, ৫/২১৯৫, নং ৫৪৯৯ )।
তাই পুরুষ সাহাবীগণ (রা) স্বাভাবিকভাবেই রেশমী পোষাকাদি পরিধান করতেন না এবং রেশম দ্বারা তৈরি কোনো কিছুর উপর বসতেন না। এমনকি অমুসলিম সমাজে এবং প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও তারা তাদের এ নীতির উপর অটল থেকেছেন। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রকার শিথিলতা প্রদর্শন কিংবা পরিবেশ বিবেচনায় কোনো ছাড়ও দেননি। এমনি একটি ঘটনার বিবরণ ইমাম আত-তাবারী দিয়েছেন, তিনি বলেন, মুসলিম সেনা বাহিনী ইয়ারমুকে অবস্থানকালীন সময়ে শত্রু পক্ষের সেনা প্রধানের নিকট এ বার্তা প্রেরণ করেন যে, আমরা আপনাদের সেনা প্রধানের সাথে দেখা করে আলোচনা করতে চাই। তাই আমাদেরকে সে সুযোগ দেওয়া হোক। শত্রুপক্ষের লোকেরা তাদের সেনা প্রধানের নিকট মুসলিম বাহিনীর অভিপ্রায়ের কথা জানালে তিনি তাদেরকে সাক্ষাতের অনুমতি প্রদান করেন। সে মোতাবেক আবু ‘উবায়দাহ এবং ইয়াজিদ ইবন আবি সুফিয়ান, আল হারিছ ইবন হিশাম, যিরার ইবনুল আযূর এবং আবু জান্দাল ইবন সুহাইল (রা) সমন্বয়ে এক প্রতিনিধি দল সেনা প্রধানের নিকট আগমন করেন। রোম সম্রাটের ভাই রোমান সেনা প্রধানের অফিসে সিল্কের তৈরি ৩০টি গদি এবং ৩০টি সোফা ছিল। মুসলিম প্রতিনিধি দল সেখানে পৌছার পর এগুলো দেখে ভেতরে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন এবং ‘আমরা সিল্ক ব্যবহার করাকে বৈধ মনে করি না’ বলে সাফ জানিয়ে দেন।
আমাদের জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করা হোক। তখন তাদের জন্য সাধারণ বিছানার ব্যবস্থা করা হলো। সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট এ তথ্য পৌছলে তিনি তির্যক মন্তব্য করে বলেন,
أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ هَذَا أَوَّلُ الذُّلّ، أَمَّا الشَّامُ فَلَا شَأْمِ، وَوَيْلٌ لِلرُّومِ مِنَ الْمَوْلُودِ الْمَشْؤُومِ
আমি কি তোমাদেরকে বলি নাই? এটা কিন্তু প্রথম অপমান! বস্তুত: সিরিয়াবাসীদের জন্য দুর্ভাগ্যের কোনো কারণ নেই। আর অলুক্ষণে সন্তানদের জন্য রোম ধ্বংস হোক ( আত-তাবারী, আবু জা’ফর মুহাম্মাদ ইবনু জারীর, তারীখুত তাবারী, বৈরুত, দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪০৭ হি., ২/৩৩৯। ২০. হাফিয ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, বৈরুত, মাকতাবাতুল মা’আরিফ, তা. বি., ৭/৯-১০ )।
হাফিয ইবন কাসীর উল্লেখ করেছেন যে, ‘সহাবীগণ বলেন, আমরা সিল্ক দ্বারা তৈরি তাঁবুতে প্রবেশ করা বৈধ মনে করি না। তারপর তাদের জন্য সিল্কের বিছানার ব্যবস্থা করা হয়। তাতেও তারা আপত্তি করে বললেন, আমরা এই বিছানার উপরও বসবো না। অতঃপর সেনা প্রধান তাদের ইচ্ছা ও পছন্দানুযায়ী স্থানেই বসেন। অতঃপর তারা দ্বিপাক্ষিক সমঝোতায় উপনীত হন। সাহাবীগণ (রা) তাদেরকে আল্লাহর পথে দাও’য়াত দিয়ে নিজেদের সেনা শিবিরে ফিরে আসেন। তারা অবশ্য দ্বীনের দাও’য়াত গ্রহণ করেনি (ইমাম আল-বুখারী পরিচ্ছেদের অধীনে সানাদবিহীহ বর্ণনা করেছেন, সহীহুল বুখারী ৪/৪০, মুসনাদ ইমাম আহমাদ, সম্পাদনা, শু’আইব আল-আরনাউত, ২/৫০, নং ৫১১৪, মুসান্নাফ ইবন আবি শাইবাহ )।
শত্রুদের মোকাবেলার পরিস্থিতিতেও সাহাবীগণ নিজেদের আদর্শ ও বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি এবং তাদের প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণ থেকে বিরত থাকেননি। সেক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করা নাকি শত্রুদের সাথে কূটনৈতিক আচরণ করা, এর কোনোটাই বিবেচ্য বিষয় ছিল না। এমনকি রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণের বিষয়টি ছোট-খাট বিষয়, নাকি অনেক বড় মাপের বিষয়, সেটাও গুরুত্বের বিষয় ছিল না।
মোট কথা সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণের ক্ষেত্রে কোনো কিছুকেই বাধা হিসেবে বিবেচনা করতেন না। তাদের পক্ষে রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণের বাইরে যাওয়া কিভাবে সম্ভব হবে?। তারা তো রাসূলের (সা) এ বাণী শুনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
وَجُعِلَ الذِّلَّةُ، وَالصَّغَارُ عَلَى مَنْ خَالَفَ أَمْرِي
‘যারা আমার নির্দেশের বিপরীত করে তাদের উপর অসম্মান ও অপমান জনক অবস্থা চাপানো হয়’ ( হুজুন নবী, পৃ. ৬৯ )।
বস্তুত: আল্লাহ তা’আলা মুসলিম জাতির সম্মান,বিজয় এবং অপমান ও পরাজয় আল্লাহর নবী (সা) এর অনুসরণ ও অবাধ্য হওয়ার সাথে সম্পর্কযুক্ত করেছেন। যারা তাঁর রাসূলের (সা) নিঃশর্ত অনুসরণ ও আনুগত্য করবে তাদের জন্য রয়েছে ইজ্জত, সম্মান। পক্ষান্তরে যারা তার অবাধ্য হবে তাদের জন্য রয়েছে পরাজয় ও অপমান জনক জীবন যাপন। বর্তমান যুগের মুসলিমগণ যদি এ সত্যটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হতো তাহলে তাদের এ করুন অবস্থার নির্মম শিকারে পরিণত হতে হতো না ( হুজুন নবী, পৃ. ৬৯)।
৮ রাসূলের (সা) প্রিয় বস্তুকেও সাহাবীগণের প্রিয় বস্তু হিসেবে গ্রহণ, আল্লাহর রাসূলের (সা) সাহাবীগণ যখন দেখতেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কোনো বস্তুকে ভালোবাসেন বা পছন্দ করেন, খাদ্য হোক, পানীয় হোক, পরিধানের বস্তু হোক, যাই হোক না কেন, সাহাবীণও সে বস্তুগুলোকে ভালোবাসতে ও পছন্দ করতে শুরু করতেন। আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহকে (সা) দা’ওয়াত দিলেন। আমিও তার সঙ্গে গেলাম। সেখানে ঝোলের তরকারী আনা হলো, যাতে লাউ তরকারি ছিল।
فَجَعَلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْكُلُ مِنْ ذَلِكَ الدُّبَّاءِ وَيُعْجِبُهُ، قَالَ: فَلَمَّا رَأَيْتُ ذَلِكَ جَعَلْتُ أَلْقِيهِ إِلَيْهِ وَلَا أَطْعَمُهُ، قَالَ: فَقَالَ أَنَسٌ : فَمَا زِلْتُ بَعْدُ يُعْجِبُنِي الدُّبَّاءُ.
তখন রাসূলুল্লাহ (সা) ঐ লাউ গুলো খেতে লাগলেন এবং পছন্দ করলেন। তিনি বলেন, যখন আমি এমনটি দেখলাম তখন এটা তাকে ঢেলে দিলাম আমি এটা খেলাম না। রাবী বলেন, পরে আনাস বলেন, এরপর থেকে আমি সর্বদাই লাউ পছন্দ করি (সহীহ মুসলিম ৩/১৬১৫, নং ২০৪১, আল-বাইহাকী, আস্-সুনানুল কুবরা ৭/৪৫৪, নং ১৪৬২০ )।
আনাস (রা) লাউ পছন্দ করতে শুরু করেন, যখন তিনি রাসূলুল্লাহকে (সা) তা পছন্দ করতে দেখেছেন তখন থেকে তিনিও তা পছন্দ করেন। তালহা ইবন নাফি’ থেকে বর্ণিত যে, তিনি জাবির ইবন ‘আব্দুল্লাহ (রা) কে বলতে শুনেছেন যে,
أَخَذَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِي ذَاتَ يَوْمٍ إِلَى مَنْزِلِهِ، فَأَخْرَجَ إِلَيْهِ فَلَقًا مِنْ حُبْرٍ، فَقَالَ: مَا مِنْ أُدم؟ فَقَالُوا: لَا إِلَّا شَيْءٌ مِنْ خَلِ، قَالَ: فَإِنَّ الْخَلَّ نِعْمَ الْأُدُمُ، قَالَ جَابِرٌ : فَمَا زِلْتُ أُحِبُّ الْخَلَّ مُنْذُ سَمِعْتُهَا مِنْ نَبِيِّ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَقَالَ طَلْحَةُ: مَا زِلْتُ أُحِبُّ الْخَلَّ
مُنْذُ سَمِعْتُهَا مِنْ جَابِرٍ
একদিন রাসূলুল্লাহ (সা) আমার হাত ধরে তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন। তখন তার সামনে কিছু রুটি পেশ করা হলো। তখন তিনি বলেন, কোনো তরকারী নেই?। তারা বললেন, না, তবে কিছু সিরকা (vinegar) আছে। তিনি বলেন, কেননা সিরকা উত্তম তরকারী। জাবির বলেন, নবী (সা) এর কাছ থেকে শোনার পর থেকেই আমি সিরকা পছন্দ করি। বর্ণনাকারী তালাহা বলেন, আমি যখন থেকে জাবিরের কাছ থেকে এটা শুনেছি তখন থেকে সিরকা পছন্দ করি (সহীহ মুসলিম ৩/১৬২২, নং ২০৫২, মুসনাদ আহমাদ ২৩/৪৩০, নং ১৫২৯৩ )।
৯- রাসূলের (সা) নির্দেশ কার্যকরী করার জন্য শত্রুদের সঙ্গে কৃতচুক্তি পূর্ণ করা, সাহাবায়ে কিরাম (রা) সাধারণ ভাবেই রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণ করতেন না বরং সুখ, দুঃখ ও কষ্ট সর্বদাই তার অনুসরণে যত্নবান ছিলেন। এমনকি শত্রুদের সাথে চুক্তি পূরণ হওয়ার আগেই তাদের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার কোনো প্রস্তুতি নেওয়াও চুক্তির লঙ্ঘন এমন দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে, তা থেকে বিরত থাকাও সাহাবীগণের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ বিষয়ে সুলাইম ইবন ‘আমির (রা) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীস থেকে জানা যায়, তিনি বলেন, ‘মু’য়াবিয়া ইবন আবি সুফইয়ান (রা) ও রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। মু’য়াবিয়া (রা) চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে আগে ভাগেই তাদের দেশের দিকেই যাচ্ছিলেন। চুক্তির মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেননি। তখন এক অশ্বারোহী ব্যক্তি এসে বললেন, আল্লাহু আকবর! আল্লাহু আকবর! তোমরা চুক্তি পূরণ কর। বিশ্বাস ঘাতকতা করোনা। লোকেরা তাকিয়ে দেখেন যে, ঐ ব্যক্তি হলেন ‘আমর ইবন ‘আবসাহ (রা)। মু’য়াবিয়া (রা) তখন একজন ব্যক্তিকে তার নিকট পাঠিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে ভালো করে জানতে চাইলেন। তিনি তখন বলেন,
سَمِعْتُ رَسُولَ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ كَانَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ قَومٍ عَهْدٌ فَلا يَشُدُّ عُقْدَةً وَلَا يَحُلُّهَا حَتَّى يَنْقَضِيَ أَمَدُهَا أَوْ يُنْبَذَ إِلَيْهِم عَلَى سواء
আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি যে, ‘দু দলের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হলে, সময় শেষ না হওয়া কিংবা উভয় পক্ষ সমানভাডে চুক্তি ভেঙে না ফেলা পর্যন্ত চুক্তিকে আরো কঠিনও করা যাবে না এবং শিথিলও করা যাবে না’। তখন মু’য়াবিয়া (রা) অভিযান থেকে যুদ্ধ না করেই প্রত্যাবর্তন করেন ( সুনানে আবী দাউদ, ৩/৩৮, নং ২৭৬১, সুনানুত তিরমিযী, সম্পাদনা, আহমাদ মুহাম্মাদ শাকির ও অন্যান্যগণ, বৈরুতঃ দারু ইহইয়াউত তুরাসিল ‘আরাবী, ৪/১৪১, নং ১৫৮০। ইমাম তিরমিযী ও আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন )।
১০- স্বর্ণের আংটি ফেলে দেওয়া এবং পুনরায় তা আর গ্রহণ না করা, রাসূলুল্লাহ (সা) জনৈক ব্যক্তির হাতে স্বর্ণের আংটি দেখে তা ফেলে দিতে বললেন। পরে কেউ কেউ তাকে পরামর্শ দিলেন যে, তুমি এটা নিয়ে গিয়ে অন্য কাজে লাগাবে। তখন তিনি বলেন, যে আংটি রাসূলুল্লাহ ফেলে দিয়েছেন তা আর আমি কখনো গ্রহণ করব না। এমনি একটি ঘটনা ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى خَاتَمَا مِنْ ذَهَبٍ فِي يَدِ رَجُلٍ، فَنَزَعَهُ فَطَرَحَهُ، وَقَالَ: يَعْمِدُ أَحَدُكُمْ إِلَى جَمْرَةٍ مِنْ نَارٍ فَيَجْعَلُهَا فِي يَدِهِ، فَقِيلَ لِلرَّجُلِ بَعْدَ مَا ذَهَبَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: حُذْ خَاتِمَكَ انْتَفِعْ بِهِ، قَالَ: لَا وَاللهِ ، لَا أَخُذُهُ أَبَدًا وَقَدْ طَرَحَهُ رَسُولُ اللَّهِ
صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
রাসূলুল্লাহ (সা) জনৈক ব্যক্তির হাতে স্বর্ণের আংটি দেখে তার থেকে তা খুলে নিয়ে ফেলে দিলেন। আর বললেন, তোমাদের কেউ জাহান্নামের আগুন নিতে ইচ্ছা করে সে যেন আগুনকে নিজের হাতে পরিধান করে। রাসূলুল্লাহ (সা) চলে যাওয়ার পর ঐ ব্যক্তিকে
নিয়ে নাও, এটাকে অন্য কাজে ব্যবহার কর। তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি এটাকে কখনো নিব না, যেটাকে রাসূলুল্লাহ (সা) ফেলে দিয়েছেন ( সহীহ মুসলিম ৩/১৬৫৫, নং ২০৯০, সহীহ ইবন হিব্বান ১/১৯২, নং ১৫, আত-তাবারানী,
আল-মু’জামুল কাবীর ১১/৪১৪, নং ১২১৭৫ )।
১১- রাসূলের (সা) নির্দেশ পাওয়া মাত্র পরিধেয় বস্ত্র পায়ের নলা পর্যন্ত পরিধান করা, আল্লাহর নবীর সাহাবীগণ সব বিষয়েই রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণ করাকে নিজেদের জন্য অপরিহার্য মনে করতেন। এমনকি ব্যক্তিগত পোশাকাদির ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তারা রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ যেন তার চাহিদা অনুযায়ী পরিপালিত হয় সে বিষয়ে অত্যন্ত পেরেশান থাকতেন। ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) বলেন,
مَرَرْتُ عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَفِي إِزَارِي اسْتِرْحَاءُ، فَقَالَ: يَا عَبْدَ اللَّهِ، ارْفَعْ إِزَارَكَ، فَرَفَعْتُهُ، ثُمَّ قَالَ : زِدْ، فَزِدْتُ، فَمَا زِلْتُ أَتَحَرَّاهَا بَعْدُ، فَقَالَ بَعْضُ الْقَوْمِ إِلَى أَيْنَ؟ فَقَالَ: أَنْصَافِ السَّاقَيْنِ
আমি রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে গেলাম, আমার পরনের লুঙ্গিটা নিচের দিকে ঝুলানো ছিল। তখন তিনি বলেন, হে ‘আব্দুলাহ! ‘তোমার লুঙ্গিটা উপরে উঠাও’। আমি এটাকে উপরে উঠালাম। তারপর তিনি বলেন, ‘আর উঠাও’। তখন আমি আর উপরে উঠালাম। এরপরে আমি বিষয়টি অর্থাৎ সর্বশেষ কাপড় উঠানো নিয়ে ভাবছিলাম, তখন লোকদের কেউ কেউ বললেন, কোনো পর্যন্ত শেষবার উঠিয়ে ছিলেন? তখন তিনি বলেন, দু’পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত (সহীহ মুসলিম ৩/১৬৫৩, নং ২০৮৬, আল-বাইহাকী, আস্-সুনানুল কুবরা ২/৩৪৫, নং ৩৩১৬ )।
১২- রাসূলুল্লাহকে (সা) সালাতের মধ্যে জুতা খুলতে দেখে সহাবীগণের জুতা খুলে ফেলা, সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) নিদের্শগুলোকে পালন করার জন্যই তৎপর ছিলেন না, বরং তারা অত্যন্ত আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে তার নড়া চড়া ও কার্যক্রমকেও গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করতেন। তারা তার মুখাকৃতি এবং চোখের ভাষা পর্যন্তও সূক্ষভাবে লক্ষ্য করতেন। সেখানেও তাদের জন্য অনুকরণীয় কিছু থাকতে পারে সে আগ্রহ ও আকাঙ্খা নিয়েই তাদের এ প্রয়াস ছিল। এ ভাবেই রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত সাহাবীগণ তার আদেশ ও নিষেধরই শুধু অনুসরণ করতেন না। তার ব্যক্তিগত কার্যক্রম এবং বডি ল্যাংগুয়েজকেও অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। নবী (সা) কে যখন কোনো কিছু করতে দেখতেন সঙ্গে সঙ্গে তারাও সে কাজটি সম্পন্ন করতে এগিয়ে আসতেন। অন্যদিকে কোনো কাজ থেকে দূরে থাকতে দেখলে তা থেকে তারাও দূরে অবস্থান করতেন (ড. ফাযল ইলাহী, হুবল্গুন নবী, পৃ. ৭০ )।
এমন একটি বিষয়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত আবু সাঈদ আল খুদরী (রা) বর্ণিত একটি হাদীসের মধ্যে প্রত্যক্ষ করা যায়। তিনি বলেন,
بَيْنَمَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّى بِأَصْحَابِهِ إِذْ خَلَعَ نَعْلَيْهِ فَوَضَعَهُمَا عَنْ يَسَارِهِ فَلَمَّا رَأَى ذَلِكَ الْقَوْمُ أَلْقَوْا نِعَاهُمْ فَلَمَّا قَضَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَاتَهُ، قَالَ: مَا حَمَلَكُمْ عَلَى الْقَائِكُمْ نِعَالَكُمْ؟. قَالُوا رَأَيْنَاكَ الْقَيْتَ نَعْلَيْكَ فَأَلْقَيْنَا نِعَالَنَا. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ
عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ جِبْرِيلَ عليه الصلاةُ والسَّلامُ أَتَانِي فَأَحْبَرَنِي أَنَّ فِيهِمَا قَذَرًا. وَقَالَ: إِذَا جَاءَ أَحَدُكُمْ إِلَى الْمَسْجِدِ فَلْيَنْظُرْ فَإِنْ رَأَى فِي نَعْلَيْهِ قَذَرًا أَوْ أَذًى فَلْيَمْسَحْهُ وَلْيُصَلِّ فِيهِمَا
‘রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবীগণকে সঙ্গে নিয়ে সালাত আদায় করছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি নিজের জুতা পা থেকে খুলে বাম পাশে রেখে দিলেন। সাহাবীগণ তা দেখে তারাও তাদের পায়ের জুতাগুলো খুলে ফেললেন। রাসূলুল্লাহ (সা) সালাত শেষ করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদেরকে জুতা খুলতে কে উদ্বুদ্ধ করলো’? তারা জবাবে বলেন যে, আমরা আপনাকে জুতা খুলে ফেলতে দেখেছি, তাই আমরাও আমাদের জুতা খুলে ফেলেছি। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘জিবরীল (আ) এসে আমাকে অবহিত করেন যে, আমার জুতা অপবিত্র এবং তিনি বলেন, তেমাদের কেউ মাসজিদে আগমন করলে নিজের জুতা দেখে নেবে, যদি জুতাতে নাপাক বা অপবিত্র কিছু থাকে তাহলে অবশ্যই মুছে নেবে এবং তা পরিধান অবস্থায় সালাত আদায় করবে’ (সুনানে আবী দাউদ, ১/২৪৭, নং ৬৫০, মুসনাদ আবি দাউদ আত-তায়ালিসী ৩/৬১২, নং ২২৬৮, আল-বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা ২/৫৬৩, নং ৪০৮৬। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, ইরওয়াউ গালীল, ১/৩৫০, নং ২৮৪ )।
১৩- রাসূলুল্লাহকে (সা) শিশুদের প্রতি সালাম দেওয়া দেখে সাহাবীদেরও সালাম দেওয়া, সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহর (সা) সব কর্ম ও অভ্যাসকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে লক্ষ্য করতেন এবং নিজেরাও সেভাবেই ‘আমল করতেন।
আনাস (রা) রাসূলুল্লাহকে (সা) শিশুদের প্রতি সালাম দিতে দেখে তিনি নিজের জীবনেও তা ‘আমল করতেন, শিশুদেরকে সালাম দিতেন। আনাসকে দেখে তার ছাত্রগণও তার কাছ থেকে শুনে তারাও শিশুদেরকে সালাম দিতে শুরু করেন। এমন একটি ঘটনার বর্ণনা দেন সাইয়্যার, তিনি বলেন, আমি সাবিত আল-বুনানিয়্যের সাথে হাঁটতে ছিলাম। তিনি কিছু শিশুদের পাশ দিয়ে যাবার সময় তাদেরকে সালাম দেন। এরপর সাবিত হাদীস বর্ণনা করে বলেন, তিনি আনাসের সাথে হাঁটতে ছিলেন, তখন আনাস (রা) একদল শিশুদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাদেরকে সালাম দেন। তারপর তিনি হাদীস বর্ণনা করেন যে,
أَنَّهُ كَانَ يَمْشِي مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَمَرَّ بِصِبْيَانٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ
তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে পথ চলতে ছিলেন। তখন তিনি কতিপয় শিশুদের পাশ দিয়ে যান এবং তাদেরকে সালাম দেন (সহীহ মুসলিম ৪/১৭০৮, নং ২১৬৮, মুসনাদ আহমাদ ১৯/৩৪৪, নং ১২৩৩৭, আর দেখুন, সহীহুল
বুখারী ৮/৫৫, নং ৬২৪৭ (শব্দের পার্থক্যসহ )।
এ হাদীসে আনাস (রা) আল্লাহর রাসূলকে (সা) দেখে ‘আমল শুরু করেছেন আবার তার ছাত্র সাবিত তাকে দেখে তিনিও শিশুদেরকে সালাম দেবার ‘আমল করেছেন।
১৪- আল্লাহর নবীর সতর্কবাণী শোনা মাত্র জনৈক মহিলার পরিধেয় গহনা দান করে দেওয়া, রাসূলুল্লাহকে (সা) যথাযথ ভালোবাসার ক্ষেত্রে পুরুষ সাহাবীগণই অগ্রগামী ছিলেন তা নয়, বরং সত্যপন্থী মহিলা সাহবীগণও তাকে সন্তান ও সম্পদের চেয়ে অধিক ভালোবাসার স্বাক্ষর রেখেছেন। ফলে তার অনুসরণে তারাও ছিলেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত (হুজুন নবী,, ওয়া ‘আলামাতুহু, পৃ. ৭১ )।
এমনি এক মহিলা সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট যখন শুনতে পেলেন যে, তার ব্যবহৃত স্বর্ণের যাকাত না দিলে তার পরিবর্তে জাহান্নামের আগুনের বালা তাকে পরিধান করানো হবে। তাই তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা দান করে দিলেন। ‘আমর ইবন শু’আইব (রা) এ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন যে,
أَنَّ امْرَأَةً أَتَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَعَهَا ابْنَةٌ لَهَا وَفِي يَدِ ابْنَتِهَا مَسَكَتَانِ غَلِيظَتَانِ مِنْ ذَهَبٍ، فَقَالَ لَهَا : أَتُعْطِينَ زَكَاةَ هَذَا؟ قَالَتْ: لَا. قَالَ : أَيَسُرُّكِ أَنْ يُسَوِّرَكِ اللَّهُ بِهِمَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ سِوَارَيْنِ مِنْ نَارٍ؟ قَالَ: فَخَلَعَتْهُمَا فَأَلْقَتْهُمَا إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَقَالَتْ: هُمَا
لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَلِرَسُولِهِ.
জনৈক মহিলা তার কন্যাসহ রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট আসেন। তার মেয়েটির হাতে স্বর্ণের দুটি মোটা বালা ছিল। তিনি বলেন, ‘তুমি এর যাকাত প্রদান কর?’ মহিলা জবাব দেন যে, না। তিনি বলেন, ‘তোমাকে কি এ বিষয়টি আনন্দ দেবে যে, আল্লাহ কিয়ামাত দিবসে এর পরিবর্তে তোমাকে আগুনের দুটি বালা পরিধান করাবেন?’ বর্ণনাকারী বলেন, মেয়েটি তখন বালা দুটি খুলে নবী (সা) এর দিকে ছুঁড়ে দেন এবং বলেন যে, এ দু’টা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) জন্য’ (আবু দাউদ, সুনানু আবী দাউদ, ২/৪, হা. নং ১৫৬৫, আল বাইহাকী, আসসুনানুল কুবরা, ৪/১৪০, হা. নং ৭৩৪ο আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন )।
এই মহিলা সাহাবী (রা) এর নবী (সা) এর প্রতি গভীর ও অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণেই তার কথার অনুসরণ করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণের দু’টা মোটা বালাও আল্লাহ ও তাঁর পথে দান করে দেন।
১৫- রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশের অনুসরণ করতে গিয়ে প্রয়োজনেও পেছনে ফিরে না তাকানো, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার দরুণ সাহাবীগণ তার প্রতিটি কথাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। তাতে তাদের অসুবিধা হলেও তা মনে করতেন না। তার প্রকৃত অনুসরণের মাধ্যমেই নিজেদে ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ নিশ্চিত হবে বলে বিশ্বাস করতেন। এমনই একটি ঘটনা ‘আলী ইবন আবি তালিব (রা) এর ক্ষেত্রে হয়েছে। খাইবার যুদ্ধে তার হাতে ঝান্ডা তুলে দিয়ে নির্দেশ দেওয়া হলো যে, সোজা চলে যাবে কোনো দিকে তাকাবে না। গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় জানার জন্য পেছন না ফিরেই জোরে আওয়াজ করে তা জেনে নিলেন। আবু হুরায়রা (রা) সে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, খাইবার যুদ্ধের সময় নবী (সা) ‘আলী (রা) কে ডেকে তার হাতে ঝান্ডা দিয়ে বললেন,
امْشِ، وَلَا تَلْتَفِتْ، حَتَّى يَفْتَحَ اللهُ عَلَيْكَ، قَالَ: فَسَارَ عَلِيٌّ شَيْئًا ثُمَّ وَقَفَ وَلَمْ يَلْتَفِتْ، فَصَرَخَ : يَا رَسُولَ اللهِ عَلَى مَاذَا أُقَاتِلُ النَّاسَ؟ قَالَ: قَاتِلْهُمْ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ …
‘যাও, আর এদিক ওদিক তাকাবে না, এমতাবস্থায় আল্লাহ তোমাকে বিজয় দান করবেন। বর্ণনাকারী বলেন, তখন ‘আলী কিছুদূর অগ্রসর হলেন তারপর থেমে গেলেন তবে পেছন ফিরে তাকালেন না। অতঃপর তিনি চিৎকার করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! মানুষদের সাথে কোনো বিষয়ের উপর যুদ্ধ করব? তিনি বলেন, তাদের সাথে ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা একথার সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল (সহীহ মুসলিম ৪/১৮৭১, নং ২৪০৫, আহমাদ ইবন হাম্বল, ফাযায়িলুস্-সাহাবাহ ২/৬৫৯, নং ১১২২ )।
‘আলী ইবন আবি তালিব (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) অতি আপনজন, তার জামাতা, তিনিও তার নির্দেশকে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে তার দিকে ফিরেই প্রশ্নটি করতে পারতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ঈমান এবং তার প্রতি অকৃত্রিম ঈমানী ভালোবাসার কারণেই তার প্রতিটি আদেশ ও নিষেধকে এভাবে পরিপালন করেছেন।
১৬- ‘বসে যাও’ এমন নির্দেশ শোনা মাত্রই সাহাবীগণের যে যেখানে ছিলেন সেখানেই বসে যাওয়া, একবার নবী (সা) খুৎবাহ দেবার সময় বললেন, ‘বসে যাও’। তখন ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) মাসজিদে প্রবেশ করছিলেন। এ কথা তার কানে আসা মাত্রই তিনি সেখানেই মাসজিদের দরজার সামনে বসে গেলেন। এ ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন জাবির ইবন ‘আব্দুল্লাহ (রা), তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) জুমু’আর দিনে মিম্বারে উঠে বললেন,
اجْلِسُوا، فَسَمِعَ ذَلِكَ ابْنُ مَسْعُودٍ، فَجَلَسَ عَلَى بَابِ الْمَسْجِدِ، فَرَآهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: تَعَالَ يَا عَبْدَ اللَّهِ بْنَ مَسْعُودٍ
তোমরা বসে পড়’। ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ এ কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গেই মাসজিদের দরজার সামনে বসে পড়েন। পরে রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে দেখে বললেন, হে ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ এ দিকে আসো (সুনান আবি দাউদ ১/২৮৬, নং ১০৯১, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ১/৪২৩, নং ১০৫৬, আল-হাকিম ও আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন )।
‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ রাসূলুল্লাহর (সা) উক্তি শোনা মাত্র নিজের জন্য এটা বৈধ মনে করেননি যে, আর এক পা সামনে বাড়াবেন। তাই যেখানে ছিলেন ওখানেই বসে পড়েছেন। রাসূলুল্লাহর (সা) আনুগত্যের এটাই উত্তম নমুনা।
১৭- ভীতিকর অবস্থায়ও রাসূলের (সা) নির্দেশ লঙ্ঘন হবে ভেবে সাহাবীগের স্থান ত্যাগ না করা, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন কোনো কাজের, কিংবা এখানেই অবস্থান কর এরূপ নির্দেশ দিতেন সাহাবীগণ (রা) সকল অবস্থাতেও তা পরিপালন করতেন, নির্দেশের লঙ্ঘন করতেন না, তাতে তাদের যতই অসুবিধা হোক না কেন। এমনি এক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন বিশিষ্ট সাহাবী আবু যার আল- গিফারী (রা), তিনি বলেন, আমি নবী (সা) এর সাথে ছিলাম।
فَلَمَّا أَبْصَرَ يَعْنِي أَحَدًا قَالَ: مَا أُحِبُّ أَنَّهُ تَحَوَّلَ لِي ذَهَبًا، يَمْكُتُ عِنْدِي مِنْهُ دِينَارٌ فَوْقَ ثَلَاثٍ إِلَّا دِينَارًا أُرْصِدُهُ لِدَيْنِ، ثُمَّ قَالَ: إِنَّ الْأَكْثَرِينَ هُمُ الأقلُّونَ، إِلَّا مَنْ قَالَ بِالْمَالِ هَكَذَا وَهَكَذَا، وَقَلِيلٌ مَا هُمْ، وَقَالَ: مَكَانَكَ، وَتَقَدَّمَ غَيْرَ بَعِيدٍ فَسَمِعْتُ صَوْتًا، فَأَرَدْتُ أَنْ آتِيَهُ، ثُمَّ ذَكَرْتُ قَوْلَهُ : مَكَانَكَ
حَتَّى آتِيَكَ، فَلَمَّا جَاءَ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ الَّذِي سَمِعْتُ أَوْ قَالَ : الصَّوْتُ الَّذِي سَمِعْتُ؟ قَالَ : وَهَلْ سَمِعْتَ؟، قُلْتُ: نَعَمْ، قَالَ: أتَانِي جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلامُ، فَقَالَ: مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِكَ لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ، قُلْتُ: وَإِنْ فَعَلَ كَذَا وَكَذَا، قَالَ: نَعَمْ.
তিনি যখন (উহুদ পাহাড়) দেখলেন, বললেন, এটা আমার জন্য স্বর্ণ হয়ে যাক তা আমি চাই না। সেখান থেকে একটি দিনারও যেন আমার কাছে তিন দিনের বেশি না থাকে। তবে একটি দিনার, যা আমি ঋণ পরিশোধের জন্য সংরক্ষণ করব। তারপর বলেন, নিশ্চয় (দুনিয়াতে) অধিক সম্পদশালীরা (পরকালে প্রতিদানের ক্ষেত্রে) তারা স্বল্পসংখ্যক। তবে যারা সম্পদকে কল্যাণের কাজে ব্যয় করেছে আর তাদের সংখ্যা কম। তিনি আরো বলেন, (আবু যার!) তুমি এই স্থানেই থাকো। আর তিনি সামান্য দূর এগিয়ে গেলেন। আমি তখন একটি আওয়াজ শুনলাম। আমার মন চাইল যে, আমি তার কাছে আসি। তারপরই আমার তার কথা মনে হলো যে, ‘আমি না আসা পর্যন্ত তুমি এখানেই অবস্থান করবে’। যখন তিনি আসলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল। আমি যা শুনলাম বা আবু যার বলেছেন, যে আওয়াজটা আমি শুনলাম? তিনি বলেন, তুমি কি কিছু শুনেছ? আমি বললাম হ্যাঁ। তিনি বলেন, আমার কাছে জিবরীল (আ) এসেছিলেন, এবং বললেন, আপনার উম্মাতের কোনো ব্যক্তি যদি এমন অবস্থায় মারা যায় যে, সে আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করে নাই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি বললাম, সে যদি এই রকম (যিনা, চুরি ইত্যাদি) করে, তিনি বলেন, হ্যাঁ’ (সহীহুল বুখারী ৩/১১৬, নং ২৩৮৮। আর দেখুন, সহীহ মুসলিম ২/৬৮৭, নং ৯৪, মুসনাদ আহমাদ
৩৫/২৭৬, নং ২১৩৪৭ )।
এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, আবু যার (রা) যখন ওখানে অন্ধকারে ছিলেন, রাসূলুল্লাহকে (সা)ও দেখা যাচ্ছে না, অন্ধকারে তিনি মিশে গিয়েছেন। হঠাৎ বোধগম্যহীন আওয়াজ শুনে তিনি ভয় পেয়ে যান যে, হয়তো রাসূলুল্লাহর (সা) কিছু হয়েছে, তাই তার কাছে যেতে চাইলেন। কিন্তু ‘আমি না আসা পর্যন্ত এখানেই থেকো’ এই নির্দেশের কথা মনে করে তিনি তার আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। হাদীসের অন্য বর্ণনাতেও এ ভয়ের এ কথাটি ফুটে উঠেছে;
ثُمَّ انْطَلَقَ فِي سَوَادِ اللَّيْلِ حَتَّى تَوَارَى، فَسَمِعْتُ صَوْتًا قَدِ ارْتَفَعَ، فَتَخَوَّفْتُ أَنْ يَكُونَ قَدْ عَرَضَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
তারপর তিনি রাতের অন্ধকারে চলে গেলেন এমনকি তিনি আড়াল হয়ে গেলেন। তখন আমি একটি উঁচু আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি ভয় পেয়ে গেলাম যে, নবী (সা) এর কিছু হয়ে যায় কিনা (সহীহুল বুখারী ৮/৯৫, নং ৬৪৪৪, ৮/৬০, নং ৬২৬৮, সহীহ মুসলিম ২/৬৮৭, নং ৯৪ )।
আবু যার (রা) রাসূলের (সা) কিংবা নিজেরও বিপদ হতে পারে এ আশঙ্কা ও ভীতি থাকা সত্ত্বেও স্থান পরিবর্তন করেননি। এটি আনুগত্য ও অনুসরণের এক অন্যান্য উদাহরণ। তারা রাসূলুল্লাহর (সা) ভালোবাসায় সিক্ত ছিলেন বলেই তাদের পক্ষে এই উদাহরণ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে।
১৮- রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিশ্রুতি পূরণে সাহাবীগণের নিঃসংকোচ উদ্যোগ, রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীগণ তার মৃত্যুর পর কেউ যদি এসে বলতেন যে, তিনি আমাকে এই এই দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার মৃত্যু হওয়াতে তা দিতে পারেননি। এমনি একটি ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন জাবির ইবন ‘আব্দুল্লাহ (রা), তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেন,
لَوْ قَدْ جَاءَنَا مَالُ البَحْرَيْنِ قَدْ أَعْطَيْتُكَ هَكَذَا وَهَكَذَا وَهَكَذَا، فَلَمَّا قُبِضَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَجَاءَ مَالُ البَحْرَيْنِ، قَالَ أَبُو بَكْرٍ : مَنْ كَانَتْ لَهُ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِدَةٌ فَلْيَأْتِنِي، فَأَتَيْتُهُ فَقُلْتُ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ كَانَ قَالَ لِي: لَوْ قَدْ جَاءَنَا
مَالُ البَحْرَيْنِ لَأَعْطَيْتُكَ هَكَذَا وَهَكَذَا وَهَكَذَا، فَقَالَ لِي: احْتُهُ، فَحَثَوْتُ حَلْيَةً فَقَالَ لِي: عُدَّهَا ، فَعَدَدْتُهَا فَإِذَا هِيَ خَمْسُ مِائَةٍ، فَأَعْطَانِي أَلْفًا وَخَمْسَ مِائَةٍ
যদি বাহরাইন থেকে সম্পদ আসে তাহলে তোমাকে এতো, আর এতো, আর এতো দেব। অতঃপর নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মৃত্যু বরণ করেন এবং বাহরাইন থেকে সম্পদ আসল। আবু বকর বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে যার প্রতিশ্রুতি রয়েছে সে যেন অবশ্যই আমার কাছে আসে। তখন আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন, ‘বাহরাইন থেকে যদি সম্পদ আসে তোমাকে এতো, আর এতো, আর এতো দেব’। তখন আবু বকর আমাকে বলেন, তুমি এক অঞ্জলি রাখ। আমি এক অঞ্জলি ভরে নিলাম। তখন তিনি আমাকে বলেন, তুমি এটা গণনা কর। আমি তা গণনা করে দেখি যে, পাঁচশত আছে। তখন তিনি আমাকে এক হাজার পাঁচশত দিলেন (সহীহুল বুখারী ৪/৯৮, নং ৩১৬৪, সহীহ মুসলিম ৪/১৮০৬, নং ২৩১৪ )।
আবু বকর (রা) রাসূলের (সা) ওয়াদা পূরণ করে দিতে দ্বিধা করেননি। বরং তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি পূরণ করে দিয়েছেন।
১৯- রাসূলুল্লাহর (সা) হাতের আংটি ফেলে দেওয়া দেখে সাহাবীগণের সঙ্গে সঙ্গে আংটি ফেলে দেওয়া, রাসূলুল্লাহর (সা) ভালোবাসায় সিক্ত যারা, তাদের তার অনুসরণের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে যে, সাহাবীগণ (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে রূপার আংটি দেখে তারাও রূপার আংটি বানালেন। পরে তিনি আংটিটি ফেলে দিলেন সাহাবীগণও সাথে সাথে ফেলে দিলেন। তারা জানতেও চাইলেন না কেনো আংটি পরিধান করলেন আবার কেন-ই বা ফেলে দিলেন। বরং তারা নীরবে রাসূলুল্লাহকে (সা) দেখেছেন সাথে সাথে ‘আমল করেছেন। নিরংঙ্কুশ আনুগত্য ও পূর্ণ অনুসরণের এক অনন্য উদাহরণ। আনাস ইবন মালিক রাদি আল্লাহু আনহু এই ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন,
أَنَّهُ رَأَى فِي يَدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَاتَمَا مِنْ وَرِقٍ يَوْمًا وَاحِدًا، ثُمَّ إِنَّ النَّاسَ اصْطَنَعُوا الخَوَاتِيمَ مِنْ وَرِقٍ وَلَبِسُوهَا، فَطَرَحَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَاتَمَهُ، فَطَرَحَ النَّاسُ خَوَاتِيمَهُمْ
তিনি একদিন রাসলুল্লাহ (সা) এর হাতে রূপার একটি আংটি দেখেন। তারপর লোকেরাও রূপার আংটি তৈরি করে এবং পরিধান করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) পরে তার আংটি ফেলে দেন। তখন লোকেরাও তাদের আংটি ফেলে দেন (সহীহুল বুখারী ৭/১৫৬, নং ৫৮৬৮, সহীহ মুসলিম ৩/১৬৫৮, নং ২০৯৩, কিতাবুল লু’লু ওয়াল মারজান, সংকলক, শাইখ ফুয়াদ ‘আব্দুল বাকী, অনুবাদ সম্পাদনা, শাইখ আকরামুজ্জামান ও তার সঙ্গীগণ, প্রকাশক, তাওহীদ প্রকাশনী, ঢাকা, ২য় সংস্করণ, ২০১২ ঈ, পৃ. ৬০৫)।
তবে এ হাদীসের বর্ণনায় রূপার ‘আংটির বিষয়টি সম্পর্কে অধিকাংশের মত হচ্ছে, তা ছিল স্বর্ণের আংটি (ইবন বাত্তাল, শারহ সাহীহিল বুখারী, সম্পাদনা, আবু তামীম ইবরাহীম, রিয়াদ- মাকতাবাতুর রুশদ, ২য় সংস্করণ, ১৪২৩ হি, ৯/১৩০ )।
২০- রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ লংঘনের আশঙ্কায় স্ত্রীর প্রতি ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদের কঠোর সিদ্ধান্তের হুমকি, রাসূলুল্লাহ (সা) সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য উল্কি অংকণ, ভুরু-চুল উপড়ানো এবং দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করার প্রতি লা’নাত করেছেন। জনৈক মহিলা ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদকে বলেন, আপনার স্ত্রীও তো এটা করে। তিনি বলেন, যাও দেখে আসো। মহিলা দেখে এসে বলেন, না, তিনি এমন কিছু দেখলেন না। তখন ‘আব্দুল্লাহ বলেন, যদি সে তা করত, তাহলে তার সাথে সহবাস করতাম না। ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) নিজেই এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,
لَعَنَ اللهُ الوَاشِمَاتِ وَالمُوتَشِمَاتِ، وَالمُتَنَمِّصَاتِ وَالمُتَفَلِّجَاتِ، لِلْحُسْنِ الْمُغَيِّرَاتِ خَلْقَ اللَّهِ. فَبَلَغَ ذَلِكَ امْرَأَةً مِنْ بَنِي أَسَدٍ يُقَالُ لَهَا أُمُّ يَعْقُوبَ، فَجَاءَتْ فَقَالَتْ: إِنَّهُ بَلَغَنِي عَنْكَ أَنَّكَ لَعَنْتَ كَيْتَ وَكَيْتَ، فَقَالَ: وَمَا لِي أَلْعَنُ مَنْ لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَمَنْ هُوَ في كِتَابِ
اللهِ، فَقَالَتْ: لَقَدْ قَرَأْتُ مَا بَيْنَ اللَّوْحَيْنِ، فَمَا وَجَدْتُ فِيهِ مَا تَقُولُ، قَالَ: لَئِنْ كُنْتِ قَرَأْتِيهِ لَقَدْ وَجَدْنِيهِ، أَمَا قَرَأْتِ: {وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا } ؟ قَالَتْ: بَلَى، قَالَ: فَإِنَّهُ قَدْ نَهَى عَنْهُ، قَالَتْ: فَإِنِّي أَرَى أَهْلَكَ يَفْعَلُونَهُ، قَالَ: فَاذْهَبِي فَانْظُرِي فَذَهَبَتْ فَنَظَرَتْ، فَلَمْ تَرَ مِنْ
حَاجَتِهَا شَيْئًا، فَقَالَ: لَوْ كَانَتْ كَذَلِكَ مَا جَامَعْتُهَا
আল্লাহ লা’নাত করেছেন ঐ সমস্ত নারীর প্রতি যারা অন্যের শরীরে উল্কি অঙ্কন করে, নিজ শরীরে উল্কি অঙ্কন করায়, যারা সৌন্দর্যের জন্য ভুরু-চুল উপড়িয়ে ফেলে ও দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে, এরা আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি আনয়নকারী। এরপর বনু আস’আদ গোত্রের উম্মু ই’য়াব নামের এক মহিলার কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি এসে বললেন, আমি জানতে পারলাম, আপনি এরকম এরকম মহিলাদের প্রতি লা’নাত করছেন। তিনি বলেন, তার প্রতি লা’নাত করবো না কেন? যার প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম লা’নাত করেছেন আর যা আল্লাহর কিতাবেও আছে? তখন মহিলা বলেন, আমি দু’ ফলকের মাঝে যা আছে তা (পূর্ণ কুরআন) পড়েছি। কিন্তু আপনি যা বলেন, তা তো এখানে পাইনি। তিনি বলেন, যদি তুমি কুরআন পড়তে তাহলে অবশ্যই তা পেতে, তুমি কি পড়নি?
{ وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا }
অর্থাৎ ‘রাসূল তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাক’, [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৭]।
মহিলা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন, নিশ্চয় তিনি এ কাজ করতে নিষেধ করেছেন। তখন মহিলা বলেন, আমার মনে হয় আপনার পরিবারও এ কাজ করে। তিনি বলেন, আপনি যান এবং দেখে আসেন। তারপর মহিলা গেলেন এবং দেখে এলেন। কিন্তু তার প্রয়োজনের কিছুই দেখতে পেলেন না। তখন ‘আব্দুল্লাহ বলেন, যদি সে (স্ত্রী) এমন করত, তবে আমি তার সাথে সহবাস করতাম না ( সহীহুল বুখারী ৬/১৪৭, নং ৪৮৮৬, সহীহ মুসলিম ৩/১৬৭৮, নং ২১২৫, কিতাবুল লু’লু ওয়াল মারজান, পৃ. ৬৪১ )।
নারীগণের এসব কর্ম যদি সৌন্দর্য বর্ধনের উদ্দেশ্যে হয় তাহলে তারা লা’নাতের উপযুক্ত আর যদি চিকিৎসা কিংবা দাঁতে কোনো অসুবিধা আছে তা দূর করার উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে হারাম নয়। হাদীসে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদের স্ত্রী যদি রাসূলুল্লাহ কর্তৃক এসব নিষিদ্ধ কর্মগুলো করতেন, তাহলে তিনি তার সাথে একত্রে বসবাস করতেন না বরং তাকে তালাক দিতেন (দেখুন, ইমাম আন-নববী, শারহ সহীহ মুসলিম ১৪/১০৬ )।
রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে তার অনুসরণকে এতোটাই গুরুত্ব ও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতেন।
২১- রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ অনুযায়ী মহিলা সাহাবীগণের রাস্তার দেওয়ালের সঙ্গে মিশে দাঁড়ানো, রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ হচ্ছে যে, ‘তোমরা মেয়েরা পথ চলার সময় রাস্তার এক পাশ দিয়ে চলা উচিৎ’। এ নির্দেশনা পাওয়ার পর নারী সাহাবীগণ সাথে সাথে তা পালন করেছেন। এ বিষয়ে আবু উসাইদ আল আনসারী (রা) বর্ণিত একটি হাদীস এখানে উল্লেখ করা হলো, তিনি বলেন,
أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ وَهُوَ خَارِجٌ مِنَ الْمَسْجِدِ، فَاخْتَلَطَ الرِّجَالُ مَعَ النِّسَاءِ فِي الطَّرِيقِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِلنِّسَاءِ : اسْتَأْخِرْنَ فَإِنَّهُ لَيْسَ لَكُنَّ أَنْ تَحْقُقْنَ الطَّرِيقَ عَلَيْكُنَّ بِحَافَاتِ الطَّرِيقِ. فَكَانَتِ الْمَرْأَةُ تَلْتَصِقُ بِالْجِدَارِ حَتَّى إِنَّ ثَوْهَا
لَيَتَعَلَّقُ بِالْجِدَارِ مِنْ لُصُوقِهَا بِهِ.
তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শুনেছেন যে, তিনি মাসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় রাস্তায় নারী ও পুরুষদের একত্রে মেলা-মেশা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মেয়েদেরকে বলেন, ‘তোমরা অপেক্ষা কর! কারণ মাঝপথ দখল করে চলা তোমাদের জন্য শোভনীয় নয়। তোমাদের রাস্তার এক পাশ দিয়ে চলা উচিৎ’। ফলে মেয়েরা রাস্তার দেওয়ালের পাশ দিয়ে এমনভাবে ঘেঁসে যেতেন যে, তাদের পরিধেয় বস্ত্র দেওয়ালের সাথে লেগে যেত (সুনান আবী দাউদ, ৪/৩৬৯, নং ৫২৭২, আত্-তাবারানী, আল-মু’জামুল কাবীর ১৯/২৬১, নং ৫৮০ আল-বাইহাকী, শু’আবুল ঈমান ১০/২৪০, নং ৭৪৩৭, আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন )।
নবী (সা) এর প্রতি মহিলা সাহাবীগণের অগাধ ও অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণেই তারাও সবসময় তার আদেশ ও নিষেধ মেনে চলতেন। তার ভালোবাসায় তারা সিক্ত ছিলেন বলে তার নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও পরিপূর্ণ অনুসরণ করার অসংখ্য উদাহরণ মহিলা সাহাবীদের জীবন চরিতে বিদ্যমান আছে।
বর্তমান সময়ে মুসলিম নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে মিলে যেন রাসূলুল্লাহর (সা) রীতি-নীতি ও আদেশ-নিষেধের বিরুদ্ধাচরণ করাই কর্তব্য মনে করে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে যুগোপযোগী ও প্রগতিশীল করে তুলছে। ইসলামের দুশমনদের পথ অনুসরণের ক্ষেত্রে তারা যে আন্তরিক এবং নিজেদেরকে তাদের বিশ্বস্ত ও অনুগত দাস হিসেবে প্রমাণ করতেই এ সব করে যাচ্ছে। অনেক মুসলিম পুরুষ প্রায় প্রতিনিয়ত রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাত ও জীবন আদর্শের বিপরীত কাজ করে। পাশ্চাত্য ধ্যান- ধারনার অন্ধ অনুকরণে তাদের সেবা দাসে পরিণত হয়ে নিজেদের ঈমান-বিশ্বাস, রসম-রেওয়ায ও কৃষ্টি-কালচার ধ্বংস করে যাচ্ছে। অপরদিকে অনেক মুসলিম নারী উগ্র সাজ-গোজ, বেশ ভূষায় পুরুষ মিশ্রিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বাজার ঘাট, ইত্যাদি স্থানে বের হয়ে নিজেদেরকে প্রগতিশীল প্রমাণ করছে। অমুসলিম মেয়েদের সাথে মুসলিম মেয়েরা একত্রে কোনো অনুষ্ঠানে থাকলে, কে মুসলিম নারী আর কে অমুসলিম নারী তা বোঝার কোনো উপায় থাকেনা। মুসলিম উম্মাহর এ করুণ অবস্থা থেকে আল্লাহর নিকট পরিত্রাণ চাই! আমীন!!
রাসূলুল্লাহর (সা) ভালোবাসায় সিক্ত সাহাবায়ে কিরামের তার প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও পরিপূর্ণ অনুসরণের এ ধরনের হাজারো উদাহরণ রয়েছে, যেগুলো মুসলিম উম্মাহর জন্য তাদের মুক্তি, শান্তি ও কল্যাণের প্রকৃত পথপ্রদর্শক, প্রিয় বিশ্ব নবী ও মানবতার বন্ধু রাসূলুল্লাহর (সা) প্রকৃত আনুগত্য ও পূর্ণ অনুসরণ ও অনুকরণের অনন্য মডেল। এসব উদাহরণের মাধ্যমে স্পষ্টভাবেই জানা যায় যে, কিভাবে রাসূলের (সা) আনুগত্য করতে হয় এবং কিভাবে তার অনুসরণ ও অনুকরণ করতে হয়। সাহাবায়ে কিরামের এই উদাহরণের বাইরে গিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা, তার নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও পরিপূর্ণ অনুসরণের দাবী নিছক দাবী। এর মধ্যে এই দাবীদারদের জন্য কোনো কল্যাণ নেই। সাহাবীগণের চেয়ে রাসূলকে অধিক ভালোবাসি, তাদের চেয়ে অধিক আনুগত্য করি, তাকে অধিক অনুসরণ করি ইত্যাদি ভাবার মধ্যে মূলতঃ কোনো সত্যতা নেই। নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণের কথার স্বপক্ষে অনেক দলীল প্রমাণ আছে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ }
‘আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা ইহসানের সাথে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন’, [সূরা আত্-তাওবাহ, আয়াত: ১০০]।
এ আয়াতে সাহাবায়ে কিরাম এবং নিষ্ঠার সাথে যারা পরবর্তীতে তাদেরকে অনুসরণ করেছেন তাদের প্রশংসা করা হয়েছে ( এ সম্পর্কে বিস্তারিত দেখুন, তাফসীরুল কুরতুবী ৮/২৩৫, ফাতহুল কাদীর ২/৪৫৩, ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ, সম্পাদনা, মুহাম্মাদ রাশাদ, প্রকাশক, জামি’য়াতুল ইমাম মুহাম্মাদ ইবন সা’উদ আল-ইসলামিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ-১৪০৬ হি. ৭/১৫৪-১৫৬ )।
সুতরাং সাহাবায়ে কিরাম হচ্ছেন রাসূলুল্লাহর (সা) আনুগত্য ও অনুসরণের উদাহরণ।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ : চতুর্থ নিদর্শন
রাসূলুল্লাহর (সা) উদ্দেশ্যে জীবন ও সম্পদ ব্যয় করার জন্য পূর্ণ প্রস্তুত থাকা।
আল্লাহ তা’আলা মুসলিম উম্মাহকে অনেক বড় দায়িত্ব ও বিশাল আমানাত দান করেছেন। আর তা হচ্ছে, বিশ্বজগত পরিচালনা ও মানবতার নেতৃত্ব দেওয়া এবং মানব গোষ্ঠীর হাত ধরে সরল সঠিক ও সত্যের পথে পরিচালিত করা। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا }
‘আর এভাবে আমরা তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতিতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা মানবজাতির উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল তোমাদের উপর সাক্ষী হতে পারেন’, [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৪৩]।
এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্য মুসলিম জাতিকে তার জান ও মালের কোরবানী করতে হয়। তারা জীবন ও সম্পদ ব্যয় করে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করা, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা এবং বাতিলের বিষদাঁত উপড়ে ফেলার মাধ্যমে মহান রব আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করে। কারণ আল্লাহর দ্বীন এবং তাঁর রাসূলের (সা) পথে তাদের জীবন ও সম্পদসহ সবকিছু কুরবানী করা এবং এ পথে সার্বিক ও সামগ্রিক সাহায্য করা ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আর কোনো পথ খোলা নেই। এমন কি আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ বা দ্বীন প্রতিষ্ঠার সার্বিক আন্দোলন কোনো ব্যক্তির নিকট অধিক প্রিয় না হলে তার জন্য কঠিন শাস্তির হুঁসিয়ারী রয়েছে। [দেখুন, সূরা আত্-তাওবাহ, আয়াত: ২৪]।
এ কারণেই দ্বীন বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠার দায়িত্বপ্রাপ্ত সর্বশেষ রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ঈমান পোষণ করা, তাকে সর্বাধিক ভালোবাসা এবং তার উদ্দেশ্যে জীবন ও সম্পদ ব্যয় করা মুসলিম উম্মাহর মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য অপরিহার্য। রাসূলুল্লাহকে (সা) অবজ্ঞা করে এবং তার প্রতি উদাসীন থেকে কারো জন্য মুক্তির কোনো পথ খোলা নেই। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{مَا كَانَ لِأَهْلِ الْمَدِينَةِ وَمَنْ حَوْلَهُمْ مِنَ الْأَعْرَابِ أَنْ يَتَخَلَّفُوا عَنْ رَسُولِ اللَّهِ وَلَا يَرْغَبُوا بِأَنْفُسِهِمْ عَنْ نَفْسِهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ لَا يُصِيبُهُمْ ظَمَا وَلَا نَصَبٌ وَلَا مَخْمَصَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَطَئُونَ مَوْطِئًا يَغِيظُ الْكُفَّارَ وَلَا يَنَالُونَ مِنْ عَدُوٌّ نَيْلًا إِلَّا كُتِبَ لَهُمْ بِهِ عَمَلٌ صَالِحٌ إِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ}
‘মাদিনাবাসী ও তাদের পার্শ্ববর্তী মরুবাসীদের জন্য সঙ্গত নয় যে, তারা আল্লাহর রাসূলের (সা) সহগামী না হয়ে পেছনে রয়ে যাবে এবং তার জীবনের চেয়ে নিজেদের জীবনকে প্রিয় মনে করবে; কারণ আল্লাহর পথে তাদেরকে যে তৃষ্ণা, ক্লান্তি ও ক্ষুধা পেয়ে বসে এবং কাফিরদের ক্রোধ উদ্রেক করে তাদের এমন প্রতিটি পদক্ষেপ আর শত্রুদেরকে কোনো কষ্ট প্রদান করে, তা তাদের জন্য সৎকাজরূপে লিপিবদ্ধ করা হয়। নিশ্চয় আল্লাহ মুহসিনদের কাজের প্রতিফল নষ্ট করেন না’, [সূরা আত্-তাওবাহ, আয়াত : ১২০]।
এই ধ্যান-ধারনা, বিশ্বাস ও বাস্তব সত্যের উপরই রাসূলুল্লাহ (সা) তার সাহাবীগণকে গড়ে তুলেছেন, তাদেরকে প্রশিক্ষিত করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু, তাঁর রাসূল (সা) এবং তাঁর দ্বীনের জন্য তারা তাদের জীবন, সম্পদ ও সন্তানাদি সব কিছু ত্যাগ করতে পারেন। এসব কিছুকে তার উদ্দেশ্যে কুরবানী করতে তারা একটুও কুণ্ঠিত নয়। তারা রাসূলুল্লাহর (সা) শানে কারো কটু কথা বলা, কষ্ট দেওয়া এমনকি তার শরীরে সামান্য কাঁটা ফুটতে দিতেও প্রস্তুত নয়। নিজেদের জীবনের বিনিময়ে হলেও তাকে কাঁটার সামান্য আঁচর পর্যন্ত লাগতে দিতে তৈরি নয়। যেহেতু সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহকে (সা) নিজেদের সবকিছুর চেয়ে ভালোবাসতেন। তারা ছিলেন তার ভালোবাসায় সিক্ত। তাই তারা তার উদ্দেশ্যে জীবন, সম্পদ, সন্তানাদি সবকিছু তার জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। আর এটাই তো স্বাভাবিক; কেননা মানুষের স্বাভাবিক জীবন ধারাতেও লক্ষ্য করা যায় যে, মানুষ যাকে অকৃত্রিম ভালোবাসে তার জন্য সে নিজের আরাম আয়েশ, সহায় সম্পত্তি এমনকি নিজের জীবন দিয়ে দেওয়ার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকে।
রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীগণ তাকে নিজেদের জীবন ও সম্পদের চেয়ে ভালোবাসতেন। তাই তারা তার উদ্দেশ্যে সকল প্রকার ত্যাগ ও কুরবানীর নজির স্থাপন করেছেন। রেখেছেন ত্যাগের ও কুরবানীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ত্যাগের মহিমায় তারা ছিলেন দীপ্ত। ত্যাগ ও তিতিক্ষার ক্ষেত্রে তারা কি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন হাদীস, সীরাত ও ইসলামী সাহিত্যে সেসব দিয়ে পৃষ্ঠা ভরপুর ( ড. ফযল ইলাহী, হুদুন নবী, পৃ. ৪৩ )।
নিম্নে তার কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো:
১- রাসূলুল্লাহকে (সা) কাফিরদের নির্যাতন থেকে মুক্ত করতে আবু বকরের জীবনের ঝুঁকি গ্রহণ, রাসূলুল্লাহ (সা) কা’বা প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন। এমন সময় ‘উকবাহ ইবন আবি মু’আইত এসে তার চাদরটি রাসূলের (সা) গলায় পেঁচিয়ে তাকে ফাঁস দেওয়ার জন্য শক্ত করে টান দেয়। তখন আবু বকর সিদ্দীক (রা) তার কাছে আসেন এবং তাকে তার হাত থেকে রক্ষা করেন, এবং বলেন, তোমরা এমন একজন ব্যক্তিকে হত্যা করতে উদ্যেত হয়েছো, যিনি বলেন, আমার রব হলেন আল্লাহ, অথচ তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দলীল প্রমাণ সহ এসেছে। তখন কাফিরগণ আবু বকরকে মারতে শুরু করে এবং তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তারপর তাকে বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া হয়। জ্ঞান ফিরে পাওয়া মাত্র তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কেমন আছেন?। এ ঘটনা সম্পর্কে ‘উরওয়াহ ইবনুয যুবাইর বলেন, আমি ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমর ইবনুল ‘আসকে বললাম, মুশরিকগণ রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সবচেয়ে কঠোর যে ব্যবহার করেছিল সে সম্পর্কে আমাকে কিছু বলুন। ‘আমর ইবনুল ‘আস বলেন,
بَيْنَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي فِي حِجْرِ الكَعْبَةِ، إِذْ أَقْبَلَ عُقْبَةُ بْنُ أَبِي مُعَيْطٍ، فَوَضَعَ ثَوْبَهُ فِي عُنُقِهِ، فَخَنَقَهُ خَلْقًا شَدِيدًا، فَأَقْبَلَ أَبُو بَكْرٍ حَتَّى أَخَذَ بِمَنْكِبِهِ، وَدَفَعَهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: {أَتَقْتُلُونَ رَجُلًا أَنْ يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ، وَقَدْ جَاءَكُمْ بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ رَبِّكُمْ}
একবার রাসূলুল্লাহ (সা) কা’বা প্রাঙ্গনে সালাত আদায় করছিলেন, এমতাবস্থায় ‘উকবাহ ইবন আবি মু’আইত আসল। অতঃপর তার কাপড়টি তার গলায় পেঁচিয়ে দিল, এবং তাকে শক্তভাবে গলায় ফাঁস আটকিয়ে দিল।
এমন সময় আবু বকর আসলেন এবং তার দু’কাঁধ ধরে তাকে ধাক্কা দিয়ে নবী (সা) থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন এবং বললেন,
{ أَتَقْتُلُونَ رَجُلًا أَنْ يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ ، وَقَدْ جَاءَكُمْ بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ رَبِّكُمْ}
“তোমরা কি এমন এক ব্যক্তিকে এ জন্য হত্যা করবে যে, সে বলে, আমার রব আল্লাহ, অথচ সে তোমাদের রবের কাছ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ তোমাদের কাছে এসেছে?” [সূরা আল-মু’মিন, সূরা: ২৮] (সহীহুল বুখারী ৫/৪৬, নং ৩৮৫৬, ৫/১০, নং ৩৬৭৮, ৬/১২৭, নং ৪৮১ ) ।
আসমা বিনত আবি বকর (রা) এর বর্ণনায় অধিক বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, আবু বকরের নিকট যখন এ আওয়াজ পৌঁছাল যে, তোমার সাথীকে বাঁচাও। তিনি তখন অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে আমাদের মধ্য থেকে বের হয়ে গেলেন। তার মাথায় চারটি ঝুঁটি ছিল। তিনি বলতে বলতে গেলেন যে, তোমরা ধ্বংস হও أَتَقْتُلُونَ رَجُلًا أَنْ يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ ! তোমরা এক ব্যক্তিকে এ জন্য হত্যা করবে যে, সে বলে, আমার রব আল্লাহ’। এরপর মুশরিকগণ নবী (সা) কে ছেড়ে দিয়ে আবু বকরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তিনি যখন বাড়ীতে ফিরে আসলেন তখন তার অবস্থা ছিল এরূপ যে, তার চুলের মধ্য থেকে যে ঝুঁটিটিই স্পর্শ করা হচ্ছিল, সেটিই সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসছিল (হীহুল বুখারী ৫/৪৬, নং ৩৮৫৬, ৫/১০, নং ৩৬৭৮, ৬/১২৭, নং ৪৮১৫, ৩৭. আবু বাকর আল-হুমাইদী, মুসনাদুল হুমাইদী, সম্পাদনা, হাসান সেলীম আদ্-দারানী, দামেস্ক-দারুস সাকা, ১ম সংস্করণ, ১৯৯৬ ঈ, ১/৩২৪, নং ৩২৬, মুসনাদ আবু ইয়া’লা ১/৫২, নং ৫২, আর দেখুন, মোবারাকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১৩৬ (বাংলা সংস্করণ )।
এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, আবু বকর (রা) নিজের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে তার সর্বাধিক প্রিয়জন রাসূলুল্লাহকে (সা) নির্যাতন থেকে রক্ষা করেছেন। নিজের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করেও তার প্রতিরোধ করেছেন। সে কারণে তিনি নির্যাতিত হয়ে জ্ঞান পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছিলেন। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর প্রথমেই তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) অবস্থার খোঁজ-খবর নিয়েছেন। এসব কারণেই তো আবু বকর (রা) উম্মাতের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদা লাভ করেছেন।
২- রাসূলুল্লাহর (সা) জীবন নাশের ভয়ে আবু বকরের কান্না, রাসূলুল্লাহ (সা) মহান রাব্বুল ‘আলামীন আল্লাহর নির্দেশে মদীনায় হিজরতের উদ্দেশ্যে প্রিয় সাথী আবু বকর (রা) কে সঙ্গে নিয়ে মদীনার দিকে রওয়ানা হলেন। মক্কার কাফির-মুশরিকগণ তাদের অনুসন্ধানে পিছু ছুটলো। তাদেরই একজন সুরাকাহ বিন মালিক মরুভূমির পথে রাসূলুল্লাহ (সা) ও আবু বকর (রা) এর খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেল। তাদের মাঝে মাত্র কয়েক মিটারের দুরত্ব ছিল। মনে হয় যেন সুরাকা এখনই তাদেরকে ধরে ফেলবে আর কি। এমতাবস্থায় আবু বকর নিজের জীবনের আশঙ্কা না করে তার একান্ত ভালোবাসার মানুষ সর্বাধিক প্রিয় রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনের ভয়ে অস্থির হয়ে উঠেন এবং মনের কষ্টে কাঁদতে শুরু করেন। এমন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা) নিজে অত্যন্ত প্রশান্ত চিত্তে প্রিয় সাথীকে শান্ত্বনা দেন এবং বলেন, চিন্তা করো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। বিশিষ্ট সাহাবী আল-বারা ইবন ‘আযিব (রা) আবু বকর (রা) এর ভাষায় এ ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন। আবু বকর বলেন, ‘আমরা মদীনাহ অভিমুখে রওয়ানা হলাম। কাফেরের দল আমাদেরকে পাকড়াও করার জন্য পিছু নিল। সুরাকাহ ইবন মালিক ইবন জু’শাম নামক এক অশ্বারোহী ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ আমাদেরকে নাগালের মধ্যে পায়নি। সুরাকাকে অতি নিকটবর্তী হতে দেখে আমি বললাম,
يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَذَا الطَّلَبُ قَدْ لَحِقَنَا. فَقَالَ: {لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا}، حَتَّى إِذَا دَنَا مِنَّا فَكَانَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُ قَدْرُ رُمْحٍ أَوْ رُمْحَيْنِ أَوْ ثَلَاثَةٍ، قَالَ: قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللهِ ، هَذَا الطَّلَبُ قَدْ لَحِقْنَا. وَبَكَيْتُ، قَالَ: لِمَ تَبْكِي؟ قَالَ: قُلْتُ: أَمَا وَاللهِ مَا عَلَى نَفْسِي أَبْكِي، وَلَكِنْ أَبْكِي عَلَيْكَ، قَالَ: فَدَعَا عَلَيْهِ
رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: اللَّهُمَّ اكْفِنَاهُ بِمَا شِئْتَ. فَسَاحْتْ قَوَائِمُ فَرَسِهِ إِلَى بَطْنِهَا فِي أَرْضِ صَلْدٍ، وَوَثَبَ عَنْهَا، وَقَالَ: يَا مُحَمَّدُ، قَدْ عَلِمْتُ أَنَّ هَذَا عَمَلُكَ، فَادْعُ اللهَ أَنْ يُنَجِّيَنِي مِمَّا أَنَا فِيهِ، فَوَاللَّهِ لَأُعَمِّيَنَّ عَلَى مَنْ وَرَائِي مِنَ الطَّلَبِ، وَهَذِهِ كِنَانَتِي فَخُذْ مِنْهَا سَهْمًا، فَإِنَّكَ
سَتَمُرُّ بِإِبْلِي وَغَنَمِي فِي مَوْضِعِ كَذَا وَكَذَا، فَخُذْ مِنْهَا حَاجَتَكَ. قَالَ: فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا حَاجَةَ لِي فِيهَا. قَالَ: وَدَعَا لَهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأُطْلِقَ، فَرَجَعَ إِلَى أَصْحَابِهِ.
হে আল্লাহর রাসূল! এই ব্যক্তি তো আমাদেরকে প্রায় ধরে ফেললো। তিনি তখন বলেন, { لا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا }’দুশ্চিন্তা করো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন’ [সূরা আত্ তাওবাহ, আয়াত ৪০]।
এমনকি সুরাকা যখন আমাদের খুব কাছাকাছি; এক বর্শা বা দু’বর্শা কিংবা তিন বর্ণা পরিমাণ এসে গেল, তখন আমি পুনরায় বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এই ব্যক্তি তো আমাদেরকে ধরে ফেলল এবং কাঁদলাম। তিনি বলেন, কাঁদছ কেন? আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! আমি নিজের জীবনের চিন্তা করে কাঁদিনা বরং আপনার জীবনের কথা ভেবে কাঁদছি। তিনি বলেন, অত:পর আল্লাহর রাসূল (সা) সুরাকার উপর বদ দু’আ করলেন যে, اللَّهُمَّ أَكْفِنَاهُ بِمَا شِئْتَ ‘হে আল্লাহ! আপনার ইচ্ছা মতো ব্যবস্থা দিয়ে আমাদেরকে তার হাত থেকে রক্ষা করুন’! তৎক্ষণাৎ সুরাকার ঘোড়ার পাগুলো শক্ত মাটির ভেতর পেট পর্যন্ত দেবে গেল। সে লাফিয়ে তার ঘোড়া থেকে নিমে গেল এবং বলল, হে মুহাম্মাদ! আমি নিশ্চিতভাবে আপনার কর্ম সম্পর্কে জেনে গেছি। আপনি আল্লাহর কাছে দু’আ করুন, তিনি যেন আমি যে অবস্থার মধ্যে আছি তা থেকে আমাকে রক্ষা করেন। আল্লাহর শপথ! আমার পেছনে যেসব অনুসন্ধানকারী দল আছে তাদেরকে আপনার সম্পর্কে অন্ধকারে রাখবো। এই যে, আমার তীর রাখার পাত্র, এ থেকে আপনার ইচ্ছা মতো তীর নিয়ে নিন। আবার আপনি অমুক অমুক স্থান দিয়ে অতিক্রম করার সময় দেখবেন, সেখানে আমার উট ও ছাগল আছে, আপনি প্রয়োজন মতো সেখান থেকে উট-ছাগল নিয়ে নিন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, এগুলোতে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। তারপর তার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) দু’আ করেন। তখন সে ছাড়া পায় এবং তার সাথীদের কাছে ফিরে যায় ( মুসনাদে আহমাদ, ১/১৮১, নং ৩, সহীহ ইবন হিব্বান ১৪/১৮৯, নং ৬২৮১। হাদীসটি শব্দের পার্থক্যসহ সহীহুল বুখারী ৪/২০১, নং ৩৬১৫, ৫/৩, নং ৩৬৫২, সহীহ মুসলিম ৪/২৩০৯, নং ২০০৯ তে আল- বারা থেকে বর্ণিত হয়েছে )।
জীবন নাশের এই সন্ধিক্ষণে আবু বকর (রা) নিজের জীবনের কথা চিন্তা না করে রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনের জন্য কাঁদতে থাকেন। নিজের জীবনের চেয়ে রাসূলকে (সা) কত বেশি ভালোবাসলে এই অবস্থা সৃষ্টি হওয়া সম্ভব তা সহজেই অনুমেয়। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি উম্মাতের এই মাত্রার ভালোবাসা থাকতে হবে। প্রয়োজনে নিজের জীবনকে বাজি রেখে রাসূলুল্লাহর (সা) জীবন, তার সম্মান ও তার দ্বীন ও জীবন আদর্শকে রক্ষা করতে হবে।
৩- রাসূলুল্লাহকে (সা) রক্ষা করা এবং তার পক্ষে প্রতিরোধ করার প্রবল আকাঙ্খা পোষণ, মক্কায় ইসলামের প্রচার ও ইসলাম গ্রহণের মাত্রা যতই বৃদ্ধি পেতে থাকে ততই মুশরিক কুরাইশদের অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা ও প্রকার বৃদ্ধি পেতে থাকে। তারা স্বয়ং রাসূলুল্লাহকে (সা) নানাভাবে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করতে থাকে। মক্কায় তখন মুসলিমদের অবস্থা খুবই ভয়ানক। নির্যাতন-নিপীড়ন প্রতিহত করার সামান্য শক্তিও তাদের ছিল না। এমতাবস্থায়ও দুর্বল সাহাবীগণ নিজেরাও নিগৃহীত হয়েছে আবার তাদের কারো কারো সামনে কা’বা ঘরের প্রাঙ্গনে রাসূলুল্লাহকে (সা) নানা রকমের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করতে দেখতেন। তারা রাসূলুল্লাহকে (সা) এতোটাই ভালোবাসতেন যে, এসব নির্যাতনের মুখে তাদের মন ভেঙে চুরমার হয়ে যেত। কিন্তু প্রতিবাদ করার প্রকাশ্য সাহস তাদের হতো না। তারা নীরবে দু’চোখের পানি ফেলে কেবল বলতেন ‘হায় আমার যদি তাকে রক্ষা করার এতোটুকু ক্ষমতা থাকত। এমনি একটি দুঃসহ হৃদয় বিদারক ঘটনার বিবরণ প্রথম যুগের ইসলাম গ্রহণকারী বিশিষ্ট সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, একদা আল্লাহর নবী (সা) বাইতুল্লাহর পাশে সালাত আদায় করছিলেন। তখন আবু জাহলের কথায় আরবদের মধ্যে নিকৃষ্টতম ব্যক্তি ‘উকবা ইবন আবি মু’আইত উটের ভুঁড়ি নিয়ে এসে সিজদারত রাসূলুল্লাহর (সা) ঘাড় ও পিঠের ওপর চাপিয়ে দিল। ইবন মাস’উদ বলেন, আমি সবই দেখছিলাম, কিন্তু কোনো কিছু করার ক্ষমতা আমার ছিলনা। হায়! যদি আমার মধ্যে তাকে বাঁচানোর কোনো ক্ষমতা থাকত!(আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১২৪ (বাংলা সংস্করণ )
বিভিন্ন সহীহ হাদীসেও এ ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) বলেন,
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُصَلِّي عِنْدَ البَيْتِ، وَأَبُو جَهْلٍ وَأَصْحَابٌ لَهُ جُلُوسٌ ، إِذْ قَالَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ : أَيُّكُمْ يَجِيءُ بِسَلَى جَزُورٍ بَنِي فُلانٍ، فَيَضَعُهُ عَلَى ظَهْرِ مُحَمَّدٍ إِذَا سَجَدَ؟ فَانْبَعَثَ أَشْقَى القَوْمِ فَجَاءَ بِهِ، فَنَظَرَ حَتَّى سَجَدَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَضَعَهُ عَلَى ظَهْرِهِ
بَيْنَ كَتِفَيْهِ، وَأَنَا أَنْظُرُ لَا أُغْنِي شَيْئًا، لَوْ كَانَ لِي مَنَعَةٌ، قَالَ: فَجَعَلُوا يَضْحَكُونَ وَيُحِيلُ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ، وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَاجِدٌ لا يَرْفَعُ رَأْسَهُ، حَتَّى جَاءَتْهُ فَاطِمَةُ، فَطَرَحَتْ عَنْ ظَهْرِهِ، فَرَفَعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأْسَهُ ثُمَّ قَالَ : اللَّهُمَّ عَلَيْكَ بِقُرَيْشٍ
ثَلَاثَ مَرَّاتٍ، فَشَقَّ عَلَيْهِمْ إِذْ دَعَا عَلَيْهِمْ، قَالَ: وَكَانُوا يَرَوْنَ أَنَّ الدَّعْوَةَ فِي ذَلِكَ البَلَدِ مُسْتَجَابَةٌ، ثُمَّ سَمَّى : اللَّهُمَّ عَلَيْكَ بِأَبِي جَهْلٍ، وَعَلَيْكَ بِعُتْبَةَ بْنِ ربيعة، وَشَيْبَةَ بْنِ رَبِيعَةَ، وَالوَلِيدِ بْنِ عُتْبَةَ، وَأُمَيَّةَ بْنِ خَلَفٍ، وَعُقْبَةَ بْنِ أَبِي مُعَيْدٍ، وَعَدَّ السَّابِعَ فَلَمْ يَحْفَظْ، قَالَ: فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَقَدْ
رَأَيْتُ الَّذِينَ عَدَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَرْعَى فِي القَلِيبِ قَلِيبِ بَدْرٍ
নবী (সা) বাইতুল্লাহর নিকট সালাত আদায় করছিলেন। এমতাবস্থায় আবু জাহল ও তার সঙ্গীরা সেখানে বসা ছিল। এদের কোনো এক ব্যক্তির মধ্যে কোনো এক ব্যক্তি অন্যদেরকে বলল, কে এমন আছে যে, অমুক গোত্র থেকে উটের ভূঁড়ি আনবে এবং মুহাম্মাদ যখন সিজদায় যাবে তখন এটাকে তার পিঠের উপর চাপিয়ে দেবে? তখন ঐ সম্প্রদায়ের নিকৃষ্টতম ব্যক্তি ‘উকবা ইবন আবু মু’আইত দ্রুত উঠে গেল এবং ভুঁড়িটা নিয়ে এসে অপেক্ষা করতে থকাল। যখন নবী (সা) সিজদায় গেলেন তখন সে ভুঁড়িটা নিয়ে তার পিঠের দিকে দু’ কাঁধের মাঝখানে রাখল। আমি সব কিছুই দেখছিলাম, কিন্তু কোনো কিছু করার ক্ষমতা আমার ছিল না। হায়, আমার যদি প্রতিরোধ করার ক্ষমতা থাকত! তিনি বলেন, এর পর তারা আনন্দ-উন্মত্ততায় হাসাহাসি করতে করতে একজন আরেকজনের গায়ে পড়তে লাগল। আর রাসূলুল্লাহ (সা) সিজদারত অবস্থায় আছেন, তিনি মাথা তুলতে পারছিলেন না। এমতাবস্থায় তার কন্যা ফাতিমা আসলেন এবং তার পিঠের উপর থেকে তা সরিয়ে দিলেন। তাখন রাসূলুল্লাহ (সা) তার মাথা উঠালেন। অতঃপর বললেন, হে আল্লাহ! আপনি কুরাইশকে পাকড়াও করুণ! তিন তিনবার বলেন। তিনি তাদের নামে বদ দু’আ করেছেন এটা তাদের কাছে খুব কঠিন মনে হলো। কারণ তারা এটা বিশ্বাস করত যে, এ শহরের মধ্যে দু’আ কবুল হয়ে থাকে। তারপর তিনি নাম ধরে ধরে বললেন, হে আল্লাহ! আপনি আবু জাহলকে পকাড়াও করুন! ‘উতবা ইবন রাবী’আহকে, শাইবাহ ইবন রাবী’আহকে, আল-ওয়ালীদ ইব ‘উতবাহকে, উমাইয়া ইবন খালাফ এবং ‘উকবাহ ইবন আবি মু’আইতকে পাকড়াও করুন। আর তিনি সপ্তম জনের নামও বলেছেন, কিন্তু বর্ণনাকারীর তা স্মরণ নেই। ইবন মাস’উদ বলেছেন, সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার জীবন!
রাসূলুল্লাহ (সা) যাদের নাম গুনে গুনে বলেছিলেন, আমি তাদের সকলকে বদর যুদ্ধে নিহত হয়ে কূপের অর্থাৎ বদরের কূপের মধ্যে পতিত অবস্থায় দেখেছি’ (সহীহুল বুখারী ১/৫৭, নং ২৪০, ৪/১০৪, নং ৩১৮৫, সহীহ মুসলিম ৩/১৪১৮, নং ১৭৯৪ )।
অন্য বর্ণনায় আছে, ইবন মাস’উদ (রা) বলেন,
وَأَنَا قَائِمٌ أَنْظُرُ ، لَوْ كَانَتْ لِي مَنَعَةٌ طَرَحْتُهُ عَنْ ظَهْرِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
আর আমি দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, আমার যদি কোনো ক্ষমতা থাকত, তাহলে আমি ভুঁড়িটাকে রাসূলুল্লাহর (সা) পিঠ থেকে সরিয়ে দিতাম (সহীহ মুসলিম ৩/১৪১৮, নং ১৭৯৪ )।
মক্কায় রাসূলুল্লাহ (সা) ও নব মুসলিমদের উপর নির্যাতনের এই কঠিন অবস্থায় ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) এর মতো সামাজিকভাবে চরম দুর্বল ব্যক্তির পক্ষে নির্দয়, পাষণ্ড কুরাইশদের হাত থেকে তার জীবনের চেয়ে প্রিয় রাসূলুল্লাহকে (সা) উদ্ধার করা সম্ভবয় হয়নি বটে, কিন্তু তার মনের আকুতি ছিল যে, তার সামান্য ক্ষমতা থাকলেও তিনি তাকেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতেন। না, তার সে ক্ষমতা ছিল না, তাই ব্যথিত মন নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রিয় মানুষটির কঠিন অবস্থা অবলোকন করছিলেন।
৪- যুদ্ধের ময়দানসহ সর্বত্র সাহাবীগণের সর্বদা রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে থাকার অঙ্গিকার, বদরের প্রান্তরে আকস্মিক অনিবার্য যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সা) উচ্চ পর্যায়ের এক সামরিক পরামর্শ সভার আয়োজন করেন। অবস্থার অকস্মাৎ ভয়াবহ মোড় পরিবর্তনের ফলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কথা অবগত হয়ে একদল সাহাবী মনে মনে ভয় পেতে থাকেন। কিন্তু আবু বকর, ‘উমার এবং আল-মিকদাদ (রা) দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহকে (সা) উৎসাহ ব্যঞ্জক পরামর্শ দিলেন এবং অতি চমৎকার কথা বললেন, আল- মিকদাদ তো বললেন, আপনার মনে যা উদয় হয় তাই আপনি সিদ্ধান্ত নিন, আমরা সর্বাবস্থায় আপনার সাথে আছি। আমরা মূসা (আ) এর সম্প্রদায়ের মতো আপনাকে একা যেতে বলবো না। তারা তিনজনই ছিল মুহাজির সাহাবী। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) এর অভিপ্রায় ছিল আনসারগণও কথা বলুক। কারণ তাদের সংখ্যাই বেশি ছিল। বিষয়টি টের পেয়ে আনসারদের মধ্য থেকে তাদের অধিনায়ক সা’দ ইবন মু’আয (রা) কথা বলেন এবং একই রকম শপথ করে প্রতিশ্রুতির কথা পূর্ণর্ব্যক্ত করে বলেন, আমরা সর্বক্ষণ আপনার সাথে আছি। আপনি যদি অগ্রসর হয়ে বারকে গিমাদ পর্যন্ত চলে যান তাহলেও আমরা আপনার সঙ্গেই যাব। আর যদি আপনি আমাদের নিয়ে ঐ সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়তে চান তবে আমরাও তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ব ( মুসনাদ আহমাদ ২১/২২, নং ১৩২৯৬, আর দেখুন, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৫২-২৫৩ )।
রাসূলুল্লাহ (সা) অত্যন্ত খুশী হয়ে পরবর্তী কর্মসূচীতে মনোনিবেশ করেন। আল-মিকদাদের ঘটনা প্রসঙ্গে ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘আমি আল-মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা) এর একটি দৃশ্য দেখেছি, যে দৃশ্যের নায়ক হওয়া আমার নিকট পৃথিবীর সমস্ত বস্তুর চেয়ে অধিক প্রিয়। আল-মিকদাদ নবী (সা) এর নিকট এমন সময় আসলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (সা) মুশরিকদের বিরুদ্ধে দু’আ করছিলেন। আল-মিকদাদ বলেন,
لَا نَقُولُ كَمَا قَالَ قَوْمُ مُوسَى اذْهَبْ أَنْتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِلَا وَلَكِنَّا نُقَاتِلُ عَنْ يَمِينِكَ وَعَنْ شِمَالِكَ وَبَيْنَ يَدَيْكَ وَخَلْفَكَ فَرَأَيْتُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَشْرَقَ وَجْهُهُ وَسَرَّهُ
আমরা এমনটি বলবো না, যেমন মুসার কওম বলেছিল, ‘তুমি আর তোমার পালনকর্তা দুজনে গিয়ে যুদ্ধ কর’, বরং আমরা আপনার ডান পাশে, বাম পাশে, সম্মুখ থেকে এবং পেছন থেকে লড়াই করবো’। আমি নবী (সা) এর দিকে তাকিয়ে দেখলাম যে, (আল-মিকদাদের এ কথার পর) তার মুখমন্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তিনি আনন্দিত হয়েছেন’ ( সহীহুল বুখারী, ৫/৭৩, নং ৩৯৫২, মুসনাদ আহমাদ ৬/২২৭, নং ৩৬৯৮ )।
একইভাবে আনাস (রা) আরো বলেন,
فَقَامَ سَعْدُ بْنُ عُبَادَةَ، فَقَالَ: إِيَّانَا تُرِيدُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَوْ أَمَرْتَنَا أَنْ تُحِيضَهَا الْبَحْرَ لَأَخَضْنَاهَا، وَلَوْ أَمَرْتَنَا أَنْ نَضْرِبَ أَكْبَادَهَا إِلَى بَرْكِ الْعِمَادِ لَفَعَلْنَا،
তখন সা’দ ইবন ‘উবাদাহ (হাদীসে সা’দ ইবন ‘উবাদার কথা বলা হয়েছে, কোন কোন সীরাত গ্রন্থে সা’দ ইবন মু’আযের কথা উল্লেখ রয়েছে ) দাঁড়ালেন, অতঃপর বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাদেরকে বুঝাতে চাচ্ছেন? ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জীবন! আপনি যদি আমাদের ঘোড়াগুলোকে সমুদ্রে ঝাঁপ নির্দেশ করেন আমরা অবশ্যই সাগরে ঝাঁপ দেব। আপনি যদি নির্দেশ দেন যে, আমরা ঘোড়াগুলোকে পদাঘাত করে অগ্রসর হয়ে বারকে গিমাদ পর্যন্ত পৌছে যাই, আমরা অবশ্যই তা করব’ (সহীহ মুসলিম ৩/১৪০৪, নং ১৭৭৯, মুসনাদ আহমাদ ২১/২৬৩, নং ১৩৭০৩)।
স্মর্তব্য যে, এই ঘটনায় আল-মিকদাদ এবং সা’দ ইবন ‘উবাদাহ (রা) নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার দরুনই তাদের পক্ষে এমনভাবে নিজেদেরকে পেশ করা সম্ভব হয়েছে। একইভাবে এখানে আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) আল-মিকদাদের মতো এ ধরণের ভূমিকা রাখার প্রবল আকাঙ্খার দিকটিও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
৫- রাসূলের (সা) সাথে অসদাচরণ করার কারণে নিষ্ঠাবান পুত্র কর্তৃক মুনাফিক পিতার প্রতি অস্ত্র ধারণ, একথা সর্বজন বিদিত যে, মুনাফিকদের নেতা ‘আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালূলের পুত্র ‘আব্দুল্লাহ (যার নামও ‘আব্দুল্লাহ ছিল) (রা) জানতে পারেন যে, তার পিতা রাসূলুল্লাহকে (সা) অসম্মানিত বলে মদীনা থেকে তাকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেয়। তখন ‘আব্দুল্লাহ মদীনার গেটে উন্মুক্ত তরবারী নিয়ে স্বীয় পিতাকে মদীনায় প্রবেশ করতে বাধা প্রদান করেন। ঘটনার বিবরণ ছিল এ রকম যে, ‘আল-মুরাইসী’ যুদ্ধে আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। তখন তাদের প্রত্যেকেই যার যার দলকে সাহায্যের জন্য আহ্বান করতে থাকে। তখন মুনাফিক নেতা ‘আব্দুল্লাহ ইবন উবাই বলে যে, আল্লাহর শপথ! আমরা যদি মদীনাতে ফিরে যাই, তবে সেখানকার সম্মানিত লোকেরা অসম্মানিত লোকদের অবশ্যই বের করে দেবে। এ কথার দ্বারা সে নিজেকে সম্মানিত ব্যক্তি এবং রাসূলুল্লাহকে (সা) অসম্মানিত বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। সে আর বলে যে, আমরা ও তাদের উদাহরণ হলো পূর্বের যুগের লোকদের প্রবাদ বাক্যের মতো যে, ‘তুমি তোমার কুকুরকে মোটা-তাজা কর, যাতে তোমাকে খেয়ে ফেলতে পারে’। এর মাধ্যমে সে রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তার সাহাবায়ে কিরামদেরকে উপহাস করেছে। তার মুখোশ উন্মোচণ এবং তার অন্তরের অপছন্দকে জন সমক্ষে লজ্জাস্কর করে তুলে ধরে আল্লাহর আয়াত নাজিল হয়। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেন,
{ يَقُولُونَ لَئِنْ رَجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ }
“তারা বলে, আমরা মদীনায় ফিরে আসলে সেখান থেকে শক্তিশালীরা দুর্বলদেরকে বের করে দেবে।” [সূরা আল-মুনাফিকূন, আয়াত: ৮]।
তখন ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন, আমাকে সুযোগ দিন আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই। নবী (আ) বলেন, ‘না, যাতে এ কথা বলা না হয় যে, মুহাম্মাদ তার সাথীদেরকে হত্যা করে’। তারা যখন মদীনায় ফিরে আসেন বিষয়টি ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালূল তার পিতার উক্তি সম্পর্কে জানতে পারেন। তখন তিনি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে এ সংবাদ পৌঁছেছে যে, আপনি আমার পিতাকে হত্যা করতে চান। যদি আপনি সত্যিই তা মনস্থ করে থাকেন তাহলে তার ব্যাপারে আমাকে আদেশ করুন, আমি আপনার কাছে তার মাথা নিয়ে আসব। এরপর তিনি তরবারী উন্মুক্ত করে মদীনার প্রবেশ দ্বারে দাঁড়িয়ে যান এবং তার পিতাকে রাসূলুল্লাহ (সা) যতক্ষণ তার পিতাকে মদীনায় প্রবেশ করতে অনুমতি না দেবেন ততক্ষণ তিনি তার পিতাকে প্রবেশ করতে বাধা দেন। এমনকি তাকে এ কথাও বলতে হবে যে, নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ (সা)ই সম্মানিত ও শক্তিশালী আর সেই তো অর্থাৎ ‘আব্দুল্লাহ ইবন উবাই অসম্মানিত ও দুর্বল ব্যক্তি (সহীহুল বুখারী ৬/১৫৪, নং ৪৯০৭, সহীহ মুসলিম৪/১৯৯৮, নং ২৫৮৪, সীরাত ইবন হিশাম ১/২৯১-২৯২, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৭৬-৩৭৮ )।
লক্ষ্য করুন যে, সৎকর্মশীল নিষ্ঠাবান সাহাবী পুত্র তার মুনাফিক পিতার সাথে কেমন আচরণ করেছেন যে, খোলা তরবারী নিয়ে পিতাকে মদীনায় প্রবেশ করতে বাধা দিয়েছেন। কারণ তো একটাই তাহলো, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং তার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন। কিন্তু তার পিতা সেই প্রিয় রাসূলুল্লাহকে (সা) অসম্মানিত করেছে, তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে। সুতরাং সে ব্যক্তি, সে যেই হোক রাসূলুল্লাহকে (সা) কষ্ট দেবে কিংবা তার মর্যাদাকে খাট করবে তার সম্মান ও মর্যাদা পাওয়ার কোনো অধিকার নেই। আর রাসূলুল্লাহর (সা) প্রিয় সাহাবীগণ যারা তার প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত, তার সম্মান রক্ষা করবেন এবং তার পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।
৬- সাহাবীগণের কবিতার অস্ত্র দিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, বিভিন্ন হাদীস ও সীরাত গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, কবি সাহাবীগণ (রা) তাদের কবিতাকে আল্লাহর দ্বীন এবং তাঁর রাসূলের (সা) প্রতিরক্ষার কাজে সমরাস্ত্রের মতো ব্যবহার করেছেন। তারা তাদের কবিতাতে একদিকে রাসূলুল্লাহর (সা) রিসালাত, নবুওয়াত এবং তার সুমহান চরিত্র বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছেন। অপরদিকে কাফির মুশরিকদেরকে কবিতার নিন্দা ও তিরস্কারসূচক শানিত ও তীর্যক শব্দমালা দিয়ে এমনভাবে তুলোধুনো করতেন যে, কাফির-মুশরিকদের শরীর, হৃদয়, মান-সম্মান, ঐতিহ্য ও কৌলিন্য চরমভাবে ধরাশায়ী হত। তারা অস্ত্রের আঘাতসহ অন্য যে কোনো আক্রমণ তো শক্তি দিয়ে প্রতিহত করতে পারত। কিন্তু রাসূলুল্লাহর (সা) কবিদের তির্যক ও তিরস্কারমূলক শানিত তরবারী ও বর্শাসম অস্ত্রের মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হতো। এমনই একজন কবি ছিলেন, যিনি রাসূলের (সা) কবি নামে খ্যাত, যিনি জাহিলী যুগ পেয়েছিলেন ৬০ বছর, আর ইসলামের যুগ পেয়েছিলেন ৬০ বছর, তিনি হলেন হাসান ইবন সাবিত (রা)। তিনি তার জিহ্বার অস্ত্র দিয়ে একদিকে কুরাইশ কাফির-মুশরিকদেরকে তিরস্কার করে ধরাশায়ী করে ফেলতেন অপরদিকে রাসূলের (সা) পক্ষে প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধের শক্ত বুহ্য রচনা করতেন। মক্কার কাফিরগণ তাই তার কবিতাকে ভীষণভাবে ভয় করত। কারণ তার কবিতার তির্যক বাণীগুলো তাদের তরবারী, বর্শা ও বিষাক্ত তীরের চেয়েও কঠিন মনে হত। রাসূলুল্লাহ (সা) জানেন যে, কুরাইশদের তিরস্কার করা মানে রাসূলুল্লাহর (সা) তো কুরাইশদের মধ্যে শামিল। তাই তিনি হাসান (রা) কে নির্দেশ দিলেন যে, তুমি আবু বকরের কাছে যাও এবং তার কাছ থেকে কুরাইশের বংশনামা ভালো করে জেনে নাও; যাতে করে মুশরিক কুরাইশদের তিরস্কার করা এবং তাদেরকে আক্রমণ করাতে রাসূলুল্লাহ (সা)ও তার মধ্যে শামিল না হয়। তখন হাসান (রা) আবু বকর (রা) এর কাছ থেকে জেনে এসে বললেন, হে আল্লাহ রাসূল! আপনার বংশকে বের করে আনা হয়েছে, ঐ সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন! আমি আপনাকে কুরাইশদের তিরস্কার থেকে এমনভাবে বের করে আনবো যেমন আটা থেকে চুল বের করে আনা হয়। উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়েশা (রা) থেকে এ ঘটনা বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
اهْجُوا قُرَيْشًا، فَإِنَّهُ أَشَدُّ عَلَيْهَا مِنْ رَشْقٍ بِالنَّبْلِ، فَأَرْسَلَ إِلَى ابْنِ رَوَاحَةَ فَقَالَ: اهْجُهُمْ، فَهَجَاهُمْ فَلَمْ يُرْضِ، فَأَرْسَلَ إِلَى كَعْبِ بْنِ مَالِكٍ، ثُمَّ أَرْسَلَ إِلَى حَسَّانَ بْنِ ثَابِتٍ، فَلَمَّا دَخَلَ عَلَيْهِ، قَالَ حَسَّانُ: قَدْ آنَ لَكُمْ أَنْ تُرْسِلُوا إِلَى هَذَا الْأَسَدِ الضَّارِبِ بِذَنَبِهِ، ثُمَّ أَدْلَعَ لِسَانَهُ فَجَعَلَ يُحَرِّكُهُ
فَقَالَ: وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ لَأَفْرِيَنَّهُمْ بِلِسَانِي فَرْيَ الْأَدِيمِ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا تَعْجَلْ، فَإِنَّ أَبَا بَكْرٍ أَعْلَمُ قُرَيْشٍ بِأَنْسَابِهَا، وَإِنَّ لي فِيهِمْ نَسَبًا، حَتَّى يُلَحِّصَ لَكَ نَسَبِي، فَأَتَاهُ حَسَّانُ، ثُمَّ رَجَعَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ قَدْ لَحَصَ لِي نَسَبَكَ، وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ لَأَسْلَنَّكَ مِنْهُمْ
كَمَا تُسَلُّ الشَّعْرَةُ مِنَ الْعَجِينِ. قَالَتْ عَائِشَةُ: فَسَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ لِحَسَّانَ: إِنَّ رُوحَ الْقُدُسِ لَا يَزَالُ يُؤَيِّدُكَ، مَا نَافَحْتَ عَنِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ، وَقَالَتْ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: هَجَاهُمْ حَسَّانُ فَشَفَى وَاشْتَفَى
তোমরা কুরাইশদেরকে হিজা (তিরস্কার ও নিন্দা মূলক কবিতা) কর, কারণ তা কুরাইশদের জন্য তীরের আঘাতের চেয়ে অধিক কঠিন। অতঃপর তিনি ‘আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহার কাছে পাঠান এবং তাকে নিন্দা করতে বলেন।
তিনি কুরাইশদেরকে কবিতা দিয়ে নিন্দা করেন। কিন্তু তা পছন্দনীয় হলো না। তারপর তিনি কা’আব ইবন মালিকের কাছে প্রেরণ করেন। তারপর তিনি হাসান ইবন সাবিতের কাছে পাঠান। হাসান যখন তার কাছে প্রবেশ করেন, হাসান বলেন, এখন আপনাদের সময় এসেছে যে, লেজ দ্বারা আঘাতকারী এই সিংহকে পাঠান। তারপর তিনি নিজের জিহ্বা (সিংহের মতো) বের করে তা নড়াচড়া করতে লাগলেন। তারপর বলেন, ঐ সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন! আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার এই জিহ্বা দ্বারা চামড়া ছেলার মতো ছিলে ফেলব। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, তাড়াহুড়ো করো না, (আবু বকরের কাছে যাও) কেননা আবু বকর কুরাইশ বংশ সম্পর্কে অধিক অবগত। আর কুরাইশের মধ্যে আমার তো বংশ আছে। সে আমার বংশকে তোমার কাছে সুনির্দিষ্ট করে দেবে।
তখন হাসান তার কাছে আসেন। তারপর ফিরে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি আমাকে আপনার বংশ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। ঐ সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন! আমি আপনাকে অবশ্যই তাদের থেকে এমনভাবে বের করে আনব যেমন আটা থেকে চুল টেনে বের করা হয়। ‘আয়েশা বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি, তিনি হাসানকে বলেন, তুমি যতক্ষণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) পক্ষে মোকাবেলা করবে ততক্ষণ রুহুল কুদুস (জিবরীল আ) তোমাকে অবশ্যই
সাহায্য করতে থাকবে। ‘আয়েশা আরো বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) এ কাথাও বলতে শুনেছি যে, হাসান তাদেরকে নিন্দা করেছে, সে স্বস্তি দিয়েছে এবং নিজেও স্বস্তি পেয়েছে'( সহীহ মুসলিম ৪/১৯৩৫, নং ২৪৯০। সহীহুল বুখারীতে ৮/৩৬, নং ৬১৫০, সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে )।
আল-বারা ইবন ‘আযিব (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
أَنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِحِسَّانَ: اهْجُهُمْ أَوْ قَالَ: هَاجِهِمْ وَجِبْرِيلُ مَعَكَ
নবী (সা) হাসানকে বলেন, ‘তুমি তাদেরকে নিন্দা করে কবিতা বল, অথবা বলেছেন, তাদের নিন্দার জবাব দাও, আর জিবরীল তোমার সাথে আছেন’ ( সহীহুল বুখারী ৮/৩৬, নং ৬১৫৩, সহীহ মুসলিম ৪/১৯৩৩, নং ২৪৮৬)।
আয়িশা (রা) থেকে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَضَعُ لِحَسَّانَ مِنْبَرًا فِي الْمَسْجِدِ فَيَقُومُ عَلَيْهِ يَهْجُو مَنْ قَالَ فِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ رُوحَ الْقُدُسِ مَعَ حَسَّانَ مَا نَافَحَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
রাসূলুল্লাহ (সা) হাসানের জন্য মসজিদে মিম্ববার স্থাপন করে দিয়েছিলেন। তারপর তিনি তার ওপর দাঁড়িয়ে যারা রাসূলুল্লাহকে (সা) নিন্দা করত তাদের নিন্দার জবাব নিন্দা ও তিরস্কারমূলক কবিতার মাধ্যমে দিতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তখন বলেন, নিশ্চয় রুহুল কুদ্দুস (জিবরীল ‘আ) হাসানের সাথে আছেন, যতক্ষণ সে রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষে মোকাবেলা করবে (সুনান আবি দাউদ ৪/৩০৪, নং ৫০১৫, সুনানুত তরিমিযী ৪/৪৩৫, নং ২৮৪৬, আল- হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ৩/৫৫৪, নং ৬০৫৮, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ এবং আলবানী হাসান বলেছেন, আল- হাকিম ও আয-যাহাবী সহীহ বলেছেন )।
এভাবে হাসান (রা) প্রত্যক্ষ ও সরাসরি ময়দানের যুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে না পারলেও তার জিহ্বা ও কবিতার অস্ত্র দিয়ে আল্লাহর রাসূলের (সা) প্রতিরক্ষা সুদৃঢ় বুহ্য রচনা করেছিলেন এবং তার আন্দোলন ও দ্বীনে হকের পক্ষে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) অন্যান্য কবিদের মধ্যে এই ময়দানে তিনি ছিলেন সিংহ পুরুষ, রণবীর এবং বীর সেনানী, যার সমকক্ষ আর কেউ ছিলেন না।
৭- রাসূলুল্লাহর (সা) জীবন রক্ষার জন্য ১১ জন আনসার সাহাবীর সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার, উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর (সা) সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে তীরন্দাজ বাহিনীর ভুল সিদ্ধান্তের কারণে তাদের অধিকাংশ যোদ্ধা গিরি পথ ছেড়ে চলে যান। এ সুযোগে কুরাইশ বাহিনীর চৌকস সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের (তখনও তিনি ইসলাম গ্রহন করেন নাই) নেতৃত্বে একদল কুরাইশ সৈন্য বাহিনী পেছন দিক থেকে অকস্মাৎ মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কাফির বাহিনীর পরিত্যক্ত গানীমাতের সম্পদ সংগ্রহে লিপ্ত মুসলিম বাহিনী হঠাৎ এই আক্রমণের ফলে তাদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এমনি একটি মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ (সা) মাত্র ১২ জন সাহাবী কর্তৃক পরিবেষ্টিত ছিলেন। এ বিষয়টি মুশরিক বাহিনী বুঝতে পেরে এটাকে একটি মোক্ষম সুযোগ হিসেবে নবী (সা) এর উপর আক্রমন করে। অতিস্বল্প সংখ্যক সাহাবী (রা) নিজেদের জীবনের বিনিময়ে তাদের প্রাণপ্রিয় রাসূলুল্লাহকে (সা) ঘিরে ধরেন এবং শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) থেকে এ ঘটনা বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘উহুদের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী ময়দান ছেড়ে পলায়ণ করে। রাসূলুল্লাহ (সা) তখন তালহা ইবন ‘উবায়দিল্লাহ (রা) সহ মাত্র ১২ জন সাহাবীর সমভিব্যাহারে ময়দানের এক দিকে ছিলেন। মুশরিকগণ এ সুযোগ গ্রহণ করে নবী (সা) কে ঘিরে ফেলে। এ দৃশ্য দেখে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ‘কে শত্রুপক্ষকে প্রতিহত করবে?’ তালহা বলেন, আমি। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘তুমি’! তখন একজন আনসার সাহাবী বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি। তখন তিনি বলেন, ‘তুমি’! এরপর ঐ সাহাবী যুদ্ধ করতে করতে নিহত হলেন। তারপর তিনি দেখলেন যে, মুশরিকগণ তাকে ঘিরে আছে। তিনি আবার বললেন, ‘শত্রুদেরকে কে মোকাবেলা করবে’? তালহা বলেন, আমি। তিনি বলেন, ‘আবার তুমি’? তখন জনৈক আনসার সাহাবী বলেন, আমি। তখন তিনি বলেন, ‘তুমি’! এরপর ঐ সাহাবী যুদ্ধ করতে করতে নিহত হলেন। তিনি এ ভাবে বলতে থাকেন। আর একজন একজন আনসার সাহাবী কাফিরদের উদেশ্যে বের হয়ে আসেন এবং পূর্ববর্তীদের মতো যুদ্ধ করতে করতে নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করে দেন। তখন জীবিত আছেন শুধু রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তালহা ইবন ‘উবায়দিল্লাহ। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : مَنْ لِلْقَوْمِ؟ فَقَالَ طَلْحَةُ : أَنَا، فَقَاتَلَ طَلْحَةُ قِتَالَ الْأَحَدَ عَشَرَ ، حَتَّى ضُرِبَتْ يَدُهُ، فَقُطِعَتْ أَصَابِعُهُ، فَقَالَ: حَسَ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَوْ قُلْتَ بِسْمِ اللَّهِ لَرَفَعَتْكَ الْمَلَائِكَةُ وَالنَّاسُ يَنْظُرُونَ، ثُمَّ رَدَّ اللَّهُ الْمُشْرِكِينَ
কে বাহিনীকে প্রতিহত করবে’? তালহা বলেন, আমি। এ কথা বলেই তালহা পূর্বের ১১ জন সাহাবীর ন্যায় লড়তে থাকেন। তার হাতে আঘাত করা হয়, তার আঙ্গুলগুলো কেটে ফেলা হয়। তখন তিনি ‘হিস’ শব্দ উচ্চারণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তখন বলেন, ‘তুমি যদি ‘হিস’ শব্দ উচ্চারণ না করে যদি ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে তাহলে লোকদের চোখের সামনেই ফেরেস্তারা তোমাকে উপরে তুলে নিয়ে যেত’। অতঃপর আল্লাহ মুশরিকদেরকে ব্যর্থ করে দেন (সুনানুন নাসাঈ ৬/২৯, নং ৩১৪৯, আন্-নাসাঈ, আস্-সুনানুল কুবরা ৪/২৯০, নং ৪৩৪২ )।
এ এক বিস্ময়কর দৃশ্য! নবী (সা) এর ১১ জন আনসার সাহাবী প্রাণপণ যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত তাদের প্রাণপ্রিয় রাসূলুল্লাহর (সা) জন্য নিজেদের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরবান করে দেন। তাদের ১২তম সঙ্গী ছিলেন তালহা ইবন উবায়দিল্লাহ (রা)। তার একার পক্ষে রাসূলুল্লাহকে (সা) রক্ষা করা সহজ কাজ ছিল না। তবুও তিনি একাই ১১ জনের সাথে লড়াই করেছেন। রাসূলুল্লাহর (সা) উপর আঘাত ঠেকাতে গিয়ে নিজের হাত ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়ে (ড. ফাযল ইলাহী, হুদুন নবী, পৃ. ৪৯ )।
শেষ পর্যন্ত তার হাত অবশ হয়ে যায়। কায়েস ইবন আবী হাযিম (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
رَأَيْتُ يَدَ طَلْحَةَ شَلَّاءَ وَقَى بِهَا النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ أُحُدٍ
আমি তালহার হাত অবশ অবস্থায় দেখেছি। তিনি উহুদ যুদ্ধের দিন এই হাত দিয়ে নবী (সা) কে রক্ষা করে ছিলেন(সহীহুল বুখারী, ৫/৯৭, হা. নং ৪০৬৩, আহমাদ ইবন হাম্বল, ফাযায়িলুস সাহাবাহ ২/৭৪৫, নং ১২৯২ )।
নবী (সা) কে বাঁচাতে গিয়ে ঐ দিন তার হাতই শুধু অবশ হয় নাই বরং তার সমস্ত শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। আবু বকর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
ثُمَّ أَتَيْنَا طَلْحَةَ فِي بَعْضٍ تِلْكَ الْحِفَارِ فَإِذَا بِهِ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ أَوْ أَقَلُّ أَوْ أكْثَرُ بَيْنَ طَعْنَةٍ وَرَمْيَةٍ وَضَرْبَةٍ
অতঃপর আমরা একটি গর্তের মধ্যে তালহাকে পেলাম। তার শরীরে সত্তুরের অধিক বা কম বা বেশি বর্শা, তীর ও তরবারীর আঘাতের আলামত ছিল( আবু দাউদ আত্-তায়ালিসী, মুসনাদ আবি দাউদ, ১/৯, নং ৬, ফাতহুল বারী, ৭/৮২-৮৩, আবু না’ঈম, আহমাদ আল-আসবাহানী, মা’রিফাতুস সাহাবাহ, সম্পাদনা, ‘আদিল আল’আযাযী, রিয়াদ-দারুল ওয়াতান, ১ম সংস্করণ, ১৪১৯ হি, ১/৯৬ )।
জাবির ইবন ‘আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি যে,
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى شَهِيدٍ يَمْشِي عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ فَلْيَنْظُرْ إِلَى طَلْحَةَ بْنِ عُبَيْدِ اللَّهِ
যে এমন শহীদ ব্যক্তিকে দেখতে চায়, যে মাটির উপরে চলাফেরা করছে, সে যেন অবশ্যই তালহা ইবন ‘উবাইদুল্লাহর দিকে তাকায় (সুনানুত তিরমিযী ৬/৯৬, নং ৩৭৩৯, আত্-তাবারানী, আল-মু’জামুল কাবীর ১/১১৭, নং ২১৫। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে গারীব বলেছেন, যিয়া উদ্দীন আল-মাকদিসী হাসান বলেছেন, আল-আহাদীসুল মুখতারাহ ৩/৩৫, ৪৪, নং ৮৩২, আলবানী সহীহ বলেছেন, যদিও কেউ কেউ যা’য়ীফ বলেছেন )।
আবু বকর (রা) উহুদ যুদ্ধের কথা স্মরণ করে কাঁদতেন আর বলতেন, ‘ঐ দিনটি পুরোটাই ছিল তালহার জন্য’ (শাইখ আহমাদ আল বান্না, মিনহাতুল মা’বুদ ফী ভারতীবে মুসনাদিত তায়ালীসী আবি দাউদ, বৈরুত: আল-মাকতাবাতুল ইসলামিয়্যাহ, ২য় সংস্করণ, ১৪০০ হি:, ২/৯৯ )।
অর্থাৎ, উহুদ যুদ্ধের দিনে তালহা (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) রক্ষায় একাই সর্বোচ্চ ত্যাগ, কুরবানী ও অসাধারণ অবদান রেখে ছিলেন।
৮- আবু তালহার নিজের শরীরকে রাসূলুল্লাহর (সা) শরীরে সামনে ঢাল হিসেবে পেশ করা, উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর (সা) শরীর ও বক্ষে যাতে শত্রুদের আঘাত ও তীর বন্ধ না হতে পারে সে জন্য আবু তালহা (রা) নিজের বক্ষকে ঢাল হিসেবে রাসূলুল্লাহর (সা) বক্ষের সামনে পেশ করেন। আনাস ইবন মালিক (রা) সে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন,
قَالَ لَمَّا كَانَ يَوْمُ أُحُدٍ الْهَزَمَ النَّاسُ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبُو طلْحَةَ بَيْنَ يَدَيْ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُجَوِّبٌ بِهِ عَلَيْهِ بِحَجَفَةٍ لَهُ وَكَانَ أَبُو طَلْحَةَ رَجُلًا رَامِيًا شَدِيدَ الْقِدِ يَكْسِرُ يَوْمَئِذٍ قَوْسَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا وَكَانَ الرَّجُلُ يَمُرُ مَعَهُ الْجَعْبَةُ مِنْ النَّبْلِ فَيَقُولُ انْشُرْهَا لِأَبِي طَلْحَةَ
فَأَشْرَفَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْظُرُ إِلَى الْقَوْمِ فَيَقُولُ أَبُو طَلْحَةَ يَا نَبِيَّ اللَّهِ بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي لَا تُشْرِفْ يُصِيبُكَ سَهُمْ مِنْ سِهَامِ الْقَوْمِ تَحْرِي دُونَ نَحْرِكَ
উহুদ যুদ্ধে লোকেরা (মুসলিম বাহিনীর কতিপয় মুজাহিদ) নবী (সা) এর নিকট থেকে দূরে সরে যায়। আর আবু তালহা নবী (সা) কে (শত্রুদের আঘাত থেকে রক্ষা করার জন্য) তার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে যান। আবু তালহা একজন দক্ষ তীর নিক্ষেপকারী ছিলেন। প্রচণ্ড তীর নিক্ষেপের কারণে ঐ দিন তার হাতে ২/৩টি ধনুক ভেঙে যায়। তার পাশ দিয়ে কোনো ব্যক্তি তীরের ঝুড়ি নিয়ে অতিক্রম করার সময় তিনি (সা) বলতেন, এগুলোকে আবু তালহার সম্মুখে রেখে দাও। এমতাবস্থায় নবী (সা) যুদ্ধের অবস্থা প্রত্যক্ষ করার জন্য মুখ বের করলে আবু তালহা বলেন, হে আল্লাহর নবী! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক! আপনি মুখ বের করে দেখার চেষ্টা করবেন না। শত্রুদের কোনো তীর আপনার শরীরে বিদ্ধ হবে। আমার বক্ষ আপনার বক্ষের সামনে ঢাল হিসেবে রয়েছে (সহীহুল বুখারী, ৫/৩৭, ৯৭, নং ৩৮১১, ৪০৬৪, সহীহ মুসলিম, ৩/১৪৪৩, হা. নং ১৮১১ )।
অর্থাৎ, আমি আপনাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে যাব। যদি শত্রুদের কোনো তীর এসে যায়ও তাহলে তা আমার বুকে আগে বিদ্ধ হবে। আপনার শরীরে তীর স্পর্শ করবে না।
৯- রাসূলুল্লাহকে (সা) রক্ষার নিমিত্তে আবু দাজানাহর নিজের দেহকে ঢাল হিসেবে পেশ করা, উহুদের যুদ্ধের দিন মুসলিম বাহিনীর ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে আল্লাহর রাসূল (সা) কে রক্ষা করা এবং মুশরিক বাহিনীর সর্বাত্মক আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য যারা নিজেদের জীবনকে বাজি রেখে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছেন এবং আত্মত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন তাদের মধ্যে আবু দাজানাহ রাদি আল্লাহু তা’আলা আনহু অন্যতম। রাসূলুল্লাহর (সা) জীবন রক্ষা এবং তার শরীরে যাতে কোনো ধরনের আঘাত লাগতে না পারে এ জন্য তিনি নিজের দেহকে ঢাল বানিয়ে দিয়েছিলেন। চতুর্দিক থেকে তার ওপর শত্রুদের পক্ষ থেকে নানা ধরনের আঘাত নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল, তিনি সবকিছু নীরবে সহ্য করে অনড় ছিলেন। উহুদ যুদ্ধের দিন আবু দাজানাহ (রা) আল্লাহর দ্বীন ও রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিরক্ষার জন্য তার তরবারী নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যান। যুদ্ধের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সা) একটি তরবারী হাতে নিয়ে বলেন, কে এই তরবারীর হক আদায় করতে পারবে। তখন আয- যুবাইর ইবনুল ‘আউওয়াম (রা) জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ও রাসূলের (সা) ফুফাতো ভাই দুই দুইবার সে তরবারী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ তাকে ফিরিয়ে দেন। তৃতীয়বারে আবু দাজানাহ এগিয়ে এসে রাসূলুল্লাহর (সা) তরবারী গ্রহণ করেন। তিনি যখন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতেন তখন লাল পট্টি মাথায় বাঁধতেন এবং নবী (সা) এর প্রদত্ত তরবারী নিয়ে গর্ব ও অহংকারের সাথে ময়দানে দাঁড়াতেন। এ জন্য তাকে আবু দাজানাহ বলা হতো। তখন রাসূলুল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় এ ধরনের হাটাকে আল্লাহ অপছন্দ করেন, তবে এই স্থানে তা অপছন্দনীয় নয় (আত্-তাবারানী, আল-মু’জামুল কাবীর ৭/১০৪, নং ৬৫০৮, আল-হাইসুমী, মাজমা’ উদ্ যাওয়ায়িদ ৬/১০৩, নং ১০০৭১ ০।
এ ঘটনা প্রসঙ্গে আয-যুবাইর ইবনুল ‘আউওয়াম (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
عَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَيْفًا يَوْمَ أُحُدٍ، فَقَالَ: مَنْ يَأْخُذُ هَذَا السَّيْفَ بِحَقِّهِ؟ فَقُمْتُ فَقُلْتُ : أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَأَعْرَضَ عَنِّي ثُمَّ قَالَ: مَنْ يَأْخُذُ هَذَا السَّيْفَ بِحَقِّهِ؟ فَقُلْتُ : أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَأَعْرَضَ عَنِّي ثُمَّ قَالَ: مَنْ يَأْخُذُ هَذَا السَّيْفَ بِحَقِّهِ؟ فَقَامَ أَبُو دُجَانَةَ سِمَالُ بْنُ
خَرَشَةَ، فَقَالَ: أَنَا أَخُذُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ بِحَقِّهِ، فَمَا حَقَّهُ؟ قَالَ: أَنْ لَا تَقْتُلَ بِهِ مُسْلِمًا وَلَا تَفِرَّ بِهِ عَنْ كَافِرٍ ، قَالَ : فَدَفَعَهُ إِلَيْهِ وَكَانَ إِذَا أَرَادَ الْقِتَالَ أَعْلَمَ بِعِصَابَةٍ، قَالَ: قُلْتُ: لَأَنْظُرَنَّ إِلَيْهِ الْيَوْمَ كَيْفَ يَصْنَعُ؟ قَالَ: فَجَعَلَ لَا يَرْتَفِعُ لَهُ شَيْءٌ إِلَّا هَتَكَهُ وَأَفْرَاهُ حَتَّى انْتَهَى إِلَى نِسْوَةٍ فِي سَفْحِ
الْجَبَلِ مَعَهُنَّ دُفُوفٌ لَهُنَّ فِيهِنَّ امْرَأَةٌ وَهِيَ تَقُولُ : قَالَ : فَأَهْوَى بِالسَّيْفِ إِلَى امْرَأَةٍ ليَضْرِها ، ثُمَّ كَفَّ عَنْهَا، فَلَمَّا انْكَشَفَ لَهُ الْقِتَالُ، قُلْتُ لَهُ: كُلُّ عَمَلِكَ قَدْ رَأَيْتُ مَا خَلَا رَفْعَكَ السَّيْفَ عَلَى الْمَرْأَةِ لَمْ تَضْرِبُهَا، قَالَ: إِنِّي وَاللَّهِ أكْرَمْتُ سَيْفَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ أَقْتُلَ بِهِ
امْرَأَةً
রাসূলুল্লাহ (সা) উহুদের দিনে একটি তরবারী তুলে ধরে বলেন, ‘কে এই তরবারীর হক আদায় করবে’? আমি বললাম, আমি, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি আমাকে এড়িয়ে গেলেন। তারপর আবার বললেন, ‘কে এই তরবারীর হক আদায় করবে’? আমি বললাম, আমি, হে আল্লাহর রাসূল! পুনরায় তিনি আমাকে এড়িয়ে গেলেন। তারপর আবার বললেন, ‘কে এই তরবারীর হক আদায় করবে’? তখন আবু দাজানাহ সিমাক ইবন খারাশাহ দাঁড়েয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এর হক আদায় করবো। তবে এর হক কি? তিনি বলেন, তুমি এর দ্বারা কোনো মুসলিমকে হত্যা করতে পারবে না এবং এটা নিয়ে কোনো কাফির ব্যক্তি থেকে পলায়ন করবে না। অতঃপর তিনি তাকে তরবারীটা দিলেন। আয-যুবাইর (রা) বলেন, আমি উহুদের দিনে তার পিছে থাকলাম যে, দেখি সে কি করে?। দেখলাম, যেই তার সামনে পড়ে তাকেই তিনি ছিঁড়ে ফেলেন এবং বিভৎস করে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি পাহাড়ের পাদদেশে নারীদের কাঁতারে যান, যাদের সাথে ঢোল তবলা ছিল এবং জনৈক মহিলা তাদের যোদ্ধাদেরকে উত্তেজিত করছিল। তিনি তখন তার উপর আঘাত করার জন্য তরবারী উত্তোলন করেই থেমে গেলেন। যুদ্ধ শেষে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, আমি আপনার সব কর্মকাণ্ডই দেখেছি, শুধুমাত্র মহিলার উপর তরবারী তুলেও কেন আঘাত করেননি। আবু দাজানাহ বলেন, আল্লাহর কসম! আমি রাসূলুল্লাহর (সা) তরবারীর সম্মান রক্ষার জন্য একজন অসহায় নারীকে এই তরবারী দিয়ে হত্যা করিনি (আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ৩/২৫৬, নং ৫০১৯, মুসনাদ আল-বায্যার ৩/১৯৩, নং ৭৯৭, আল-হাকিম ও আয়- যাহাবী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। এ হাদীস অন্যান্য রাবী থেকেও বর্ণিত আছে )।
কোনো বর্ণনায় আছে যে, সেই মহিলাটির নাম ছিন হিন্দ বিনত ‘উতবাহ, তিনি পারসীয়ানদের পোশাক পরা ছিলেন। আবু সুফইয়ানের স্ত্রী (রা)। এ ঘটনায় আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, আবু দাজানাহ রাদি আল্লাহ ‘আনহু রাসূলুল্লাহর (সা) তরবারীর সম্মানার্থে একজন মহিলার উপর এই তরবারী দ্বারা আক্রমণ করেননি। ইবন ইসহাক এই ত্যাগী সাহাবীর রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসার প্রমাণ জীবনকে বাজি রেখে দিয়েছেন, উহুদের যুদ্ধের এমন একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন,
وترس دونَ رَسولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَبُو دَجَانَةَ بِنَفْسِهِ، وَيَقَعُ النَّبْلُ فِي ظَهْرِهِ، وَهُوَ مُنْحَنٍ عَلَيْهِ حَتَّى كَثُرَ فِيهِ النَّبْلُ
আবু দাজানাহ (রা) নিজের দেহকে রাসূলুল্লাহর (সা) শরীরের সামনে ঢাল বানিয়ে দেন। তিনি তার উপর ঝুঁকে পড়ে তাকে আগলে রাখেন। ফলে তীর তার পিঠে বিদ্ধ হয় এবং প্রচুর সংখ্যক তীর তার শরীরে বিদ্ধ হওয়ার ফলে তার শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয় (ইবনু হিশাম, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ৩/৭৫-৭৬, আল বায়হাকী, আবু বকর আহমাদ বিন হুসাইন, দালাইলুন নবুওয়াহ, সম্পদনা, ড. আব্দুল মু’তী কাল’আজী, বৈরুত, দারুল কুতুবুল ‘ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪০৫ হিঃ, ৩/২৩৪, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩১৩ (বংলা সংস্করণ )।
অন্য আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, ‘তিনি একটুও নড়াচড়া করতেন না’ ( ইবনুল কাইয়্যেম, যাদুল মা’আদ, সম্পাদনা: শু’আয়িব আল আরনাউত, বৈরুত: মুআস্-সাসাতুর রিসালাহ, ৩য় সংস্করণ, ১৯৯৮ ঈ., ৩/১৭৭)।
বাস্তবিক অর্থেই নিজের জীবনের চেয়ে রাসূলুল্লাহকে (সা) অধিক ভালোবাসা যে সম্ভব আবু দাজানাহ (রা) এর এ কর্ম তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিভাবে তিনি নিজের দেহকে নবী (সা) এর জীবন রক্ষার জন্য মানব ঢাল হিসেবে পেশ করে ছিলেন! এ কথা সত্য যে, আবু দাজানাসহ অন্যান্য এ সব ত্যাগী সাহাবীগণও মানুষ ছিলেন। অন্য মানুষের মতো তাদের শরীরও রক্ত-মাংস দ্বারা গঠিত। সে শরীরে ব্যথা আছে, কষ্ট আছে, দুঃখ আছে, এমন কি সে দেহ থেকে প্রান চলে যাওয়ার আশঙ্কাও আছে। কিন্তু নবী (সা) কে সব কিছুর চেয়ে এমন কি নিজের জীবনের চেয়েও অধিক ভালোবাসতে হবে। তার প্রতি ঈমান ও ভালোবাসার এ দাবী পূরণ করতে হবে। তাই তারা বাস্তবে এই বিস্ময়কর প্রমাণ রেখেছেন!
১০- রাসূলুল্লাহর (সা) খুনের প্রতিশোধ গ্রহণে সাহাবীগণের অঙ্গিকার, উহুদের যুদ্ধে এক নাজুক অবস্থায় মুশরিকগণ রাসূলুল্লাহকে (সা) ঘিরে ধরে তার উপর আক্রমণ করতে থাকেন। তখন ‘উতবাহ ইবন আবি ওয়াক্কাস আঘাত করে রাসূলুল্লাহর (সা) এর দস্ত মুবারাক ভেঙে ফেলে। বিশিষ্ট সাহাবী হাতিব ইবন আবি বালতা’আহ রদি আল্লাহু ‘আনহু জানতে পারেন যে, ‘উতবাহ রাসূলুল্লাহর (সা) দাঁত শহীদ করেছে তার মুবারাক চেহারাকে রক্তাক্ত করেছে। তখন তিনি প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তার পেছনে ধাওয়া করেন এবং তাকে তরবারী দ্বারা ভীষন জোরে আঘাত করেন। ফলে তার মস্তক দেহচ্যুত হয়ে যায় এবং তার ঘোড়া ও তরবারী নিজের অধিকারে নিয়ে নেন। একইভাবে সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা) তার নিজের এই ভাই ‘উতবাহকে নিজ হাতে হত্যা করার জন্য খুবই আকাঙ্খী ছিলেন, কেননা তার ভাই রাসূলুল্লাহর (সা) দাঁত ভেঙে ফেলেছিল এবং তার চেহারা মুবারাক রক্তে রঞ্জিত করেছিল (আয-যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ১/৪১১ )।
কিন্তু তিনি সফলকাম হননি বরং হাতিব (রা) এ সৌভাগ্য অর্জন করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) হাতিব রাদি আল্লাহ ‘আনহুর জন্য দু’আ করে বলেন, ‘আল্লাহ তোমার প্রতি দু’বার সন্তুষ্ট হয়েছেন ( আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ৩/৩৪০, নং ৫৩০৭, আয-যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৩/৩৬৬, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩১৩ (বাংলা সংস্করণ ) ।
হাতিব ইবন আবি বালতা’আহর বিশেষত্ব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রত্যয়ন সম্পর্কিত একটি হাদীস জাবির (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
أَنَّ عَبْدًا لِحَاطِبِ جَاءَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَشْكُو حَاطِبًا فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ لَيَدْخُلَنَّ حَاطِبٌ النَّارَ ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كَذَبْتَ لَا يَدْخُلُهَا، فَإِنَّهُ شَهِدَ بَدْرًا وَالْحُدَيْبِيَةَ
জনৈক দাস ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে এসে অভিযোগ করে বলল যে, হে আল্লাহর রাসূল! হাতিব অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছো, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না; কেননা সে বদর ও হুদাইবিয়াতে উপস্থিত ছিল’ (সহীহ মুসলিম ৪/১৯৪২, নং ২৪৯৫, মুসনাদ আহমাদ ২২/৩৬৯, নং ১৪৪৮৪, সুনানুত তিরমিযী ৬/১৮০, নং ৩৮৬৪ )।
উপর্যুক্ত ঘটনা থেকে জানা যায় যে, হাতিব ইবন আবি বালতা’আহ ও সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তারা দু’জনই ‘উতবাহ ইবন আবি ওয়াক্কাসকে হত্যা করতে আগ্রহী হয়েছিলেন। উহুদের যুদ্ধেই তাকে হত্যা করার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন হাতিব ইবন আবি বালতা’আহ (রা)।
১১- রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিরক্ষায় উহুদের যুদ্ধে মহিলা সাহাবীর জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ, নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেও যেসব পুরুষ ও নারী সাহাবীগণ নবী (সা) এর সুরক্ষা এবং তার পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, তাদের মধ্যে যোদ্ধা মহিলা সাহাবী উম্মু ‘আমারাহ, নাসিয়্যাহ বিনত কা’আব (রা) অন্যতম। উম্মু সা’দ বিনত সা’দ ইবন ইবন রাবী’ বলেন, উম্মু ‘আমারাহ তার স্বামী ও দু’সন্তান সহকারে উহুদের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। তিনি বের হয়েছিলেন মুসলিম বাহিনীকে পানি পান করানো এবং আহত সাহাবীগণকে সেবা দানের উদ্দেশ্যে। কিন্তু উহুদ যুদ্ধে মোড় পরিবর্তনের ফলে মুসলিম বাহিনী যখন ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছে আর তাদের মুশরিক বাহিনী তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছে তখন তিনি তার তরবারী হাতে নেন এবং কাপড় দিয়ে নিজের শরীরের মাঝখানে শক্ত করে বেঁধে নেন। তিনি সাহসী বীর যোদ্ধার মতো যুদ্ধ করেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিরক্ষায় অনেক বড় আঘাত প্রাপ্ত হন। তার শরীরে ১২টি আঘাতের ক্ষতস্থান ছিল (সীরাত ইবন হিশাম, ২/৮১-৮২, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩১৪ (বাংলা সংস্করণ), আল-ওয়াকিনী, আল-মাগাযী, সম্পাদনা, মারসিন জোনস, বৈরুত-দারুল আ’লামী, ৩য় সংস্করণ, ১৪০৯হি, ১/২৬৯- ২৭০ )।
ঐ দিনের ঘটনা সম্পর্কে যামুরাহ ইবন সা’ঈদ আল-মাযিনী তার দাদীর সূত্রে, যিনি উহুদের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন, পানি পান করানোর দায়িত্বরত ছিলেন, বর্ণনা করেছেন, তার দাদী বলেন,
سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ: لَمَقَامُ نُسَيْبَةَ بِنْتِ كَعْبٍ الْيَوْمَ خَيْرٌ مِنْ مَقَامِ فُلَانٍ وَفُلَانٍ . وَكَانَ يَرَاهَا يَوْمَئِذٍ تُقَاتِلُ أَشَدَّ الْقِتَالِ وَإِنَّهَا الحَاجِزَةٌ ثَوْبَهَا عَلَى وَسَطِهَا حَتَّى جُرِحَتْ ثَلَاثَةَ عَشَرَ جُرْحًا وَكَانَتْ تَقُولُ: إِنِّي لَأَنْظُرُ إِلَى ابْنِ قُمَيْتَةَ وَهُوَ يَضْرِبُهَا عَلَى عَاتِقِهَا وَكَانَ
أَعْظَمَ جِرَاحِهَا فَدَاوَتْهُ سَنَةً ثُمَّ نَادَى مُنَادِي رَسُولِ اللَّهِ إِلَى حَمْرَاءَ الْأَسَدِ فَشَدَّتْ عَلَيْهَا ثِيَابَهَا فَمَا اسْتَطَاعَتْ مِنْ نَزْفِ الدَّمِ وَلَقَدْ مَكَثْنَا لَيْلَتَنَا نُكَمِّدُ الجراحَ حَتَّى أَصْبَحْنَا فَلَمَّا رَجَعَ رَسُولُ اللَّهِ مِنْ الْحَمْرَاءِ مَا وَصَلَ رَسُولُ اللَّهِ إِلَى بَيْتِهِ حَتَّى أَرْسَلَ إِلَيْهَا عَبْدَ اللَّهِ بْنَ كَعْبِ الْمَازِنِي يَسْأَلُ
عَنْهَا فَرَجَعَ إِلَيْهِ يُخْبِرُهُ بِسَلَامَتِهَا فَسُرَّ بِذَلِكَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم.
আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি, ‘আজকের দিনে নুসাইবাহ বিনত কা’আবের মর্যাদা অমুক অমুকের মর্যাদার চেয়ে অধিক শ্রেয়। তিনি ঐদিন তাকে প্রচণ্ডভাবে যুদ্ধ করতে দেখেছেন এবং তার কাপড় দ্বারা তার শরীরের মাঝখানে শক্ত করে বেঁধে নিয়েছিলেন। এমনকি তার শরীরে আঘাতের তেরটি ক্ষতস্থান ছিল। যামুরার দাদী আরো বলেন, আমি ইবন কামিআহকে দেখছি যে, সে উম্মু ‘আমারার কাঁধের উপর আঘাত করছে। আর এটা তার বড় ধরনের গভীর ক্ষত ছিল। তিনি এক বছর এর চিকিৎসা করেছেন। এরপর রাসূলুল্লাহর (সা) ঘোষক এসে হামরাউল আসাদ যুদ্ধে অংশ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে গেলেন। তিনি যুদ্ধের পোশাক পরে প্রস্তুত হলেন ঠিকই, কিন্তু রক্তক্ষরণের কারণে যেতে সক্ষম হলেন না। আমরা সে রাত আহত রোগীদের সেবা দিয়ে গেলাম, এভাবে সকাল হলো। যখন রাসূলুল্লাহ (সা) হামরাউল আসাদ থেকে ফিরলেন। তিনি বাড়িতে পৌঁছতে না পৌঁছতেই ‘আব্দুল্লাহ ইবন কা’আব আল-মাযিনীকে পাঠিয়ে উম্মু ‘আমারার খবর নিলেন। ‘আব্দুল্লাহ ফিরে গিয়ে তিনি ভালো আছেন এ সংবাদ দেবার পর নবী (সা) খুব খুশী হলেন (ইবন সা’দ, আত্-তাবাকাতুল কুবরা, সম্পাদনা, ইহসান ‘আব্বাস, বৈরুত-দারু সাদির, ১ম সংস্করণ, ১৯৬৮ ৭, ৮/৪১৩ )।
উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) উহুদ যুদ্ধের দিন বলতে শুনেছি যে,
مَا الْتَفَتُ يَوْمَ أُحُدٍ يَمِينًا وَلَا شِمَالاً إِلَّا وَأَرَاهَا تُقَاتِلُ دُوْنِي
আমি ডানে এবং বামে যে দিকেই তাকাই দেখি যে, উম্মু ‘আমারাহ আমাকে রক্ষার জন্য লড়াই করছে (ইবনুল জাওযী, ‘আব্দুর রাহমান ইবন ‘আলী, সাফওয়াতুস সাফওয়াহ, সম্পাদনা, ‘আহমাদ ইবন ‘আলী, কায়রো-দারুল হাদীস, ১৪২১ হি, ১/৩৩৬, ইবন হাজার আল-‘আসকালানী, আল-ইসাবাহ ফী তাময়ীষিস্ সাহাবাহ, সম্পাদনা, ‘আদিল আহমাদ ও তার সঙ্গী, বৈরুত-দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১৫ হি, ৮/৪৪২ )।
উম্মু ‘আমারার ছেলে ‘আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ বলেন, নবী (সা) আমার মায়ের কাঁধের উপর ক্ষতস্থান দেখে আমাকে বলেন, তোমার মায়ের ক্ষতস্থানে পট্টি বেঁধে দাও। আল্লাহ তোমাদের বাড়ির লোকদের প্রতি রহম করুন! তখন উম্মু ‘আমারাহ আল্লাহর রাসূলকে বলেন,
ادْعُ اللَّهَ أَنْ نُرَافِقَكَ فِي الْجَنَّةِ. فَقَالَ: اللَّهُمُ اجْعَلْهُمْ رُفَقَائِي فِي الْجَنَّة فَقَالَتْ: مَا أُبَالِي مَا أَصَابَنِي مِنَ الدُّنْيَا
আল্লাহর কাছে দু’আ করুন, আমরা যেন আপনার সাথে জান্নাতে একত্রে থাকতে পারি! তখন নবী (সা) বলেন, হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে জান্নাতে আমার সাথী করে দিন! তখন উম্মু ‘আমারাহ বলেন, দুনিয়াতে কি পেলাম, তাতে আমার আর কোনো পরওয়া নেই (ইবন সা’দ, আত্-তাবাকাতুল কুবরা, ৮/৩০৫, ইমাম আয যাহাবী, সিয়ার আ’লামিন নুবালা, কায়রো-দারুল হাদীস, ১৪২৭ হি, ৩/৫১৬ )।
লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, উম্মু ‘আমারা (রা) এর শক্তি, সাহস ও দৃঢ়তার কোনো পর্যায় ছিল যে, ‘আরবের বিখ্যাত অশ্বারোহী মুশরিক ইবন কামিআহর সামনে রাসূলুল্লাহকে (সা) রক্ষা করার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে দাঁড়িয়ে গেলেন। যখন এই নরাধম রাসূলুল্লাহকে (সা) হুমকি ধমকি দিচ্ছিল এবং তাকে হত্যা করা ও তার শক্তিকে শিকড় শুদ্ধ উপড়ে ফেলার জন্য খুঁজে বেড়াচ্ছিল। তিনি তাকে দু’বার আঘাত করেছিল কিন্তু তার গায়ে বর্ম থাকার কারণে এই নরাধম পাষন্ডের তেমন কিছু হয়নি। কিন্তু সে উম্মু ‘আমারার কাঁধের উপর প্রচণ্ড আঘাত করার কারণে গভীর ক্ষত হয়ে গিয়েছিল এবং এক বছর পর্যন্ত চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো হয়ে যায়। আল্লাহর রাসূলের (সা) এই ত্যাগী ও সাহসী মহিলা সাহাবী বাই’আতে ‘আকাবার শপথ থেকে শুরু করে উহুদ, খন্দক, হুদাইবিয়া, বাই’আতে রিদওয়ান, কাযায়ে ‘উমরা, মক্কা বিজয়, হুনাইন, রিদ্দাহ ও ভন্ড নবী মুসাইলামার সাথে ইয়ামামার যুদ্ধসহ অনেক ঘটনায় প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহন করেছেন।
১২- রাসূলুল্লাহর (সা) জন্য প্রচণ্ড আহত হয়ে তার পায়ের উপর মাথা রেখে জনৈক আনসার সাহাবীর মৃত্যু বরণ, উহুদের যুদ্ধে জনৈক আনসার সাহাবী নবী (সা) এর জীবন রক্ষার জন্য নিজের জীবনকে কুরবানী করে দেন। জীবনের শেষ মুহূর্তে তার মাথা তার প্রাণপ্রিয় রাসূলুল্লাহর (সা) পায়ের উপর ছিল। মূল ঘটনাটি আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, উহুদ যুদ্ধের দিনে যখন আক্রমণকারীগণ রাসূলুল্লাহর (সা) একেবারে নিকটে পৌঁছে যায়, তখন তিনি বলেন, مَنْ يَرُدُّهُمْ عَنَّا وَلَهُ الْجَنَّةُ؟ أَوْ هُوَ رَفِيقِي فِي পারে? তার জন্য জান্নাত রয়েছে’। অথবা বলেন, ‘সে জান্নাতে আমার সঙ্গী । ‘এমন কেউ আছে কি, যে এদেরকে আমার নিকট হতে দূর করে দিতে হবে’। তার এ কথা শুনে একজন সাহাবী অগ্রসর হন এবং যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যান। এরপর পুনরায় মুশরিকগণ তার খুব কাছে এসে পড়ে এবং এবারও তিনি আহ্বান জানান । এভাবে সাত জন আনসারী সাহাবী শহীদ হয়ে যান। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘আমরা আমাদের সঙ্গীদের সাথে ন্যায় বিচার করলাম না (সহীহ মুসলিম ৩/১৪১৫, নং ১৭৮৯ )।
এ সাতজনের মধ্যে ‘উমারাহ ইবন ইয়াযিদ ইবন সাকান ছিলেন। তিনি লড়াই করতে করতে প্রচণ্ড রকমের আহত হন। অতঃপর একদল মুসলিম বাহিনী তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন এবং তাকে শত্রু মুক্ত করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: أذنُوهُمي
তোমরা তাকে আমার কাছে নিয়ে আস’।
লোকেরা তাকে কাছে আনলে তিনি তার পা বিছিয়ে দেন। আহত ঐ সাহাবীর মাথা নবী (সা) এর পায়ের উপর থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয় ( ইবনু হিশাম, আস সীরাতুন নববিয়্যাহ, ৩/৭৫, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩০৮-৩০৯ )।
১৩- সা’দ ইবনুর রাবী’ মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করা অবস্থায়ও রাসূলুল্লাহর (সা) নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত, উহুদ যুদ্ধে শত্রুদের আঘাতে মৃত্যুর পথযাত্রী হয়ে শাহাদাতের অপেক্ষা করছিলেন, তাদের মধ্যে সা’দ ইবনুর রাবী’ একজন। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে জিহাদে অংশ গ্রহণ করে নিজের জীবনটাই পেশ করেছেন। তার সমস্ত দেহে তীর, বল্লম, বর্শা ও তরবারীর ৭০টি আঘাত ছিল। শরীরে কোনো মতে হয়ত জীবনটা আছে। নানা ধরনের অস্ত্রের আঘাতে জর্জরিত মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফটকারী এক মুমূর্ষ ব্যক্তি। দুনিয়ার জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে বোধ হয় একটি মুহূর্তের ব্যবধান। এমতাবস্থায়ও নিজের পরিবার-পরিজন, সন্তানাদি ও ধন-সম্পদের চিন্তা না করে রাসলুল্লাহ (সা) এর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত, ব্যথিত। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত এই বাস্তব ঘটনারই বর্ণনা রয়েছে বিভিন্ন হাদীস, সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থে। যায়দ ইবন সাবিত (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) উহুদ যুদ্ধের দিনে আমাকে সা’দ ইবনুর রাবী’ (রা) এর অনুসন্ধানে এই বলে পাঠালেন যে,
إِنْ رَأَيْتَه فَاقْرَأْهُ مِنِّي السَّلامَ، وَقُلْ لَهُ يَقولُ لَكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَيْفَ تَجِدُكَ؟
যদি তুমি তাকে পাও তাহলে আমার সালাম পৌঁছে দিও এবং তাকে বল, রাসূলুল্লাহ (সা) আপনাকে বলেছেন, ‘আপনার অবস্থা কি?’। যায়েদ ইবন সাবিত বলেন, আমি নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তাকে খুঁজতে থাকলাম এবং তাকে মৃত্যুর শেষ প্রহরে পেলাম। দেখি তার শরীরে ৭০টি তীর, বল্লম, বর্শা ও তরবারীর আঘাত রয়েছে। আমি তাকে বললাম, হে সা’দ! রাসূলুল্লাহ (সা) আপনার নিকট সালাম পাঠিয়েছেন এবং তিনি আপনার উদ্দেশ্যে বলেছেন যে, আপনার অবস্থা কি? তা যেন আমাকে অবহিত করেন। সা’দ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি এবং আপনার প্রতি আমার সালাম। তাকে বলবেন যে, আমি জান্নাতের সুঘ্রান পাচ্ছি। আর আনসারদেরকে বলবেন,
لا عُذْرَ لَكُمْ عِنْدَ اللهِ أَنْ يُخْلِصَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ وَفِيكُمْ شُفْرٌ يَطْرِفُ
তোমাদের জীবনের শেষ বিন্দু দিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি নিষ্ঠাবান থেকো, অন্যথায় আল্লাহর নিকট তোমাদের কোনো ওযর গ্রহণযোগ্য হবে না’। যায়েদ (রা) বলেন, এই কথা বলার সাথে সাথেই তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন, আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন! (আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক, আল- জিহাদ, সম্পাদনা, ড. নাযীহ হাম্মাদ, তিউনিসিয়া-আদ-দারুত তিউনিসিয়া, প্রকাশকাল- ১৯৭২ ঈ, পৃ. ৮০, আল হাকিম, আল- মুস্তাদরাক, ৩/২২১, নং ৪৯০৬, আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ৩/৮৭, আল-বাইহাকী, দালায়িলুন নাবুওয়াহ ৩/২৪৮, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩২১ (বাংলা সংস্করণ), আল-হাকিম ও আয-যাহাবী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে হাদীসটি হাসান পর্যায়ে পৌঁছে বলেও কেউ কেউ বলেছেন )।
এ ভাবেই সা’দ ইবনুর রাবী’ (রা) তার জীবনের শেষ মুহূর্তেও রাসূলুল্লাহকে (সা) নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছেন। নিজের জীবন তো উৎসর্গ করেছেনই এবং শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার পূর্বে নিজের গোত্র-গোষ্ঠী আনসারদেরকেও নবী (সা) কে সাহায্য করার এবং তার প্রতি একনিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালনের ওসিয়াত করেন। অন্যথায় আল্লাহ তা’আলার নিকট তাদের কোনো ক্ষমা নাই ( ড. ফাযল ইলাহী, হুজুন নবী, পৃ. ৫৭ )।
১৪- জনৈক সাহাবী নিজেই ইসলাম কাবুল করে রাসূলুল্লাহর (সা) সাহায্যে যুদ্ধের ময়দানে শাহাদাত বরণ, উহুদের যুদ্ধের শেষে মুসলিমগণ তাদের শহীদ ও আহতদের খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করেন। মুসলিমগণ আহতদের মধ্যে উসাইমীরকেও দেখতে পান, যার নাম ছিল ‘আমর ইবন সাবিত। তার প্রাণ ছিল তখন ওষ্ঠাগত। ইতঃপূর্বে তাকে ইসলামের দা’ওয়াত দেওয়া হতো, কিন্তু তিনি ইসলাম গ্রহণ করতেন না। এ জন্য সাহাবীগণ বিস্মিতভাবে পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করেন, এই উসাইমীর কিভাবে এখানে আসল? আমরা তো তাকে দ্বীনের বিরোধী হিসেবেই রেখে এসেছিলাম। তাই তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে উসাইমীর! কোনো বিষয় তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছে? তোমার সম্প্রদায়কে সাহায্য করার উত্তেজনা, না ইসলামের প্রতি আকর্ষণ? তিনি উত্তরে বলেন, ইসলামের আকর্ষণ। আসলে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) এর প্রতি ঈমান এনেছি এবং এরপর রাসূলুল্লাহকে (সা) সাহায্য করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধে শরীক হয়েছি এবং তার সাথে যুদ্ধ করেছি। তারপর যে অবস্থায় রয়েছি তা আপনারা দেখতে পাচ্ছেন। এ কথা বলার পরই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এ কথা শোনার পর বলেন, إِنَّهُ لَمِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ ‘নিশ্চয় সে জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত’। আবু হুরায়রা (রা) বলেন, ‘অথচ তিনি এক ওয়াক্ত সালাতও আল্লাহর জন্য আদায় করেন নি’ (ইবনু হিশাম, আস সীরাতুন নববিয়্যাহ ২/৯০, আল-বাইহাকী, দালায়িলুন নাবুওয়াহ ৩/২৪৭, যাদুল মা’আদ ৩/১৮০, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩২১-৩২২ )।
আল্লাহর নবী (সা) এর এই সাহাবী জীবনের শেষ মুহূর্তে ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়ে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ঈমান গ্রহণ করেই আল্লাহর দ্বীন ও রাসূলুল্লাহর (সা) সাহায্যে তরবারী নিয়ে ময়দানে কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন। তিনি ইসলামের সালাতসহ অন্য কোনো ‘আমলই করার সুযোগ লাভ করেননি। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহর রাসূলের (সা) ভালোবাসায় সিক্ত সৌভাগ্যবান ব্যক্তিগণ এভাবেই ত্যাগের মহিমায় ইসলামের ইতিহাসে চির ভাস্বর হয়ে আছেন।
১৫- রাসূলুল্লাহ (সা) যেন তার যানবাহন থেকে পড়ে না যান এ কারণে আবু কাতাদার সারারাত তার সঙ্গে পথ চলা, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন আরেক সাহাবী আবু কাতাদাহ আল- আনসারী (রা)। যিনি নিজের আরাম-আয়েশে ত্যাগ করে আল্লাহর রাসূল (সা) এর আরাম-আয়েশ ও নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ঘটনার বিবরণ হচ্ছে যে, কোনো এক সফরে রাসূলুল্লাহ (সা) নিজ বাহনের পিঠে আরোহণ করে রাত্রিতে পথ চলছিলেন। আরোহণ অবস্থায় ঘুমের ঘোরে তিনি নিচে পড়ে যান কিনা এ দুঃচিন্তায় সাহাবী আবু কাতাদাহ সারারাত তার বাহনের পাশে থেকে নবী (সা) কে পাহারা দিয়েছেন। আবু কাতাদাহ (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা) আমাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন,
إِنَّكُمْ تَسِيرُونَ عَشِيَّتَكُمْ وَلَيْلَتَكُمْ وَتَأْتُونَ الْمَاءَ إِنْ شَاءَ اللَّهُ غَدًا
তোমরা সন্ধ্যা ও রাত্রে অবিরাম যাত্রা করবে এবং আগামী কাল আল্লাহ চাহে তো পানির কাছে পৌঁছে যাবে’। তখন লোকেরা কেউ কারোর জন্য অপেক্ষা করল না। আবু কাতাদাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) মধ্যরাত পর্যন্ত বিরতিহীন ভাবে একনাগারে পথ চলেন এবং আমি তার পাশেই ছিলাম। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা) তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে যানবাহন থেকে একদিকে ঝুঁকে পড়তেন। আমি অতি সন্তর্পণে ঘুম না ভাঙ্গিয়ে তার আসনটি সোজা করে দেই। এ ভাবে রাসুলুল্লাহ (সা) অধিকাংশ রাত পর্যন্ত পথ চলেন।
এরপর আবারো তিনি একদিকে ঝুঁকে পড়েন। তখন আমি তার ঘুম না ভাঙ্গিয়েই আবার আসনটিকে সোজা করে দেই। এ ভাবেই শেষ রাত পর্যন্ত পথ চলতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি আগের দু’বারের চেয়ে অধিক ঝুঁকে পড়েন এবং একদম নিচে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হন। আমি তাকে সাহায্য করি। তখন তিনি মাথা উঠিয়ে বলেন
مَنْ هَذَا؟ قُلْتُ أَبُو قَتَادَةَ. قَالَ: مَتَى كَانَ هَذَا مَسِيرَكَ مِنِّي؟ قُلْتُ مَا زَالَ هَذَا مَسِيرِى مُنْذُ اللَّيْلَةِ. قَالَ: حَفِظَكَ اللَّهُ بِمَا حَفِظْتَ بِهِ نَبِيَّهُ
কে? আমি জবাব দিলাম, আমি আবু কাতাদাহ। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘কখন থেকে তুমি এ ভাবে আমার সাথে সাথে পথ চলছো?’ আমি বললাম, প্রথম রাত থেকেই আমি আপনার সাথে সাথে চলছি। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে হেফাযত করুন, যে ভাবে তুমি তার নবীকে হেফাযত করেছো’ (সহীহ মুসলিম, ১/৪৭২, নং ৬৮১, ইবনুল জা’দ, ‘আলী আল-বাগদাদী, মুসনাদ ইবনুল জা’দ, সম্পাদনা, ‘আমির হায়দার, বৈরুত, মুআসসাসাতু নাদির, ১ম সংস্করণ, ১৪১০ হি. ১/৪৫০, নং ৩০৭৫ )।
এ ভাবে নবী (সা) এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার দাবী পূরণ করার জন্যই আবু কাতাদাহ (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) আরাম-আয়েশ ও নিরাপত্তার জন্য সমস্ত রাত তার সাথে পাশাপাশি পথ চলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) তন্দ্রা বা ঘুমের কারণে যখনই বাহন থেকে আসনসহ পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, তখনই আবু কাতাদাহ দৌড়ে গিয়ে অতি সন্তর্পণে আসনটিকে বাহনের উপর পুনরায় সোজা করে দিয়েছেন।
১৬- মহিলা সাহাবীদেরও যুদ্ধের ময়দানে ত্যাগের নমুনা স্থাপন, আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর রাসূলুল্লাহর (সা) সাহায্য করা মুসলিম পুরুষ ও নারী নির্বিশেষে সকলের ঈমানী দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহর (সা) ভালোবাসার অর্থ তাকে সুখে-দুঃখে, বাড়ীতে সফরে, যুদ্ধ ও সন্ধি সর্বত্র তার সাহায্য করা তার প্রতিরক্ষা দায়িত্ব পালন করা ঈমান বিল্লাহ ও ঈমান বির রাসূল এবং তার প্রতি সর্বোচ্চ ভালোবাসার দাবী। এ দাবী পূরণে পুরুষ সাহাবী (রা) এর পাশাপাশি মহিলা সাহাবী (রা), তারাও অবদান রেখেছেন। তারাও যুদ্ধের ময়দানে গিয়েছেন। প্রয়োজনে অস্ত্র ধারণ করে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। তার প্রয়োজন না হলে মুসলিম বাহিনীকে পানি পান করানো এবং আহতদেরকে সেবা করার কাজ করতেন। এ জন্য আমরা দেখি উহুদের যুদ্ধের
শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যেও মহিলা সাহাবীগণ উপস্থিত ছিলেন। এমনকি উম্মুল মু’মিনীনগণও ছিলেন। আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেছেন,
لَمَّا كَانَ يَوْمُ أُحُدٍ، الْهَزَمَ النَّاسُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: وَلَقَدْ رَأَيْتُ عَائِشَةَ بِنْتَ أَبِي بَكْرٍ ، وَأَمَّ سُلَيْمٍ وَإِنَّهُمَا لَمُشَمِّرَتَانِ، أَرَى خَدَمَ سُوقِهِمَا تَنْقُزَانِ القِرَبَ، وَقَالَ غَيْرُهُ: تَنْقُلَانِ القِرَبَ عَلَى مُتُونِهِمَا، ثُمَّ تُفْرِغَانِهِ فِي أَفْوَاهِ القَوْمِ ، ثُمَّ تَرْجِعَانِ فَتَمْلَأَئِهَا، ثُمَّ تَحِيتَانِ فَتُفْرِغَائِهَا
فِي أَفْوَاهِ القَوْمِ
যখন উহুদ যুদ্ধে মুসলিমগণ নবী (সা) থেকে ছত্রভঙ্গে হয়ে যায়। তিনি বলেন, আমি ‘আয়েশাহ বিনত আবি বকর এবং উম্মু সুলাইম (রা) কে দেখি যে, তারা পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত কাপড় উঠিয়ে নিয়ে পিঠের উপর পানির মশক বহন করে আনছেন এবং পানি বের করে কাওমের (আহতদের) মুখে দিচ্ছেন। অন্যজন বলেছেন যে, তারা তাদের পিঠে করে পানির মশক বহন করে আনছেন। তারপর তা আহতদের মুখে দিয়ে মশক খালি করে আবার ভর্তি করে আনছেন এবং লোকদের মুখে পানি তুলে দিচ্ছেন (সহীহুল বুখারী ৪/৩৩, নং ২৮৮০, ৫/৩৭, নং ৩৮১১, ৫/৯৭, নং ৪০৬৪, সহীহ মুসলিম ৩/১৪৪৩, নং ১৮১১ )।
সা’লাবাহ ইবন মালিক বলেন, ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) আনসার মহিলাদের মধ্যে রেশম কিংবা পশমীর পোশাক বন্টন করছিলেন। একটি পোশাক অবশিষ্ট থাকল, তখন তার কাছে কেউ কেউ বললেন, হে আমীরুল মু’নীন! আপনি এটি আপনার ঘরে রাসূলুল্লাহর (সা) যে কন্যা আছে; অর্থাৎ উম্মু কুলসুম বিনত ‘আলীকে দেন। তখন ‘উমার বলেন,
أُمُّ سَلِيطٍ أَحَقُّ، وَأُمُّ سَلِيطٍ مِنْ نِسَاءِ الأَنْصَارِ، مِمَّنْ بَايَعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ عُمَرُ : فَإِنَّهَا كَانَتْ تَزْفِرُ لَنَا القِرَبَ يَوْمَ أُحُدٍ
উম্মু সালীতই অধিক হকদার, উম্মু সালীত ঐসব আনসার মহিলাদের একজন যারা রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে বাই’আত গ্রহণ করেছেন। তিনি আরো বলেন, কেননা তিনি উহুদ যুদ্ধের দিন আমাদের জন্য পানির মশক বহন করে আনতেন (সহীহুল বুখারী ৪/৩৩, নং ২৮৮০১, ৫/১০০, নং ৪০৭১ )।
১৭- যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে আসা মুজাহিদগণকে মহিলা সাহাবীর তিরস্কার করা, উহুদের যুদ্ধের মোড় পরিবর্তনের ফলে মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে মদীনায় ফিরে যেতে ও প্রবেশ করতে দেখে উম্মু আইমান (রা) তাদের চেহারায় মাটি নিক্ষেপ করেন এবং তাদেরকে বলতে লাগলেন, ‘তোমরা এ সূতা কাটার ফিরকী ( সূতা কাটা ‘আরব মহিলাদের বিশিষ্ট কাজ ছিল। এ জন্য সূতা কাটার চরকা তাদের কাছে সাধারণ বস্তু ছিল, যেমন আমাদের দেশে পুরুষদেরকে তিরস্কার করার প্রবাদ হিসেবে প্রচলিত আছে, পুরুষ হয়েও এ কাজটি যখন পারছোনা, তাহলে হাতে চুরি পরে থাক ) গ্রহণ কর এবং আমাদেরকে তরবারী দিয়ে দাও’। এরপর তিনি দ্রুতগতিতে যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছেন এবং আহত মুজাহিদগণকে পানি পান করাতে শুরু করেন। তার উপর হিব্বান ইবনুল ‘আরাকাহ তীর নিক্ষেপ করে। তিনি পড়ে যান এবং বিবস্ত্র হয়ে যান, এ দেখে আল্লাহর শত্রু প্রচণ্ড হাসিতে মেতে ওঠে। রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে বিষয়টি ভীষন কষ্টকর মনে হয় এবং তিনি সা’দ ইবন আবি ওক্কাস (রা) কে একটি পলকবিহীন তীর দিয়ে বলেন, ‘এটা নিক্ষেপ কর’। সা’দ (রা) তীরটা নিক্ষেপ করলে এটা হিব্বানের গলায় লেগে যায় এবং সে চিৎ হয়ে পড়ে যায় এবং বিবস্ত্রও হয়ে যায়। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সা) এমন হাসেন যে, তার দাঁত দেখা যায় এবং তিনি বলেন,
اسْتَقَادَ لَهَا سَعْدٌ أَجَابَ اللَّهُ دَعْوَتَهُ
সা’দ উম্মু আইমানের বদলা নিয়েছে। আল্লাহ তার দু’আ কবুল করুন ( আল-ওয়াকিনী, আল-মাগাযী ১/২৪১, ‘আলী ইবন ইবরাহীম আল-হালাবী, আস্-সীরাতুল হালাবিয়্যাহ, বৈরুত-দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, ২য় সংস্করণ, ১৪২৭হি, ২/৩১০, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩১৯ (বাংলা সংস্করণ) )। উম্মু আইমান (রা) রাসূলুল্লাহকে (সা) যুদ্ধের ময়দানে ফেলে মদীনাতে ফিরে আসা সাহাবীগণকে গ্রহণ করতে পারেননি। তাই তিনি তাদেরকে তিরস্কার করেছেন এবং নিজে রাসূলুল্লাহ ও আহত সাহাবীগণের সাহায্যে দ্রুতগতিতে যুদ্ধের ময়দানে ছুটে গিয়েছেন। আহতদের সেবার কাজে লেগে গেছেন। নিজের জীবনের নিরাপত্তার কি হবে এসব ভাবনা তাকে আটকিয়ে রাখতে পারেনি। ফলে রাসূলুল্লাহ (সা) শত্রুর হাতে তার অপমানে ব্যথিত হয়েছেন এবং প্রতিশোধ নেবার জন্য সাহাবী সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা) কে দায়িত্ব দিয়েছেন এবং তার প্রতিশোধে সন্তোষ ও স্বস্তি প্রকাশ করে তার জন্য দু’আ করেছেন। এটি ত্যাগী এই মহিলা সাহাবী (রা) এর জন্য দুনিয়াতেই চরম পাওয়া।
এভাবে আল্লাহর রাসূল (সা) এর সাহাবীগণ (রা) তার উদ্দেশ্যে নিজেদের জীবন ও সম্পদকে অকাতরে ব্যয় করতে পরিপূর্ণ প্রস্তুত থেকেছেন এবং প্রয়োজনের সময় জীবন ও সম্পদ, কিংবা নিজের আরাম আয়েশকে বিসর্জন দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহর (সা) রক্ষা, নিরাপত্তা, আরাম আয়েশের বিঘ্ন না ঘটা, ক্ষতির ঝুঁকি ইত্যাদি বিষয়ে সর্বদা সতর্ক থেকেছেন। কেননা সাহাবীগণ; পুরুষ ও নারী নির্বিশেষে রাসূলুল্লাহকে (সা) নিজেদের সবকিছুর চেয়ে অধিক ভালোবাসতেন। তারা ছিলেন তার ভালোবাসায় সিক্ত। তাই তারা তার উদ্দেশ্যে জীবন, সম্পদ, সন্তানাদি সবকিছু উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন এবং উৎসর্গ করেছেন। সকল প্রকার ত্যাগ ও কুরবানীর নজির স্থাপন করেছেন। এক্ষেত্রে তারা ছিলেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং ত্যাগের মহিমায় দীপ্ত।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ : পঞ্চম নিদর্শন
রাসূলুল্লাহর (সা) উপস্থাপিত দ্বীন-শরী’য়াত ও সুন্নাতের সাহায্য, সংরক্ষণ এবং প্রতিরোধ করা
এ কথা সর্বজন স্বীকৃত যে, যে ব্যক্তি যাকে সত্যিকারের ভালোবাসে সে তার প্রিয়জনের অনুসরণ করতেও ভালোবাসে এবং তার চিন্তা-বিশ্বাস ও কর্ম ও কর্মপদ্ধতির সাহায্য করে, সংরক্ষণ করে এবং তা রক্ষা ও তার প্রতিরোধে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা) মহান আল্লাহ প্রদত্ত যাবতীয় উপায় উপকরণ মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের জন্য ব্যয় করেছেন। তিনি তার সমস্ত শক্তি দিয়ে মানুষদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনার প্রানান্তকর চেষ্টা করেছেন। মানুষকে মানুষের গোলামী থেকে মুক্ত করে মানুষের স্রষ্টা ও রাব্বুল ‘আলামীনের দাসত্ব করার দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। আল্লাহর দ্বীন ও রিসালাতের দায়িত্ব পালনের নিমিত্তে প্রানপণ জিহাদ করেছেন। যাতে আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হয়, কাফির-মুশরিক ও মানব রচিত বাতিল দ্বীন-ধর্ম ও মতবাদ পরাজিত হয়, ভূলুণ্ঠিত হয়। তিনি পৃথিবী থেকে পাপাচার, অনাচার, অন্যায়, অবিচার ও বিশৃঙ্খলা পুরোপুরিভাবে দূর করে সেখানে আল্লাহ তা’আলার পরিপূর্ণ দ্বীন প্রতিষ্ঠায় লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। যার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন
{وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ }
“আর তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাকবে যতক্ষণ না ফেৎনা দূর হয় এবং দ্বীন পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৩৯, আল-বাকারা, আয়াত: ১৯৩]
এ আয়াতে উল্লেখিত শব্দ ‘ফিৎনা’ ও ‘দ্বীন’ শব্দ দু’টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাফসীরবিদগণ এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা করেছেন।
এক. ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস (রা) থেকে এর তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘ফিৎনা অর্থ কুফর ও শিরক আর দ্বীন অর্থ ইসলাম। এ তাফসীর অনুযায়ী আয়াতে কারীমার অর্থ হচ্ছে, মুসলিম উম্মাহকে কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই-সংগ্রাম করে যেতে হবে যতক্ষণ না শিরক ও কুফর সমূলে উৎপাটিত হয় (ইবন জারীর, তাফসীরুত তাবারী ৩/৫৭০, ১৩/৫৩৮, তাফসীরুল কুরতুবী ২/৩৫৩, তাফসীর ইবন কাসীর৪/৫৫-৫৬ )। এ অর্থে কিয়ামাত পর্যন্ত শর্ত সাপেক্ষে (যা অন্যান্য শার’য়ী দলীল দ্বারা প্রমাণিত) জিহাদ করে যাওয়া, যতক্ষণ সমাজ ও পৃথিবী থেকে শিরক ও কুফরী শেষ না হয় এবং শিরক ও কুফরী মতবাদের প্রভাব হ্রাস না হয়।
দুই. ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) সহ অন্যান্য কতিপয় সাহাবীগণ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘ফিৎনা’ হচ্ছে, দুঃখ-দুর্দশা, যুলম-নির্যাতন ও বিপদ-মুসীবতের ধারা, আর ‘দ্বীন’ শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রভাব ও বিজয়। মক্কার কাফির-মুশরিকগণ মুসলিমরা যতদিন মক্কায় অবস্থান করেছিলেন, তারা তাদের উপর সার্বক্ষণিক যুলম-নির্যাতন ও অত্যাচার অব্যাহত রেখেছিল। তাদের আওতাধীন থাকায় তাদের অকথ্য নির্যাতন ও চাপানো দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছেন। তারপর তারা যখন মদীনায় হিজরাত করেন এবং নতুন একটি দেশে আশ্রয় নেন, তারপরও তারা হিংসা ও রোষের বশীভূত হয়ে মদীনা রাষ্ট্রটির উপর আক্রমণ করে তা ধ্বংস করার পাঁয়তারা করেছিল। এ প্রেক্ষিতে আয়াতের অর্থ হবে যে, মুসলিমগণকে কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ অব্যাহত রাখা কর্তব্য, যতক্ষণ তারা অন্যায়- অত্যাচার ও উৎপীড়ণ থেকে মুক্তি লাভ করতে সমর্থ না হন। মুসলিমগণ স্বচ্ছন্দে তাদের দ্বীন পালন করতে কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন না হন ( তাফসীর ইবন কাসীর ৪/৫৭-৫৮, কুরআনুল কারীম বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর ১/৯০৬ )।
তিন. এ আয়াতের আরেকটি তাফসীর হচ্ছে, আয়াতে জিহাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়েছে। আর তা হচ্ছে, একদিকে ফিৎনা না থাকা অপরদিকে দ্বীন সম্পূর্ণরূপে কেবল আল্লাহর জন্য হবে, দ্বীন বিজয়ী হবে। শুধু এই সর্বাত্মক মহৎ উদ্দেশ্যেই কেবল মুসলিমদের জন্য লড়াই- সংগ্রাম করা জায়িয বা ফারয। কেবলমাত্র এ উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে লড়াই করা মুসলিমদের মোটেই জায়িয নয় এবং তাতে অংশগ্রহণও শোভনীয় নয়। একটি হাদীসে এ কথার প্রমাণ রয়েছে। আবু মূসা
আল-আশ’আরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَا الْقِتَالُ في سَبِيلِ اللَّهِ؟ فَإِنَّ أَحَدَنَا يُقَاتِلُ غَضَبًا، وَيُقَاتِلُ حَمِيَّةً، فَرَفَعَ إِلَيْهِ رَأْسَهُ، قَالَ: وَمَا رَفَعَ إِلَيْهِ رَأْسَهُ إِلَّا أَنَّهُ كَانَ قَائِمًا، فَقَالَ: مَنْ قَاتَلَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ العُلْيَا، فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
জনৈক ব্যক্তি এসে (সা) এর কাছে আসেন অতঃপর বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদ কি? কেননা আমাদের কেউ তো ক্রোধের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধ করে, আবার কেউ নিজস্ব গর্ব-অহমিকা (গোত্রীয় বা জাতীয় যাই হোক তা) ঠিক রাখার জন্য যুদ্ধ করে। তখন তিনি তার দিকে নিজের মাথা উঠালেন। তিনি তার দিকে মাথা এ জন্য তুলেছেন যে, লোকটি দাঁড়িয়ে ছিল, তারপর বলেন, ‘যে আল্লাহর কালিমাকে বুলন্দ করার জন্য যুদ্ধ করে সে মহাপরাক্রান্ত ও মহিমান্বিত আল্লাহর পথে জিহাদ করল ( সহীহুল বুখারী ১/৩৬, নং ১২৩, সহীহ মুসলিম ৩/১৫১৩, নং ১৯০৪ )। কোনো কোনো মুফাসসির এ আয়াতের উপর্যুক্ত তিনটি তাফসীরই গ্রহণ করেছেন ( আশ-শাইখ আস-সা’দী, তাইসীরুল কারীম, পৃ. ৮৯, ৩২১, আত-তাফসীরুল মুয়াসার, বাদশাহ ফাহদ কমপ্লেক্স, আল-মাদীনা, ২য় সংস্করণ, ১৪৩০ হি, পৃ. ৩০, আর দেখন, কুরআনুল কারীম, বাংলা অনুবাদ ১/৯০৬-৯০৭)।
রাসূলুল্লাহ (সা) এ আয়াতসহ আরো অন্যান্য আয়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী দ্বীনের প্রচার করেছেন এবং ফিৎনার মূলোৎপাটন করে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য যথাযথ লড়াই-সংগ্রাম করেছেন এবং উম্মাতকে একটি পূর্ণাঙ্গ, প্রতিষ্ঠিত, শ্বেত-শুভ্র ও পরিচ্ছন্ন দ্বীনের উপর রেখে গেছেন। স্বাভাবিকভাবেই যারা রাসূলুল্লাহকে (সা) প্রকৃত ভালোবাসার দাবী করে তারাও তার সার্বিক জীবন আদর্শের অনুসরণ করে। তাদের ইচ্ছা, কর্ম, ধন-সম্পদ, জীবন ও প্রাণ সেই মহৎ উদ্দেশ্যে দ্বিধাহীন চিত্তে স্বতস্ফুর্তভাবে ব্যয় করে, যে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আল্লাহর প্রিয় রাসূল (সা) সব কিছু ব্যয় করেছেন। নবী (সা) এর প্রিয় সাহাবীগণ (রা) তার উপস্থাপিত দ্বীন-শরী’য়াত ও সুন্নাতের প্রচার করা, সাহায্য করা, সংরক্ষণ করা এবং প্রতিরোধ করা ইত্যাদির ক্ষেত্রে অনন্য অবদান ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন এবং এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন (ড. ফাযল ইলাহী, হুজুন নবী, পৃ. ৭৫-৭৬ )।
তার কিছু নমুনা নিম্নে তুলে ধরা হলো;
১- আল্লাহর দ্বীন ও রাসূলুল্লাহ সুন্নাতের (জীবনাদর্শ) বিজয় ও রক্ষায় উমাইর ইবনুল হাম্মামের আত্মত্যাগ, বদরের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলিমদের দ্বীনের বিজয়, সুরক্ষা ও প্রতিরক্ষার জন্য সাহাবীগণকে উৎসাহ দিতে গিয়ে বলেন,
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَا يُقَاتِلُهُمْ الْيَوْمَ رَجُلٌ فَيُقْتَلُ صَابِرًا مُحْتَسِبًا، مُقْبِلًا غَيْرَ مُدْبِرٍ، إِلَّا أَدْخَلَهُ اللَّهُ الْجَنَّةَ
সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের জবীন! যে ব্যক্তি আজকের দিনে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে পুণ্যের কাজ মনে করে, ধৈর্যের সাথে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে পিছ পা না হয়ে লড়াই করতে করতে নিহত হবে, আল্লাহ তাকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন’ (সীরাত ইবন হিশাম, ২/২৪৪, ইবন কাসীর আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ২/৪২০, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৬২-২৬৩ (বাংলা সংস্করণ )।
আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, বদরের যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (সা) উদ্বুদ্ধ করতে আরো বলেন,
قُومُوا إِلَى جَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضُ، قَالَ: يَقُولَ عُمَيْرُ بْنُ الْحُمَامِ الْأَنْصَارِيُّ: يَا رَسُولَ اللهِ، جَنَّةٌ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضُ؟ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: بَحْ بَعٍ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا يَحْمِلُكَ عَلَى قَوْلِكَ بَحْ بَحْ؟ قَالَ: لَا وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِلَّا رَجَاءَةَ أَنْ أَكُونَ
مِنْ أَهْلِهَا، قَالَ: فَإِنَّكَ مِنْ أَهْلِهَا، فَأَخْرَجَ ثَمَرَاتٍ مِنْ قَرَيْهِ، فَجَعَلَ يَأْكُلُ مِنْهُنَّ، ثُمَّ قَالَ: لَئِنْ أَنَا حَبِيتُ حَتَّى أَكُلَ تَمَرَانِي هَذِهِ إِنَّهَا لَحَيَاةٌ طَوِيلَةٌ، قَالَ: فَرَمَى بِمَا كَانَ مَعَهُ مِنَ التَّمْرِ، ثُمَّ قَاتَلَهُمْ حَتَّى قُتِلَ
তোমরা ঐ জান্নাতের দিকে উঠে যাও যার প্রস্থ আসমান ও জমিনের সমান’। এমন ঘোষণা শুনে ‘উমাইর ইবনুল হাম্মাম আল-আনসারী বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এমন জান্নাত, যার প্রস্থ আসমান ও জমিনের সমান? তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’, তখন ‘উমাইর বলেন, খুব ভাল! খুব ভাল!
তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘তোমাকে এ কথা বলতে কিসে উদ্বুদ্ধ করল?’ ‘উমাইর বললেন, না, আল্লাহর শপথ! হে আল্লাহর রাসূল! আমার তো শুধু এই আশা যে, আমিও ঐ জান্নাতবাসীদেরই অন্তর্ভুক্ত হবো। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয় তুমি ঐ জান্নাতবাসীদেরই অন্তর্ভুক্ত’। তারপর তিনি তার খাবারের থলে থেকে কিছু খেজুর বের করে খেতে লাগলেন। তারপর বলেন, যদি আমি এ খেজুরগুলো খেয়ে শেষ করা পর্যন্ত জীবিত থাকি তবে এটাও তো দীর্ঘ জীবন হয়ে যাবে। সুতরাং তিনি তার কাছে যে খেজুরগুলো ছিল সেগুলো ফেলে দিলেন। তারপর মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন (সহীহ মুসলিম ৩/১৫১০, নং ১৯০১, আল-বাইহাকী, দালায়িলুন নাবুওয়াহ ৩/৬৮, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ২/৪২০, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৬২-২৬৩ (বাংলা সংস্করণ )।
২- রাসূলুল্লাহর (সা) দ্বীন, তার সুন্নাতের সুরক্ষা এবং তার শত্রুদেরকে প্রতিরোধ করতে দুই কিশোর যুবক সাহাবীর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ, রাসূলুল্লাহর (সা) দ্বীন ইসলামের সুরক্ষা, আল্লাহর রাসূল এবং তার সুন্নাত বা জীবন আদর্শের প্রতিরক্ষার জন্য দু’জন কিশোর উহুদের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে আল্লাহর রাসূল ও তার দ্বীনের এক জঘন্য দুশমন কুফরী শক্তির প্রধান নেতৃত্ব আবু জাহলকে হত্যা করেন। বিশিষ্ট সাহাবী ‘আব্দুর রহমান ইবন ‘আওফ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বদরের যুদ্ধের দিন আমি সৈন্যদের সারিতে ছিলাম। এমতাবস্থায় হঠাৎ ডানে এবং বামে অল্প বয়স্ক দু’জন যুবককে দেখতে পেলাম। তাদের উপস্থিতিতে আমি নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারলাম না। এমন অবস্থায় তাদের একজন তার সঙ্গীকে এড়িয়ে আমার কাছে এসে বলল, চাচ! আবু জাহল কোনো লোকটি, আমাকে দেখিয়ে দিন। আমি বললাম, ভাতিজা! তাকে তোমার কি প্রয়োজন? সে বলল, আমি জেনেছি, সে রাসূলুল্লাহকে (সা) মন্দ বলেছে। সেই সত্তার কসম! যার হাতে আমার জীবন রয়েছে, যদি আমি তাকে দেখতে পাই তাহলে যতক্ষণ আমাদের মধ্যে যার মৃত্যু পূর্বে অবধারিত হয়েছে সে মৃত্যুবরণ না করবে ততক্ষণ আমার অস্তিত্ব তার অস্তিত্ব থেকে পৃথক হবে না। আমি ছেলেটি কথায় অভিভূত হয়ে পড়লাম। ‘আব্দুর রহমান বলেন,
এরপর দ্বিতীয় যুবকটি এসেও আমাকে একই কথা বলল। আমি তখন দেখলাম যে আবু জাহল লোকদের মধ্যে চক্কর দিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি তাদেরকে দেখিয়ে দিলাম। একথা কোনো মাত্র তারা উভয়ে তরবারী নিয়ে লাফ দিয়ে এগিয়ে চলল এবং সেই কুখ্যাত নরাধমকে ধরাশায়ী করল। এরপর রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে প্রত্যাবর্তন করল। ঐ দু’যুবকের নাম ছিল, মু’আয ইবন ‘আমর ইবনুল জামূহ এবং মু’আয ইবন ‘আফরা (রা)। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের উভয়ের তরবারী পরীক্ষা করে বলেছেন, তোমরা দু’জনই তাকে হত্যা করেছ (সহীহুল বুখারী ৪/৯১, নং ৩১৪১, সহীহ মুসলিম ৩/১৩৭২, নং ১৭৫২)।
পরে অবশ্য মু’আয ইবন ‘আফরা যুদ্ধ করতে করতে ওহুদেই শাহাদাত বরণ করেন। তাই রাসূলুল্লাহ (সা) আবু জাহলের জিনিসপত্রগুলো মু’আয ইবনুল জামূহকে দিয়েছেন। আর তরবারীটি দিয়ে ছিলেন ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) কে। কারণ তিনি শেষ মুহূর্তে তার কাছে গিয়ে তাকে শেষ নিশ্বাস অবস্থায় পেয়েছিলেন এবং তার মস্তক কর্তন করে রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে হাজির করেছিলেন। তার মাথা দেখে রাসূলুল্লাহ বলেন, ‘এ ব্যক্তি এ উম্মাতের ফির’আউন (আল-ওয়াকিন্দী, আল-মাগাধী, ১/৯১, আল-বাইহাকী, দালায়িলুন নাবুওয়াহ ৩/৮৮, আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ২/৪৪৪, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৬৬ (বাংলা সংস্করণ )।
৩- আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা এবং রাসূলের (সা) আদর্শেকে সমুন্নত করার অভিপ্রায়ে খোঁড়া সাহাবীর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ, দ্বীনে হক ও রাসূলুল্লাহর (সা) এর জীবন আদর্শের প্রতিষ্ঠা, সংরক্ষণ ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রয়োজনে যুদ্ধে যাওয়া সুস্থ ও সবল মুসলিমদের জন্য ফারয। নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য এ রকম সরাসরি যুদ্ধে যাওয়া অপরিহার্য নয়। বনু সালামাহ গোত্রের বৃদ্ধদের থেকে ইবন ইসহাক তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তারা বলেছেন, ‘আমর ইবনুল জামূহ একজন কঠিন খোঁড়া ব্যক্তি ছিলেন, তার চারজন যুবক ছেলে ছিল, যারা সবসময়ই রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন উহুদ যুদ্ধের দিকে রওয়ানা দিচ্ছেন, তখন তার ছেলেরা তাকে বলল, আল্লাহ ‘আয্যা ওয়া জাল্লা তো আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন যে, আপনার যুদ্ধে অংশ গ্রহন করার প্রয়োজন নেই। আপনি বাড়িতেই থাকেন, আমার ছেলেরাই যথেষ্ট। তখন ‘আমর ইবনুল জামূহ রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে আসেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার এসব ছেলেরা আপনার সাথে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে নিষেধ করছে। আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই শহীদ হওয়ার আশা করি আর আমার এই খোঁড়া পা দিয়ে জান্নাতের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করতে চাই। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে বলেন,
أَمَّا أَنْتَ فَقَدْ وَضَعَ اللهُ عَنْكَ الْجِهَادَ، وَقَالَ لِبَنِيهِ: وَمَا عَلَيْكُمْ أَنْ تَدَعُوهُ، لَعَلَّ اللَّهَ يَرْزُقُهُ الشَّهَادَةَ
অবশ্য তুমি, আল্লাহ তোমাকে জিহাদ থেকে দায়মুক্তি দিয়েছেন’ আর তিনি তার ছেলেদেরকে বলেন, তোমরা তাকে এ ব্যাপারে সুযোগ দিলে তোমাদের কোনো দায় নেই। হতে পারে আল্লাহ তাকে শাহাদাত লাভের তাওফীক দেবেন’। অতঃপর ‘আমর ইবনুল জামূহ রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং উহুদ যুদ্ধের দি শাহাদাত বরণ করেন। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, তিনি বলেছিলেন, তোমরা জান্নাতে যাবে আর আমি তোমাদের কাছে বসে থাকব। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে মদীনাতে আর ফিরে আনবে না ( আল-বাইহাকী, আস্-সুনানুল কুবরা ৯/৪২, নং ১৭৮২১, সহীহ ইবন হিব্বান ১৫/৪৯৩, নং ৭০২৪, ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ৩/৮৩, আল-ওয়াকিদী, আল-মাগাযী ১/২৬৪)।
‘আমর ইবনুল জামূহ (রা) একজন খোঁড়া ব্যক্তি হয়েও আল্লাহ ও তার রাসূলের (সা) দ্বীনের বিজয় ও দ্বীনের পক্ষে জীবন দিয়ে সর্বোচ্চ ফাযীল জান্নাত লাভের অদম্য আগ্রহ নিয়ে পরিবারের নিষেধ না মেনে রাসূলুল্লাহর (সা) বিশেষ অনুমতি নিয়ে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং আল্লাহর পথে জীবন দিয়ে শাহাদাতের অমূল্য মর্যাদা লাভ করেন। এই বীর শহীদকে জাবির (রা) এর পিতা ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমর ইবন হারামের সাথে উহুদের ময়দানেই একত্রে এক কবরে দাফন করা হয় (সহীহুল বুখারী ২/৯৩, নং ১৩৫১, মুআজয়ে ইমাম মালিক, সম্পাদনা, মুহাম্মাদ ফুয়াদ ‘আব্দুল বাকী, ২/৪৭০, নং ৪৯, ইবন শুব্বাহ, তারীখুল মদীনাহ ১/১২৭ )
৪- মুস’আব ইবন ‘উমাইরের জীবন দিয়ে রাসূলুল্লাহ প্রদত্ত ইসলাম রক্ষার জাতীয় পতাকা সমুন্নত রাখার চেষ্টা, মুস’আব ইবন ‘উমাইর (রা) ছিলেন আরবের ঐশ্বর্যশালী এক বিলাসী যুবক। ইসলাম গ্রহণের কারণে তাকে সবকিছুর মায়া ত্যাগ করতে হয়। এমনকি এ কারণে তার মা পর্যন্ত তার প্রতি কঠোর আচরণ করেন। তাকে ইসলাম ত্যাগ করতে বাধ্য করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা তার মা করেছেন। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সা) প্রথম দা’ওয়াতী রাষ্ট্রদূত, যাকে তিনি মদীনার নতুন মুসলিমদেরকে দ্বীনের তা’লীম-তারবিয়াত প্রদান এবং মদীনার অবিশিষ্ট নেতৃবর্গ ও সাধারণ জনগণের কাছে ইসলামের দা’ওয়াত পৌঁছানোর দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি সেখানে গিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষে মুসলিম নেতাদের সাথে নিয়ে মদীনার প্রতিটি ঘরে ঘরে ইসলামের দা’ওয়াত পৌঁছে দেন। তার ঐকন্তিক প্রচেষ্টায় মদীনাবাসীগণ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় এসে আশ্রয় নেন এবং ইসলামের শান্তি ও ইনসাফের পতাকাতলে সমবেত হন। এর মাধ্যমেই রাসূলুল্লাহর (সা) হিজরাতের জন্য মদীনার জমীন প্রস্তুত হয়ে যায়। উহুদের যুদ্ধে মুসলিমগণের জাতীয় পতাকা মুস’আব ইবন ‘উমায়ের (রা) এর হাতে অর্পিত হয়েছিল। দ্বীন ইসলামের বিজয়, রাসূলুল্লাহর (সা) জীবন আদর্শকে সমুন্নত করা এবং ইসলামের পতাকার মর্যাদা রক্ষার মুস’আব (রা) কে প্রথম থেকেই প্রচণ্ড রকম যুদ্ধ করে আসতে হয়েছিল এবং তীর ও তরবারীর আঘাতে তার সমস্ত শারীর একেবারে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। এমনি যুদ্ধাবস্থায় মুশরিক বাহিনীর দুর্ধর্ষ ইবন কামিয়াহ আল-লাইসী অগ্রসর হয়ে তার ডান বাহুর ওপর তরাবারীর আঘাত করল। বাহুটি কেটে যাওয়ার সাথে সাথে মুস’আব (রা) বাম হাতে পতাকা ধারণ করেন। কিন্তু অবিলম্বে ইবন কামিয়াহর তরবারীর দ্বিতীয় আঘাতে তার বাম বাহুটিও দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে শত্রুপক্ষের আরেকটি তীর এসে তার জ্ঞান, ভক্তি ও বীরত্বপূর্ণ বুকটি ভেদ করে চলে গেল এবং তিনি চির নিদ্রায় নিদ্রিত হয়ে শাহীদের অমর জীবন লাভ করেন। রাসূলুল্লাহর (সা) আকৃতির সাথে মুস’আব (রা) এর আকৃতির সাদৃশ্য ছিল। সুতরাং মুস’আব (রা) কে শহীদ করে ইবন কামিয়াহ মুশরিকদের কাছে ফিরে গিয়ে চিৎকার করে ঘোষণা করে যে, মুহাম্মাদকে হত্যা করা হয়েছে (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ৩/৬৭, যাদুল মা’আদ ৩/১৭৬, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩১৪ )।
মুস’আব ইবন ‘উমাইর (রা) শাহাদাত লাভ করেন। তার পরিত্যক্ত একটি চাদর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। খাব্বাব ইবনুল আরত (রা) বলেন,
فَلَمْ تَجِدُ مَا نُكَفِّتُهُ إِلَّا بُرْدَةً إِذَا غَطَّيْنَا بِمَا رَأْسَهُ خَرَجَتْ رِجْلَاهُ، وَإِذَا غَطَّيْنَا رِجْلَيْهِ خَرَجَ رَأْسُهُ، فَأَمَرَنَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نُغَطِيَ رَأْسَهُ، وَأَنْ تَجْعَلَ عَلَى رِجْلَيْهِ مِنَ الْإِذْخِرِ
একটি চাদর ব্যতীত তাকে কাফন পরানোর মত আর কিছু আমরা পাইনি। চাদরটি দিয়ে যদি তার মাথা ঢেকে দেই তাহলে তার দু’পা বের হয়ে যায়। আর যদি তার দু’পা ঢেকে দেই তাহলে তার মাথা বের হয়ে যায়। তখন নবী (সা) আমাদেরকে তার মাথা ঢেকে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন এবয় আমরা যেন তার দু’পা ইযখির ঘাস দিয়ে ঢেকে দেই (সহীহুল বুখারী ২/৭৭, নং ১২৭৬, সহীহ মুসলিম ২/৬৪৯, নং ৯৪০ )।
৫- জিহাদের ডাকে সাড়া দিয়ে নব বিবাহিতা স্ত্রীর আলিঙ্গন থেকে যুদ্ধের ময়দানে অতঃপর শাহাদাত বরণ, আল্লাহর দিনের বিজয় ও রাসূলুল্লাহর (সা) শ্বাশ্বত জীবন আদর্শকে সমুন্নত করতে রাসূলুল্লাহর (সা) আরেক সাহাবী হানযালাহ ইবন ইবন আবি ‘আমির (রা) এর উহুদের ময়দানে শাহাদাত লাভ করেন। তিনি ছিলেন সদ্য বিবাহিত। রাতে নববধুর বাহুবন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। ইতোমধ্যে তার কানে যুদ্ধের আহ্বান সম্বলিত ঘোষণা শোনেন। সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীর বাহু বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে জিহাদের জন্য বেরিয়ে পড়েন। যখন উহুদ প্রান্তরে ভীষণ যুদ্ধ চলছে তখন তিনি মুশরিকদের সারিগুলো ভেদ করে তাদের সেনাপতি আবু সুফইয়ানের কাছে পৌঁছে গেলেন এবং তাকে প্রায় ধরাশায়ী করতেই যাচ্ছিলেন। কিন্তু মহান আল্লাহ তার ভাগ্যেই শাহাদাত লিখে রেখেছিলেন। তাই যেমনই তিনি আবু সুফইয়ানকে লক্ষ্য করে তরবারী উঁচু করে ধরেছেন, তেমনই শাদ্দাদ ইবন ‘আওস তাকে দেখে ফেলে এবং তৎক্ষণাৎ তাকে আক্রমণ করে। ফলে তিনি নিজেই শাহাদাত বরণ করেন। তাকে ফেরেশতাগণ উপরে উঠিয়ে গোসল করিয়ে ছিলেন এ জন্য তাকে হানযালা গাসীলুল মালাইকাহ বা ফেরেশতা কর্তৃক গোসলকৃত হানযালা নামে অভিহিত করা হয়। আল্লাহর দ্বীনের বিজয় ও ইসলামের প্রতিরক্ষার জন্য এই সাহাবীর ত্যাগ ও কুরবানী অকল্পনীয়। নববধুর বাহু থেকে মুক্ত হয়ে জিহাদের ময়দানে আল্লাহর দ্বীনের জন্য যুদ্ধ করতে করতে জীবনটা দিয়ে আল্লাহর কাছে সর্বোচ্চ পুরস্কার শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছেন ( ইবন সহীহ ইবন হিব্বান ১৫/৪৯৫, নং ৭০২৫, ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ৩/৬৮-৬৯, আবুল কাসিম আস-সুহাইলী, আররাওফুল ‘উনুফ, সম্পাদনা, উমার আস্-সুলামা, বৈরুত, দার ইহইয়ায়িত তুরাসিল ‘আরাবী, ১ম সংস্করণ-১৪২১ ছি ৫/৩২০, যাদুল মা’আদ ৩/১৭৯, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩০৪। হাদীসটিকে শাইখ আল-আরনাউত সহীহ বলেছেন, আলবানী হাসান বলেছেন )।
৬- আনাস ইবনুন নাযরসহ কতিপয় সাহাবীর আল্লাহর পথে জীবন দেওয়ার আহ্বান এবং নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করে দেওয়া, ইসলামের ইতিহাসের প্রসিদ্ধ উহুদ যুদ্ধে একটি অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির করুন শিকারে পরিণত হয়ে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। লড়াইয়ের ময়দানে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিস ওয়া সাল্লামকে শহীদ করা হয়েছে। হৃদয় বিদারক এ ঘটনা শুনে অনেক সাহাবী (রা) কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পড়েন এবং হতাশা আর নিরাশার মধ্যে
হাতের অস্ত্র ফেলে দিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করে দেন। কেউ কেউ এ চিন্তাও করল যে, মুনাফিকদের নেতা ‘আব্দুল্লাহ ইবন উবাইয়ের সাথে মিলিত হয়ে তাকে বলা হোক যে, সে যেন আবু সুফইয়ানের নিকট তাদের জন্য নিরাপত্তা চায়। এ অবস্থা দেখে আনাস ইবনুন নাযর (রা) তাদের নিকট এসে জিজ্ঞাসা করেন যে, তোমরা যুদ্ধাস্ত্র ফেলে দিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছ কেন? তারা উত্তর দেন যে, রাসূলুল্লাহকে (সা) তো শহীদ করা হয়েছে। তখন তিনি তাদেরকে বলেন,
فماذا تصنعون بالحَيَاةِ بَعْدَه؟ قُومُوا فَمُوتُوا عَلى مَا مَاتَ عَلَيْهِ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
‘এরপরেও তোমাদের এ জীবন দিয়ে কি করবে? উঠ। এবং রাসূলুল্লাহ (সা) যে পথে মৃত্যু বরণ করেছেন তোমরাও সে পথে মৃত্যু বরণ কর’ ( ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, সম্পাদনা, শায়খ মুহাম্মাদ আলী ও তার সঙ্গী, বৈরত আল মাকতাবাতুল ‘আসরিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ ১৯৯৮, ৩/৭৬, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩০৭ )।
আনাস ইবনুন নাযর (রা) আল্লাহর দ্বীনের সুরক্ষা এবং তাঁর দ্বীনের বিজয়ের জন্য ত্যাগ ও কুরবানীর এক অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, আনাস ইবন মালিক (রা) সে বর্ণনা দিয়ে বলেন,
فَلَمَّا كَانَ يَوْمُ أُحُدٍ وَانْكَشَفَ الْمُسْلِمُونَ قَالَ: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعْتَذِرُ إِلَيْكَ بِمَا صنع هؤلاء يَعْنِي أَصْحَابَهُ، وَأَبْرَأُ إِلَيْكَ مِمَّا صَنَعَ هَؤُلَاءِ يَعْنِي الْمُشْرِكِينَ، ثُمَّ تَقَدَّمَ فَاسْتَقْبَلَهُ سَعْدُ بْنُ مُعَادٍ، فَقَالَ: يَا سَعْدَ بْنَ مُعَاذَا الْجَنَّةَ وَرَبِّ النضر! إني أَجِدُ رِيحَهَا مِنْ دُونِ أَحَدٍ، قَالَ سَعْدٌ: فَمَا اسْتَطَعْتُ يَا
رَسُولَ اللَّهِ مَا صَنَعَ. قَالَ أَنَسٌ : فَوَجَدْنَا بِهِ بِضْعًا وَثَمَانِينَ ضَرْبَةٌ بِالسَّيْفِ أَوْ طَعْنَةً بِرُمْحٍ أَوْ رَمْيَةً بِسَهُم، وَوَجَدْنَاهُ قَدْ قُتِلَ، وَقَدْ مَثَّلَ بِهِ الْمُشْرِكُونَ، فَمَا عَرَفَهُ أَحَدٌ إِلَّا أُحْتُهُ بِبَنَانِهِ، قَالَ أَنَسٌ : كُنَّا تُرَى أَوْ نَظُنُّ أَنَّ هَذِهِ الْآيَةَ نَزَلَتْ فِيهِ وَفِي أَشْبَاهِهِ مِنْ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا
اللَّهَ عَلَيْهِ إِلَى آخِرٍ الآية
উহুদের যুদ্ধে মুসলমানগণ যখন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, তখন আনাস ইবনুন নাযর বলেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট তাদের, অর্থাৎ সহাবীগণের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থণা করছি। অপরদিকে ওদরে অর্থাৎ মুশরিকদের অপকর্ম থেকে আপনার কাছে সম্পর্কচ্ছেদ করার ঘোষণা প্রদান করছি। এ কথা বলেই তিনি সামনের দিকে অগ্রসর হন এবং সা’দ ইবন মু’আষের সাক্ষাত লাভ করেন। তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘হে সা’দ ইবন মু’য়ায! নাষরের পালনকর্তার কসম! আমি জান্নাত লাভের আশা করি। আমি সুনিশ্চিতভাবে উহুদ পাহাড়ের দিক থেকে জান্নাতের সুবাস অনুভব করছি। অতঃপর সা’দ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল। তারপর তিনি কি যে দুঃসাহসিক কর্ম করলেন, যা আমি ভাষায় বর্ণনা করতে অক্ষম। আনাস বলেন, আমরা যুদ্ধের পর তার শরীরে ৮০টিরও অধিক তরবারী, বর্শা এবং তীরের আঘাতের ক্ষত চিহ্ন পেয়েছি। মুশরিকরা তাকে হত্যা করে তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তন করেছে। তাকে এতোটাই বিকৃত করা হয়েছিল যে তাকে কেউ চিনতেই পারেনি। তার বোন আঙ্গুলের একটা চিহ্ন দেখে তাকে সনাক্ত করেন। আনাস আরো বলেন, আমরা মনে করতাম যে, আল্লাহ তা’আলার বাণী,
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ
‘মু’মিনগণের মধ্যে কতিপয় ব্যক্তি আল্লাহর সাথে তাদের চুক্তিকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছেন’ শেষ আয়াত পর্যন্ত [আল আহযাব ৩৩: ২৩] তার ও তার মতো ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যেই নাজিল হয়েছে’ (সহীহুল বুখারী, ৩/১০৩২, নং ২৬৫১, কিতাবুল জিহাদ, যাদুল মা’আদ ৩/১৭৭-১৭৮, ৯৬)।
অনুরূপ সাবিত ইবন দাহদাহ (রা) নিজের গোত্রের লোকদেরকে ডেকে বলেন, ‘যদি মুহাম্মাদ (সা) নিহত হয়ে থাকেন, তবে জেনে রেখ যে, আল্লাহ জীবিত আছেন। তিনি চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই। তোমরা তোমাদের দ্বীনের জন্য যুদ্ধ করে যাও। আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য ও বিজয় দান করবেন। তার এ কথা শুনে আনসারের একটি দল উঠে পড়েন এবং সাবিত (রা) তাদের সহায়তায় একদল মুশরিকের উপর আক্রমণ করেন, যাদের মধ্যে ‘আমর ইবনুল ‘আস, ‘ইকরামাহ ইবন আবি জাহল ও খালিদ ইবন ওয়ালিদ প্রমূখ ব্যক্তিবর্গ ছিল। সাবিত (রা) যুদ্ধ করতে করতে খালিদের বর্শার আঘাতে শহীদ হয়ে যান। তার মতো তার সঙ্গীরাও যুদ্ধ করতে করতে শাহাদাত লাভ করেন (আস-সীরাতুল হালাবিয়্যাহ ২/৩০৯, আল-ওয়াকিন্দী, আল-মাগাযী ১/২৮১, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩০৭, (বাংলা সংস্করণ )।
আবু নাজীহ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, উহুদের যুদ্ধের সময় জনৈক মুহাজির সাহাবী একজন রক্তে রঞ্জিত আনসার সাহাবীর পাশ দিয়ে গমণ করেন। মুহাজির সাহাবী তাকে বলেন, হে অমুক ভাই! আপনি কি অবগত আছেন যে, মুহাম্মাদ (সা) নিহত হয়েছেন। তখন ঐ আনসারী বলেন,
إِنْ كَانَ مُحَمَّدٌ قَدْ قُتِلَ فَقَدْ بَلَغَ، فَقَاتِلُوا عَنْ دِينِكُمْ
যদি মুহাম্মাদ (সা) নিহত হয়ে থাকেন, তিনি তো আল্লাহর দ্বীন অবশ্যই পৌঁছে দিয়েছেন। সুতরাং আপনারা আপনাদের দ্বীনের হিফাযতের জন্য যুদ্ধ করুন (আল-বাইহাকী, দালায়িলুন নাবুওয়াহ ৩/২৪৯, যাদুল মা’আদ ৩/১৮৬, ইবন কাসীর, আস-সীরাতুন
নাবাবিয়্যাহ ৩/৬১ )।
৭- দ্বীনের দা’ওয়াত পৌঁছানো, রাসূলুল্লাহর (সা) শারী’য়াতের সংরক্ষণ এবং দ্বীনকে বিজয়ী করার নির্দেশ পালনের মাধ্যমে হয় শাহাদাত কিংবা বিজয় অর্জনের সুদৃঢ় অঙ্গিকার, আল্লাহর নবী (সা) ৮ম হিজরীতে বিভিন্ন অঞ্চলের শাসক, গভর্ণর ও রাজা-বাদশাহদের নিকট দূত মারফত দাওয়াতী চিঠি প্রেরণ করেন। এই ধারাবাহিকতায় রোমান সম্রাট কায়সারের নিকট দূত হিসাবে আল হারিছ ইবন ‘উমাইর আল-আযদী (রা) কে প্রেরণ করেন। পথিমধ্যে রোমান সাম্রাজ্যের অধিনস্থ সিরিয়ার ‘বালকা’ এলাকার গভর্ণর শুরাহবীল তার গতিরোধ করে এবং তাকে হত্যা করে। তাই রাসূল্লাহ (সা) রিসালাতের দা’ওয়াত পৌঁছানো এবং দূত হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য রোমান সম্রাটের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেন। এ জন্য ৩০০০ (তিন হাজার) সৈন্যের এক মুজাহিদ বাহিনী প্রস্তুত করেন এবং তাদেরকে ঐ অঞ্চলের মানুষদেরকে প্রথমে ইসলামের দিকে দা’ওয়াত দান, অস্বীকার করলে যুদ্ধ, এ উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। এই যুদ্ধের জন্য তিনজন সেনাপতি নিয়োগ দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, এ যুদ্ধের প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবে যায়দ ইবন হারিসাহ, তিনি নিহত হলে জা’ফর ইবন আবী তালিব সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবে। তিনিও নিহত হলে ‘আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবে। সে যাই হোক তিন হাজারের মুসলিম সেনাবাহিনী সিরিয়ার বালকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে ‘মি’আন’ নামক স্থানে পৌঁছে জানতে পারেন যে, বাদশাহ হিরাকল (হিরাক্লিয়াস) এক লক্ষ বাহিনী নিয়ে বালকা থেকে বের হয়েছে এবং তার সাথে বিভিন্ন গোত্রের আরো এক লক্ষ সৈন্য যোগ দিয়েছে। এই অকস্মাৎ খবরে মুসলিম বাহিনী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। এত বড় বিশাল বাহিনীর সাথে মাত্র তিন হাজার মুজাহিদ কিভাবে যুদ্ধ করবে, তা নিয়ে মহা চিন্তায় পড়ে যান। তাই তারা ‘মি’আন’ নামক স্থানে যাত্রা বিরতি করেন এবং দু’ রাত সেখানে অবস্থান করে বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করতে থাকেন। তারা সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, শত্রুপক্ষের সেনা সংখ্যার কথা রাসূলুল্লাহকে (সা) অবহিত করা হবে। তিনি চাইলে আমাদেরকে আরো অতিরিক্ত মুজাহিদ দিয়ে সাহায্য করবেন অথবা আমাদেরকে কোনো নির্দেশ দেবেন, আমরা সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত ‘আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) এর পছন্দ হলো না। তিনি এক হৃদয়গ্রাহী ও উদ্দীপক বক্তব্য তুলে ধরে সঙ্গীয় বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করেন। তিনি বলেন,
يَا قَومِ وَاللهِ إِنَّ التي تَكْرَهُونَ لِلَّتِي خَرَجْتُم تَطْلُبُونَ الشَّهَادَةَ، وَمَا نُقَاتِلُ النَّاسَ بِعَدَدٍ وَلَا قُوَّةٍ ولا كَثرَة، مَا تُقَاتِلُهُم إِلا بِهَذَا الدِّينِ الَّذِي أَكْرَمَنَا اللَّهُ بِهِ، فَانْطَلِقُوا فَإِنَّمَا هِيَ إِحْدَى الْحُسْنَيَيْنِ، إِمَّا ظُهُورٌ وَإِمَّا شَهَادَةٌ
হে আমার কাওম! শপথ আল্লাহর! তোমরা যে বস্তুর আশায় বের হয়েছো সে বস্তুকেই এখন অপছন্দ করছো, তোমাদের তো শাহাদাতের তামান্না রয়েছে। আমরা তো সংখ্যা, শক্তি এবং আধিক্যের বিবেচনায় শত্রুদের সঙ্গে লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হই না। আমরা তো কেবল এই দ্বীনের স্বার্থেই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি, যে দ্বীন দ্বারা আল্লাহ আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। সুতরাং এগিয়ে চলো, আমাদের জন্য দুটি উত্তম ফলাফলের যে কোনো একটি অবধারিত। হয় আমাদের বিজয় হবে, নতুবা আমাদের শাহাদাত নাসীব হবে (ইবন হিশাম, আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ৪/১১, আল-বাইহাকী, দালায়িলুন নাবুওয়াহ ৪/৩৬০, ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ৪/২৭৭, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৪৭)।
তার বক্তব্য শেষ হতে না হতেই মুজাহিদগণ বললেন, ‘আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা সত্যই বলেছেন। তাই তারা রাসুলুল্লাহ (সা) এর নিকট সাহায্য চাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে যেসব যোদ্ধা আছেন, তাদের দিয়েই বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বালকার ‘মৃ’তা’ নামক স্থানে গিয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন।
৮ম হিজরীর জুমাদাল উলা মোতাবেক ৬২৯ ঈ. সনের আগস্ট কিংবা সেপ্টেম্বর মাসে মৃ’তার প্রান্তরে দু’ পক্ষের মধ্যে পৃথিবীর মানব ইতিহাসে এক অসম যুদ্ধ শুরু হয়। মুসলিম বাহিনীর প্রথম সেনাপতি যায়দ ইবন হারিসার নেতৃত্বে মাত্র তিন হাজার মুজাহিদ দুই লক্ষ রোমান বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করছে, বিশাল বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করছে। অকল্পনীয় বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতে করতে যায়দ ইবন হারিসা (রা) শাহাদাতের পেয়ালায় অমৃত সুধা পান করেন। সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় সেনাপতি রাসূলুল্লাহর (সা) চাচাতো ভাই জা’ফর ইবন আবী তালিব (রা) ইসলামের ঝান্ডা হাতে নিয়ে নজীর বিহীন দুঃসাহসিকতা ও ক্ষিপ্রতার সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। শত্রুরা তার ঘোড়ার পাগুলো কেটে ফেললে তিনি মাটিতে অবস্থান নিয়েই যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। তার ডান হাত কেটে ফেলা হলো, ইসলামের ঝান্ডা তিনি বাম হাতে ধারণ করলেন। সে হাতও কেটে ফেলা হলো তখন তিনি হাতের অবশিষ্ট দু’বাহু দ্বারা বুকের সাথে পতাকা জড়িয়ে ইসলামের ঝান্ডা আগলে ধরেছেন এবং সমুন্নত রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনিও শাহাদাত বরণ করেন। করুণাময় আল্লাহ তা’আলা তার দু’হাতের বিনিময়ে জান্নাতে তাকে দু’টি হাত প্রদান করেন, যার ফলে তিনি জান্নাতের যেখানে খুশী সেখানে উড়ে বেড়াতে পারছেন। এ জন্য তাকে জা’ফার ‘আত্-তাইয়্যার’ এবং ‘যুল জানাহাইন’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে, অর্থাৎ ‘দু’পাখা বিশিষ্ট উড়ন্ত জা’ফার ( সহীহুল বুখারী ৫/২০, নং ৩৭০৯, আর-আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৪৮ (বাংলা সংস্করণ )।
আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার থেকে বর্ণিত, তিনি নাফি’কে অবহিত করেছেন যে,
أَنَّهُ وَقَفَ عَلَى جَعْفَرٍ يَوْمَئِذٍ، وَهُوَ قَتِيلٌ، فَعَدَدْتُ بِهِ خَمْسِينَ، بَيْنَ طَعْنَةٍ وَضَرْبَةِ، لَيْسَ مِنْهَا شَيْءٌ فِي دُبُرِهِ
তিনি মৃ’তার যুদ্ধের দিন জা’ফার (রা) এর শাহাদাত অবস্থায় তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি তার শরীরে বর্শা ও তরবারীর ৫০টি আঘাত গণনা করেছিলাম। এসবের মধ্যে একটি আঘাতও পেছন দিক থেকে লাগেনি ( সহীহুল বুখারী ৫/১৪৩, নং ৪২৬০)।
তার অন্য একটি বর্ণনায় বলেন, আমি তার দেহে বর্শা ও তীরের নব্বইটিরও অধিক আঘাতের চিহ্ন দেখলাম (প্রাগুক্ত, ৫/১৪৩, নং ৪২৬১)।
তারপর ‘আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) ইসলামের পতাকা নিয়ে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে তিনিও শহীদ হয়ে যান। অতঃপর মুসলিম বাহিনী খালিদ ইবন ওয়ালিদের নেতৃত্বে যুদ্ধ শুরু করেন। সেনাপতির দায়িত্ব ভার গ্রহণের পর পতাকা হাতে নিয়ে তিনিঅত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীডপনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন। খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) নিজেই বর্ণনা করেছেন যে, ‘মু’তার যুদ্ধের দিন আমার হাতে ৯টি তরবারী ভেঙেছিল এবং ইয়ামানের তৈরি মাত্র একটি ছোট তরবারী হাতে অবশিষ্ট ছিল (প্রাগুক্ত, ৩/১৪৪, নং ৪২৬৫, আর দেখুন, আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৪৮-৪৪৯ (বাংলা সংস্করণ )।
শেষ পর্যন্ত এই অসম যুদ্ধে বিশাল রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলিমগণ জয়লাভ করেন। এদিকে (সা) যুদ্ধের ময়দান থেকে কোনো খবর না পেয়ে অত্যন্ত চিন্তাযুক্ত ছিলেন। এমন সময় ওহীর মাধ্যমে তাকে খবর দেওয়া হয়। তখন তিনি যুদ্ধের জীবন্ত বর্ণনা মদীনায় সাহাবায়ে কিরামদের সামনে তুলে ধরেন। আনাস ইবন মালিক (রা) সে ঘটনার বর্ণনা এ ভাবে তুলে ধরেছেন,
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَعَى زَيْدًا وَجَعْفَرًا وَابْنَ رَوَاحَةَ لِلنَّاسِ قَبْلَ أَنْ يَأْتِيَهُمْ خَبَرْهُمْ فَقَالَ أَخَذَ الرَّايَةَ زَيْدٌ فَأُصِيبَ ثُمَّ أَخَذَ جَعْفَرٌ فَأَصِيبَ ثُمَّ أَخَذَ ابْنُ رَوَاحَةَ فَأَصِيبَ وَعَيْنَاهُ تَدْرِفَانِ حَتَّى أَخَذَ سَيْفٌ مِنْ سُيُوفِ اللَّهِ حَتَّى فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ
নবী (সা) যায়দ, জা’ফর ও ইবন রাওয়াহার নিহত হওয়ার খবর লোকদের নিকট পৌঁছার পূর্বেই তাদেরকে অবহিত করেন। তিনি বলেন, ‘যায়দ ইসলামের ঝান্ডা হাতে যুদ্ধ শুরু করে, সে নিহত হলো। তারপর জা’ফর সে ঝান্ডা গ্রহণ করে। সেও নিহত হয়। তারপর ইবন রাওয়াহা ঝান্ডা হাতে নেয়। সেও নিহত হয়। এ সময় তার দু’ চোখ বেয়ে ক্রমাগত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। অবশেষে আল্লাহর তরবারী সমূহের মধ্য থেকে এক তরবারী ঝান্ডা হাতে তুলে নেয় এবং আল্লাহ তার হাতেই বিজয় দান করেন’ (সহীহুল বুখারী, ৫/২৭, নং ৩৭৫৭, ৫/১৪৩, নং ৪২৬২, বাব মানাকিব খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ )।
রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার এক অনুপম দৃষ্টান্ত হলো এ সকল সাহাবী। বিশাল বাহিনীর সামনে অতিরিক্ত সাহায্য চাওয়ার ক্ষেত্রেও রাসূলের (সা) এক বিচক্ষণ অনুসারী ‘আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) তাদের করনীয় সম্পর্কে সাথীদের দৃষ্টি আকর্ষন করেন। একজনের নীতিগত ও আদর্শিক দৃষ্টি আকর্ষনী ২৯৯৯ জন সঙ্গীর চোখ খুলে দেয়। তাই সকলেই এক বাক্যে তার কথা মেনে নেন এবং বলেন যে, ইবন রাওয়াহা সত্য ও সঠিক কথাই বলেছেন এবং তারা মাত্র তিন হাজার সৈন্য নিয়ে দুই লক্ষ রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। জীবনের, সন্তানাদি, পরিবার ও দুনিয়ার কোনো মোহ তাদেরকে এই ত্যাগ থেকে ফেরাতে পারেনি।
দ্বীনের হেফাযত এবং দ্বীনের বিজয়ের ক্ষেত্রে সাহাবীগণ (রা) এর ত্যাগের আরেক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো মু’তার এই যুদ্ধ। কারণ যে কোনো যুদ্ধের জন্য সেনাপতি থাকে একজন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) এই যুদ্ধের জন্য ৩ জন সেনাপতি নিয়োগ করেন। এ ৩ জন সাহাবী, তাদের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনসহ সর্ব সাধারণ; কোনো মানুষের পক্ষেই বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে অন্ততঃ এই ৩ জন সাহাবী যুদ্ধের ময়দান থেকে আর কোনো দিন মদীনায় তাদের স্বজনদের কাছে ফিরে আসবেন না। তারপরেও তাদের কেউ আপত্তি করেননি, কেউ বাধা দেননি, কেউ পেছন দিক থেকে টেনে ধরেননি। রাসূলুল্লাহর (সা) সিদ্ধান্তকে অমান্য করেননি। বরং হাসি খুশি ভাবেই তারা তাদের প্রিয় রাসূল (সা) এর নির্দেশ মেনে নিয়ে ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শুধু তাই নয়, এ যুদ্ধের তৃতীয় সেনাপতি ‘আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) জীবনের শেষ জুম’আর সালাত রাসূলুল্লাহর (সা) পিছনে পড়ার উদ্দেশ্যে মুজাহিদ বাহিনীর সঙ্গে সকাল বেলায় রওয়ানা না করে পিছনে থেকে যান। ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস (রা) সে ঘটনা তুলে ধরে বলেন যে,
بَعَثَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ رَوَاحَةَ فِي سَرِيَّةٍ فَوَافَقَ ذَلِكَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، قَالَ: فَقَدَّمَ أَصْحَابَهُ، وَقَالَ: أَتَخَلَّفُ فَأُصَلِّي مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْجُمُعَةَ، ثُمَّ أَلْحَقُهُمْ، قَالَ فَلَمَّا رَآهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم، قَالَ مَا مَنَعَكَ أَنْ تَغْدُو مَعَ أَصْحَابِكَ؟ قَالَ، فَقَالَ: أَرَدْتُ
أَنْ أُصَلِّي مَعَكَ الْجُمُعَةَ ثُمَّ أَلْحَفَهُمْ، قَالَ : فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَوْ أَنْفَقْتَ مَا فِي الْأَرْضِ مَا أَدْرَكْتَ عَدْوَتَهُمْ
রাসূলল্লাহ (সা) ‘আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে কোনো এক যুদ্ধে প্রেরণ করেন। দিনটি ছিল জুমু’আর দিন। তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন যে, তিনি তার সঙ্গীদেরকে আগে পাঠিয়ে দেন এবং বলেন যে, আমি বিলম্ব করবো এবং রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সালাতুল জুম’আহ আদায় করে তারপর তাদের সঙ্গে মিলিত হবো। তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, তিনি (সা) তাকে দেখে জিজ্ঞাসা করেন ‘তুমি কেন তোমার সাথীদের সাথে সকাল বেলায় রওয়ানা হওনি?’ তিনি বলেন: আমি আপনার সঙ্গে সালাতুল জুম’আহ আদায় করে তারপর তাদের সঙ্গে মিলিত হবো বলে মন স্থির করেছি। বর্ণনাকারী বলেন যে, তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘তুমি পৃথিবীর সমস্ত বস্তু ব্যয় করেও তাদের সকালে বের হওয়ার সমান পূণ্য লাভ করতে পারবে না'( ইমাম আহমাদ, মুসনাদে আহমাদ, ৩/৪৩১, নং ১৯৬৬, সুনানুত তিরমিযী, ২/৪০৫, নং ৫২৭, ইবন কাসীর, আল বিদায়াছ ওয়ান নিহায়াহ, ৪/২৭৬। হাদীসটির সানাদকে কেউ কেউ দূর্বল বলেছেন )।
এ হাদীস অনুযায়ী ‘আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা রাদ আল্লাহু ‘আনহুর আল্লাহর রাসূলের (সা) পেছনে সালাত আদায়ের মর্যাদা লাভের শেষ সুযোগটিও গ্রহণ করেছেন। এটা তার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
৮- দ্বীন ইসলামের দা’ওয়াতের কাজে জীবন উৎসর্গ করার সময় হারাম ইবন মিলহানের আনন্দ প্রকাশ, বিশিষ্ট সাহাবী আনাস ইবন মালিক (রা) এর মামা, তার মা উম্মু সুলাইম (রা) এর ভাই হারাম ইবন মিলহান (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ নিজের জীবনকেই পেশ করে ছিলেন। তার উপস্থাপিত দ্বীনের দা’ওয়াত ও নাবুওয়াতের রিসালাত নাজদ এলাকার ‘বী’রে মা’উনাহ’ নামক স্থানের বনু ‘আমির গোত্রের নিকট প্রচার করতে গিয়ে ইসলামের দুশমনদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। হারাম (রা) যখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে তার এই পরম সৌভাগ্য লাভের অপরিসীম আনন্দ আর আত্মতৃপ্তির কথা নিজ ভায়ায়ই প্রকাশ করেছেন। এ ঘটনাটি আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ خَالَهُ أَخَا لِأُمِّ سُلَيْمٍ فِي سَبْعِينَ راكبًا …. فَانْطَلَقَ حَرَامٌ أَخُو أَمِّ سُلَيْمٍ وَهُوَ رَجُلٌ أَعْرَجُ وَرَجُلٌ مِنْ بَنِي فُلَانٍ قال كونا قَرِيبًا حَتَّى آتِيَهُمْ فَإِنْ آمَنُونِي كُنْتُمْ وَإِنْ قَتَلُونِي أَتَيْتُمْ أَصْحَابَكُمْ فَقَالَ أَتُؤْمِنُونِي أُبَلِّغُ رِسَالَةَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَجَعَلَ
يُحَدِّثُهُمْ وَأَوْمَنُوا إِلَى رَجُلٍ فَأَتَاهُ مِنْ خَلْفِهِ فَطَعَنَهُ قَالَ هَمَّامٌ أَحْسِبُهُ حَتَّى أَنْفَذَهُ بالرمح قَالَ اللَّهُ أَكْبَرُ فُرْتُ وَرَبِّ الْكَعْبَةِ
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামে তার মামা, উম্মু সুলাইমের ভাইকে ৭০ জনের একদল সাহাবীর সাথে পাঠান। উম্মু সুলাইমের ভাই হারাম, জনৈক খোঁড়া ব্যক্তি (বাক্যের গঠন অনুযায়ী বুঝা যায় যে, হারাম একজন বৌড়া লোক ছিলেন। কিন্তু ইবনু হাজার (রহ) বিষয়টির ব্যাখ্যা করেছেন এ ভাবে যে, এখানে ভুল হয়েছে বলে মনে হয়। সঠিক বাক্য হবেঃ عرج। هو ورجلأ দেখুন: ফাতছল বারী, ৭/৩৮৭। ইবন হাজারের এ ব্যাখ্যার সমর্থনে হাদীসের অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, ৭০ জন সাহাবীর মধ্যে একজন খোঁড়া সাহাবী ছিলেন, যিনি পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে কাফিরদের হাত থেকে বেঁচে গিয়ে ছিলেন। হারাম ইবন মিলহান খোঁড়া ছিলেন বলে কোনো প্রমাণ নেই) এবং অন্য গোত্রের আরো একজন ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হন। হারাম সঙ্গীদ্বয়কে বলেন, আমি তাদের (বনু ‘আমির গোত্রের লোকদের) নিকট আসা অবধি তোমরা দু’জন আমার থেকে অনতি দূরে অবস্থান কর। যদি তারা আমাকে নিরাপত্তা প্রদান করে, তখনি কেবল তোমরা আমার নিকটে আসবে। আর তারা যদি আমাকে হত্যা করে, তাহলে তোমরা তোমাদের সাথীদের কাছে ফিরে এসো। তারপর তিনি তাদের (গ্রামবাসীদের) নিকট নিবেদন করে বলেন, তোমরা কি আমাকে অভয় দিবে যে, আমি তোমাদের নিকট রাসূলুল্লাহর (সা) রিসালাতের বাণী পৌঁছে দেব? অতঃপর তিনি তাদের সাথে কথা বলা শুরু করেন। কিন্তু তারা জনৈক ব্যক্তিকে (হারামকে (রা) হত্যা করার) ইঙ্গিত করে। তখন সে ব্যক্তি পিছন দিক থেকে এসে তাকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করে। হাদীছের বর্ণনাকারী হাম্মাম বলেন, আমার মনে হয়, সেই ব্যক্তি বর্শার আঘাতে তাকে ধরাশায়ী করে ফেলে। তখন তিনি (হারাম রা) বলেন, ‘আল্লাহু আকবার! আল্লাহ মহান! কা’বা ঘরের রবের কসম! আমি সফল হয়েছি’ ( সহীহুল বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, ৪/১৮, নছ ২৮০১, ৫/১০৫, নং ৩৮৬৪, সহীহ মুসলিম ৩/১৫১১, নং ৬৭৭)।
এই হলো প্রকৃত ভালোবাসার নিদর্শন! যে ভালোবাসার ফলে প্রিয় ব্যক্তির পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবনকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে নিজের নিশ্চিত সফলতার আশায় আনন্দে উৎফুল্ল হয় ( ড. ফাযল ইলাহী, হুজুন নবী, পৃ. ৭৮ )।
৯- রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যু পরবর্তী মদীনার কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও খালীফা আবু বকর সিদ্দীক কর্তৃক উসামাহ ইবন যায়েদের বাহিনীকে অভিযানে প্রেরণ, রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যুর অব্যাবহিত পরেই তার সাহাবীগণ (রা) অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন। মুসলিম জনগোষ্ঠীর কতিপয় আরব মুরতাদ হয়ে মুসলিমদের একমাত্র রাষ্ট্র ও আবাস ভূমি মদীনা মুনাওয়ারাতে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। মুসলিম উম্মাহর সামনে নেতৃত্বের বড় চ্যালেঞ্জ এবং চরম দুর্দিন ও সংকট মারাত্মক আকারে ধারণ করে। ‘আম্মার ইবন ইয়াসির (রা) এর ভাষায় মদীনার সাহাবীগণ তখন যেন রাখাল বিহীন উটের পালের মতো বিপর্যস্ত অবস্থায় পতিত হন। মদীনার জনগণের নিকট মদীনার শান্তি ও নিরাপত্তা এতোটাই হুমকির মুখে পতিত হয় যে, তাদের কাছে এ পবিত্র ভূ-খণ্ডটি হাতের আংটির চেয়েও সরু ও সংকীর্ণ অনুভূত হয় (ইবন হিব্বান আল বাসতী, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ওয়া আখবারুল খুলাফা, সম্পাদনা, সাইয়্যেদ ‘আযীয ও অন্যরা, বৈরুত: মুআসসাসাতুল কুরুবিস সাকাফাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪০৭ ছি, পৃ. ৪২৮)।
এই শ্বাসরুদ্ধকর ও সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেই খলীফাতু রাসূলিল্লাহ (সা) আবু বকর সিদ্দীক (রা) তার প্রিয় রাসূলের (সা) গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে অত্যন্ত দৃঢ়তার পরিচয় দেন। এসভ কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং সিদ্ধান্তসমূহের উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হলো উসামা ইবন যায়েদ (রা) এর বাহিনীকে মদীনার বাইরে শত্রদের বিরুদ্ধে সিরিয়া অভিযানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া; কেননা রাসূলুল্লাহ (সা) উসামার নেতৃত্বে এই বাহিনী নিজ হাতে প্রস্তুত করেছিলেন। অসুস্থতা ক্রমশঃ বৃদ্ধি হওয়ার কারণে তিনি তা স্থগিত করে ছিলেন। এমতাবস্থায়ই আল্লাহ তা’আলার প্রিয় রাসূল (সা) দুনিয়া ত্যাগ করে তার মহান বন্ধু আল্লাহ তা’আলার সান্নিধ্যে চলে যান।
এ পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও মুসলিম উম্মাহর প্রথম খলীফা সিদ্দীকে আকবার আবু বকর (রা) তার সর্বাধিক প্রিয় রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্তকে স্থির চিত্তে অকুতোভয়ে কঠিন পরিস্থিতি উপেক্ষা করেই বাস্তবায়ন করে ছিলেন। প্রসিদ্ধ মুফাসসির ও প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইমাম ইবন জারীর আততাবারী ‘আসিম ইবন ‘উমারের বরাতে সে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, ‘আসিম বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যুর দুদিন পর খালীফা আবু বকর (রা) এর পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় যে,
ليتم بَعْثُ أُسَامَةَ أَلا لا يَبْقَيَنَّ بِالْمَدِينَةِ أَحَدٌ مِنْ جُنْدِ أَسَامَةَ إِلَّا خَرَجَ إِلَى عَسْكَرِهِ بِالْجَرَفِ
উসামাহর বাহিনীকে অবশ্যই অভিযানে প্রেরণ করা হবে। সুতরাং মদীনায় অবস্থিত তার বাহিনীর প্রতিটি নির্বাচিত সৈন্য যেন অতি সত্বর জারাফ নামক স্থানে তার সেনা ক্যাম্পে উস্থিত হয় (আত্-তাবারী, মুহাম্মাদ ইবন জারীর, তারিখুল উমাম ওয়ার রুসুল ওয়াল মুলুক, বৈরুত, দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪০৭ হি, ২/২৪৪, আর দেখুন, ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৬/০৩৫ )।
মদীনা মুনাওয়ারার কঠিন পরিস্থিতি ও জরুরী অবস্থার কথা চিন্তা করে উসামাহ রাদি আল্লাহু যখন খালীফাতুর রাসূল আবু বকর (রা) এর নিকট তার সেনা বাহিনীসহ মদীনায় অবস্থান করা এবং যুদ্ধযাত্রা স্থগিত করার অনুমতি প্রার্থনা করেন, তখন আবু বকর তাকে লেখে পাঠান যে,
مَا كُنتُ لأَسْتَفْتِحَ بِشَيْءٍ أَوْلَى مِنْ إِنْفَاذِ أَمْرِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلَأَنْ تَخْطِفَنِي الطَّيْرُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ ذَلِكَ
রাসূলুল্লাহর (সা) সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেয়ে অন্য কোনো বিষয়ের সূচনা করা আমার নিকট অগ্রাধিকারযোগ্য নয়। আমার নিকট এর চেয়ে (অর্থাৎ রাসূলের (সা) সিদ্ধান্তকে গৌণ করে দেখার চেয়ে) পাখিদের আমার মাথার মগজ কুঁড়ে খাওয়াও অধিক পছন্দনীয়’ (আবু ‘উমার, খালীফাহ ইবন খাইয়াত আল লাইলী, তারিখ ইবনি খাইয়াত, সম্পদনা, ড. আকরাম জিয়া আল ‘উমরী, বৈরত। মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ২য় সংস্করণ, ১৩৬৭ হি, পৃ. ৬৪ )।
নবী (সা) এর মৃত্যুর কারণে কতিপয় বিদ্রোহী আরবদের মদীনা আক্রমণের আশঙ্কার প্রতি খলীফাতুর রাসূলের (সা) দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। তার প্রেক্ষিতে আবু বকর সিদ্দীক (রা) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন,
أنا أَحْبِسُ جيشاً بَعَثَهم رسولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَقَدِ اجْتَرَأْتُ عَلَى أمر عظيم، والذي نَفْسي بِيَدِهِ لأَنْ تَمِيلَ عَلَيَّ العَرَبُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِن أَنْ أَحْبِسَ جيشاً بَعَثَهُم رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
রাসূলুল্লাহ (সা) যে বাহিনীকে প্রেরণ করেছেন সে বাহিনীকে আমি আটকিয়ে রাখব? তাহলে তো আমি অনেক বড় দুঃসাহসের কাজ করব। যাঁর হাতে আমার প্রাণ সে সত্তার শপথ! আল্লাহর রাসূল (সা) এর গঠন করা বাহিনীকে আটকিয়ে রাখার চেয়ে আমার ওপর সমস্ত আরবের আক্রমণ অধিক প্রিয়’ (আয-যাহাবী, তারীখুল ইসলাম, ‘বুলাফায়ে রাশিদীন’ অধ্যায়, সম্পাদনা: ড. ‘উমার আব্দুস সালাম তাদমুরী, বৈরুত, দারুল কিতাবিল ‘আরাবী, ১ম সংস্করণ, ১৪০৭ হি, ৩/২০-২১ )।
ইমাম ইবন জারীর আত তাবারীর অন্য একটি বর্ণনায় আছে যে, আবু বকর (রা) তখন বলেছিলেন,
والذي نَفسُ أَبِي بَكْرٍ بِيَدِهِ لَو ظَنَنْتُ أَنَّ السَّبَاعَ تَخْطِفُنِي لَأَنْفَذْتُ بَعثَ أسامَةَ كَمَا أَمَرَ بِه رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلَوْ لَمْ يَبْقَ فِي القُرَى غَيْرِي لَأَنْفَذْتُه
যে সত্তার হাতে আবু বকরের জীবন তাঁর শপথ! যদি আমার কাছে মনে হয় যে, হিংস্র পশুরা আমার মগজ কুঁড়ে কুঁড়ে খায় তবুও আমি রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ অনুযায়ী উসামাহ বাহিনীকে অভিযানে প্রেরণের সিদ্ধান্ত কার্যকরী করবো। এমন কি এই অঞ্চলে আমি ছাড়া আর কেউ যদি নাও থাকে তবুও আমি এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করব ( ইবন জারীর, আত তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ২/২৪৫, ইবনু জাওযী, আল-মুনতাযিম ফী তারীখিল উমাম ওয়ান মুল্ক, সম্পাদনা, মুহাম্মাদ ‘আব্দুল কাদির ও তার সঙ্গী, বৈরুত, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১২ হি, ৪/৭৪)।
অতঃপর আবু বকর (রা) উসামাহর বাহিনীকে বিদায় জানাতে বের হয়ে যান। বিদায় বেলায় মুসলিম জাতির প্রথম খালীফা পায়ে হেঁটে অশ্বারোহী সেনা প্রধান উসামাহকে যাত্রা পথে এগিয়ে দিচ্ছেন। ‘আব্দুর রহমান ইবন ‘আওফ (রা) ঘোড়াটি চালিয়ে নিচ্ছেন। এমতাবস্থায় উসামাহ (রা) বলেন,
يَا خَلِيفَةَ رَسُولِ اللهِ! وَاللهِ لَتَرْكَبَنَّ أو لَأَنْزِلَنَّ، فَقَالَ: وَاللَّهِ لَا تَنْزِلْ، وَوَاللَّهِ لا أَرْكَبْ، وَمَا عَلَيَّ أَنْ أُغَتِرَ قَدَمَيَّ فِي سَبِيلِ اللَّهِ سَاعَةً
হে আল্লাহর রাসূলের (সা) খলীফা! আল্লাহর কসম! হয় আপনি বাহনে আরোহণ করন অথবা আমি নিচে নেমে পড়ব’। তখন আবু বকর বলেন, শপথ আল্লাহর! তুমি অবতরণ করো না। শপথ আল্লাহর! আমিও বাহনে উঠবোনা। আমি কিছু সময়ের জন্য আমার পা দুটোকে আল্লাহর পথে ধুলোমলিন করতে চাই’ (ইবন জারীর, তারীখুল উমাম ২/২৪৬ )।
এই বলে তিনি উসামাহ (রা) কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘আল্লাহর নবী (আ) তোমাকে যে নির্দেশ দিয়েছেন তা বাস্তবায়ন কর। কুযা’আহ শহর থেকে তোমার অভিযান শুরু কর। তারপর আবিল অঞ্চলে আস। রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশসমূহের কোনো কিছুকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র শিথিলতা দেখাবে না (প্রাগুক্ত ২/২৪৬ )।
অন্য আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, আবু বকর (রা) বলেন,
امض يا أسامة في جيشك للوجه الذي أُمِرتَ بِهِ، ثُمَّ اغْرُ حَيْثُ أَمَرَكَ رسولُ الله صَلَّى الله عليه وسلَّمَ مِنْ نَاحِيَةِ فلسطين، وَعَلَى أَهْلِ مُؤْتَه، فَإِنَّ اللَّهَ سَيَكْفِي مَا تَرَكْتَ
হে উসামাহ! তুমি তোমার সেনাবাহিনী নিয়ে যে দিকে যাওয়ার আদিষ্ট হয়েছো সে দিকে যাও। তারপর রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ মোতাবেক ফিলিস্তীন এলাকা হয়ে মু’তা বাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই কর। কেননা আল্লাহ তা’আলা তোমার পরিত্যাজ্য এলাকাগুলোর জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা করে দেবেন’ (হাফিয আয-যাহাবী, তারীখুল ইসলাম, ৩/২১ )।
সুতরাং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার উজ্জ্বল নিদর্শন হলো, তার আদেশ অনুযায়ী আল্লাহর দ্বীনের বিজয় এবং সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়া। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিই মুসলিম জাতির প্রথম খলীফা আবু বকর রাদি আল্লাহুর বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও বলিষ্ঠ বক্তব্যের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। সে বক্তব্যের মধ্যে না ছিল কোনো জড়তা, না কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও ভীতু ভাবের কোনো প্রকাশ। আবু বকর (রা) জটিল পরিস্থিতির মধ্যেও নির্দ্বিধায় ও সুদৃঢ় চিত্তে, প্রশান্ত মনে বলিষ্ঠতার সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার উজ্জ্বল নিদর্শন দেখিয়েছেন।
১০- কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ‘আরবের মুরতাদ ও যাকাত দিতে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে আবু বকরের সামরিক অভিযান: রাসূলুল্লাহর (সা) মৃত্যুর পর মুসলিম উম্মাহর সম্মুখে যেসব জটিল সমস্যা ও সংকট দেখা দেয় তন্মধ্যে অন্যতম হলো, একদল ‘আরব মুসলিম যাকাত দিতে অস্বীকার করে। ঘটনাটির সংক্ষিপ্ত বিবরণ হলো,
اعتقد بعض مانعي الزَّكَاةِ مِنْ أَحْيَاء العَرْبِ أَنْ دَفَعَها إلى الإمام لا يكون، وإنما كان هذا خاصا بِرَسولِ اللهِ ، وقد احْتَجُوا بِقَوْلِهِ تَعَالَى: {خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً ، وقَدْ رَدَّ عَلَيْهِمْ هَذَا التَّأْوِيلِ السَّقِيمِ وَالفَهْمِ الفَاسِدِ أَبُو بَكرٍ وَسَائِرِ الصَّحَابَةِ رِضْوانُ اللَّهِ عَلَيْهِمْ .
‘আরবের কোনো কোনো এলাকার লোকেরা মনে করে যে, মুসলিম শাসকের নিকট যাকাত দিলে তা সিদ্ধ হবে না। তাদের যুক্তি ছিল যে,যাকাত কেবল রাসূলুল্লাহর (সা) জন্য নির্দিষ্ট ছিল। তারা এ বিষয়ে কুরআনের আয়াত, }حُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةٌ { ‘আপনি তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ করুন’ [সূরা আত তাওবা, আয়াত: ১০৩] দ্বারা প্রমাণ পেশ করেন। কিন্তু খলীফাতুর রাসূল আবু বকর (রা)সহ সকল সাহাবী (রা) তাদের এ আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা এবং ভ্রান্ত ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন (তাফসীর ইবন কাসীর, ২/৪০০ )।
যাকাত দিতে অস্বীকারকারীগণ তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকার ঘোষণা দেয়। খলীফাতুর রাসূল আবু বকর (রা) তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন এবং অনড় অবস্থান গ্রহণ করেন। নাজুক পরিস্থিতির বিবেচেনায় এবং বিশেষভাবে মুসলিম জাহানের খলীফার পক্ষে মুসলিমদের বিরুদ্ধেই সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রেক্ষিতে ‘উমারসহ (রা) প্রায় সকল সাহাবীই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। তারা এ ধরনের অভিযানের পক্ষে মত দিতে দ্বিধাবোধ করেন। এতদ সত্বেও আবু বকর তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি তার প্রকৃত ভালোবাসার আরেকটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দেন,
والله لو مَنعُونِي عِقَالاً كَانُوا يُؤَدُّونَهُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم لَقَاتَلْتُهُم عَلَى مَنْعِهِ
কসম আল্লাহর! তারা যদি উট বাঁধার রশি, যা তারা রাসূলুল্লাহকে (সা) তাহলে আমি তাদের (যাকাত হিসাবে) দিতো, তা দিতেও অস্বীকার করে, বিরুদ্ধে অবশ্যই লড়াই করবো’ (সহীহুল বুখারী ৯/৯/৩, নং ৭২৮৪, সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, ১/৫১, নং ২০)।
তাছাড়াও আবু বকর (রা) যখন জানতে পারেন যে, কতিপয় মুরতাদ গোত্র মদীনা মুনাওয়ারার উপর আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তখন তিনি নিজেই তাদেরকে শায়েস্তা করার জন্য সৈন্য বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রা) বলেন, ‘আমার পিতা নিজেই উন্মুক্ত তরবারী হাতে বাহনে উঠে যুল কিস্সা (মদীনা থেকে রাবযাহর পথে ২৪ মাইল দূরে একটি স্থানের নাম ) নামক স্থানের দিকে অগ্রসর হন’ ( ইবন কাসীর, আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, বৈরুত। মাকতাবাতুল মা’আরিফ, ৬/১৮৮, আর দেখুন,হুজুন নবী, পৃ. ৮৪)।
খলীফাতুল মুসলিমীন আবু বকর (রা) কে যখন মদীনায় অবস্থান করে অন্য কাউকে এ দায়িত্ব দিয়ে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়, তখন তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন,
وَاللَّهِ لَا أَفْعَلُ وَلَأُوَاسِيَنَّكُمْ بِنَفْسِي
আল্লাহর কসম! আমি তা করবোনা। আমি নিজে তোমাদেরকে অনুসরণ করবো’ (ইবন জারীর, তারীখুত তাবারী, ২/২৫৬, আল বিদায়াহ ওয়াল নিহায়াহ ৬/৩১৪)।
আল্লাহ তা’আলার দ্বীনের আহ্বান যখন আসে, ইসলামী শরী’য়াত যখন সাহায্যের জন্য ডাকে, তখন রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসার দাবীদারদের পক্ষে সে ডাকে সাড়া না দিয়ে বসে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য যে, আল্লাহ তা’আলার দ্বীন এবং শরী’য়াত আজ পৃথিবীর সর্বত্র উপেক্ষিত। দ্বীন ইসলাম আজ ক্ষত বিক্ষত। পৃথিবীতে দ্বীন বিজয়ী নেই। বিশ্বনবী (সা) পর্যন্ত অপমান আপদস্থের করুন শিকারে পরিণত হচ্ছে, কুরআনের মর্যাদা ভূলুষ্ঠিত এবং কোথাও কোথাও পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার ফৌজদারী দন্ড-বিধি বাতিল করার দাবী করা হচ্ছে, মানব রচিত আইন দ্বারা পরিচালিত কোর্টে রিট করা হচ্ছে। ইসলাম বিদ্বেষী অমুসলিমসহ কিছু কপট মুসলিম নামধারী ব্যক্তি পর্যন্ত এই কুফরী কর্মের সাথে জড়িত। এমনকি সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর অনেক ব্যক্তির নিকটও আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং ইমলামী শরী’য়াত বর্তমান যুগে অপ্রয়োজনীয় বলে প্রায় তা পরিত্যাজ্য। এমন অবস্থায় দ্বীন ইসলাম মুসলিম উম্মাহর নিকট চিৎকার করে সাহায্য প্রার্থনা করছে, রাসূলের (সা) আদর্শ ও দ্বীনের সুরক্ষা ও প্রতিরক্ষার জন্য আর্তনাদ করছে। কিন্তু কোটী কোটী মুসলিম, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার কথিত দাবীদার সে আহবানে সর্বাত্মকভাবে সাড়া দিচ্ছে না। দ্বীনের সাহায্য ও রক্ষার জন্য এগিয়ে আসছে না। মূক ও বধিরের মতো তাদের কর্ণ কুহরে সে আর্তনাদ ও গগণ বিদারী চিৎকার ধ্বনি প্রবেশ করছে না। প্রকৃত পক্ষেই তাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহর বাণী সত্যে পরিণত হয়েছে ( ইবন জারীর, তারীখুত তাবারী, ২/২৫৬, আল বিদায়াহ ওয়াল নিহায়াহ ৬/৩১৪। ৩৩০, ড. ফাযল ইলাহী, হুজুন নবী, পৃ. ৮৫)।
মহান আল্লাহ বলেন,
لهُمْ قُلُوبٌ لا يَفْقَهُونَ بِمَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لا يَسْمَعُونَ بِمَا أُولَئِكَ كَالأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُوْلَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ
“তাদের অন্তর আছে তা দিয়ে তারা বুঝে না, তাদের চক্ষু আছে তা দ্বারা তারা দেখে না, তাদের কান আছে, তা দিয়ে তারা শোনে না। তারাই চতুষ্পদ জন্তুর মতো। বরং তার চেয়েও অধিক ভ্রষ্ট। প্রকৃত পক্ষে তারাই উদাসীন”। [সূরা আল আরাফ, আয়াত: ১৭৯]
১১- শত্রুপক্ষের বাগান বাড়ির দরজা ভিতর থেকে খুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও আল বারা ইবন মালিকের দেওয়াল টপকানোর অনুমতি প্রার্থনা, ১২হি, সনে সংঘটিত ইয়ামামার যুদ্ধে নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদার মুসায়লামাতুল কায্যাবের বাহিনী একটি বাগান বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে ভিতর থেকে দরোজা বন্ধ করে দেয়। রাসূলুল্লাহর (সা) একজন নিষ্ঠাবান সাহাবী দেওয়াল টপকে বাগানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে দরজা খুলে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে সাথীদের নিকট অনুমতি প্রার্থনা করেন।
ঘটনাটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপ,
মুসলিম বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণের ফলে শত্রু পক্ষ বাগানের ভিতরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। বাস্তবে সেটি তো বাগান ছিল না, ছিল যেন তাদের জন্য এক মৃত্যুপুরী। শত্রুপক্ষে নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদার আল্লাহর দুশমন মুসায়লামাতুল কায্যাব ছিল। তখন সাহাবী আল-বারা ইবন মালিক (রা) বলেন,
يَا مَعْشَرَ الْمُسْلِمِينَ، أَلْقُونِي عَلَيْهِمْ فِي الْحَدِيقَةِ، فَقَالَ النَّاسُ: لَا تَفْعَلْ يَا بَرَاءُ، فَقَالَ: وَاللَّهِ لَتَطْرِحُنِّي عَلَيْهِمْ فِيهَا
হে মুসলিম সমাজ! তোমরা আমাকে বাগানের মধ্যে ফেলে দাও। লোকেরা বললো, হে বারা। তুমি এ কাজ করো না। তিনি তখন বলেন, আল্লাহর শপথ! তোমরা আমাকে অবশ্যই বাগানের ভিতর ফেলবে’। অতঃপর তাকে ধরে উপরে তুলে বাগানের দেওয়ালের উপরে উঠানো হলো। তিনি তখন জোর পূর্বক ঢুকেই বাগানের দরজার সামনেই শত্রুদের সাথে লড়াই শুরু করে দিলেন এবং মুসলিম বাহিনীর জন্য বাগানের প্রবেশ দ্বার উন্মুক্ত করে দিলেন। মুসলিম বাহিনী সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করে শত্রুদের উপর প্রচণ্ড আক্রমণ করে আল্লাহর দুশমন মুসায়লামাকে হত্যা করেন। তাকে ওয়াহশী, যিনি জুবাইর ইবন মুতয়িমের মুক্ত করা দাস ছিল এবং উহুদের যুদ্ধে হামযাহ ইবন আব্দুল মুত্তালিবকে হত্যা করেছিলেন, এবং আরেকজন আনসারী সাহাবী মিলে হত্যা করেছিলেন (তারীখুত তাবারী, ২/২৭৯, ইবনুল আসীর, আল-কামিল ফীত তারিখ ২/২১৮, আল-বিদায়াহ ওয়াল-নিহায়াহ ৬/৩৫৭)।
এ ভাবে নিষ্ঠাবান মু’মিনগণ দ্বীন ইসলামের সাহায্য এবং হেফাযাতের পথে রাসূলুল্লাহর (সা) আদর্শের উপরে নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতেও এতোটুকু ইতস্ততঃ ও দ্বিধাবোধ করেননি।
১২- ইয়ারমুক যুদ্ধে ৪০০ মুসলিম বাহিনী কর্তৃক জীবন দিয়ে দেওয়ার জন্য বাই’য়াত গ্রহণ, ১৫হি, সনে সংঘটিত ইয়ারমুক যুদ্ধের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, মুসলিম মুজাহিদগণ আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করা, দ্বীনের রক্ষা করা এবং মানব রচিত মতবাদের সৃষ্ট ফেৎনা-ফাসাদ ও বিপর্যয়ের মূলোৎপাটন করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ৪০০ মুজাহিদ শহীদ হওয়ার জন্য বাই’য়াত গ্রহণ করেন ( ড. ফাযল ইলাহী, হুজুন নবী, পৃ. ৮৭ )।
ইয়ারমুক যুদ্ধের দিন ‘ইকরামাহ ইবন আবি জাহল (রা) বলেন,
قَاتَلْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي كُلِّ مَوْطِنٍ، وَأَفِرُّ مِنْكُمُ الْيَوْمَ ثُمَّ نَادَى : مَنْ يُبَايِعُ عَلَى الْمَوْتِ؟
আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অনেক স্থানে যুদ্ধ করেছি। আর আজকে তোমাদেরকে যুদ্ধের ময়দানে ফেলে পলায়ন করবো? (তা কখনো হতে পারে না) তারপর তিনি ঘোষণা করেন, কে মৃত্যুর জন্য বাই’য়াত গ্রহণ করবে’? তখন তার চাচা আল-হারিস ইবন হিশাম, যিরার ইবনুল আওয়ারসহ ৪০০ প্রখ্যাত যোদ্ধাগণ (রা) তার হাতে বাই’য়াত গ্রহণ করেন। তারা খালিদের শিবিরের সম্মুখ যুদ্ধ করেন এবং সকলেই আহত হন। তাদের মধ্যে ফিরার ইবনুল আওযূর (রা) সহ অনেকেই শাহাদত বরণ করেন।
আল্লাহ তা’আলা তাদের সকলের উপর সন্তুষ্ট হোন ( ইবন জারীর, তারীখুত তাবারী, ২/৩৩৮, ইবন কাসীর, আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৭/১৫)।
মানবতার মহান শিক্ষক রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গী-সাথীগণ এই ইয়ারমুক যুদ্ধের ময়দানে ত্যাগ ও কুরবানীর আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ইবন কাসীর আল-ওয়াকিদী ও অন্যান্যদের বরাতে উল্লেখ করেন যে,
وَقَدْ ذَكَرَ الْوَاقِدِيُّ وَغَيْرُهُ أَنَّهُمْ لَمَّا صُرِعُوا مِنَ الْجِرَاحِ اسْتَسْفَوْا مَاءً فَجِيْءَ إِلَيْهِمْ بِشَرْبَةِ مَاءٍ فَلَمَّا قُرِّبَتْ إِلَى أَحَدِهِمْ نَظَرَ إِلَيْهِ الْآخَرُ فَقَالَ: إِدْفَعْهَا إِلَيْهَا، فَلَمَّا دُفِعَتْ إِلَيْهِ نَظَرَ إِلَيْهِ الْآخَرُ فَقَالَ: إِدْفَعْهَا إِلَيْهِ، فَتَدَافَعُوهَا كُلُّهُمْ مِنْ وَاحِدٍ إِلَى وَاحِدٍ حَتَّى مَاتُوا جَمِيعًا وَلَمْ يَشْرَبُهَا أَحَدٌ مِنْهُمْ
، رَضِيَ اللهُ عَنْهُم أجمعين.
আল-ওয়াকিদী এবং আরো অন্যরা উল্লেখ করেছেন যে, ইয়ারমুক যুদ্ধে আহত মুজাহিদগণ যখন পানি পানি বলে কাতরাচ্ছিলেন। তখন তাদের সামনে পানি আনা হল, যখন তাদের কারো একজনের নিকট পানি হাজির করা হল, তখন অন্য আরেকজন তার দিকে তাকালেন, তখন এই ব্যক্তি বললেন, পানির পাত্রটি তাকে দিন। যখন তাকে দেওয়া হল, তখন অন্য আরেকজন তার দিকে তাকালেন। তখন এই ব্যক্তিও বললেন, তাকে দিন। এভাবে প্রত্যেকেই একজন আরেকজনকে পানি পাত্র ঠেলে দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তারা প্রত্যেকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, তাদের কেউই পানি পান করেননি। আল্লাহ তা’আলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন !!(আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৭/১২। ইবন সা’দ আহতদের নাম উল্লেখ করে, আল-হারিস ইবন হিশাম, তিনি ‘ইকরামাহ ইবন আবু জাহলকে, তিনি ‘আইয়াশ ইবন আবি রাবী’আহকে প্রমূখ, অনুরূপ একটি ঘটনা তার তাবাকাতে ইবন সা’দ এর সংযোজিত খন্ডে উল্লেখ করে বলেছেন, আমি মুহাম্মাদ ইবন ‘উমারকে ঘটনাটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এটি একটি ধারণামূলক ঘটনা, দেখুন, তাবাকাতে ইবন সা’দ পৃ. ৩৩০, নং ১৪৫, মাক্কা বিজয়ের পর যেসব সাহাবী ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাদের চতুর্থ স্তর অধ্যায়) ইবন কাসীর (রহ) ওয়াকিনী ও অন্যান্যদের বরাতে যে ঘটনা উল্লেখ করেছেন, সেখানে কোনো সাহাবীর নির্দিষ্ট নাম নেই। ইবন সা’দের মন্তব্যটি এ বর্ণনাকে শামিল করে না। তবে প্রশ্ন থেকে যায়)।
১৩- মুসলিম বাহিনীর শত্রুপক্ষের দূর্গের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আয-যুবাইর কর্তৃক বিশাল দূর্গের চূড়ায় আরোহণ:
রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার আরেক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছেন আয-যুবাইর (রা)। তিনি আল্লাহর দ্বীন ও রাসূলুল্লাহর (সা) জীবন আদর্শের স্বার্থে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন। তিনি এবং তার সাথী মুসলিম বাহিনী ইয়ামামার যুদ্ধে আল বারা ইবন মালিক (রা) যেমন কঠিন ও সাহসী ভূমিকা রেখেছেন, তারাও অনুরূপ ভূমিকা পালন করে ত্যাগের উজ্জ্বল উদাহরণ স্থাপন করেছেন। তাদের ক্ষেত্রে ত্যাগ ও কুরবানীর নজীর পেশ করা মোটেও বিচিত্র ছিল না। যেহেতু তারা সকলেই রাসূলুল্লাহর (সা) গঠিত ও পরিচালিত বিদ্যাপিঠ থেকে শিক্ষা লাভ করেছেন, প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাদের সকলের মহান শিক্ষক ছিলেন নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। তিনি তাদের সকলের নিকটই অত্যাধিক প্রিয়পাত্র ছিলেন (ড. ফাযল ইলাহী, হুদুন নবী, পৃ. ৮৮ )।
মিসর বিজয়ের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ‘আমর ইবনুল ‘আস (রা) এর মিসর বিজয় বিলম্বিত হচ্ছিল। তখন তিনি আমীরুল মু’মিনী ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) কে সৈন্য সাহায্য চেয়ে চিঠি লেখেন। ‘উমার (রা) চার হাজার সৈন্য পাঠান এবং বলেন, প্রতি একহাজার শত্রু সৈন্যের বিপরীতে মুসলিম সৈন্য একজন। তাদের মধ্যে আয-যুবাইর ইবনুল ‘আউওয়াম, আল-মিকদাদ ইবন ‘আমর, ‘উবাদাহ ইবনুস সামিত ও মাসলামাহ ইবন মুখাল্লাদ আরো অনেকে ছিলেন। অন্য আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, আমীরুল মু’মিনীন উমার (রা) ‘আমর ইবনুল ‘আসের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে আয-যুবাইরের পিছে পিছে আর বার হাজার সৈন্য দিয়ে সাহায্য করেন। শত্রুপক্ষ একটি দূর্গের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিল এবং দূর্গটির চতুর্দিকে পরিখা খনন করা ছিল। ফলে মুসলিম বাহিনী দূর্গটির উপর আক্রমণ করার কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারছিলেন না। দূর্গের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করা ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। ফলে শত্রুদের উপর আক্রমণ বিলম্বিত হচ্ছিল (আব্দুর রাহমান ইবনুল হাকাম, ফুতুহু মিসর ওয়াল মাগরিব, প্রকাশক, মাকতাবাতুস সাকাফাতিন দীনিয়্যাহ, প্রকাশ কাল, ১৪১৫ বি, ৮২-৮৪, ইউসুফ ইবন তাগরি বারদী, আন্-নুজুমুয যাহিরাহ ফী মুলুফি মিসর ওয়াল কাহিরাহ, মিসর, দারুল কুতুব, প্রকাশ, ওযারাতুস সাকাফাহ, তা.বি, ১/৮-৯ )।
এমনি বাস্তব সমস্যার কারণে ‘আমর ইবনুল ‘আস (রা) এর মিসর বিজয় আরো বিলম্বিত হচ্ছিল। তখন আয-যুবাইর রাদি (রা) বলেন:
إِنِّي أَهَبُ نَفْسِي اللهِ، وَأَرْجُو أَنْ يَفْتَحَ اللَّهُ عَلَى الْمُسْلِمِينَ
আমি অবশ্যই আমার জীবনকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত আছি এবং আমার এই ত্যাগের মাধ্যমে মুসলিমদের বিজয় অর্জিত হবে বলে আমি আশাবাদী। এই বলে তিনি আল-হামাম বাজারের দিক থেকে দূর্গের সাথে সিঁড়ি লাগালেন। তারপর সিঁড়িতে আরোহণ করে মুসলিম বাহিনীকে বললেন যে, তারা যখন তাকবীর ধ্বনি শুনবে তখনই যেন একত্রে ‘আল্লাহু আকবার’ শ্লোগান দিয়ে উঠেন। শত্রুপক্ষ টের পাওয়ার পূর্বেই আয-যুবাইর (রা) তরবারী হাতে দূর্গের চূড়ায় উঠে সজোরে ‘আল্লাহু আকবার’ শ্লোগান দিলেন। শ্লোগান শোনা মাত্র লোকেরা একত্রে সিঁড়িতে উঠার জন্য হুড়াহুড়ি শুরু করেন। ‘আমর ইবনুল ‘আস (রা) সিঁড়ি ভেঙে যেতে পারে এ আশঙ্কায় তাদেরকে নিষেধ করেন। আয-যুবাইর ও তার অনুসারীগণ বল প্রয়োগ করে দূর্গে প্রবেশ করে ভেতর থেকে এবং বাহিরে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনী একত্রে সমস্বরে ‘আল্লাহু আকবার’ শ্লোগানে মুখরিত করে তোলেন। দূর্গে অবস্থানকারী শত্রুপক্ষ তখন নিশ্চিত হয় যে, ‘আরব মুসলিম বাহিনী তাদের দূর্গে প্রবেশ করেছে। তারা তখন দূর্গ ছেড়ে পলায়ন করে। অপর দিকে আয- যুবাইর (রা) ও তার সঙ্গীগণ দূর্গের প্রধান ফটক খুলে দেন এবং মুসলিম বাহিনী দূর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে দূর্গ জয় করেন (ফুতুহু মিসর ওয়াল মাগরিব, পৃ. ৮৫, আন-নুজুমুয যাহিরাহ ১/১০)।
আয-যুবাইর (রা) জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাহিনীর সেনাপতি ‘আমর ইবনুল ‘আস (রা) সহ সাথীগণের নিষেধ সত্ত্বেও প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে দূর্গে প্রবেশ করেন এবং বিজয়কে ত্বরান্বিত করেন। আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলের (সা) দ্বীনকে বিজয় করার জন্য এই ত্যাগ এক অনন্য উদাহরণ।
১৪- নু’মান ইবন মুকাররিনের শাহাদাতের বিনিময়ে মুসলিমদের বিজয় লাভের প্রার্থনা, ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) এর সময়ে ২১ হিজরী সনে নাহাওয়ান্দ যুদ্ধ মুসলিম বাহিনী ও পারস্য বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত হয়। মু’তার যুদ্ধে যেমন রোমান সাম্রাজ্যে চরম পরাজয় হয়েছিল, তেমনি নাহাওয়ান্দ যুদ্ধে পারস্য সাম্রাজ্যে চরম শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের পতন ডঙ্কা বেজে উঠেছিল। ইসলামের প্রসিদ্ধ ইতিহাসবিদ ইবন জারীর আত্ তাবারী এই যুদ্ধকে ‘বিজয়সমূহের বিজয়’ নামে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ এই যুদ্ধের পর পারস্যবাসীরা আর দাঁড়াতে পারেনি এবং তার আর ঐক্যবদ্ধও হতে পারেনি (তারিখুত তাবারী ৪/১৩৫, ইবনুল আসীর, আল-কামিল ফীত তারীখ ২/৩৯৯ )।
আল্লাহর দ্বীনের বিজয় এবং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার চূড়ান্ত নজীর পেশ করেন আল্লাহ তা’আলার আরেক বান্দা নু’মান ইবন মুকাররিন (রা)। তিনি এই যুদ্ধে করুণাময় আল্লাহর নিকট দু’আ করেন যে, দয়ালু ও সাহায্যকারী আল্লাহ ‘আয্যা ওয়া জাল্লা যেন তার শাহাদাতের বিনিময়ে মুসলিমদেরকে বিজয় দান করেন। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থে সে ঘটনার বিবরণ রয়েছে যে, মুসলিম বাহিনী ও শত্রু পক্ষের মধ্যে নাহাওয়ান্দ নামক স্থানে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছিল। তখন আন-নু’মান বিন মুকাররিন (রা) নিজের সাথীদেরকে বলেন,
إن قُتِلْتُ فَلا يَلوِي عَلَيَّ أَحَدٌ، وَإِنِّي دَاعِ بِدَعْوَةٍ فَأَمِنُوا. ثُمَّ دَعَا: اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي الشَّهَادَةَ بِنَصْرِ الْمُسْلِمِينَ وَالْفَتْحِ عَلَيْهِمْ، فَأَمَّنَ القَوْمُ وَحَمَلُوا فَكَانَ النُّعْمَانُ أَوَّلَ صَرِيعِ
আমি যদি নিহত হই, আমার জন্য কেউ দুঃখ করবে না। তাই আমি একটি দু’আ করবো তোমরা সকলে আমীন বলবে। অতঃপর তিনি দু’আ করলেন : ‘হে আল্লাহ! মুসলিমদের বিজয়ের বিনিময়ে আমাকে শাহাদত দান করুন!। অতঃপর মুসলিমগণ ‘আমীন’ বললেন এবং আক্রমণ শুরু করলেন। এরপর আন্-নু’মান (রা) প্রথম শাহাদত বরণ করেন (হাফিয আয যাহাবী, তারীখুল ইসলাম, (‘আসরুল খুলাফারির রাশিদীন), ৩/২২৫, আর দেখুন, আল-বালাযুরী, আহমাদ ইবন ইয়াহইয়া, ফুতুহুল বুলনান, বৈরুত, দার ও মাকতাবাতুল হিলাল, প্রকাশকাল, ১৯৮৮ ঈ, ২৯৭, ইবন খাইয়াত, তারীখ খালীফা ইবন খাইয়াত, পৃ. ১৪৮-১৪৯ )।
অন্য আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, আন্-নু’মান বলেন,
اللهُمَّ أَعْزِزْ دِينَكَ، وَانْصُرْ عِبَادَكَ، وَاجْعَلِ النُّعْمَانَ أَوَّلَ شَهِيدٍ الْيَوْمَ عَلَى إِعْزَازِ دِينِكَ وَنَصْرِ عِبَادِكَ
হে আল্লাহ! আপনার দ্বীনকে বিজয় করুন। আপনার বান্দাদেরকে সাহায্য করুন। আপনার দ্বীনের বিজয় এবং আপনার বান্দাদের সাহায্যের বিনিময়ে আন-নু’মানকে আজ প্রথম শহীদ হিসাবে কবুল করুন’ ( ইবন জারীর, তারীখুত তাবারী ৪/১৩২, ইবনুল আছীর, আল কামিল ফীত-তারীখ ২/৩৯৬ )।
বস্তুত: আন-নু’মান ইবন মুকাররিন (রা) যে দু’আ করেছেন তা কেবল রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা এবং এর উপর সুদৃঢ় অবস্থানকারী ব্যক্তিদের পক্ষেই সম্ভব।
১৫- ইসলাম ও দ্বীনে হকের বিজয়ের পথে মুসলিমদের জীবন উৎসর্গ করার প্রবল আকাঙ্খা, মিসর অভিযানের অন্যতম এক মুজাহিদ ‘উবাদহাহ ইবনুস্-সামিত (রা)। তিনি মিসরের ফির’আউনের বংশধর মুকাওকিসের নিকট মহান আল্লাহর দ্বীনের স্বার্থে মুসলিম বাহিনীর নিজেদের জীবন-সম্পদ, এমনকি সব কিছু উৎসর্গ করার প্রবল আকাঙ্খা ও দৃঢ়তার কথা বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেন। তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এর মাধ্যমে পৃথিবীতে মানব সৃষ্ট ফেৎনা-ফাসাদ, বিশৃঙ্খলা, বিপর্যয় ও যাবতীয় অন্যায়-অনাচারের মূলোৎপাটন হবে। শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা হবে এবং আল্লাহ তা’আলা মনোনীত একমাত্র পরিপূর্ণ জীবন বিধান দ্বীন ইসলাম পূর্ণাঙ্গভাবে মহিমান্বিত ও মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর জমিনে প্রতিষ্ঠিত হবে ( ড. ফাযল ইলাহী, হুজুন নবী, পৃ. ৯১)।
‘উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা) রোমান নেতৃবৃন্দকে বলেন, আমরা জানি যে, যুদ্ধে জয়ের জন্য তোমাদের বিশাল প্রস্তুতি আছে। তোমাদের অনেক সৈন্য সামন্ত আছে। তোমাদের তুলনায় আমাদের প্রস্তুতি খুবই সামান্য। কিন্তু আমাদের মনে আছে বিশাল বিশ্বাস ও আস্থা। মনে প্রবল বাসনা ও কামনা আছে যে, আমরা যদি তোমাদের উপর জয়ী হই, তাহলে তোমাদের বিশাল সম্পদ দিয়ে আল্লাহ আমাদেরকে উপকৃত করবেন। আর যদি তোমরা জয়লাভ কর তাহলে পরকালে আমরা বিশাল পুরস্কার লাভকরবো। আর এটাইতো আমরা চাই। আমাদের চিন্তা-ভাবন, পরিকল্পনা ও চেষ্টা-প্রচেষ্টার পর এ দুটোর একটি তো আমাদের অবশ্যই অর্জিত হবে। আমাদের স্বস্তির জায়গা হচ্ছে, যা আমাদের রব আমাদের উদ্দেশ্যে কুরআন কারীমে বলেছেন,
كمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً كَثِيرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ }
“আল্লাহর হুকুমে কত ক্ষুদ্র দল কত বৃহৎ দলকে পরাভূত করেছে! আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৪৯]। তারপর তিনি তাদের সামনে এক ঐতিহাসিক বিস্ময়কর বাণী তুলে ধরে বলেন,
وَمَا مِنَّا رَجلٌ إِلا وَهُوَ يَدْعُو رَبُّه صَبَاحاً ومساءً أَنْ يَرْزُقَهُ الشَّهَادَةَ، وَأَلا يَرُدَّه إِلَى بَلَدِه وَلَا إِلَى أَرْضِهِ، وَلا إِلَى أَهْلِهِ وَوَلَدِهِ. وَلَيْسَ لأَحَدٍ مِنَّا هَم فِيمَا خَلْفَه ، وَقَد اسْتَوْدَعَ كُلُّ وَاحِدٍ مِنَّا رَبَّهُ أَهْلَهُ وَوَلَدَه، وَإِنَّمَا هنَا مَا أَمَامَنَا
আমাদের প্রত্যেক ব্যক্তি সকাল ও সন্ধ্যায় তার মহান রবের নিকট শাহাদাত লাভের জন্য প্রার্থনা করেন। তিনি যেন তাকে নিজের দেশ, জন্মভূমি, পরিবার-পরিজন এবং সন্তানাদির কাছে ফিরিয়ে না নেন। পিছনে ফেলে আসা কোনো কিছুর প্রতি আমাদের কারো কোনো মোহ বা আগ্রহ নেই। আমরা প্রত্যেকেই আপন আপন পরিবার ও সন্তানদিগকে মহান রবের দায়িত্বে রেখে এসেছি। আমাদের সামনের দায়িত্ব পালন করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ও চিন্তার বিষয়’ (আবুল কাসিম আল-মিসরী, ফুতুহু মিত্র ওয়াল মাগরিব, পৃ. ৮৯-৯০, আন- নুজুমুয যাহিরাহ, পৃ. ১৪, আস-সুষ্কৃতী, ‘আব্দুর রাহমান ইবন আবি বাকর, হুসনুল মুহাযারাহ কী তারিখি মিসর ওয়াল কাহিরাহ, সম্পাদনা, মুহাম্মাদ আবু ফাযল ইবরাহীম, মিসর, দারুল ইহইয়াছিল কুতুবিল ‘আরবিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৩৮৭ ছি, ১১২-১১৩ )।
এভাবে রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীগণ জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাদের প্রিয় রাসূলের (সা) প্রতি ভালোবাসার নজীর পেশ করেছেন। উম্মাতের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ ও কুরবানীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও উদাহরণ স্থাপন করেছেন। মহান করুণাময় আল্লাহ সুবহানাহু উম্মাতকে নিষ্ঠার সাথে তাদেরকে অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন! আমীন!!
তৃতীয় অধ্যায় : রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি বৈরীভাব ও অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ
রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি বৈরীভাব ও অবজ্ঞার বিষয়টিকে ভালভাবে বুঝার জন্য তার অনুপম আদর্শ ও পবিত্র সুন্নাহ ও জীবন আদর্শের সাথে আমাদের জীবন, জীবনাচার ও অনুশীলত আদর্শের যাচাই করতে হবে। বস্তুত: আমাদের বাস্তব জীবন, সার্বিক বিশ্বাস, যাবতীয় কার্যক্রম ও কর্মতৎপরতা পর্যালোচনা করলে প্রতিয়মান হবে যে, প্রকৃত পক্ষেই বর্তমানে মুসলিম জাতি দুঃখজনক হলেও সত্যি জাতিগত ভাবেই রাসূলুল্লাহ (সা), তার সুন্নাত বা জীবন আদর্শের সাথে দুরত্ব সৃষ্টি করে রেখেছে। তার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করছে এবং তার থেকে নিরঙ্কুশ আনুগত্যের মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তার রেখে যাওয়া দ্বীনের সার্বিক বিধি-বিধানের সাথে চরম বিদ্রোহাত্মক আচরণ হচ্ছে। অথচ বিশ্বজগতের করুণার মূর্ত প্রতিক ও বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলিম উম্মাহ ও মানব জাতিকে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত মুক্তির এক সুস্পষ্ট পথ ও পরিচ্ছন্ন পরিপূর্ণ জীবন বিধান ইসলামের উপর রেখে গেছেন। এ প্রেক্ষিতে আন্তরিক ও নিষ্ঠাপূর্ণ আত্মসমালোচনার মাধ্যমে সত্যপন্থী মু’মিন-মুসলিমদের ঈমান, ‘আমল ও মানব জাতির কল্যাণের প্রতি দায়িত্ব- কর্তব্যবোধ আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। অপরদিকে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার নিদর্শন মুসলিমদের জীবন, আকীদাহ-বিশ্বাস, কর্ম, আচার-আচরণ ও দৈনিন্দন সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে ফুটে উঠতে পারে। আবার যারা সত্যি সত্যিই দুর্ভাগ্যক্রমে তার প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ করে, তার জীবন আদর্শকে অবজ্ঞা করে, আধুনিক যুগে তার আদর্শকে অনুপোযোগী মনে করে তার থেকে দুরে চলে গিয়েছে, তারাও ফিরে আসার সুযোগ পেতে পারে। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি বিরূপ মনোভাব ও তার উপস্থাপিত জীবনাদর্শ ইসলাম ও এর যাবতীয় কিংবা আংশিক বিধি-বিধান ও নীতিমালার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের অনেক দৃশ্যমান নমুনা ও স্পষ্ট নিদর্শন আছে। হতে পারে কেউ কেউ না জেনেও এই মারাত্মক ভ্রষ্টতার মধ্যে ডুবে আছে। সংবিত ফেরানো ও সচেতনতার জন্য নিম্নে কতিপয় নিদর্শন ও ‘আলামত উল্লেখ করা হলো;
১- গোপনে ও প্রকাশ্যে সুন্নাহ থেকে দূরে অবস্থান করা, রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ, নিয়ম-নীতি, জীবন পদ্ধতি থেকে গোপনে ও অস্পষ্টভাবে দূরে থাকা; যেমন, যাবতীয় ‘ইবাদাত, আদেশ-নিষেধ ও ইসলামী কার্যক্রমকে ইসলামী বিধান হিসাবে সম্পন্ন করার পরিবর্তে সামাজিক রীতি-নীতি, ‘আদত-অভ্যাস ও কৃষ্টি-কালচার হিসাবে পালন করার প্রবণতাই হলো অস্পষ্টভাবে রাসূলের (সা) আদর্শ থেকে দূরে থাকার নিদর্শন। ইসলামী শরী’আতের বিধান পালনের ক্ষেত্রে ইখলাস ও নিষ্ঠা তথা একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাঁর নিকট প্রতিদান লাভের মানসিকতার অভাব এবং রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণ না করা। আল্লাহর রাসূলের (সা) প্রতি সম্মান ও নিষ্ঠাপূর্ণ আন্তরিক ভালোবাসা না থাকা। সর্বক্ষেত্রে তার আদর্শ ও সুন্নাতসমূহ বিস্মৃত হওয়া এবং তা পাশ কাটানো। তার জীবনাদর্শকে জানার চেষ্টা না করা। তার জীবন পদ্ধতির প্রতি সত্যিকারের সম্মান প্রদর্শনের পরিবর্তে যুগ চাহিদার প্রেক্ষিতে হেয় প্রতিপন্ন ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য মনোভাব লালন করা।
রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ ও বিধি-বিধান; হোক তা অত্যাবশ্যক, কিংবা আবশ্যক বা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ নির্বেশেষে সব বিধি-বিধানকে প্রকাশ্যেই পরিত্যাগ করা। যেমন, ইসলামী ঈমান-আকীদার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) ও তার সাহাবীগণের রীতি-নীতি ও পথ-পদ্ধতিকে পাশ কাটানো। শিরক ও বিদ’আত পন্থীদেরকে ত্যাগ করার পরিবর্তে তাদের অনুসরণ করা ও তাদের পক্ষাবলম্বন করা। আবার মানব রচিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সংস্কৃতিক, সামাজিক ও বিচারিক ইত্যাদি মতবাদগুলো আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলের (সা) দ্বীন ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক ও পরিপন্থী হওয়া সত্তেও তা আঁকড়ে ধরা এবং জীবন পণ করে তার পক্ষালম্বন করা ও তা প্রতিষ্ঠা ও প্রতিরোধে অনড় অবস্থানে থাকা। আবশ্যক ও তাকীদপূর্ণ সুন্নাহ ও রীতি-নীতির অনুসরণ না করা। যেমন: খাদ্য, পোশাক-পরিচ্ছেদ, রসম-রেওয়াজ, সুন্নাহ ও বিতর সালাত, হজ্জ, ওমরাহ, সিয়াম, কুরবানী, আকীকাহ, বিয়ে-শাদী ইত্যাদি বিষয়ে সুন্নাত তরীকাহর প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে প্রচলিত পন্থায় করে যাওয়া। মুসলিমদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ ও জীবন পদ্ধতির প্রতি যথাযথ আন্তরিক শ্রদ্ধার অভাব রেখে এবং তার প্রদর্শিত পথ ও পদ্ধতি বাস্তবে কার্যকরী না করে কখনো মুসলিম ব্যক্তি তার জীবনকে ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখতে পারবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা) ঘোষণা করেছেন:
فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي
‘যারা আমার সুন্নাহ ও জীবন আদর্শকে এড়িয়ে চলে, তারা আমার দলের অন্তর্ভুক্ত নয়’ ( সহীহুল বুখারী, ৭/২, নং ৫০৬৩, সহীহ মুসলিম ২/১০২০, নং ১৪০১ )।
২. সহীহ হাদীস প্রত্যাখ্যান করা, কোনো না কোনো যুক্তির ওপর নির্ভর করে প্রমাণিত সহীহ হাদীসকে প্রত্যাখ্যান করা রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সুন্নাহর প্রতি অবহেলা প্রদর্শন এবং তাঁর আদর্শ থেকে দূরে অবস্থান করার একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। যে সব যুক্তির ভিত্তিতে বিশুদ্ধ হাদীসগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা হয় সেগুলো হলো:
(১) হাদীসের বক্তব্য ‘আকল ও যুক্তির পরিপন্থী হওয়া।
(২) স্থান, কাল ও বাস্তব অবস্থার বিপরীত হওয়া।
(৩) হাদীসের দাবী বাস্তবায়ন করাকে অসম্ভব মনে করা।
(৪) হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে অহংবোধকে প্রাধান্য দেওয়া, হাদীস ও নুসূসের বক্তব্যের অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেওয়া এবং ভিন্নভাবে মনমত ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা।
(৫) হাদীস সহীহ হওয়া সত্ত্বেও হাদীসকে ‘খবরে ওয়াহিদ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া।
(৬) শুধুমাত্র কুরআন কারীমের অনুসরণের দাবী করা এবং কুরআন ছাড়া হাদীস ও সুন্নাহকে মান্য না করা।
ইত্যাদি যুক্তির ওপর নির্ভর করে মুসলিম জাতির কেউ কেউ সহীহ হাদীসকে প্রত্যাখ্যান করে থাকে।
প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য করা যেতে পারে যে, উপর্যুক্ত যুক্তিগুলোর সর্বশেষ যুক্তি ‘শুধুমাত্র কুরআনের অনুসরণ করবো’ এই শ্রেণির লোকদের সম্পর্কেই রাসূলুল্লাহ (সা) আর এ কারণেই সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন,
لا الْفِيَنَّ أَحَدُكُمْ مُتَّكِنَا عَلَى أَرِيكَتِهِ يَأْتِيهِ الْأَمْرُ مِنْ أَمْرِي مِمَّا أَمَرْتُ بِهِ أَوْ نهَيْتُ عَنْهُ، فَيَقُولُ لَا نَدْرِي مَا وَجَدْنَا فِي كِتَابِ اللَّهِ اتَّبَعْنَاهُ
‘আমি তোমাদের মধ্যে এমন ব্যক্তি পেতে চাইনা যে তার সোফাতে আরাম করে বসে থাকে। তার নিকট আমার নির্দেশিত কিংবা নিষেধকৃত কোনো নির্দেশ আসলে তখন সে বলে, আমরা জানি না, আমরা আল্লাহর কিতাবে যা পাব কেবল তারই অনুসরণ করবো’ (আত তিরমিযী, সুনানুত তিরমিযী, ৪/১৪৪, নং ২৮০০, ইমাম তিরমিযী হাসান বলে উল্লেখ করেছেন, সুনান আবী গাউন, ৪/৩২৯, নং ৪৬০৭, আবু রাফি’ (রা) থেকে বর্ণিত। আলবানী হাদীছটিকে সহীহ বলেছেন )।
বস্তুত মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর কুরআন মাজীদে, রাসূলুল্লাহ (সা) বিস্তারিত অবিস্তারিত যা কিছুই এনেছেন তা গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। উম্মাতের জন্য তা পালন করাকে অত্যাবশ্যক করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ}
“আর তোমাদের জন্য রাসূল যা দিয়েছেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাক আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠিন শাস্তি প্রদানকারী।” [সূরা আল হাশর, আয়াত: ৭। শুধু এ আয়াতই নয়, বরং আল্লাহ তা’আলা কুরআন কারীমের প্রায় ৩৩ স্থানে রাসূলুল্লাহর (সা) আনুগত্যের কথা উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)ও বলেছেন,
ألا إِنِّي أُوتِيتُ الْكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ
‘
হ্যাঁ, নিশ্চয় আমাকে আল কিতাব এবং এর সাথে অনুরূপ আরেকটি দান করা হয়েছে’ ( সুনানু আবী দাউদ, ৪/৩২৮, নং ৪৬০৬, আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন )।
এতদ বিষয়ে মদীনার ইমাম বলে খ্যাত মালিক ইবন আনাস বলেন, ‘যখনই আমাদের নিকট কোনো তর্কবিদ আসে তখন আমরা তার যুক্তি-তর্কের সামনে জিবরীল (আ) মুহাম্মাদ (সা) এর নিকট যা নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন, তা পেশ করি’ (আবু নু’আইম, হিলয়াতুল আওলিয়া, ৩/১১২, আয যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ৮/৯৯ )।
রাসূলুল্লাহ (সা) আরো বলেন,
سَنَّ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَوُلاةُ الأَمْرِ بَعْدَه سُنَنًا، الأَخَذُ بِهَا تصديق لكِتَابِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَاسْتِكْمَالٌ لِطَاعَةِ اللَّهِ، وَقُوَّةٌ عَلَى دِينِ اللهِ. مَنْ عَمِلَ بِمَا مُهْتَدٍ، وَمَنِ اسْتَنْصَرَ بِهَا مَنْصُورٌ، وَمَنْ خَالَفَهَا اتَّبَعَ غَيْرَ سبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ، وَوَلَاهُ اللَّهُ مَا تَوَلَّى
রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তার পরে শাসকগণ অনেক সুনান ও নিয়ম-নীতি নির্ধারণ করেছেন। সেগুলোকে গ্রহণ করার অর্থই হলো, মহান আল্লাহর কিতাবকে বিশ্বাস করা, আল্লাহর আনুগত্যের পূর্ণতা দান করা এবং আল্লাহর দ্বীনকে শক্তিশালি করা। যে এই সুন্নাহ ও নিয়ম-নীতিগুলো অনুযায়ী ‘আমল করবে সে হেদায়াতপ্রাপ্ত হবে। যে এগুলোর মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করবে সে সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি এই সুন্নাহর বিরোধিতা কওে, সে মু’মিনদের বিপরীত পথের (ভিন্ন আদর্শের) অনুসরণ করে আর আল্লাহ তাকে সে পথেই ধাবিত করেন, যে পথে সে যেতে চায়’ (আল খাতীব আল বাগদাদী, শারাফু আসহাবিল হাদীস, পৃ. ৭ )।
প্রসিদ্ধ ইসলামী বিশেষজ্ঞ ও ‘আলিমে দ্বীন ইবনুল কাইয়্যেম (রহ.) বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে আদবের দাবী হলো, তার বাণী নিয়ে কোনো প্রশ্ন না তোলা বরং সকল প্রকার মতামতকে তার বাণীর সামনে পেশ করা। তার বক্তব্যকে কিয়াস ও যুক্তির মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ না করা। সকল প্রকার যুক্তি পরিত্যাগ করা এবং সেগুলোকে তার নিকট থেকে প্রাপ্ত সহীহ নুসৃস দ্বারা বিচার-বিশ্লেষণ করা। কল্পনাবিলাসী ও খেয়ালীদের কথিত যুক্তির প্রেক্ষিতে তার হাদীসকে এর প্রকৃত অবস্থা থেকে পরিবর্তন করা যাবে না। তিনি যা কিছু এনেছেন তা গ্রহণ করার বিষয়টি কোনো ব্যক্তি বিশেষের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করে না। এ ধরনের আচরণ রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে বেয়াদবীর বহিঃপ্রকাশ এবং অনেক বড় দুঃসাহসিক কর্ম( ইবনুল কাইয়্যেম, মাদারিজুস সালিকীন, সম্পাদনা, মুহাম্মাদ মু’তাসিম বিল্লাহ আল-বাগদাদী, বৈরুত, দারুল কিতাবিল ‘আরাবী, ২০০১ঈ, ২/৩৬৮ )।
৩- রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনী ও নীতি-আদর্শ বিষয়ে আলোচনার সময়ে সম্মানবোধ না থাকা, কোনো স্থানে রাসূলুল্লাহ (সা) ও তার হাদীস-সুন্নাহ নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গ আসলে, তা খুবই সাদামাটা ভাবে করা হয়, সেখানে কোনো প্রকার সম্মানবোধ ও গুরুগাম্ভির্যভাব থাকে না। মনে হয় যেন, কোনো সাধারণ মানুষ এবং তার কথা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মনে হয় কোনো কবি, সাহিত্যিক, পর্যটক, গল্পকার, শিল্পী, নাট্যকার, খেলাওয়াড়, নেতৃবৃন্দের মতো সাধারণ মানুষ প্রসঙ্গ আলোচনার অবতারনা হয়েছে। তার জীবনী, জীবন আদর্শ ও হাদীস নিয়ে আলোচনার সময় কোনো প্রকার আদব, শিষ্টাচার সম্মান লক্ষ করা যায় না। নবুওয়াতের মর্যাদাবোধ ও মহত্ব প্রকাশ সেখানে অনুপস্থিত। তার প্রতি নেই যেন কোনো গুরুত্ব ও সম্মানমিশ্রিত ভীতি। ভাবটা এমন যে, তিনি আর দশ জন সাধারণ মানুষের মতো একজন সাধারণ মানুষ। তাই অন্যদের নিয়ে কথাবার্তার রীতি-নীতি আর বিশ্ব মানবতার মহান শিক্ষক, বিশ্ব জগতের মালিক আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল (সা) সম্পর্কে রীতি-নীতি ও আদব-কায়দা মনে হয় যেন একই। মনে রাখা প্রয়োজন যে, তার সাথে এ ধরনের ব্যবহার নিঃসন্দেহে তার সাথে মানসিক, আত্মিক ও রূহানী সম্পর্কের এক বিশাল দূরত্বের বহিঃপ্রকাশ। তার প্রতি আদবের নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ }
“হে যারা ঈমান পোষণ করেছো! তোমরা তোমাদের আওয়াজকে নবীর আওয়াজের উপর উঁচু করো না। আর তোমরা পরস্পর যে ভাবে উচ্চ স্বরে কথা বলো সে রকম তার সম্মুখে উচ্চ স্বরে কথা বলো না। তাহলে তোমাদের সকল ‘আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে, অথচ তোমরা টেরও পাবে না।” [সূরা আল-হুজরাত, আয়াত: ২।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর প্রিয় রাসূল (সা) এর নাম ধরে ‘হে মুহাম্মাদ’ কিংবা ‘হে আহমাদ’ বলে ডাকতে নিষেধ করেছেন ( আশ শানকীরী, তাফসীর আযওয়াইল বায়ান, ৫/৫২)।
কারণ তাতে রাসূলুল্লাহকে (সা) নবুওয়াত ও রিসালাতের যে সুউচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তা খাট করা হয়। তাই রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সুউচ্চ মর্যাদা, সম্মান ও পরম শ্রদ্ধা পোষণ করা মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যাবশ্যক। তার ব্যত্যায় হওয়ার কোনো সূযোগ ইসলামে নেই। কোনো মুসলিম কর্তৃক তার প্রতি সামান্য অমর্যাদা, ও অশ্রদ্ধার কিছু ঘটলে তার জীবনের সকল ভাল কর্মগুলোর সুফল নষ্ট হয়ে যাবে। সে ব্যাপারেও আল্লাহ তা’আলা উপরের আয়াতে সুস্পষ্টভাবে হুঁসিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ কুরআন কারীমের বিভিন্ন আয়াতে দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
{لا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْضاً }
“তোমরা পরস্পর পরস্পরকে যেভাবে সম্বোধন কর সেভাবে রাসূলকে সম্বোধন কর না।” [সূরা আন নূর, আয়াত: ৬৩]। মহিমান্বিত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা, স্বয়ং যিনি তাকে নবুওয়াত ও রিসালাত দিয়ে মহা সম্মানিত করেছেন তিনি নিজেও তাকে সম্মান প্রদান করেছেন। মহান রাব্বুল ‘আলামীন যেখানে অন্যান্য নবী ও রাসূলকে তাদের স্ব-স্ব নাম ধরে সম্বোধণ করেছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, }وَقُلْنَا يَا آدَمُ{ “আর আমরা বললাম, হে আদম।” [সূরা আল বাকারা, আয়াত: ৩৫]। আল্লাহ সুবহানাহু বলেন, }وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إبراهيم{ “আমরা তাকে হে ইবরাহীম বলে সম্বোধন করলাম।” [সূরা আস সাফফাত, আয়াত: ১০৪) মহান আল্লাহ বলেন, أَهْلِكَ{ }قَالَ يَا نُوحُ إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ “তिনি বলেন, হে নূহ! অবশ্যই সে তোমার পরিবারের কেউ নয়।”[ সূরা হুদ, আয়াত: ৪৬, ৪৮]। আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, قَالَ يَا مُوسَى إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ }عَلَى النَّاسِ “তিনি বলেন, হে মূসা। নিশ্চয় আমি তোমাকে সকল মানুষের মধ্য থেকে বাছাই করেছি।” [সূরা আল আ’রাফ, আয়াত: ১৪৪]। আল্লাহ সুবহানাহু আরো বলেন, }إِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ{ “যখন আল্লাহ বললেন, হে ‘ঈসা! নিশ্চয় আমি তোমার মৃত্যু দানকারী।” [সূরা আলে ‘ইমরান, আয়াত: ৫৫]। আল্লাহ আরো বলেন, }يَا دَاوُدُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفة{ “হে দাউদ! নিশ্চয় আমরা তোমাকে খলীফা করে সৃষ্টি করেছি।” [সূরা সোয়াদ, আয়াত: ২৬]। অথচ বিশ্ব জগতের মালিক আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূলকে ‘মুহাম্মাদ’ বা ‘আহমাদ’ নামে সম্বোধন করেননি, বরং তিনি তাকে ‘হে নবী!’, ‘হে রাসূল!’, ইত্যাদি সম্মান সূচক ও শ্রদ্ধাপূর্ণ উপাধীতে ডেকেছেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, }يَا أَيُّهَا النَّي{ ‘হে নবী’, [সূরা আল আনফাল, আয়াত: ৬৪] আল্লাহ আরো বলেন, }يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ{ ‘হে রাসূল!’, [সূরা আল মায়েদাহ, আয়াত: ৪১]। মহান আল্লাহ বলেন, } يَا أَيُّهَا الْمُؤْمِلُ{ “হে চাদর দ্বারা আবৃতকারী!’, (সূরা আল মুয্যাম্মিল, আয়াত: ১। আল্লাহ আরো বলেন, }يَا أَيُّهَا الْمُدَّيرُ{ ‘হে কম্বল দ্বারা আচ্ছাদনকারী!’, [সূরা আল মুদ্দাসসির, আয়াত: ১]। সুতরাং রাসূলুল্লাহকে (সা) শুধু ‘মুহাম্মাদ’ বলে সম্বোধন করা আদৌ সমিচীন নয়। বরং তাকে ‘আল্লাহর নবী’ কিংবা ‘রাসূলুল্লাহ’ বলে সম্বোধন করা আবশ্যক।
সাহাবায়ে কিরাম (রা) এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) জন্য অসম্মান হয় কিংবা তার প্রতি অসম্মানের পর্যায়ে পড়ে এমন কোনো কথা, কাজ ও আচারণও করতেন না। সূরা আল-হুজারাতের উপর্যুক্ত ২ নং আয়াত নাজিল হলে ‘উমার ইবনুল খাত্তাব রাদি আল্লাহহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহর (সা) সম্মুখে এমন নিম্ন স্বরে কথা বলেতেন যে, তার বোধগম্যই হতো না। তাই তিনি তাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করতেন (সহীহুল বুখারী, ৬/১৩৭, নং ৪৮৪৫, কিতাবুত তাফসীর, সূরা আল-হুজরাত পরিচ্ছেদ)।
একইভাবে সাবিত ইবন কায়স (রা) এর কথাও ইতোপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে যে, তারও গলার আওয়াজ উঁচু ছিল। তাই তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সম্মুখে আসাই বন্ধ করে দিলেন এবং বাড়িতে বসে এই ভেবে কাঁদতে লাগলেন যে, আল্লাহর নবীর সামনে উঁচু গলায় কথা বলার কারণে বোধ হয় তার সকল ভাল ‘আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে তিনি হয়ত জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছেন। আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণিত সে ঘটনায় আমরা ইতোপূর্বেও দেখেছি যে, শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে আস্বস্ত করে বলেছেন, সাবিত ইবন কায়েস জান্নাতীদের একজন (সহীহ মুসলিম, ১/৭৭, নং ৩২৯, মুমিন ব্যক্তির আশংকা পরিচ্ছেদ, আর দেখুন সহীহুল বুখারী, ৬/১৩৭, হা. নং ৪৮৪৬, আলামাতুন নবুওয়াহ পরিচ্ছেদ)।
রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে শুধুমাত্র উচ্চ কণ্ঠে কথা বলার কারণে তাদের সকল ভাল কাজের সুফলগুলো নষ্ট হয়ে যাবে, এ আশঙ্কায় সাহাবায়ে কিরাম বিচলিত হয়ে পড়েছেন।
রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় শুধু নয় বরং তার মৃত্যুর পরও সাহাবীগণ তার কবরের পাশে কিংবা তার মসজিদেও উঁচু স্বরে কথা বলাকে তার প্রতি অসম্মান ও অশ্রদ্ধা প্রদর্শন বলে বিশ্বাস করতেন। তারা নিজেরা কখনো এই গর্হিত কাজ করতেন না। কাউকে এমন আচরণ করত দেখলে তাকে তারা কঠোরভাবে তিরস্কার করতেন। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সাহাবী সায়েব ইবন ইয়াজীদ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
كُنتُ قَائِمًا فِي الْمَسْجِدِ فَحَصَبَنِي رَجُلٌ فَنَظَرْتُ فَإِذَا عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ فَقَالَ اذْهَبْ فَأْتِنِي بِهَذَيْنِ فَجِئْتُهُ بِهِمَا قَالَ مَنْ أَنْتُمَا أَوْ مِنْ أَيْنَ أَنْتُمَا قَالَا مِنْ أَهْلِ الطَّائِفِ قَالَ لَوْ كُنْتُمَا مِنْ أَهْلِ الْبَلَدِ لَأَوْجَعْتُكُمَا تَرْفَعَانِ أَصْوَاتَكُمَا فِي مَسْجِدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
আমি মাসজিদে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ইত্যবসরে কে একজন আমাকে কঙ্কর দ্বারা আঘাত করলো। আমি তাকিয়ে দেখি যে, তিনি হলেন ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)। তিনি বললেন, যাও তো এই দু’জন ব্যক্তিকে আমার নিকট নিয়ে আস। আমি তাদের দু’জনকে তার নিকট আনলাম। তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা কারা? কিংবা তোমরা কোনো স্থান থেকে এসেছো? তারা জবাব দিলো যে, আমরা তায়েফের বাসিন্দা। তখন তিনি বলেন, তোমরা যদি স্থানীয় হতে তাহলে তোমাদের দুজনকে আমি বেত্রাঘাত করতাম।
তোমরা রাসূলুল্লাহর (সা) মাসজিদে উঁচু আওয়াযে কথা বলছো? (সহীহুল বুখারী ১/১০১, নং ৪৭০, মসজিদে উঁচু স্বরে কথা বলা পরিচ্ছেদ )।
৪- রাসূলুল্লাহর (সা) বৈশিষ্ট ও তার মু’জিযাহ সমূহ সম্পর্কে জ্ঞান না রাখা, রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে দূরত্ব সৃষ্টির আরেকটি উজ্জ্বল নিদর্শন হলো মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (সা) কে অনেক মু’জিযাহ ও বিশেষ বৈশিষ্ট দান করে ধন্য করেছেন, সেগুলোকে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ না করা। সেগুলো সম্পর্কে নুন্যতম ধারণাও না থাকা। বস্তুত: সকল মুসলিমের এ বিষয়গুলো জানা অত্যাবশ্যক। বিশেষ করে সর্বসাধারণ মানুষের চেয়ে শিক্ষক, প্রশিক্ষক, সংগঠক ও সংস্কারবাদীদের এ বিষয়গুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকা আরো বেশি প্রয়োজন। কারণ দা’ওয়াত, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সংস্কারের জন্য এ বিষয়গুলো অনেক বড় পাথেয় হিসেবে কাজ করে।
প্রসঙ্গত, ইসলামী আকীদায় কারামাত সত্য। কারামাত হলো কোনো বস্তুতে আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকত হওয়া। যেমন, পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানি সরবরাহ হওয়া ইত্যাদি রকমের অলৌকিক ঘটনার উদ্ভব ও সংঘটিত হওয়া, যা সাধারণভাবে মানুষ বা জিন সংঘটিত করতে পারেনা। মহান আল্লাহ তাঁর নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর কতিপয় বান্দাদের দ্বারা পূর্ব নির্ধারিত রীতি-নীতি ও নিয়ম ছাড়াই সংঘটিত করান। এ ধরনের কারামাত কেবল এমন ব্যক্তিদের দ্বারাই হতে পারে, যারা প্রকাশ্যে ও গোপনে সকল অবস্থায় আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল (সা) এর পরিপূর্ণ অনুসরণ করে সিরাতে মুস্তাকীমের উপর সুদৃঢ়ভাবে অবস্থান করেন। অপরদিকে মু’জিযাহ হলো নবী ও রাসূলগণ ‘আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালামের জন্য নির্দিষ্ট। নবুওয়াত ও রিসালাতের প্রমাণ স্বরূপ এবং শত্রুদেরকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য মহান আল্লাহ তাঁর প্রেরীত নবী রাসূলগণ দ্বারা সংঘটিত করান। একইভাবে সর্বশেষ রাসূলুল্লাহর (সা) ‘বৈশিষ্ট’, অর্থাৎ যে বিধানগুলো মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূলের (সা) জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন, যেগুলো অন্য কোনো মানুষের জন্য বৈধ বলে স্বীকৃত নয়। যেমন, ৪ জনের অধিক স্ত্রী রাখা, পবিত্র মাক্কা নগরীর হারামের সীমানায় যুদ্ধ বিগ্রহ ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহর (সা) শামায়েল গঠন-প্রকৃতি, উত্তম আচরণ, উন্নত চরিত্র, অনন্য নীতি-নৈতিকতা, ক্ষমাপ্রবণ, বিনয়, নম্রতা ও সৎস্বভাব ইত্যাদি বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত।
৫- দ্বীনের মধ্যে বিদ’আত সৃষ্টি করা: রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে দূরত্বের ভয়াবহতা আরো বৃদ্ধি পায়, যদি মুসলিম ব্যক্তি শারী’য়াতের নীতিমালাগুলোকে পাশ কাটিয়ে দ্বীনের মধ্যে বিদ’আত ও বিদ’আতী কার্যক্রম শুরু করে দেয় এবং ভ্রষ্ট ও ভ্রান্তবাদীদের অনুসরণ করতে চেষ্টা করে। তারা রাসূলের (সা) আদর্শের পরিপন্থী তাদের অনুকরণে তাদের কথিত বিভিন্ন তরীকার পীর, মাশায়েখ, ওলী-আওলিয়া ও দরবেশদেরকে মাত্রাতিরক্ত ভক্তি, সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে থাকে। তাদের নিকট যে সব সুন্নাহ বিরোধী চিন্তা-চেতনা এবং কল্পনা প্রসূত অলৌকিকতা রয়েছে, সেগুলোর মোহে এ সব পীর-দরবেশদেরকে নবী ও রাসূলদের উপরেও শ্রেষ্ঠত্ব দান করতে কুণ্ঠিত হয় না। তাদের জীবদ্দশায় তাদের ব্যাপারে অতিরঞ্জন বিশ্বাস পোষণ করে। তাদের মৃত্যুর পর তাদেরকে আরো পবিত্র মনে করে। আরো শক্তিশালী, কল্যাণকারী, ক্ষতিকারী, দানকারী, উদ্ধারকারীসহ অতিপ্রাকৃতিক গুণাগুণের অধিকারী বলে অগাধ বিশ্বাস পোষণ করে। একমাত্র মহাশক্তিশালী আল্লাহ তা’আলাকে বাদ দিয়ে তাদের নিকটেই দু’আ প্রার্থনা করে। তাদের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে নযর, মান্নত ও উপঢৌকন পেশ করে, তাদের তরে কুরবানী করে। তাদের কবরের চতুর্দিকে তওয়াফ করে। তাদের কবরের উপর পাকা ইমারত নির্মাণ করে। বস্তুত: এ সবের মধ্যে অনেক কর্মকাণ্ড, কর্ণা-বার্তা ও বিশ্বাস সুস্পষ্ট শিরক ও শিরকের উপায় ও বাহন। শিরকের মূলোৎপাটন করার জন্য রাব্বুল ‘আলামীন আল্লাহ তাঁর নবী ও রাসূলগণকে নবুওয়াত ও রিসালাত সহকারে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। মানুষের অন্তরে এবং আল্লাহ তা’আলার এ জমিনে তাঁর একত্ববাদ ও খাঁটি তাওহীদ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়েছেন। মহান আল্লাহ রিসালাতের এ পবিত্র মিশনের মাধ্যমে তাঁর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর প্রিয় বান্দা নবী ও রাসূলগণকে সাহায্য করেছেন। তাদের নিষ্ঠাবান অনুসারী ও সহযোগী মু’মিন-মুসলিমদেরকে সহায্য করেছেন। শিরক আর জাহিলিয়াতের পঙ্কিলতা থেকে মানবতাকে মুক্তি দিয়েছেন। ফলে তারা পরিপূর্ণ তৃপ্তি, শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নত জীবন-জীবিকার প্রকৃত উপায় ও পথ খুঁজে পেয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় আল্লাহর প্রিয় রাসূল (সা) ইসলামের মহান বিজয়, মাক্কা বিজয়ের দিনে জাহিলিয়াতের প্রতীক ও নিদর্শন মূর্তিগুলোকে নিজ হাতে ভেঙে দিয়েছেন এবং জাহিলিয়াতের মানবতা বিরোধী ব্যবস্থাকে পদদলিত করেছেন আর ঘোষণা করছেন,
{وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا }
‘আর সত্য সমাগত হয়েছে, অসত্য নিশ্চিহ্ন হয়েছে। আর নিশ্চিহ্ন হওয়াই বাতিলের অপরিহার্য পরিণতি”। [সূরা আল ইসরা, আয়াত: ৮১]
ইসলামী শরী’য়াতের জ্ঞানে সমৃদ্ধ কোনো ব্যক্তির নিকট এটা অস্পষ্ট নয় যে, মাযার ও কবরের চতুর্দিকে তোয়াফ করা, মাযারের পাশে অবস্থান নেওয়া, মৃত ব্যক্তিদের নিকট প্রয়োজন পূরণের প্রার্থনা করা, আরোগ্য কামনা করা কিংবা তাদের মাধ্যমে বা তাদের সম্মানের উসীলা করে আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা করা ইত্যাদি অপকর্মগুলো দ্বীনের মধ্যে নব আবিষ্কৃত বিষয়। এগুলোর সাথে ইসলামের কোনো দূরতম সম্পর্কও নাই। বস্তুত: শরী’য়াত সিদ্ধ তোয়াফ হলো পবিত্র কা’বা ঘরের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করা। আর কল্যাণ, ক্ষতি ও সুপারিশ কেবল মাত্র আল্লাহ তা’আলার হাতে। আল-কুরআনুল কারীম, সুন্নাতে নাবাবী এবং ইজমা’ দ্বারা এগুলো সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত। বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট থেকে যে ওহী ও প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হয়েছেন, তা আমানতদারীর সাথে উম্মাতের নিকট পৌছে দিয়েছেন। তিনি আল্লাহর নির্দেশকে যথাযথভাবে পালন করেছেন। মহিমান্বিত আল্লাহ সুবহানাহু বলেন,
{ قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا، قُلْ إِنِّي لَنْ يُجِيرَنِي مِنَ اللَّهِ أَحَدٌ وَلَنْ أَجِدَ مِنْ دُونِهِ مُلْتَحَدًا إِلَّا بَلَاغًا مِنَ اللَّهِ وَرِسَالَاتِهِ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ لَهُ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا }
‘আপনি বলুন! আমি তোমাদের না ক্ষতি করার না ভাল করার ক্ষমতা রাখি। আপনি বলুন! নিশ্চয় আল্লাহ থেকে কেউই আমাকে কক্ষনো রক্ষা করতে পারবে না। আর তিনি ব্যতিত আমি কখনোই কোনো আশ্রয় পাবনা। তবে হ্যাঁ! আল্লাহর পক্ষ থেকে পৌঁছানো এবং তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব পালন আমাকে রক্ষা করবে। যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) অবাধ্য হবে তার জন্য জাহান্নামের আগুন অবধারিত, তারা সেখানে স্থায়ীভাবে থাকবে’, [সূরা আল জিন, আয়াত: ২১-২৩]।
তাই মনে রাখতে হবে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) যদি ভাল করা মন্দ করার ক্ষমতা না রাখেন, আল্লাহর হাত থেকে কেউ যদি তাকে রক্ষা করতে না পারেন, তাহলে অন্য সাধারণ মানুষের ব্যাপারে কি আশা করা যেতে পারে? মূলতঃ এর মাধ্যমেই প্রকৃত নিষ্ঠাবান মু’মিন ও অন্যান্য লোকদের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে তা পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠে। প্রকৃত মু’মিনগণ আল কুরআন, আস সুন্নাহ ও সালফে সালিহীনের অনুসরণের মধ্যেই নিজেদের জন্য মুক্তির পথকে সুগম করার চেষ্টা করে। এর বাইরে বিদ’আত ও শিরকের মতো ধ্বংসাত্মক মত ও পথ থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে থাকে।
৬- রাসূলুল্লাহর (সা) ব্যাপারে অতিরঞ্জন ধ্যান-ধারণা করা, যে সব বিষয় রাসূলুল্লাহকে (সা) কষ্ট দেয় এবং তার দা’ওয়াত ও আদর্শের বিপরীত, ইসলামের মূল স্তম্ভ ‘তাওহীদ’ এরও পরিপন্থী, তন্মধ্যে অন্যতম হলো, আল্লাহর রাসূলের (সা) প্রতি অতিরঞ্জন বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণা পোষণ করা। তাকে নাবুওয়াতের মর্যাদার উর্ধে উঠানো। আল্লাহ যেসব গায়েব ও অদৃশ্যের জ্ঞান তার রাসূলকে দিয়েছেন তার বাইরে, তিনি সব ধরনে গায়েব ও অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন বলে আল্লাহর সাথে তাকে শরীক করা। আল্লাহ ব্যতিত তার নিকট প্রার্থনা করা, তার নামে শপথ করা ইত্যাদি। বস্তুত: উম্মাতের কোনো কোনো হতভাগ্য গোষ্ঠী বা দল এ সব অপকর্মের মধ্যে লিপ্ত হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই রাসূলুল্লাহ (সা) মৃত শয্যায় শায়িত অবস্থায়ও উম্মাতকে সাবধান করেছেন। ইবন ‘আব্বাস (রা) ‘উমার (রা) কে মম্বারের উপর বলতে শুনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ سَمِعَ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَقُولُ عَلَى الْمِنْبَرِ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ : لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ.
তোমরা আমার ব্যাপারে অতিরঞ্জন করো না, যেমন অতিরঞ্জন করেছে খ্রিষ্টানেরা মারইয়াম পুত্রের ব্যাপারে। বরং তোমরা বল, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল’ (সহীহুল বুখারী, ৪/১৬৭, নং ৩৪৪৫, কিতাবুত তাফসীর, তাফসীর সূরা মারইয়াম )।
এ কথা সর্বজন বিদিত যে, খ্রিষ্টানেরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাথে ‘ঈসারও ইবাদাত করে। তারা ‘ঈসাকে (আ) কে ‘আল্লাহর পুত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। একইভাবে আল্লাহ ব্যতিত তাঁর রাসূল (সা) এর নিকট প্রার্থনা করার অর্থই হলো তার ‘ইবাদাত করার নামান্তর। বস্তুত: ‘ইবাদত শুধুমাত্র আল্লাহ তা’আলার জন্য নির্দিষ্ট। ‘ইবাদাতের সামান্যতম অংশও আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেননা এটাই শিরক।
রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি বাড়াবাড়ি হতে পারে এবং যা তার ‘ইবাদাতের পর্যায়ে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা থেকে তিনি তার কবরকে ‘ঈদ বা উৎসব স্থল ও মাযার বানানো থেকে উম্মাতকে সাবধান করেছেন। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
لا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قُبُورًا، وَلَا تَجْعَلُوا قَبْرِى عِيدًا، وَصَلُّوا عَلَيَّ؛ فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ تَبْلُغُنِي حَيْثُ كُنْتُمْ
‘তোমরা তোমাদের ঘর-বাড়িকে কবরস্থান বানিয়ো না। আর আমার কবরকে উৎসবস্থল বানিয়োনা। আমার প্রতি সালাত পাঠ কর। কেননা তোমরা যেখানেই থাক তোমাদের সালাত আমার নিকট নিশ্চিত পৌঁছে যায়’ (সুনানু আবী দাউদ, ২/১৬৯, নং ৩০৪৪। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন )।
রাসূলুল্লাহর (সা) যাত ও সত্তায় কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে কঠিন হুঁসিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে। যারা নবীদের কবরসমূহকে উপাসনালয় বানিয়ে নিয়েছে, তাদের প্রতি আল্লাহ তা’আলার অভিসম্পাত ও লা’নতের ঘোষণা রয়েছে। এ বিষয়ে প্রচুর হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ‘আয়িশা রাদি আল্লাহু ‘আনাহ থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী তার অসুস্থতার সময়, যে অসুস্থ অবস্থায় তিনি মৃত্যু বরণ করেছেন বলেন,
لَعَنَ اللهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسْجِدًا قَالَتْ وَلَوْلَا ذَلِكَ لأَبْرَزُوا قَبْرَهُ غَيْرَ أَنِّي أَخْشَى أَنْ يُتَّخَذَ مَسْجِدًا
আল্লাহ ইহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে লা’নত করুন, তারা তাদের নবীগণের কবরসমূহকে মাসজিদ বানিয়ে নিয়েছে’। আয়েশা বলেন, এ আশঙ্কা যদি না থাকতো তাহলে তারা তার কবরকে উঁচু করে রেখে দিতেন। কিন্তু তার কবরকে মসজিদ বানানো হতে পারে এ ব্যাপারে আমি শঙ্কিত (সহীহুল বুখারী ২/৮৮, নং ১৩৩০, কবরের ওপর মাসজিদ বানানো অপছন্দনীয় কাজ পরিচ্ছেদ, সহীহ মুসলিম, কবরের ওপরে মাসজিদ বানানো নিষিদ্ধ পরিচ্ছেদ, ২/৬৭, হা. নং ১২১২ )।
আরো উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহর (সা) ব্যাপারে বাড়াবাড়ির যে কোনো উদ্যোগকে স্বয়ং তিনি তার সময়কালেই শক্তভাবে সাবধান করেছেন।
আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন,
إِنَّ نَاسًا قَالُوا : يَا رَسُولَ اللهِ، ويَا خَيْرَنَا وَابْنَ خيرنا ، وَيَا سَيِّدَنا وَابْنَ سَيِّدِنا ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : السَّيِّد الله، قَالُوا : أَنتَ أفضلنا فضلاً ، وَأَعْظَمُنَا طَوْلا ، فَقَالَ : يا أَيُّهَا النَّاسُ، عَلَيْكُمْ بِقَولِكُم، وَلَا يَسْتَهْوِينَّكُمُ الشَّيْطَانُ، إِنِّي لا أُرِيدُ أَنْ تَرْفَعُونِي فَوقَ مَنْزِلَتِي الَّتِي
أَنْزَلَنِيْهَا اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى، أَنَا مُحَمَّدُ بنُ عَبْدِ اللَّهِ، عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُه.
‘একবার এক দল মানুষ এসে বললো যে, হে আল্লাহর রাসূল! হে আমাদের উত্তম ব্যক্তি, আমাদের উত্তম ব্যক্তির পুত্র। হে আমাদের সাইয়্যেদ-নেতা, আমাদের নেতার পুত্র! তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ‘সাইয়্যেদ’ কেবলমাত্র আল্লাহ। তারা বললো, আপনি আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, আমাদের মধ্যে অধিক দানবীর। তখন তিনি বলেন, ‘হে মানব সকল! তোমরা তোমাদের কথা বল। আর শাইতান যেন তোমাদেরকে প্রলুব্ধ করে বিপথগামী না করে। বারকাতময় আল্লাহ তা’আলা আমাকে যে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন তার উপরের মর্যাদায় আমাকে উঠাবে না। আমি আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল’ (ইবনুল আহীর আল জাযায়ী, জামি’উল উসুল লি আহাসীছির রাসূল, সম্পাদনা। আব্দুল কাদির আল আরনাউত, মাকতাবাতুল হালাওয়ানী, ১ম সংস্করণ, ১৯৭২৮, ১১/৪৯)।
আল্লাহর রাসূলের (সা) ব্যাপারে বাড়াবাড়ির আরেকটি নিদর্শন হলো তার নামে কসম করা। বস্তুত: কসম হলো ‘সম্মান’। এটি একটি ‘ইবাদাত। এ ‘ইবাদতটির প্রাপ্য হকদার একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। তাই মহা সম্মানিত, মহা পরক্রমশালী আল্লাহ ব্যতিত আর কারো নামে কসম বা শপথ করা বৈধ নয়। ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহর (সা) বলেন,
مَنْ كَانَ حَالِفًا فَلْيَحْلِفْ بِاللَّهِ أَوْ لِيَصْمُتْ
‘যে ব্যক্তি শপথ করতে চায় সে যেন অবশ্যই আল্লাহর নামে শপথ করে অথবা সে যেন (শপথ না করে) চুপ থাকে’ (সহীহুল বুখারী, বাবু কাইফা ইয়াহলিফু, ৩/১৮০, হা, নং ২৬৭৯, সহীহ মুসলিম, বাবুন নাইরি ‘আনিল হালফি, ৫/৮১, হা. নং ৪৩৪৮ )।
রাসূলুল্লাহর (সা) বিষয়ে অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে উপরোক্ত হাদীসগুলো বলিষ্ঠ প্রামাণ্য দলীল। এগুলোর মাধ্যমে তার প্রতি উম্মাতের দৃষ্টিভঙ্গির একটি ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে। তার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন করা কোনো ভাবেই তার প্রতি বিশুদ্ধ ঈমান ও প্রকৃত ভালোবাসার নিদর্শন নয়। বরং তার নীতি আদর্শ ও তার সাথে দূরত্ব বজায় রাখারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
৭- রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠানো পরিত্যাগ করা, আমরা রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাত ও সালামের গুরুত্ব মর্যাদা এবং সাহাবায়ে কিরামের ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়ে দ্বিতীয় নিদর্শনে আলোচনা করেছি (দেখুন, দ্বিতীয় পরিচ্ছে। দ্বিতীয় নিদর্শন, {পাঁচ, রাসূলুল্লাহর প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ })।
রাসূলুল্লাহর (সা) নাম আলোচনায় আসলে মৌখিক বা লিখিত বা উভয় ভাবেই সুন্নাহ পদ্ধতিতে তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ না করা, তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার অন্যতম একটি নিদর্শন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের সমাজে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিংবা সমষ্টিগত পর্যায়ে সর্বোতই যেন আল্লাহর রাসূলের (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পাঠের ব্যাপারে উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। বস্তুত: এই নীতির মধ্যে উম্মাতের জন্য না দুনিয়াতে কোনো কল্যাণ আছে আর না পরকালে কোনো উপকার রয়েছে। রাসূলুল্লাহর (সা) নাম উল্লেখ হলে তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ না করা সবচেয়ে বড় কৃপণতা। এ দূরারোগ্যের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তাদের জন্য অনেকগুলো অকল্যাণের হুঁসিয়ারী রয়েছে। তাই মুসলিম উম্মাহর উচিৎ, বিশ্বনবী (সা) এর নাম শোনা মাত্রই তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করে উভয় জগতে কল্যাণ লাভে ধন্য হওয়া। তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের তৎক্ষনাৎ বাস্তব কর্ম হচ্ছে, তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করে আমাদের প্রতি তার অধিকার পূরণ করার দায়িত্ব পালন করা। আল-হুসাইন ইবন ‘আলী বলেন, আমি শাফি’ঈকে বলতে শুনেছি যে,
يُكْرَه لِلرَّجُلِ أَنْ يَقُولَ: قَالَ الرَّسُولُ، وَلَكِنْ يَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ تَعْظِيمًا لِرَسُولِ اللهِ
একজন ব্যক্তির কাছে এমন কথা গ্রহণযোগ্য নয় যে, সে বলে, ‘রাসূল’ বলেছেন। বরং আল্লাহর রাসূলের (সা) প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সে বলবে, ‘রাসূলুল্লাহ বলেছেন’ বলেছেন (আবুল ফযল আল মুক্তী, ‘আহাদীসুন ফী যাম্মিল কালাম ওয়া আহলিহী, সম্পাদনা, ড. নাসির ইবন আব্দির রহমান আল জুদা’ই, রিয়াদ, দার আটলাস, ১ম সংস্করণ, ১৯৯৬ ঈ, ৫/১৬৯)।
৮- সহাবায়ে কিরামগণের মান-মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা, রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সম্পর্ক ছিন্ন ও তার সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়া এবং তাকে অবজ্ঞা করার অন্যতম আরেকটি নিদর্শন হলো, তার সম্মানিত সাহাবীগণের মান-মর্যাদা ও সম্মান সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকা। প্রকৃতপক্ষে সাহাবীগণ হলেন, মানব ইতিহাসে নবী ও রাসূলগণের পরে শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম প্রজন্ম। মহান আল্লাহ তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল (সা) এর জন্য এমনি শ্রেষ্ঠ ও উত্তম একদল লোকদেরকে নির্বাচন করেছিলেন। সাহাবীগণও সর্বশ্রেষ্ট রাসূল ও বিশ্বনবীর সাহচর্য লাভ করেছেন। তার সান্নিধ্যে লাভে ধন্য হয়েছেন। তার সরাসরি আদর, ভালোবাসা, শিক্ষা, দীক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। সুখে, দুঃখে, বিপদে-আপদে, হাসিতে-খুশিতে, ত্যাগ-কুরবানীতে, কাজে-কর্মে, যুদ্ধ-বিগ্রহে, জয়ে, পরাজয়ে, দেশে-বিদেশে, বাড়িতে সফরে সর্বক্ষেত্রেই তারা তার সাথে ছায়ার মতো লেগে থেকেছেন। এ কারণেই ইসলামের এই মহান জনগোষ্ঠী ও প্রজন্মের ক্ষণজন্মা মানুষগুলোর কথা তাদের মর্যাদা ও বৈশিষ্টের আলোচনা দিয়ে পবিত্র হাদীস ও সীরাত গ্রন্থগুলো ভরপুর। কখনো ব্যক্তি বিশেষের আলোচনা। কখনো সাধারণভাবে তাদের জীবনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরা। আবার কখনো আনসার হিসেবে তাদের বৈশিষ্ট। কখনো মুহাজির হিসাবে তাদের পৃথক মর্যাদার কথা। মুসলিম জাতির পরবর্তী প্রজন্মের উচিৎ তাদেরকে নিয়ে গর্ব করা, অহংকার করা। তাদের অনুসরণে নিজেদের প্রজন্ম ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে গড়ে তোলা। নবী ও রাসূলগণ ‘আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালামের পরে মানব ইতিহাসের এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মান-মর্যাদা ও প্রশংসা স্থান পেয়েছে বিশ্ব জগতের মহান প্রতিপালক আল্লাহ তা’আলার পবিত্র বাণী আল কুরআনে। যে মহান বাণীকে তিনি তাঁর সর্বশেষ রাসূলের (সা) নিকট বিশ্ব মানবতার পথ প্রদর্শক হিসেবে নাজিল করেছেন। মাজীদের অনেক আয়াতে আল্লাহ তা’আলা তাদের প্রশংসা করেছেন। মহান আল্লাহ সুবহানাহু বলেন,
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ}
“আর যে সব মুহাজির ও আনসার অগ্রবর্তী প্রথম, আর যেসব লোক নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুগামী, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর আল্লাহ তাদের জন্য এমন উদ্যান প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহমান থাকবে, যেখানে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে, এটাই হলো মহা সফলতা।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০০]
মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেন,
لَقَدْ تَابَ اللهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَة
“নিশ্চয় আল্লাহ নবীর প্রতি, মুহাজির ও আনসাগণের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যারা সংকট মুহূর্তেও তার অনুগামী হয়েছিল।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১১৭]।
আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন,
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُمْ مَنْ قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُمْ مَنْ يَنْتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا}
“মু’মিনদের মধ্যে কিছু মানুষ আল্লাহর সাথে কৃত চুক্তিকে সত্যে পরিণত করেছে। অতঃপর তাদের কেউ কেউ মৃত্যু বরণ করেছে আর কিছু লোক অপেক্ষায় আছে। বস্তুত: তারা (তাদের অঙ্গিকারে কোনো) পরিবর্তন করেনি।” [সূরা আল আহযাব, আয়াত: ২৩]। করুণাময় আল্লাহ আরো বলেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ فَمَنْ نَكَثَ فَإِنَّمَا يَنْكُتُ عَلَى نَفْسِهِ وَمَنْ أَوْفَى بِمَا عَاهَدَ عَلَيْهُ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا }
“বস্তুত: যারা আপনার বায়’আত গ্রহণ করে তারা প্রকৃত পক্ষে আল্লাহরই বায়’আত গ্রহণ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর। সুতরাং যে তা ভঙ্গ করে, ভঙ্গ করবার পরিণাম তার ওপরই বর্তায়। আর যে আল্লাহর সাথে কৃত চুক্তি পূর্ণ করে, তিনি অতিশীঘ্রই তাকে মহা প্রতিদান দেন।” [সূরা আল ফাতহ, আয়াত: ১০]। আল্লাহ ‘আয্যা ওয়া জাল্লা বলেন,
مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رَكَعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السجود
“মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং যারা তার সাথে আছেন, কাফিরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের প্রতি সহানুভূতিশীল। আপনি তাদেরকে রুকুকারী, সাজদাহকারী অবস্থায় দেখবেন। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টির প্রত্যাশা করে। তাদের চেহারাতে সাজদার চিহ্ন রয়েছে।”[সূরা আল ফাতহ, আয়াত : ২৯]।
মহান আল্লাহ সাহাবীগণ সম্পর্কে আরো বলেন,
لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا وَيَنْصُرُونَ اللهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ. وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ
خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“(এ সম্পদ) ‘দরিদ্র মুহাজিরদের জন্য, যাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পদ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে, তারা আল্লাহর নিকট অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) সাহায্য করে। তারাই তো সত্যবাদী। আর যারা এ নগরীতে বসবাস করেছে ও ঈমান এনেছে তারা তাদেরকে ভালোবাসে, যারা তাদের নিকট হিজরাত করে এসেছে এবং তাদেরকে যা দেওয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে প্রয়োজনবোধ করে না, আর তারা অভাব থাকা সত্বেও তাদেরকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়। যারা কার্পণ্য হতে নিজেদেরকে মুক্ত করেছে তারাই সফলকাম।” [সূরা আল হাশর, আয়াত: ৮, ৯]।
উপর্যুক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় রাসূল (সা) এর সাহাবী মুহাজির ও আনসারগণের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি সকল মানুষকে অবহিত করেছেন যে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। তাদের জন্য অকল্পনীয় সুখের জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন। তাদের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট তুলে ধরে আল্লাহ সুবহানাহু তাদের স্তুতি করেছেন যে, তারা নিজেদের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং আল্লাহদ্রোহীদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর। আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবীর সঙ্গী সাথী হওয়ার জন্য তাদেরকে বাছাই করেছেন। তারা আল্লাহর দুশমনদের অন্তরের জ্বালা ও অস্বস্তির কারণ ছিলেন। মুহাজির সাহাবীগণ আল্লাহর অনুগ্রহ, সন্তুষ্টি এবং দ্বীনের সাহায্যের উদ্দেশ্যে নিজেদের ঘর-বাড়ি সহায়-সম্বল ও ধন-সম্পদ ত্যাগ করেছিলেন। অপরদিকে আনসার সাহাবীগণ এ সব ত্যাগী মুহাজিরদেরকে আপন ভাইয়ের মতো সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। নিজেদের ঘনিষ্ট আত্মীয় বানিয়ে নিয়ে ছিলেন। নিজেদের ঘর-বাড়ি, সম্পদ ও সম্পত্তিতে তাদেরকে ভাগীদার বানিয়ে ছিলেন। এক কথায় তারা ছিলেন সত্যবাদী একদল প্রকৃত মু’মিন ও মুসলিম।
এ সব ছিল সাহাবায়ে কিরামগণের সাধারণ বৈশিষ্ট। তাছাড়াও তাদের পরস্পরের মধ্যে একজন আরেক জনের চেয়ে পৃথক ও আরো উন্নত বৈশিষ্টের অধিকারী ছিলেন। একজন অপর জনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। সর্বোৎকৃষ্ট সাহাবী ছিলেন চার খলীফা। যথা, আবু বকর, ‘উমার, ‘উসমান এবং আলী (রা)। তারপর জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশ জনের উপর্যুক্ত ৪ জনসহ বাকী ছয়জন; তারা হলেন, তালহা ইবন ‘উবাইদুল্লাহ, আয-যুবাইর ইবনুল ‘আউওয়াম, ‘আব্দুর রহমান ইবনু ‘আওফ, আবু ‘উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ, সা’দ ইবন আবি ওক্কাস এবং সা’ঈদ ইবন যায়েদ (রা)। তাছাড়াও মুহাজির সাহাবীগণ আনসার সাহাবীগণের চেয়ে অধিক মর্যাদা সম্পন্ন ছিলেন। বদরী সাহাবীগণ বায়’আতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। আবার যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন ও জিহাদ করেছেন, তারা মাক্কা বিজয়ের পরে ইসলাম গ্রহণকারীদের চেয়ে অধিক মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।
তাছাড়াও মানবতার মহান শিক্ষক রাসূলুল্লাহ (সা), যিনি উম্মাতের শ্রেষ্ঠ মানব গোষ্ঠী ও সর্বোত্তম প্রজন্মকে ওহী সমৃদ্ধ শিক্ষা কারিক্যুলাম দিয়ে সরাসরি নিজের তত্ত্বাবধানে গঠন করেছেন ও প্রশিক্ষিত করেছেন। তিনি তাদের জীবনের সানাদ প্রদান করেছেন। তাদের মানাকিব; মানসিক, আত্মিক, চারিত্রিক, সামাজিকসহ সার্বিক জীবনের সফলতার নানা দিক তুলে ধরেছেন। এ প্রসঙ্গে অনেক হাদীস বিবৃত হয়েছে। বুখারী, মুসলিম ও হাদীসের অন্যান্য ইমামগণ বিভিন্ন সহীহ সানাদে আব্দুল্লাহ ইবন মাস’উদ, আবু হুরায়রা ও ‘ইমরান ইবন হুসাইয়িন (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
خيرُ النَّاسِ قَرْنِي، وَفِي رِوَايَةٍ : خَيْرُ أُمَّتِي الْقَرْنُ الَّذِينَ بُعِثْتُ فِيهِم، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُوهُمْ
‘মানুষদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট মানুষ হচ্ছে, আমার যুগের মানুষেরা; সাহাবীগণ, কোনো কোনো বর্ণনা মতে আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ হচ্ছে, যাদের মধ্যে আমি প্রেরিত হয়েছি, এরপর তাদের পরবর্তী যুগের মানুষেরা; অর্থাৎ তাবি’ঈগণ, এরপর তাদের পরবর্তী যুগের লোকেরা; অর্থাৎ তাব’ই তাবি’ঈগণ’ (সহীহুল বুখারী, ৮/৯১, হা নং ৬৪২৯, সহীহ মুসলিম, বাবু ফাথলিস সাহাবাহ, ৭/১৮৫, হা নং ৬৬৩৫, এ হাদীসটি ‘আব্দুল্লাহ ইবনু মাস’উদ থেকে বর্ণিত)।
সুতরাং সাহাবীগণ হলেন উম্মাতের শ্রেষ্ঠ মানবগোষ্ঠী। তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা, শ্রদ্ধা নিবেদন করা এবং তাদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা পোষণ করা উম্মাতের অত্যাবশ্যক দায়িত্ব। তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে আল্লাহ তা’আলা, তাঁর প্রিয় রাসূল ও দ্বীনের অনুসরণের দাবী করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ তারা রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে সরাসরি দ্বীনের শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। ওহী নাজিলের সময় তারাই ছিলেন কুরআন ও সুন্নাহর প্রথম সরাসরি সম্বোধিত জনগোষ্ঠী। তাই তারাই দ্বীনের সঠিক জ্ঞান রাখেন। ইসলামের প্রতিটি কর্ম করনীয়, বর্জনীয় নির্বিশেষে তারা সঠিকভাবে পরিপালন করেছেন। সুতরাং তাদের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে, তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং দ্বীন পালন করা সম্ভব নয়, এবং সাহাবীগণের চেয়ে অধিক দ্বীন পরিপালনের দাবী কারোর জন্যই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের প্রতি বিদ্বেষ ভাব প্রকারান্তরে আল্লাহর রাসূল (সা) এবং দ্বীন ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষণের নামান্তর। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর রাসূলের (সা) বিরোধিতা এবং সাহাবায়ে কিরামগণের বিরোধিতার ব্যাপারে উম্মাতকে সতর্ক করেছেন এবং এর ভয়াবহ পরিণতি যে জাহান্নাম তা সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,
{وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا }
“যে ব্যক্তি তার নিকট হেদায়াত সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরে রাসূলের (সা) খেলাপ করবে এবং মুসলিমদের পন্থার বিপরীত পন্থার অনুসরণ করবে, আমরা তাকে তার পথেই যেতে দেই এবং তাকে আমরা জাহান্নামে প্রবেশ করাব আর জাহান্নাম কতই না নিকৃষ্ট স্থান।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত ৪: ১১৫]। এ আয়াতে বর্ণিত মুসলিমদের পথ ও পন্থা বলতে প্রথমতঃ সাহাবায়ে কিরাম এবং পরবর্তীতে কিয়ামাত পর্যন্ত যারা নিষ্ঠার সাথে সাহাবীগণকে অনুসরণ করেন তাদেরকে বুঝানো হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবীগণকে গাল-মন্দ করতে নিষেধ করেছেন। আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন
, لا تَسُبُّوا أَصْحَابِي فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَهُ
‘তোমরা আমার সাহাবীগণকে গালি দিওনা। কেননা তোমাদের কোনো ব্যক্তি যদি উহুদ পাহাড়ের সমতুল্য স্বর্নও দান করে তা তাদের এক মুদ কিংবা অর্ধেক মুদ (দানের মর্যাদার) সমপরিমাণও পৌঁছবে না’ (সহীহুল বুখারী ৫/৮, নং ৩৬৭৩, সহীহ মুসলিম ৪/১৯৬৭, নং ২৫৪১, বাবু তাহরীমি সাব্বিস সাহাবাহ আবু হুরাইরা (রা) থেকেও অনুরূপ বর্ণিত আছে, সহীহ মুসলিম ৪/১৯৬৭, নং ২৫৪০ )।
উল্লেখ্য যে, শী’য়া, রাফিযী ও খারিজী সম্প্রদায়ের লোকেরা রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীগণকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে থাকে, এমনকি তাদেরকে তারা গালি-গালাজও করে। কিন্তু আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’য়াত সাহাবায়ে কিরামের ফাযীলত মর্যাদা, যা কুরআন কারীম ও সহীহ সুন্নাতে প্রমাণিত, তা নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে এবং তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করাকে ঈমানের এবং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসার দাবী বলে বিশ্বাস করে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ইসলামের ইতিহাসে সাহাবায়ে কিরামগণের মধ্যে যে সব মতানৈক্য ও মতবিরোধ হয়েছে; এমনকি যার কতিপয় বিরোধের ফলে রক্তপাত ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধও সংঘটিত হয়েছে সেক্ষেত্রে মুসলিম জাতির বিশ্বাস ও ভূমিকা হলো যে, তারা মানুষ ছিলেন, মা’সূম বা নিষ্পাপ ছিলেন না। তাদের মধ্যে কতিপয় সম্মানিত সাহাবী; যাদের সংখ্যা ৩০ জনেরও কম ছিল (দেখুন ইবনু তাইমিয়াহ, মিনহাজুস সুন্নাহ ৬/২৩৬ )।
যদি ইজতিহাদী ভুলে পতিত হয়েও থাকেন, তাহলেও তারা আল্লাহ তা’আলার নিকট সওয়াবের হকদার। কেননা মুজতাহিদের ইজতিহাদ সঠিক হলে দুটি প্রতিদান, আর ভুল হলে একটি প্রতিদান (সহীহুল বুখারী ৯/১০৮, নং ৭৩৫২, সহীহ মুসলিম ৩/১৩৪২, নং ১৭১৬, বাবু ইযা হাকামাল হাকিম। আমর ইবনুল ‘আস (রা) থেকে বর্ণিত )।
অধিকন্তু তাদের হাজার হাজার ভাল ও সৎকর্মের তুলনায় তা ছিল খুবই নগণ্য। ভাল কাজের দরুন তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি দয়াময় আল্লাহ তা’আলা ক্ষমা করে দেবেন। তবে মুসলিম উম্মাহ মনে করে যে, মহান আল্লাহ যাদেরকে তাঁর প্রিয় নবীর সঙ্গী হিসেবে বাছাই করেছেন এবং সার্বক্ষণিক সহযোগী হিসেবে নির্বাচিত করেছেন, ইসলামের প্রতি তাদের ত্যাগ ও কুরবানীর প্রশংসা করেছেন, ইতিহাসের বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ণের প্রেক্ষিতে এ সকল মণিষীদের ত্রুটি-বিচ্যুতির বিচার করার জন্য নিজেদেরকে উপযুক্ত বিবেচনা করে না। এ রকম ধৃষ্টতা দেখাতে তারা আদৌ প্রস্তুত নয়। বরং আল্লাহ তা’আলা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশনা দিয়েছেন সেটা করাই তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে মনে করে।
মহান আল্লাহ সুবহানাহু বলেন,
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
“হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদেরকে এবং আমাদের পূর্বে যে সব ভাইয়েরা ঈমান নিয়ে গত হয়ে গিয়েছেন তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং মুমিনদের ব্যাপারে আমাদের অন্তরে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি হতে দেবেন না। নিশ্চয় আপনি দয়ালু ও করুণাশীল।” [সূরা আল হাশর, আয়াত: ১০]।
উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয় যে, সাহাবায়ে কিরাম (রা)দের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন, শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ভালোবাসার ক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি, অবহেলা, অবজ্ঞা এমনকি নিষ্প্রোয়জন মনে করা মূলতঃ আল্লাহর রাসূল (সা) এর প্রতি বৈরীভাব ও অবজ্ঞা প্রদর্শনেরই নামান্তর।
চতুর্থ অধ্যায় : রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টির উপায়
রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা সৃষ্টির অনেক উপায় আছে, যেগুলোর মাধ্যমে তার প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা, যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি হতে পারে। ফলে জীবনের সর্বক্ষেত্রে তার নিরঙ্কুশ আনুগত্য করা এবং তার যথাযথ পরিপূর্ণ অনুসরণের কর্তব্যবোধ মনের গভীরে সুদৃঢ় হবে। নিম্নে কতিপয় উল্লেখযোগ্য কতিপয় উপায়-উপকরণ তুলে ধরা হলো;
১- আল্লাহ তা’আলার প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং সর্বদা তাঁর স্মরণ ও প্রশংসা করতে তৃপ্তি বোধ করা। মহিমান্বিত আল্লাহ তা’আলার প্রকাশ্য, গোপন, স্পষ্ট ও অস্পষ্ট সকল প্রকারের নি’য়ামত ও অনুগ্রহের যথাযথ স্তুতি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তো শেষ করা যাবে না, বান্দার এমন অপারগতা ও দৈন্যতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে মহা অনুগ্রহকারী আল্লাহর চূড়ান্ত দাসত্ব ও তাঁর সামনে নিজের পরিপূর্ণ বিনয়ের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সর্বক্ষণ আল্লাহ সুবহানাহুর যিকির ও স্মরণের নির্দেশ আল-কুরআনের বহু স্থানে দেওয়া হয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেন,
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ
“তোমরা আমার স্মরণ করো আমি তোমাদেরকে স্মরণ করবো। আর তোমরা আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো এবং আমার অকৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করো না।” [সূরা আল বাকারা, আয়াত: ১৫২)। আল্লাহ তা’আলার অসংখ্য নি’য়ামতের অন্যতম হলো, তিনি মানব জাতির জন্য জীবন বিধান হিসাবে চির শ্বাশ্বত ইসলাম দান করেছেন, যা মানবতার ইহকালীন ও পরকালীন উভয় জগতের সফলতার একমাত্র সানাদ। তিনি আমাদেরকে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল দান করেছেন। আমাদেরকে মানবতার কল্যাণের জন্য শ্রেষ্ঠ উম্মাত হিসাবে নির্বাচণ করেছেন। আরো অসংখ্য নি’য়ামত তিনি দান করেছেন, যা গণনা করে শেষ করা যাবে না।
আল্লাহ সুবাহানাহু বলেন,
{وَمَا بِكُمْ مِنْ نِعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ }
“তোমাদের নিকট যে নি’য়ামতই আছে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে।” [সূরা আন নাহল, আয়াত: ৫৩)।
মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ বলেন,
{وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا إِنَّ اللَّهَ لَغَفُورٌ رَحِيمٌ}
“তোমরা যদি আল্লাহর নি’য়ামত গণনা করতে চাও তা গণনা করতে পাববেনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।” [সূরা আন নাহল, আয়াত: ১৮]। আল্লাহ তা’আলার বান্দাদের উচিৎ, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা সৃষ্টি হওয়া এবং সর্বক্ষণ ও সর্বাবস্থায় তার আনুগত্য, অনুসরণ ও অনুকরণের উপর অবিচল থাকার জন্য মহিমান্বিত দয়াময় আলাহ তা’আলার নিকট বেশি বেশি করে দু’আ করা। আল্লাহ তা’আলার বান্দাদের উচিত, নীরবে নির্জনে আল্লাহ সুবহানাহুর ‘ইবাদাতে মনোনিবেশ করা। বস্তুত: একমাত্র সত্য ইলাহ আল্লাহর ‘ইবাদাতের মধ্যেই প্রকৃত সুখ ও চূড়ান্ত শাস্তি নিহিত রয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, رَأَيْتُ الْخَلَوَةَ أَروحَ لِقَلْبِي ‘নিভৃত-নির্জনে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ । আমার হৃদয়ের সবচেয়ে বেশি প্রশান্তি’ (ইমাম আয-যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন দুবালা ১১/২২৬ )।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন,
مَا يَصْنَعُ أَعْدَائِي بِي؟ أَنَا جَنَّتِي وَبُسْتَانِي فِي صَدْرِي، إِنْ رُحْتُ فَهِيَ مَعِي لا تُفَارِقُنِي، إِنَّ حَبْسِي خِلْوَةٌ، وَقَتْلِي شَهَادَةٌ، وَإِخْرَاجِي مِنْ بَلَدِي سِيَاحَةٌ
‘আমার শত্রুরা আমার কি করতে পারবে? আমার জান্নাত ও বাগান (প্রশান্তির স্থান) তো আমার হৃদয়ের মধ্যেই আছে, আমি যেখানেই যাই না কেন তা আমার সাথেই আছে, আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না, (আলাহর সান্নিধ্যের জন্য) নির্জনতাই আমার কারাগার, আমাকে হত্যা করা আমার জন্য শাহাদাত, আর আমার দেশ থেকে আমাকে নির্বাসন দেওয়াই আমার আনন্দ ভ্রমণ’ (ইবন তাইমিয়্যাহ, শারহুল ‘আকীদাতিল আসফাহানিয়্যাহ, পৃ. ১৭, ইবনুল কায়্যেম, আলওয়াবিলুস সাইবি মিনাল কালিমিত তাইয়্যিবি, পৃ. ৪৮ )।
বস্তুত: আল্লাহ তা’আলার প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন হলো, আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে ধর্ণা না দেওয়া। বান্দাহ দয়াময় আল্লাহ ছাড়া আর কারো নিকট চাইবেনা, সাহায্য প্রার্থনা করবে না।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন
, إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللَّهَ، وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ
‘
তুমি যখন চাইবে আল্লাহর কাছেই শুধু চাইবে আর যখন সাহায্য কামনা করবে তখন কেবলমাত্র আল্লাহর নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করবে’ (সুনানুত তিরমিযী, ৪/৬৬৭, নং ২৫১৬, মুসনাদে আহমাদ ৪/৪১০, নং ২৬৬৯, হাদীসটি ইমাম ইবন ‘আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিরমিযী এ হাদীসকে হাসান সহীহ বলেছেন, আলবানী সহীহ বলেছেন )।
মহান আল্লাহ তাঁর মু’মিন বান্দাদের প্রশংসা করে বলেছেন,
وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ{ }حُبًّا لِلَّهِ
“আর যারা ঈমান পোষণ করেছে তাদের আল্লাহর জন্য প্রচণ্ড ভালোবাসা আছে।” [সূরা আল বাকারা, আয়াত: ১৬৫]।
আল্লাহ তা’আলার প্রতি ভালোবাসার নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে তাঁর কিতাব মনোযোগ সহকারে পাঠ করা, গভীরভাবে অধ্যায়ন করা, চিন্তা-গবেষণা করা, তাঁর আইন কানুন বিধি-বিধানের সামনে অবনত হয়ে যাওয়া, মেনে নেওয়া, তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য সম্মিলিতভাবে প্রানপণ চেষ্টা করা। এ ব্যাপারে মতানৈক্য না করা। সকল প্রকার ফারয, ওয়াজিব সুন্নাত, নাফল ও মুস্তাহাব যথাযথভাবে আদায় করা। এভাবে কোনো বান্দা যদি আল-কুরআনের বাস্তবায়ন করেন তিনি তখন আলাহর ওলী ও বন্ধু হয়ে যান। এ ধরনের আল্লাহর ওলী ও বন্ধুদের সাথে যারা দুশমনী করে আল্ল-াহও তাদের সাথে দুশমনী করেন।
এ কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল (সা) এর প্রতি ভালোবাসার বিষয়টি শুধু কথার কথা নয়, গান নয়, কবিতা আবৃত্তি নয়, কারো কাছে গল্প করার বস্তুও নয়। এমনকি তা কোনো দাবী করার বিষয়ও নয়। মহান আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার অপরিহার্য ও বাধ্যতামূলক বিষয় হলো আল্লাহ সুবহানাহু ও তাঁর রাসূল (সা) এর যথাযথ অনুসরণ করা। তার উপস্থাপিত হেদায়াত ও আদর্শের উপর চলা, তার দেওয়া জীবন পদ্ধতি নিজেদের বাস্তব জীবনে কার্যকরী করা। সর্বাবস্থায়
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) নিঃশর্ত পরিপূর্ণ আনুগত্য করা ও তার অনুসরণ করা। যারা আল্লাহ তা’আলার প্রতি ভালোবাসার দাবীদার তাদের রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণ বাধ্যতামূলক। আল্লাহ বলেন,
{قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ }
“আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস তাহলে আমার (রাসূলের (সা)) অনুসরণ করো। তবেই আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন আর আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল দয়ালু। আপনি বলুন, তোমরা আল্লাহর এবং রাসূলের (সা) আনুগত্য করো। তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে আল্লাহ অবশ্যই কাফিরদেরকে ভালোবাসেন না।” [সূরা আলে-‘ইমরান, আয়াত: ৩১-৩২]
২- রাসূলুল্লাহর (সা) কথা ও নির্দেশসমূহকে সকল কিছুর উপর প্রাধান্য দেওয়া, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার সৃষ্টির আরেকটি উপায় হচ্ছে, তার কথা ও নির্দেশকে সবার উপরে স্থান দেওয়া। তাঁর প্রতি হৃদয়-মনের ভালবাসা থেকে শুরু করে তার দর্শন, সাক্ষাত ও সাহচর্য লাভের আকাঙ্খা করা এবং তার উপস্থাপিত দ্বীন ও শরী’য়াতের সকল বিষয়কে আন্তরিকতা ও আগ্রহের সাথে কার্যকরী করা। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার মাত্রা কতটুকু হতে হবে তার বর্ণনা ইতোপূর্বে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রাসূলুল্লাহকে (সা) ধন-সম্পদ, সন্তানাদি, দুনিয়ার সমস্ত মানুষ এমনকি নিজের জীবনের চেয়েও অধিক ভালোবাসতে হবে (সহীহুল বুখারী, ৮/১২৯, হা.নং ৬৬৩২)।
রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহকে (সা) যদি চাক্ষুস দেখা সম্ভব হতো তাহলে তারা নিজেদের পরিবার ও সম্পদ ব্যয় করেও তাকে দেখাকে মনে প্রাণে চাইবে (এ সম্পর্কে দেখুন, সহীহ মুসলিম ৪/২১৭৮, হা.নং ২৮৩২)।
প্রকৃতপক্ষে মুসলিম উম্মাহ যদি কতিপয় বিষয়কে নিষ্ঠার সাথে বিবেচনা করে এবং গভীরভাবে স্মরণ করে তাহলে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি তাদের মনের প্রবল আগ্রহ ও অকৃত্রিম ভালোবাসার সৃষ্টি হবে এবং তার প্রতি গভীর সম্মানবোধ তৈরিতে অনুপ্রেরনা যোগাবে। বিষয়গুলো হলো:
ক. উম্মাতের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা) প্রচণ্ড মমত্ববোধ, ভালবাসা, তাদের কল্যাণ কামনা এবং উম্মাতের চিন্তায় যে অস্থিরতা দেখাতেন তা গভীরভাবে স্মরণ করা।
মহান আল্লাহ বলেন,
{لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ }
“তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য থেকে এমন একজন রাসূল আগমন করেছে, যার কাছে তোমাদের ক্ষতিকর বিষয় অতি কষ্টদায়ক মনে হয়, যে তোমাদের খুবই হিতাকাঙ্খী, মু’মিনদের প্রতি বড়ই স্নেহশীল, করুণাপরায়ণ।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১২৮]।
উম্মাতের কল্যাণের চিন্তায় তায়েফ বাসীদের অকথ্য নির্যাতনেও তিনি তাদের শান্তি কামনা করেননি বরং আশা করেছেন যে, তাদের মধ্যে কেউ এক আল্লাহ ‘ইবাদাত করবে।
‘আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
بَلْ أَرْجُو أَنْ يُخْرِجَ اللهُ مِنْ أَصْلَابِهِمْ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ وَحْدَهُ، لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا
‘বরং আমি আশা করি আল্লাহ তাদের বংশ থেকে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে এক আল্লাহর ‘ইবাদাত করবে এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না’ (সহীহুল বুখারী ৪/১১৫, নং ৩২৩১, সহীহ মুসলিম ৩/১৪২০, নং ১৭৯৫ )।
দ্বীনের স্বার্থে তিনি অকথ্য নির্যাতন ও নিপীড়নের মুখে তার অন্যান্য নবী-রাসূলগণের নির্যাতনের কথা স্মরণ করে ধৈর্য ধারণ করেছেন এবং তাদের ধৈর্যের প্রশংসা করেছেন।
আব্দুল্লাহ ইবনু মাস’উদ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
يَرْحَمُ اللَّهُ مُوسَى لَقَدْ أُوذِيَ بِأَكْثَرَ مِنْ هَذَا فَصَبَرَ
‘আল্লাহ মূসাকে দয়া করুন। তাকে এর চেয়েও অধিক কষ্ট দেওয়া হয়েছে। অতঃপর তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন’ (সহীহুল বুখারী ৮/৭৩, নং ৬৩৩৬, সহীহ মুসলিম ২/৭৩৯নং ১০৬২)।
তিনি অকথ্য নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েও তা মনে না করে মূসা (আ) এর কষ্টকে বড় করে দেখেছেন এবং প্রার্থনা করেছেন।
খ. রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা ও তার প্রতি সালাত ও সালাম পাঠ করলে দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় জগতে যে বিশাল প্রতিদান লাভ করা যায়, অনেক বড় মর্যাদার অধিকারী হওয়া যায় সে কথা স্মরণ করলেও তার প্রতি ভালোবাসার অনুপ্রেরণা লাভ করা যায়। ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল, তাদের ছাড়া অন্য সকল কিছুর চেয়ে অধিক প্রিয় হলে সে ঈমানের স্বাদ পাবে (সহীহুল বুখারী ১/১২ নং ১৬, সহীহ মুসলিম ১/৬৬, নং ৬৭)।
সালাত ও সালাম পাঠের ফাযীলাতের মর্যাদাও অনেক বড় তা ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে।
গ. বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত রাসূলুল্লাহর (সা) মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা দ্বীন ইসলাম ও শরী’য়াতকে প্রসস্থ, পূর্ণাঙ্গ, উদার ও সার্বজনীন করেছেন। যা সকল যুগের সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ বিষয়গুলো স্মরণ করার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানবোধ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। মহান আল্লাহ বলেন,
يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ }
‘তিনি মানুষকে সৎকাজের আদেশ দেন ও অন্যায় কাজ করতে নিষেধ করেন, আর তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ বৈধ করে দেন এবং অপবিত্র ও খারাপ বস্তুকে তাদের প্রতি অবৈধ ও হারাম করেন আর তাদের উপর চাপানো বোঝা ও বন্ধন হতে তাদেরকে মুক্ত করেন’ [সূরা আল আ’রাফ, আয়াত: ১৫৭]।
ঘ. রাসূলুল্লাহ (সা) সর্বক্ষেত্রে যা পছন্দ করেছেন তা পছন্দ করা আর যা অপছন্দ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা। তিনি যে বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত দেন তা স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাচ্ছন্দ্য মনে মেনে নেওয়া। তার সিদ্ধান্ত না মানার কোনো সুযোগই কোনো মু’মিন-মুসলিমের নেই।
মহান আল্লাহ বলেন,
{وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا }
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোনো মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীর সে বিষয়ে (ভিন্ন) কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।” [সূরা আল আহযাব, আয়াত: ৩৬)।
আল্লাহ সুবহানাহু আরো বলেন,
{فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا }
“কিন্তু না, আপনার রবের শপথ! তারা মু’মিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার উপর অর্পন না করে; অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়।” [সূরা আন্-নিসা, আয়াত: ৬৫]।
আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَكُونَ هَوَاهُ تَبَعًا لِمَا جِئْتُ بِهِ
‘তোমাদের কেহ মু’মিন হবে না যতক্ষণ না তার প্রবৃত্তিকে আমি যে বিধান নিয়ে এসেছি তার অনুগত করবে’ (আল বাগাভী, শারহুস সুন্নাহ ১/২১৩, জামি’উল ‘উলুম ওয়াল হিকাম ২/৩৯৩, ইমাম নববী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। কেউ কেউ ব’য়ীফ বললেও হাদীসের অর্থ সন্দেহাতীতভাবে সঠিক )।
৩- আল্লাহর নবীর সাহাবীগণের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব পোষণ করা, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টির উপায়সমূহের মধ্যে অন্যতম আরেকটি উপায় হলো, সকল সাহাবী রিদওয়ানুল্লাহি ‘আলাইহিমের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব পোষণ করা, তাদের মর্যাদা ও সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা করা। তাদের নিজেদের মধ্যে সংঘটিত বিরোধগুলো নিয়ে আলোচনা সমালোচনা না করা। বরঞ্চ আমরা তাদেরকেই প্রিয় মানুষ মনে করবো, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) কে যথার্থ ও গভীরভাবে ভালোবাসে। সাহাবীগণের প্রতি নিষ্ঠাপূর্ণ ভালোবাসা ও তাদের সাথে বন্ধুত্ব মুসলিমদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার নিকটবর্তী করে দেবে। আমাদের অন্তরে তাদের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেবে। যেমন কারো প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা) ভালোবাসা থাকলে তাকে মুসলিমরাও ভালোবাসে। একইভাবে কারো প্রতি তার বিদ্বেষভাব থাকলে তার সাথেও মুসলিমগণ বিদ্বেষভাব রাখে। এটাই প্রকৃত ঈমানের দাবী। রাসুলুল্লাহর (সা) প্রতি যার প্রকৃত ভালোবাসা আছে, তার মধ্যে অপরিহার্যভাবে এ নিদর্শন থাকতে হবে এবং এ নিদর্শনের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে হবে। রাসূলুল্লাহর (সা) বাস্তব জীবনে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ লক্ষ্য করা যায়। উম্মুল মু’মিনীন খাদিজা (রা) এর বোন হালাহ বিনত খুওয়াইলিদ রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট অনুমতি প্রার্থনা করেন। তিনি তার আওয়াজ শুনে প্রিয় স্ত্রী খাদিজার আওয়াজের কথা মনে করে তার বিয়োগে বিষন্ন হয়ে পড়েন। এ ঘটনার বিবরণ দিয়ে উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়েশা (রা) বলেন,
اسْتَأْذَنَتْ هَالَةُ بِنْتُ حُوَيْلِدٍ، أَحْتُ خَدِيجَةَ، عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَعَرَفَ اسْتِنْذَانَ خَدِيجَةَ فَارْنَاعَ لِذَلِكَ، فَقَالَ: اللَّهُمَّ هَالَةَ. قَالَتْ: فَغِرْتُ، فَقُلْتُ: مَا تَذْكُرُ مِنْ عَجُورٍ مِنْ عَجَائِزِ قُرَيْشٍ، حَمْرَاءِ الشَّدْقَيْنِ، هَلَكَتْ فِي الدَّهْرِ، قَدْ أَبْدَلَكَ اللَّهُ خَيْرًا مِنْهَا
খাদিজার বোন হালাহ বিনত খুওয়াইলিদ রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট অনুমতি চাইলেন। তিনি তখন খাদিজার অনুমতি প্রার্থনার কথা স্মরণ করেন এবং এ কারণে বিষন্ন হয়ে পড়েন। অতঃপর বলেন, ‘হে আল্লাহ! এ তো হালাহ’। ‘আয়েশা বলেন, আমি তখন ঈর্ষান্বিত হই এবং বলি, কুরাইশের বৃদ্ধা মহিলাদের দাঁত পড়া একজন রমনী, যিনি যুগের গহ্বরে বিলীন হয়ে গিয়েছেন, আপনি তাকে স্মরণ করছেন? অথচ আল্লাহ তার চেয়ে আপনাকে আরো উত্তম দান করেছেন (সহীহুল বুখারী ৫/৩৯, নং ৩৮২১, সহীহ মুসলিম ৪/১৮৮৯, নং ২৪৩৭)।
সহীহ হাদীস থেকে জানা যায় যে, উম্মুল মু’মিনীন খাদিজা (রা) এর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ কোনো ছাগল যবাই হলে রাসূলুল্লাহ (সা) সে গোশত খাদিজার বান্ধবীদের নিকট পাঠাতে নির্দেশ দিতেন।
আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
ما غَرْتُ عَلَى أَحَدٍ مِنْ نِسَاءِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مَا غِرْتُ عَلَى خَدِيجَةَ، وَمَا رَأَيْتُهَا، وَلَكِنْ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُكْثِرُ ذِكْرَهَا، وَرُبَّما ذَبَحَ الشَّاةَ ثُمَّ يُقَطِعُهَا أَعْضَاءُ، ثُمَّ يَبْعَثُهَا فِي صَدَائِقِ خَدِيجَةَ، فَرُبَّمَا قُلْتُ لَهُ: كَأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ فِي الدُّنْيَا امْرَأَةً إِلَّا خَدِيجَةُ، فَيَقُولُ: إِنَّهَا
كَانَتْ وَكَانَتْ، وَكَانَ لِي مِنْهَا وَلَدٌ
নবী (সা) এর স্ত্রীদের মধ্যে আমি খাদিজার প্রতি যত ঈর্ষা করেছি আর কারো প্রতি এত ঈর্ষা করিনি। অথচ আমি তাকে দেখিনি। নবী (সা) তাকে নিয়ে অনেক আলোচনা করতেন। আর অনেক সময় ছাগল জবাই করে সেটিকে টুকরা টুকরা করে খাদিজার বান্ধবীদের বাড়ীতে পাঠাতেন। আমি কোনো কোনো সময় তাকে বলেছি, মনে হয় যেন দুনিয়াতে খাদিজা ছাড়া আর কোনো মেয়েলোক নেই। তিনি তখন বলতেন, সে এমন এমন ছিল এবং তার থেকেই আমার সন্তানরা জন্ম লাভ করেছে’ (সহীহুল বুখারী ৫/৩৮, নং ৩৮১৮)।
সহীহ মুসলিমেও শব্দের পার্থক্য সহকারে বর্ণিত হয়েছে, সে বর্ণনায় আছে, إنِّي قَدْ رُزِقْتُ حُبَّهَا ‘আমাকে তার প্রতি ভালোবাসা দান করা হয়েছে’ (, সহীহ মুসলিম ৪/১৮৮৮, নং ২৪৩৫)।
স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) তার সাহাবীদের গুণাগুণ বর্ণনা করেছেন। তাদের মর্যাদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। সে মর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। তাই কেউ তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করতে পারে, তাদেরকে তিরস্কার করতে পারে, তাদেরকে অমর্যাদা করতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি সাধারণ সকল সাহাবীর ব্যাপারে মুসলিম জাতিকে সাবধান করেছেন। আবু সা’ঈদ আল খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘তোমরা আমার সাহাবীদেরকে গালি দিও না। তোমাদের কেহ যদি উহুদ পাহাড়ের মতো স্বর্ণও ব্যয় করে, তবুও তা তাদের কারো এক মুদ পরিমাণ, এমনকি তার অর্ধেকও পৌছাতে পারবে না’ (সহীহুল বুখারী ৫/৮, হা.নং ৩৬৭৩, সহীহ মুসলিম ৪/১৯৬৭ (শব্দের পার্থক্য সহ), হা.নং ২৫৪১)।
রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনার আনসার সাহাবীদের ব্যাপারে বিশেষ ভাবে নির্দেশনা দান করেছেন। আনাস (রা) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসের শেষাংশে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
أُوصِيكُمْ بِالأَنْصَارِ، فَإِنَّهُمْ كَرِشِي وَعَيْبَتِي، وَقَدْ قَضَوُا الَّذِي عَلَيْهِمْ، وَبَقِيَ الَّذِي لَهُمْ، فَاقْبَلُوا مِنْ مُحْسِنِهِمْ، وَتَحَاوَرُوا عَنْ مُسِيئِهِمْ.
আমি তোমাদেরকে আনসারদের ব্যাপারে ওসিয়্যাত করছি; কেননা তারা হলো আমার গোপনীয়তা ও আমানতের আশ্রয়স্থল। তারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে আর তাদের পাওনা অবশিষ্ট রয়েছে। তাদের ভাল লোকদেরকে গ্রহণ করো আর কটুক্তিকারীদের ক্ষমা করে দাও’ (সহীহুল বুখারী৫/৩৫, হা. নং ৩৭৯৯, সহীহ মুসলিম ৪/১৯৪৯, (শব্দের পার্থক্য সহ) হা.নং ২৫১০)।
রাসূলুল্লাহ (সা) আনসারদের প্রতি ভালোবাসাকে ঈমানের নিদর্শন এবং তাদের প্রতি বিদ্বেষভাবকে মুনাফিকের ‘আলামত হিসাবে ঘোষণা করেছেন। আল-বারা (রা) বলেন যে, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি যে,
الأَنْصَارُ لا يُحِبُّهُمْ إِلَّا مُؤْمِنٌ، وَلا يُبْغِضُهُمْ إِلَّا مُنَافِقٌ، فَمَنْ أَحَبَّهُمْ أَحَبَّهُ اللَّهُ، وَمَنْ أَبْغَضَهُمْ أَبْغَضَهُ اللَّهُ
আনসারগণ, মু’মিন ব্যক্তিই কেবল তাদেরকে ভালোবাসে। আর মুনাফিক ব্যক্তিই শুধু তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। সুতরাং যে তাদেরকে ভালোবাসে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন এবং যে তাদেরকে অপছন্দ করে আল্লাহ তাকে অপছন্দ করেন’ (সহীহুল বুখারী, ৫/৩২, হা. নং ৩৭৮৩, সহীহ মুসলিম ১/৮৫, হা. নং ৭৫)।
মুহাজির সাহাবীদের বৈশিষ্ট বর্ণনা করে মহান আল্লাহ বলেন,
لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا وَيَنْصُرُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ }
(এ সম্পদ) অভাবগ্রস্থ মুহাজিরদের জন্য, যারা নিজেদের ঘরবাড়ী ও সম্পত্তি হতে উৎখাত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) সাহায্য করে। তারাই তো সত্যবাদী’, [আল হাশর- ৫৯: ৮]।
আল কুরআনুল কারীমে মুহাজির ও আনসার উভয়ের মর্যাদা ও গুণাগুণ একত্রে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ}
“আর যে সব মুহাজির ও আনসার অগ্রবর্তী এবং প্রথম, আর যেসব লোক নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর আল্লাহ তাদের জন্য এমন জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার তলদেশে নদীসমূহ বইতে থাকবে, যার মধ্যে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে, তা হচ্ছে বিরাট কৃতকার্য।” [সূরা আত তাওবাহ, আয়াত: ১০০]।
এমন অনেক বিষয় আছে, যেগুলোকে মনে করে সম্মানিত সাহাবীগণ (রা) কে অকৃত্রিম ও একনিষ্ঠভাবে ভালোবাসতে হবে সেগুলোর অন্যতম হলো,
ক. রাসূলুল্লাহ (সা) স্বয়ং তাদেরকে ভালোবেসেছেন, স্নেহ করেছেন এবং সম্মিলিতভাবে ও পৃথক পৃথকভাবে তাদের প্রশংসা করেছেন, তাদের মর্যাদার কথা বলেছেন।
খ. তারা সৃষ্টির সেরা বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত সর্বশেষ রাসূলুল্লাহকে (সা) ঈমানের সাথে দেখেছেন, তার সাহচর্য লাভ করেছেন। সুখে দুঃখে তার সাথে থেকেছেন। আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে তার নবী (সা) এর সাহাবী হওয়ার জন্য নির্বাচন করেছেন।
গ. ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে তারাই ছিলেন অগ্রগামী, এ কারণে তারা অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন। বর্ণাতীত ধৈর্য ধারণ করেছেন এবং এর মধ্য দিয়েই আল্লাহ তা’আলা তাদের দুঃখ, কষ্ট দূর করে দিয়েছেন। তাদেরকে প্রভাব-প্রতিপত্তি দান করেছেন।
ঘ. তারা আল্লাহ তা’আলা, তাঁর দ্বীন এবং তাঁর রাসূল (সা) এর উদ্দেশ্যে নিজেদের জান- মাল, সম্পদ ও সন্তানাদি উৎসর্গ করেছেন। আল্লাহর রাসূল ও তার আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে যা যা প্রয়োজন, তারা সব কিছু দিয়ে সাহায্য করেছেন, ভূমিকা পালন করেছেন।
ঙ. তারা এক মন, এক দেহে শীষা ঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর দ্বীনের প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠা করেছেন। মানুষকে দ্বীন শিক্ষা দিয়েছেন। আল-কুরআন ও দ্বীনের শিক্ষা ও প্রচারের জন্য সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছেন।
চ. সাহাবায়ে কিরামই রাসূলুল্লাহর (সা) পরে দ্বীনের বিষয়ে সবচেয়ে অধিক জ্ঞানী। তারা যেসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন তার বিপরীত অবস্থান নেওয়ার কোনো সুযোগ মুসলিম জাতির জন্য অবশিষ্ট নেই।
৪- আহল বাইত তথা রাসূলল্লাহর পরিবার ও বংশের মানুষদেরকে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সর্বাধিক সম্মান দেওয়া, রাসূলুল্লাহর (সা) পরিবার ও বংশধরের মধ্যে যারা সৎ ও নেককার তাদেরকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা করা ও সম্মান করা অত্যাবশ্যক। শারী’য়াতের দাবী অনুসারেই তাদেরকে ভালোবাসতে হবে, সম্মান দিতে হবে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى }
“আপনি বলুন, আমি এর বিনিময়ে তোমাদের নিকট হতে আত্মীয়তার সৌহার্দ ব্যতিত অন্য কোনো প্রতিদান চাই না।” (সূরা আশ-শুরা, আয়াত: ২৩]।
উল্লেখ্য যে, এ আয়াতের স্পষ্ট বর্ণনা অনুযায়ী কারো মনে হতে পারে যে, রাসূলুল্লাহর (সা) রিসালাতের দায়িত্ব পালনের প্রতিদান স্বরূপ তার আত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রকাশ করা কর্তব্য। এটা মনে করার সুযোগ নেই। কারণ এখানে উল্লেখিত ‘১’ (ইল্লা, অর্থ: তবে, ব্যতিত) অক্ষরটির পরের বিষয়টিকে ১! (ইল্লা) এর আগের বিষয়বস্তু থেকে বিছিন্ন করা হয়েছে, অর্থাৎ আগের বিষয়টির সাথে পরের বিষয়টির সম্পর্ক নেই। এটাকে ‘আরবী ব্যকরণ রীতি অনুযায়ী استثناء منقطع বলা হয়। আয়াতের মর্মার্থ হলো (আল্লাহ তা’আলা অধিক অবগত) আমি তোমাদেরকে আত্মীয়ের প্রতি ভালোবাসার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি এবং তোমাদের সাথে আমার সম্পর্কের বিষয়ও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি (তাফসীরুল বাগাজী ৭/১৯২, দারু তাইয়্যেবাহ)।
অর্থাৎ আমি রিসালাতের দা’ওয়াত পৌঁছানোর জন্য তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক বা বিনিময় চাই না। তবে তোমাদের ও আমাদের মাঝে আত্মীয়তার যে বন্ধন আছে তোমরা কুরাইশরা অন্তত সে দিকে লক্ষ্য রাখবে এতটুকু আমি অবশ্যই চাই। তোমরা আমার দা’ওয়াত গ্রহণ করবে, আমাকে সাহায্য করবে এবং আত্মীয় হিসেবে অন্ততঃ শত্রুতা করবে না। তোমরা আত্মীয়তার অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখ। মানা না মানা তোমাদের ইচ্ছ। আমি অন্ততঃ তোমাদের কাছে আত্মীয় হিসেবে এতটুকু প্রত্যাশা করি (তাফসীরুত তাবারী ২১/৫২৫, তাফসীর ইবন কাসীর ৭/১৯৯, শাইখ আস-সা’দী, তাইসীরুল কারীম, পৃ. ৭৫৭)।
যায়দ ইবন আরকাম (রা) বর্ণনা করেন,
قَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمًا فِينَا خَطِيبًا، بِمَاءٍ يُدْعَى حَمَّا بَيْنَ مَكَّةَ وَالْمَدِينَةِ فَحَمِدَ اللهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ، وَوَعَظَ وَذَكَّرَ، ثُمَّ قَالَ: أَمَّا بَعْدُ، أَلَا أَيُّهَا النَّاسُ فَإِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ يُوشِكُ أَنْ يَأْتِيَ رَسُولُ رَبِّي فَأُجِيبَ، وَأَنَا تَارِكٌ فِيكُمْ ثَقَلَيْنِ: أَوَّهُمَا كِتَابُ اللهِ فِيهِ الْهُدَى وَالنُّورُ فَخُذُوا بِكِتَابِ
اللهِ، وَاسْتَمْسِكُوا بِهِ، فَحَثَّ عَلَى كِتَابِ اللهِ وَرَغَبَ فِيهِ، ثُمَّ قَالَ: وَأَهْلُ بَيْتِي أذكركُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، أُذكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْنِي. فَقَالَ لَهُ حُصَيْنٌ: وَمَنْ أَهْلُ بَيْتِهِ؟ يَا زَيْدُ أَلَيْسَ نِسَاؤُهُ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ؟ قَالَ: نِسَاؤُهُ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ، وَلَكِنْ أَهْلُ بَيْتِهِ مَنْ حُرِمَ
الصَّدَقَةَ بَعْدَهُ، قَالَ: وَمَنْ هُمْ؟ قَالَ: هُمْ آلْ عَلِيٌّ وَآلُ عَقِيلٍ، وَآلُ جَعْفَرٍ، وَآلُ عَبَّاسٍ، قَالَ: كُلُّ هَؤُلَاءِ حُرِمَ الصَّدَقَةَ؟ قَالَ: نَعَمْ
একদা রাসূলুল্লাহ (সা) মাক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থানে ‘ঘুম’ নামক জলাশয়ের পাশে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিলেন, আল্লাহর প্রশংসা করেন তাঁর স্তুতি বর্ণনা করেন এবং নাসীহত করেন ও স্মরণ করিয়ে দেন। তারপর বলেন, অতঃপর, হে মানব সকল! মনোযোগ দিয়ে কোনো! প্রকৃত পক্ষে আমি একজন মানুষ, যে কোনো সময় আমার নিকট আমার রাবের দূত (মালাকাল মাউত) এসে যেতে পারে, আমি তখন সাড়া দেব। আমি তোমাদের মাঝে দু’টি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি, প্রথমটি হলো আল্লাহর কিতাব, তাতে হেদায়াত ও আলো রয়েছে। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কিতাবকে গ্রহণ করবে এবং একে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরবে’। তারপর তিনি আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে উৎসাহ দিলেন ও অনুপ্রানিত করেন। তারপর বলেন ‘আর আমার পরিবার-পরিজন। তোমাদেরকে আমার আহল বাইতের ব্যাপারে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি! তোমাদেরকে আমার আহল বাইতের ব্যাপারে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি! তোমাদেরকে আমার আহল বাইতের ব্যাপারে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি’। তখন হুসাইন حُصَيْن তাকে (যায়দকে) জিজ্ঞাসা করেন, হে যায়দ! আহল বাইত কারা? তার স্ত্রীগণ কি আহল বাইতের মধ্যে নয়? তিনি বলেন, তার স্ত্রীগণ আহল বাইতের অন্তর্ভুক্ত। তবে তারা হলো আহল বাইত, তার মৃত্যুর পরে যাদের উপর সাদাকাহ খাওয়া হারাম। তিনি বললেন, তারা কারা? তিনি বলেন, তারা হলো ‘আলীর বংশধর, ‘আকীলের বংশধর, জা’ফরের বংশধর এবং ‘আব্বাসের বংশধর। তিনি বলেন, তাদের প্রত্যেকের উপর সাদাকাহ হারাম? তিনি উত্তর দেন, হ্যাঁ(সহীহ মুসলিম ৪/১৮৭৩, নং ২৪০৮)
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আল- কুরআনের পরই আহল বাইতের কথা বলার অর্থ, আহল বাইতকে রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহর উপর অগ্রাধিকার ও প্রাধান্য দেওয়া নয়। আল-কুরআনের পরই ‘আস-সুন্নাহ’কে আঁকড়ে ধরার কথা অন্যান্য হাদীসে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে। তাই আল-কুরআনের পরই সুন্নাহ ও হাদীসের স্থান। আহল বাইত আস-সুন্নাহর উপর অগ্রাধিকারযোগ্য নয়। আস-সুন্নাহর স্থান যে আহল বাইতের উপর, এর বাস্তব ‘আমল খলীফাতুর রাসূল আবু বকর (রা) এর সময়ে তার ভূমিকার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহকে প্রাধান্য দিয়ে ফাতিমাহ বিনত রাসূলুল্লাহকে (সা) তার দাবী গ্রহণ না করে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ‘উরওয়াহ ইবনুয যুবাইরকে উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়েশা (রা) অবহিত করেছেন যে,
أَنَّ فَاطِمَةَ ابْنَةَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، سَأَلَتْ أَبَا بَكْرِ الصِّدِّيقَ بَعْدَ وَفَاةِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنْ يَقْسِمَ لَهَا مِيرَاثَهَا، مِمَّا تَرَكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِمَّا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَيْهِ. فَقَالَ لَهَا أَبُو بَكْرٍ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَا نُورِثُ، مَا
تَرَكْنَا صَدَقَةٌ، فَغَضِبَتْ فَاطِمَةُ بِنْتُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَهَجَرَتْ أَبَا بَكْرٍ، فَلَمْ تَزَلُّ مُهَاجِرَتَهُ حَتَّى تُوُفِّيَتْ، وَعَاشَتْ بَعْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سِتَّةَ أَشْهُرٍ
ফাতিমা বিনত রাসূলুল্লাহকে (সা) তার মৃত্যুর পর আবু বকর সিদ্দীকের নিকট এসে আল্লাহ রাসূলুল্লাহকে (সা) যা দান করেছেন, তার সেই পরিত্যক্ত সম্পদ ওয়ারিশ হিসাবে বন্টন করে দেওয়ার দাবী করেন। তখন আবু বকর তাকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আমরা (সম্পদের) উত্তরাধিকার রেখে যাই না, আমরা যা কিছু ছেড়ে যাই তা সাদাকাহ’। তখন ফাতিমা বিনত রাসূলুল্লাহ (সা) ক্ষুব্ধ হন এবং আবু বকরের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। এ অবস্থার মধ্য দিয়েই তিনি (ফাতিমা) মৃত্যু বরণ করেন। রাসূলুল্লাহর (সা) পরে তিনি ছয় মাস জীবিত ছিলেন(সহীহুল বুখারী ৪/৭৯, নং ৩০৯২, ৩০৯৩)।
আহল বাইতের গুরুত্ব সম্পকে ইবন ‘উমার আবু বকর (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
ارْقُبُوا مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي أَهْلِ بَيْتِهِ
‘তোমরা আহল বাইতের মাধ্যমে মুহাম্মাদ সালালাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল-ামের হিফাযত করো’ (সহীহুল বুখারী ৫/২১, নং ৩৭১৩)।
সুতরাং আহল বাইতকে গালি দেওয়া, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা এবং হেয় প্রতিপন্ন করা রাসূলুল্লাহকে (সা) কষ্ট দেওয়ার শামিল। সেক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে স্মরণ রাখা উচিৎ;
ক. পৃথিবীর অন্যান্য বংশের চেয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) বংশ পৃথক বৈশিষ্ট বহন করে। তাদের এ বংশ মর্যাদা চিরকাল অক্ষুন্ন থাকবে।
খ. এ বংশের লোকেরাও ভাল মন্দের দিক থেকে অন্যান্য সাধারণ মুসলিমদের মতোই। তাদের বংশের মধ্যে যেমন ভাল মানুষ আছে, একইভাবে তাদের অন্য ধরনের মানুষও আছে। তারা সহ অন্যান্য সকল মানুষই রাসূলুল্লাহর (সা) এ পবিত্র বাণীর আওতাভূক্ত। আবু হুরায়রা (রা) বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসের শেষাংশে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
وَمَنْ بَطَأَ بِهِ عَمَلُهُ، لَمْ يُسْرِعْ بِهِ نَسَبُهُ
যার ‘আমল তাকে পেছনে ফেল অগ্রগামী হতে পারবে না’ (৪০০, সহীহ মুসলিম ৪/২০৭৪, নং ২৬৯৯)। দেয়, তার বংশ মর্যাদা তাকে নিয়ে
গ. রাসূলুল্লাহর (সা) পরিবারের জন্য সর্বদা দু’আ করা এবং সালাত ও সালাম পাঠ করা। যেমনটি আমরা বলি, ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদ, ওয়া ‘আলা আলিহী ওয়া সাল্লিম’।
ঘ. আহল বাইতের লোকদেরকে সাহায্য করা, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ত্যাগ স্বীকার করা, তাদের জীবন চরিত, গুণাগুণ ও ভাল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা।
ঙ. রাসূলুল্লাহর (সা) বংশের কোনো অসৎ লোকের জন্য দু’আ করা, তাকে উপর্যুপরী উপদেশ দিতে থাকা। তাদের প্রতি সদয় ও করুণাশীল হওয়া। প্রতিনিয়ত তাদের পুত-পবিত্র আহল বাইতের পথ এবং শরী’য়াতে মুহাম্মাদীর উপর চলার জন্য আহ্বান জানানো।
প্রকৃতপক্ষে সাহাবীগণ (রা) আহল বাইতের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তাদের প্রতি অগাধ ভালোবাসা পোষণ করতেন।
কেননা তারা রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট থেকে এ ব্যাপারে আদিষ্ট ছিলেন। আমীরুল মু’মিনীন ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) দূর্ভিক্ষের বছরে ‘আব্বাস ইবনুল মোত্তালিবকে লোকদের নিয়ে বৃষ্টির জন্য দু’আ করতে অনুরোধ করেছিলেন। তিনি দু’আ করলে তারা বৃষ্টি পেয়েছিলেন। এ দু’আর সময় ‘উমার (রা) বলতেন,
اللَّهُمَّ إِنَّا كُنَّا نَتَوَسَّلُ إِلَيْكَ بِنَبِيِّنَا فَتَسْقِينَا، وَإِنَّا نَتَوَسَّلُ إِلَيْكَ بِعَمِّ نَبِيِّنَا فَاسْقِنَا، قَالَ: فَيُسْقَوْنَ
‘হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট আমাদের নবীর (দু’আর) মাধ্যমে বৃষ্টি চাইতাম, আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করতেন। এখন আমরা আমাদের নবীর চাচার (‘আব্বাসের দু’আর) মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করছি, আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করুন। তিনি (আনাস) বলেন, তখন বৃষ্টি বর্ষণ হতো’ (সহীহুল বুখারী ২/২৭, নং ১০১০)।
এ হাদীসের মাধ্যমে একদিকে ‘উমার (রা) এর রাসূলুল্লাহর (সা) বংশধর ‘আব্বাস (রা) এর প্রতি বিনয়ভাব প্রমাণ করে, অপরদিকে জীবিত সৎমানুষের দু’আর উসীলা করে আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা করাকেও প্রমাণ করে। সাহাবী (রা) এর আহল বাইতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আরেকটি উদাহরণ সম্পর্কিত একটি আসার শা’আবী থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
صَلَّى زَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ عَلَى جِنَازَةٍ ثُمَّ قُرِّبَتْ لَهُ بَغْلَةٌ لِيَرْكَبَهَا، فَجَاءَ ابْنُ عَبَّاسٍ فَأَخَذَ بِرِكَابِهِ، فَقَالَ لَهُ زَيْدٌ: خَلِ عَنْهُ يَا ابْنَ عَمِّ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ! فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: هَكَذَا يُفْعَلُ بِالْعُلَمَاءِ وَالْكُبَرَاءِ. وَزَادَ بَعْضُهُمْ فِي هَذَا الْحَدِيثِ: إِنَّ زَيْدَ بْنَ ثَابِتٍ كَافَأَ ابْنَ عَبَّاسٍ عَلَى أَخَذِهِ
بِرِكَابِهِ أَنْ قَبَّلَ يَدَهُ، وَقَالَ: هَكَذَا أُمِرْنَا أَنْ نَفْعَلَ بِأَهْلِ بَيْتِ نَبِيِّنَا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
যায়দ ইবন সাবিত একটি জানাযাহ শেষ করার পর তার খচ্চরটি আনা হলো। তিনি যখন তাতে আরোহণ করবেন তখন ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস পাদানী ধরলেন। তখন যায়দ বললেন, হে রাসূলুল্লাহর (সা) চাচার ছেলে! আপনি এটা ছেড়ে দেন। ইবন ‘আব্বাস তখন বলেন, ‘আলিম ও বড়দের সাথে এ রকমই করতে হয়।
কেউ কেউ এ হাদীসে আরো অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, যায়দ ইবন সাবিত ইবন ‘আব্বাসের পাদানী ধরার প্রতিদান স্বরূপ তার হাতে চুম্বন দেন এবং বলেন, আমাদের রাসূলুল্লাহর (সা) পরিবার-পরিজনের সাথে এ রকম করার নিদের্শই আমাদেরকে দেওয়া হয়েছো (জামি’ বায়ানিল ‘ইলম ওয়া ফাদলিহী, ইবন ‘আন্দিল বার, সম্পাদনা, আবুল আশবাল, সৌদী আরব, দার ইবনুল জাওযী, ১ম সংস্করণ, ১৯৯৪ঈ, ১/৫১৪)।
একবার ‘আব্দুল্লাহ ইবনুল হাসান ইবনুল হুসাইন ইবন ‘আলী ইবন আবী তালিব রাদি আল্লাহু আনহুম কোনো এক প্রয়োজনে ‘উমার ইবন ‘আব্দিল ‘আযীযের নিকট প্রবেশ করেন। তখন ‘উমার বলেন,
إِذَا كَانَتْ لَكَ حَاجَةٌ فَأَرْسِلْ إِلَيَّ أَوِ اكْتُبْ، فَإِنِّي أَسْتَحِي مِنَ اللَّهِ أَنْ يَرَاكَ عَلَى بَابِي
আপনার যখন কোনো প্রয়োজন হবে, তখন আমার কাছে কাউকে পাঠাবেন অথবা লিখবেন; কেননা আল্লাহর কাছে লজ্জাবোধ করি যে, তিনি আপনাকে আমার দরোজায় দেখবেন’ (আশ-শিফা বিতা’ রীফি হুকুকিল মোস্তফা, কাযী ‘ইয়ায ২/৬০৮ )।
৫- হাদীস, সুন্নাহ, এবং ওহীর প্রমাণাদিকে কথা, কাজ ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে সম্মান জানানো ও প্রাধান্য দেওয়া। এ ক্ষেত্রেও সাহাবীগণ উম্মাতের জন্য উত্তম দৃষ্টান্ত। ‘আব্দুলাহ ইবন মাস’উদ (রা) বলেন,
الاقتصاد في السُّنَّةِ خَيْرٌ مِنَ الاجْتِهَادِ فِي الْبِدْعَةِ
সুন্নাহ ভিত্তিক ‘আমল কম হলেও তা বিদ’আত ভিত্তিক অনেক ‘আমলের চেয়ে উত্তম’ ( ইবনুল জাওযী, তালবীসু ইবলীস, পৃ. ১০)।
আবু ‘উসমান আল- হীরী বলেন,
مَنْ أَمَّرَ السُّنَّةَ عَلَى نَفْسِهِ قَوْلًا وَفِعْلًا نَطَقَ بِالْحِكْمَةِ وَمَنْ أَمَّرَ الْهَوَى عَلَى نَفْسِهِ نَطَقَ بِالْبِدْعَةِ
যে ব্যক্তি কথা ও কাজের ক্ষেত্রে নিজের উপর সুন্নাহকে নিয়ন্ত্রক বানায় সে প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বলে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নিজের উপর প্রবৃত্তিকে পরিচালক বানায়, সে বিদ’আতী কথা বলে’ (হিলয়াতুল আওলিয়া ১০/২৪৪)।
ইবনুল কাসিম বলেন,
قِيلَ لِمَالِكٍ : لِمَ لَمْ تَأْخُذْ عَنْ عَمْرِو بنِ دِينَارٍ؟ قَالَ: أَتَيْتُهُ، فَوَجَدتُهُ يَأْخَذُوْنَ عَنْهُ قِيَاماً، فَأَجْلَلْتُ حَدِيثَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ اخُذَهُ قَائِماً
ইমাম মালিককে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি ‘আমর ইবন দীনারের নিকট থেকে কেন হাদীস গ্রহণ করেন না? তিনি তখন বলেন, আমি তার নিকট এসে দেখলাম, লোকেরা দাঁড়ানো অবস্থায় তার নিকট থেকে হাদীস গ্রহণ
করছে। তখন আমি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসকে তার নিকট দাঁড়ানো অবস্থায় তা নেওয়ার চেয়ে অনেক উর্ধে মনে করেছি’ ( সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৭/১৬২)।
আবু মুহাম্মাদ সাহল ইবন ‘আব্দিল্লাহ বলেন,
أُصُولُنَا سِتَّةُ أَشْيَاءَ : التَّمَسُّكُ بِكِتَابِ اللَّهِ تَعَالَى وَالِاقْتِدَاءُ بِسُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَكْلُ الْحَلَالِ وَكَفُّ الْأَذَى وَاجْتِنَابُ الْآثَامِ وَالتَّوْبَةُ وَأَدَاءُ الْحُقوقِ
আমাদের ৬টি মূলনীতি আছে; আল্লাহ তা’আলার কিতাবকে আঁকড়ে ধরা, রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহর অনুকরণ করা, হালাল খাওয়া, কষ্টদায়ক বস্তুকে সরিয়ে দেওয়া, পাপ থেকে দূরে থাকা, তাওবাহ করা এবং সকল প্রকারের হক আদায় করা (হিলয়াতুল আওলিয়া ১০/১৯৮, শাষারাতুয যাহাব ৩/৩৪৩)।
সুন্নাহ, হাদীস ও আসারের প্রতি মুহাব্বত পয়দা হওয়ার সহায়ক হলো কতিপয় বিষয়কে গভীরভাবে অনুভব করা এবং সদা সর্বদা সেগুলো স্মরণ করা;
ক. আস-সুন্নাহ মুসলিমদেরকে সুন্নাহ অনুযায়ী ‘আমল করার আহ্বান জানায়। ‘আমল ও কর্ম হলো প্রকৃত ভালোবাসার অধীনস্থ বিষয়। আল্লাহ তা’আলা এ নির্দেশ দিয়েই বলেছেন,
{قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ }
আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস তাহলে আমার অনুসরণ করো, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন’, [সূরা আলে-‘ইমরান, আয়াত: ৩১)।
খ. আস-সুন্নাহ হলো, অপরিহার্য শরী’য়াত, যা ছাড়া দ্বীন মান্য করার দাবী আদৌ করা যেতে পারে না। ‘ইরবায ইবন সারিয়া (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي، وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، عَضُوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ
অতঃপর তোমরা আমার সুন্নাত ও আমার পরে হেদায়াত প্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদ্বীনের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরবে। তোমরা এর উপর মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে থাকবে’ ( সুনানুত তিরমিযী ৫/৪৪, নং ২৬৭৬, ইমাম আত্-তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন, সুনান আবী দাউদ ৪/২০০, নং ৪৬০৭, সুনান ইবন মাজাহ ১/১৫, নং ৪২, আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছে )।
গ. আস-সুন্নাহ হলো, ন্যায়-নিক্তি ও ন্যায়ের মানদণ্ড, যার মাধ্যমে কারা দ্বীনের প্রকৃত অনুসারী আর কারা দ্বীনের অনুসারী নয়, তা যথাযথ ও সুক্ষভাবে নির্ণয় করা যায়। অধিকন্তু সুন্নাহ হলো আকীদাহ-বিশ্বাস, আখলাক-চরিত্র, মু’য়ামেলাত, লেন-দেন ও বিধি-বিধানের মূলনীতি। একইভাবে সুন্নাহ হলো মধ্যপন্থী শারী’আত ও জীবন আদর্শ। মহান বিধানদাতা আল্লাহ সুবাহনাহু বলেন,
{وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا }
“আর এভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী জাতি করেছি; যেন তোমরা মানুষের জন্য সাক্ষী হও এবং রাসূলও তোমাদের জন্য সাক্ষী হয়।” [সূরা আল বাকারা, আয়াত: ১৪৩]।
ঘ. আস-সুন্নাহ হলো, চির শ্বাস্বত সত্য, যা এবং যার অনুসারীরা কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে স্থায়ী থাকবে। যুগ, সময় ও স্থান-কাল পাত্র ভেদে যার কোনো ক্ষয় নেই। যার হারিয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। বিশিষ্ট সাহাবী সাওবান (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ، لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَهُمْ، حَتَّى يَأْتِي أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَذَلِكَ
আমার উম্মাতের একটি দল সত্যের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে। কেউ তাদেরকে অপদস্থ করে তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহর নির্দেশ আসা পর্যন্ত এভাবেই তারা তাদের অবস্থার উপর টিকে থাকবে (সহীহ মুসলিম ৩/১৫২৩, নং ১৯২০, সহীহুল বুখারীতেও শব্দের পার্থক্য সহকারে বর্ণিত আছে, ৪/২০৭, নং ৩৬৪০)।
ঙ. আস্-সুন্নাহ ও আল-হাদীস হলো সকল যুগ ও স্থান এবং সকল মানুষের জন্যই সুস্থ ও সুন্দর স্বভাব-প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
{فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا }
“তুমি একনিষ্ঠ হয়ে নিজেকে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত কর। আল্লাহর প্রকৃতির অনুসরণ কর, যে প্রকৃতির উপর আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আর-রূম, আয়াত: ৩০]
৬- সাধারণভাবে আস্-সুন্নাহ অনযায়ী জীবনযাপনকারী এবং সুন্নাহর বাস্তবায়নকারীদেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখা, যারা রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ, হাদীস ও আদর্শ অনুসরণ করে ও বাস্তবায়ন করে তাদেরকে সম্মানের চোখে দেখা। বিশেষ করে তাদের মধ্যে নিষ্ঠাবান ‘আলিমদেরকে আরো বেশি মর্যাদা দান করা এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করা। আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে মুসলিম উম্মাহর উজ্জ্বল নক্ষত্র বানিয়েছেন। তারা আলোকবর্তীকা হিসাবে মানুষের মধ্যে বিচরণ করেন। তারা নবী ও নবুওয়াতের বিশ্বস্ত আমানতদার এবং ‘ইলমের উত্তরাধিকারী।
উম্মাহর প্রতি তাদের অধিকার আরো তীব্রভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়; যেহেতু তারাই হাদীস ও সুন্নাহকে পুনর্জীবিত করেন। মূর্খতার কালের গর্ভে দ্বীনের যেসব নিদর্শন, রীতি-নীতি ও ঐতিহ্য বিলীন হয়ে যায়, সঠিক সংস্কারের মাধ্যমে তারাই পুনরায় তা চালু করেন। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য যাবতীয় কাজ, কর্ম, আখলাক-চরিত্র সম্পর্কে তারাই অধিক জ্ঞাত। জ্ঞান চর্চা ও জ্ঞান বিতরণের ক্ষেত্রে তারাই আল্লাহর রাসূলের (সা) অধিক নিকটবর্তী। অনুরূপভাবে তারা রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদেরকে গভীরভাবে ভালোবাসেন। তাদের নিকট থেকে জ্ঞান, ‘আমল অনুধাবন ও আচরণসহ সকল দিক থেকেইে আস্-সুন্নাহ ও হাদীস গ্রহণ করেছেন।
মানুষের মাঝে তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। তারাই আল- কুরআন, আস্-সুন্নাহ ও ইজমা’ এর নিদর্শনকে সুউচ্চে তুলে ধরেছেন। এর উপরই শিষা-ঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধভাবে দ্বীনের হিফাযাত করেছেন। দ্বীনকে সকল ভ্রষ্টতা, বিশৃংখলা, মতানৈক্য, বিভ্রান্তি ইত্যাদি প্রকারের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দান করেছেন। দ্বীন ও সুন্নাহর প্রতিরক্ষায় নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগের নজরানা পেশ করেছেন। বিজ্ঞ ‘আলিমগণের এই মহান অবদান ও কৃতিত্বের কারণেই আল-ফুযাইল ইবন ‘ইয়ায বলেন,
مَا أَحَدٌ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ إِلا وَفِي وَجْهِهِ نَضْرَةٌ لِقَوْلِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: نَضَّرَ اللَّهُ امْرَأَ سَمِعَ مِنَّا حَدِيثًا
আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে উজ্জ্বলতা দান করুন। যে আমাদের নিকট থেকে হাদীস শুনেছে’, রাসূলুল্লাহর (সা) এ দু’আর কারণেই আহলুল-‘ইলম বা হাদীসের অনুসারীদের চেহারায় সজীবতা বিরাজ করে (আয-যাহাবী, মু’জামুশ শুয়ূখ ১/১৩৩)।
অপরদিকে ইমাম শাফি’ঈ বলেন,
إِذَا رَأَيْتُ رَجُلاً مِنْ أَصْحَابِ الحَدِيثِ، فَكَأَنِي رَأَيْتُ رَجُلاً مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، جَزَاهُمُ اللهُ خَيْراً، فَهُم حَفِظُوا لَنَا الْأَصْلَ، فَلَهُمْ عَلَيْنَا فَضْلٌ.
আমি আসহাবুল হাদীসের কোনো ব্যক্তিকে যখন দেখি, আমার তখন মনে হয় আমি যেন রাসূলুল্লাহর (সা) কোনো সাহাবীকে দেখছি। আল্লাহ তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দান করুন! তারা আমাদের জন্য আসল বস্তু (হাদীস ও সুন্নাহ) সংরক্ষণ করেছেন। আমাদের প্রতি তাদের অনুগ্রহ রয়েছে’ (সিয়ার আ’লামিন নুবালা ১০/৬০, হিলইয়াতুল আওলিয়া ৯/১০৯)।
তাই মুসলিমগণ যারা, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালবাসা পোষণ করেন তাদের আহলুস সুন্নাহ ও হাদীসের উপর ‘আমলকারীদেরকে ভালোবাসা, ভক্তি করা, সম্মান করা এবং শ্রদ্ধা করা উচিৎ। তাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধভাব ও আচরণ লালন করে দ্বীন ইসলামের উপর টিকে থাকার চিন্তা অবান্তর।
পক্ষান্তরে তাদেরকে আল-কুরআন ও আস-সুন্নাহর অনুসারী ও বাস্তবায়নকারীদের পাশ কাটিয়ে ভ্রান্ত ও গোমরাহের পথ-পদ্ধতি অনুসরণকারীদের সাথে কোনোভাবেই সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না। ধর্ম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজনীতি, রাজনীতি ও অথীনীতির ক্ষেত্রে বিপথ গামী লেখক, সাহিত্যিক, কবি, শিল্পী, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, সমাজ বিজ্ঞানী এবং এই বিশ্বাস ও চরিত্রের অধিকারীদের সাথে সুসম্পর্ক ও সদ্ভাব বজায় রাখা উচিৎ নয়। তবে তাদের ভুল চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস ও কর্ম থেকে ফিরিয়ে আনার সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করা কাম্য, যা করা অপরিহার্য। এ জন্য তাদেরকে পরিত্যাগ না করে উপদেশ প্রদানের মাধ্যমে এ বিভ্রান্ত গোষ্ঠীকে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার অব্যাহত চেষ্টা থাকা অত্যন্ত জরুরী।
সর্বদা ইসলাম, আল-কুরআন ও আস্-সুন্নাহর বিজ্ঞ ‘আলিমগণের পক্ষাবলম্বন করে দ্বীনের ও তাদের প্রতিরক্ষার জন্য বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করা অত্যাবশ্যক। তাদের প্রতি গভীর ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রদ্ধাভরে তাদের পাশে থাকা, সঙ্গ দেওয়া, উপদেশ দেওয়া কর্তব্য। তাদের বৈঠকে আসা যাওয়া করা এবং তাদের প্রতি আস্থাবান থাকা ঈমানের দাবী। কারণ তাদের কাছে আছে নবী-রাসূলগণের শিক্ষা, জ্ঞান ও ‘আমল।
৭- রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনী ও সীরাতগ্রন্থ বেশি বেশি অধ্যয়ন করা, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হওয়ার আরেকটি উপায় হলো, তার জীবন চরিত ও সীরাতগ্রন্থগুলো বেশি বেশি অধ্যয়ন করা। তার জীবন, আচার-আচরণ, কথা-বার্তা, কাজ-কর্ম, আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য তার প্রানান্তকর চেষ্টা করা, চূড়ান্ত জিহাদে অংশ গ্রহণ করা, ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র কায়েমের আন্দোলনে শারীক হওয়া ও দ্বীনকে পরিপূর্ণরূপে কায়েম করা, আল্লাহর দ্বীন ও শরী’য়াতকে স্থান-কাল, পাত্র নির্বিশেষে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞান অর্জন করা অত্যাবশ্যক। একইসাথে নবী জীবনের পাশাপাশি তার পরিবার-পরিজন, আহল বাইত ও সাহাবায়ে কিরামগণের জীবন আচার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করাও অতীব জরুরী।
অন্যদেরকেও তাদের জীবন চরিত শিক্ষা দেওয়া। কেননা তাদের জীবনীর মাধ্যমে দ্বীন ও রাসূলুল্লাহর (সা) জীবন ও চরিত্রের সঠিক ও বাস্তব চিত্র দিনের আলোর মতো উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। তাই প্রতিদিন নিয়মিত তাদের জীবনী ও সীরাত অধ্যয়নের ফলে মনের মধ্যে ইসলাম, দ্বীন ও নবীর প্রতি ভালোবাসার সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ আছে। মনের গ্লানি ও কালিম মুছে যাওয়ার এক মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। কলুষিত অন্তর পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর হয়ে উঠে। শাকীক আল-বালখী বলেন, বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ‘আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাককে জিজ্ঞাসা করা হলো,
إِذَا أَنْتَ صَلَّيْتَ لِمَ لا تَجْلِسُ مَعَنَا ؟ قَالَ : أَجلِسُ مَعَ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ، أَنْظُرُ فِي كُتُبِهِم وَآثَارِهِمْ، فَمَا أَصْنَعُ مَعَكُمْ؟ أَنْتُم تَغْتَابُوْنَ النَّاسَ
আপনি সালাত শেষ করে আমাদের সাথে কেন বসেন না? তিনি উত্তরে বলেন, আমি সাহাবী ও তাবি’ঈগণের সাথে বসি। তাদের কিতাবাদি ও বই পুস্তুক পাঠ করি। তোমাদের সাথে বসে কি লাভ হবে? তোমরা তো মানুষের গীবত- নিন্দা চর্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকো (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৮/৩৯৮)।
৮- রাসূলুল্লাহর (সা) দুশমনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টির আরেকটি উপায় হচ্ছে, তার সকল প্রকার ও ধরনের দুশমনদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং তাদেরকে প্রতিরোধ করা। আল্লাহ তা’আলা, তাঁর দ্বীন ও রাসূল (সা) এর বিরুদ্ধে অবস্থানগ্রহণকারী স্বার্থান্বেষী, মুনাফিক, প্রাচ্য ও প্রতিচ্যের যেসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠী গণমাধ্যম, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইত্যাদির মাধ্যমে মুসলিম জাতির ঈমানী অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া এবং আল্লাহ তা’আলা, তাঁর দ্বীন ও তাঁর রাসূলের (সা) নাম নিশানা মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে যে যুদ্ধ ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করা। আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর রাসূলের (সা) পক্ষে কঠিন ইস্পাতের মতো শক্ত বুহ্য রচনা করে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং সার্বিক প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া। এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা সৃষ্টি হতে পারে। আল্লাহর রাসূল (সা) এর প্রিয় সাহাবীগণ নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবনকে বাজি রেখে তাদের প্রিয় রাসূলকে সুরক্ষা দিয়েছেন। তার শত্রুদের মোকাবেলায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তো মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ তা’আলার নিকট থেকেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেয়েছিলেন। এতদ সত্বেও রাসূলুল্লাহ (সা) মুশরিকদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য সাহাবীদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। বিশিষ্ট সাহাবী আনাস ইবন মালিক (রা) সে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন,
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَفْرِدَ يَوْمَ أُحُدٍ فِي سَبْعَةٍ مِنَ الْأَنْصَارِ وَرَجُلَيْنِ مِنْ قُرَيْشٍ، فَلَمَّا رَهِقُوهُ، قَالَ: مَنْ يَرُدُّهُمْ عَنَّا وَلَهُ الْجَنَّةُ؟ أَوْ هُوَ رفيقي في الجنَّةِ، فَتَقَدَّمَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ، فَقَاتَلَ حَتَّى قُتِلَ، ثُمَّ رَهِقُوهُ أَيْضًا، فَقَالَ مَنْ يَرُدُّهُمْ عَنَّا وَلَهُ الْجَنَّةُ؟ أَوْ هُوَ رَفِيقِي فِي
الْجَنَّةِ، فَتَقَدَّمَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ، فَقَاتَلَ حَتَّى قُتِلَ، فَلَمْ يَزَلْ كَذَلِكَ حَتَّى قُتِلَ السَّبْعَةُ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِصَاحِبَيْهِ: مَا أَنْصَفْنَا أَصْحَابَنَا
উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) মাত্র ৭জন আনসার এবং ২জন কুরাইশ সাহাবী দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। যখন তারা (কাফিরগণ) তাকে ঘিরে ধরে, তখন তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের পক্ষ থেকে তাদেরকে প্রতিরোধ করবে তার জন্য জান্নাত রয়েছে’ অথবা ‘সে জান্নাতে আমার সঙ্গী হবে’।
তখন জনৈক আনসার সাহাবী এগিয়ে গেলেন এবং যুদ্ধ করতে করতে নিহত হলেন। কাফিরগণ পুনরায় তাকে ঘিরে ধরলে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের পক্ষ থেকে তাদেরকে প্রতিরোধ করবে তার জন্য জান্নাত রয়েছে’ অথবা ‘সে জান্নাতে আমার সঙ্গী হবে’। তখন জনৈক আনসার সাহাবী এগিয়ে গেলেন এবং যুদ্ধ করতে করতে নিহত হলেন। এভাবে ৭জনই নিহত হলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তার দু’জন সঙ্গীকে বলেন, ‘আমরা আমাদের সাথীদের সাথে ইনসাফ করলাম না’ (সহীহ মুসলিম ৩/১৪১৫, হা.নং ১৭৮৯ )।
রাসূলুল্লাহ (সা) কোনো এক যুদ্ধ থেকে মদীনা তায়্যেবায় ফেরার পথে বিরতীহীনভাবে সারা রাত পথ চলার ঘোষণা দিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) পথে ক্লান্তির কারণে নিজের বাহনে ঘুমিয়ে পড়েন। এ দৃশ্য দেখে তার একজন সাহাবী আবু কাতাদাহ (রা) ভাবলেন যে, ঘুমের কারণে তিনি হয়ত অসতর্ক অবস্থায় বাহন থেকে মাটিতে পড়ে যেতে পারেন। তাই সারাটি রাত তার বাহনের সাথে সাথে পথ চলতে থাকেন। তার আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়, সত্যি সত্যিই রাসূলুল্লাহ (সা) ঘুমের ঘোরে তিন তিনবার পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলে সঙ্গে সঙ্গে আবু কাতাদাহ প্রতিবারেই তাকে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেন। এ কারণে তাকে সারা রাত বিনিদ্র অবস্থায় রাসূলুল্লাহর (সা) বাহনের পাশে পাশে পথ চলতে হয়েছিল। শেষ বারে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করার সময় রাসূলুল্লাহ (সা) টের পান এবং তাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে, এই সাহাবী সারারাত তার সাথে এভাবে পথ চলেছে। তখন তিনি তার জন্য দু’আ করেন যে,
حَفِظَكَ اللَّهُ بِمَا حَفِظْتَ بِهِ نَبِيَّهُ
তুমি আল্লাহর নবীকে হিফাযত করার কারণে তিনি যেন তোমাকে হিফাযত করেন’ (সহীহ মুসলিম ১/৪৭২, হা.নং ৬৮১, আবু কাতাদাহ (রা) বর্ণিত )।
কাফির ও মুশরিকগণ নানাভাবে রাসূলুল্লাহকে (সা) নির্যাতন করেছে। এমন কি তারা কবিতার মাধ্যমেও তাকে কষ্ট দিতো। ইতোপূর্বে এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। মুশরিক কবিগণ রাসূলুল্লাহকে (সা) গালি গালাজ, ঠাট্টা বিদ্রুপ, উপহাস ও তীর্যকভাবে তিরস্কার করতো। রাসূলুল্লাহ (সা) তার কবি হাসান ইবন সাবিত (রা) কে শত্রুদের এই মৌখিক আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার নিমিত্তে ডাকেন এবং তাকে কবিতা দিয়ে
শত্রুদেরকে প্রতিরোধ করা এবং রাসূলুল্লাহর (সা) ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা, সম্মান ও তার আদর্শের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব দেন। তিনি তার উদ্দেশ্যে বলেন: اهْجُهُمْ أَوْ هَاجِهِمْ وَجِبْرِيلُ مَعَكَ ‘তুমি তাদেরকে তীর্যক তিরস্কার করে কবিতা বলো অথবা তাদের তিরস্কারের মোকাবেলা করো আর জিবরীল তোমার সাথে আছেন’ ( সহীহুল বুখারী ৪/১১২, হা.নং ৩২১৩, সহীহ মুসলিম ৪/১৯৩৩, হা.নং ২৪৮৬)।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, রাসূলুল্লাহ (সা), তার পরিবার-পরিজন এবং তার সাহাবীদের পক্ষে প্রতিরোধ করা এবং তাদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করার মধ্যে অনেক বড় কৃতিত্ব রয়েছে। প্রত্যেক মুসলিমের এ কৃতিত্ব ও সুউচ্চ মর্যাদা অর্জনের প্রবল আগ্রহ আবশ্যক। নিষ্ঠাবান মুসলিমদের আরো দায়িত্ব হচ্ছে, যেসব মানুষ রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ ও জীবনাদর্শ এবং তার সুন্নাহর অনুসারী ও আদর্শের পতাকাবাহীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাদের নামে বিষোদাগার করে তাদেরকে সাবধান করা। তাদের মুখোশ উন্মোচন করে দেওয়া; যাতে করে তাদের ছড়ানো সন্দেহ- সংশয়ের বিষ-বাষ্প মানুষের মধ্যে ছড়াতে না পারে, মানুষেরা সংক্রমিত না হয়। অপরদিকে সাধারণ মুসলিমদেরকেও এসব দুশমনদের ব্যাপারে সাবধান করা। এসব ব্যক্তি, শ্রেণী ও গোষ্ঠীর বক্তব্য, লেখনী ও বই-পুস্তকের ব্যাপারে মুসলিমদেরকে সতর্ক করাও অপরিহার্য। মহান আল্লাহ তা’আলা যারা তাঁর দ্বীন ও তাঁর নবী-রাসূলগণ এবং যুগে যুগে নিষ্ঠার সাথে যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছেন, তাদেরকে অবশ্যই রক্ষা ও সাহায্য করেন। তাদেরকে সুরক্ষা দান করেন। মহান আল্লাহ বলেন,
{وَلَيَنْصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ }
“আর আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৪০]।
আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন,
{إِنَّا لَتَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ}
“নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে এবং মু’মিনদেরকে সাহায্য করবো পার্থিব জীবনে এবং যে দিন সাক্ষিগণ দন্ডায়মান হবে।” [সূরা আল মু’মিন, আয়াত: ৫১]।
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণকে সাহায্য করার অর্থ হলো, তাঁর মনোনীত সত্য দ্বীন ও জীবন পদ্ধতিকে সাহায্য করা এবং এ দ্বীনের প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠার দিকে মানুষকে আহ্বান করা। কারণ একমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তা’আলা তো তাঁর বান্দাদের সাহায্যের মুখাপেক্ষী নন। এই চরম সত্যটিকে আরো পরিষ্কার করার জন্য মহাবিজ্ঞ আল্লাহ সুবহানাহু নিশ্চয়তার সাথে আয়াতের শেষাংশে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন যে, ‘আল্লাহ অবশ্যই সর্বশক্তিমান, মহাপরাক্রমশালী’। তিনি কারো সাহায্য সহযোগিতার ধার ধারেন না বরং সকল কিছু তাঁরই মুখাপেক্ষী (সাইয়্যেদ কুতুব, ফী-যিলালিল কুরআন ৬/৩৪৯৫)।
আল্লাহ তা’আলার মনোনীত দ্বীনের সাহায্য এবং ইসলামের প্রতিরক্ষার অপরিহার্য দাবী হলো, সর্বকাল ও সকল স্থানে দ্বীন ইসলামের অনুসারী নিপীড়িত জনগোষ্ঠী, দ্বীন ইসলামকে বিজয়ী করার দৃঢ় প্রত্যয়ী মুজাহিদ এবং ইসলামী আন্দোলনের নিবেদিত প্রাণ কর্মীগণকে সাহায্য ও সহযোগিতা করা, তাদের মনোবল ও শক্তি-সামর্থ বৃদ্ধি করা, তাদের প্রতিরক্ষার জন্য সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যার যা আছে; জান, মাল, লেখনী, বক্তৃতা-বিবৃতি, প্রতিবাদ ইত্যাদি মাধ্যমকে ব্যবহার করে সত্য দ্বীনের পতাকাবাহীদেরক সাহায্য করা অত্যাবশ্যক। যাতে করে সর্ব প্রকারের পরিপূর্ণ সাহায্য সুনিশ্চিত হয় এবং এ জমিনে মুসলিম জাতির প্রভাব-প্রতিপত্তি, নেতৃত্ব ও শাসনব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন,
{وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِنْ بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ }
“আমি উপদেশের পর যাবুর কিতাবে লিখে দিয়েছি যে, আমার সৎকর্মশীল বান্দারা পৃথিবীর অধিকারী হবে।” [সূরা আল আম্বিয়া, আয়াত: ১০৫]।
৯- রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সর্বাবস্থায় সম্মান প্রদর্শন করা মান্য করা, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টির আরেকটি উপায় হলো, তাকে তার জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর সকল সময়ই সম্মান করা, তার আদেশ-নিষেধকে মান্য করা, শ্রদ্ধা করা। মনে প্রাণে ও গভীর অনুভূতিতে তার সকল কথা-বার্তা ও নির্দেশনাকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় নেওয়া। কথা-কাজ, আচার-আচরণ, চরিত্র-আখলাক মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগে নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও বিনয়ের সাথে কার্যকরী করা। বাস্তব জীবনের সর্বত্র এ কর্মগুলোকে প্রয়োগ করার নাম হলো রাসূলুল্লাহকে (সা) সাহায্য করা, সম্মান করা, ভক্তি করা, শ্রদ্ধা করা এবং মুহাব্বত করা। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
{إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا. لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا}
“আমরা আপনাকে সক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ঈমান পোষণ করো এবং তাকে (রাসূলকে) সাহায্য করো, সম্মান করো আর সকাল সন্ধ্যায় তাঁর (আল্লাহর) পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করো।” [সূরা আল ফাতহ, আয়াত: ৮-৯]।
১০- রাসূলুল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখা ও নিষেধাবলির প্রতি মনে গভীর সম্মানবোধ লালন করা, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার তৈরীর আরেকটি উপায় হলো, আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল (সা) কর্তৃক নির্ধারিত হুদুদ-সীমারেখা ও নিষেধাজ্ঞার প্রতি মনের গভীরে প্রচণ্ড ও সম্মানবোধ লালন করা। এই গভীর সম্মানবোধ অন্তরে অবশিষ্ট থাকলে তখনই কেবল সকল বাতিল, ভ্রান্ত ও অসত্য চিন্তা-চেতনা দর্শণ ও বিশ্বাস মুসলিমদের দেহ, অন্তর-মন ও মননশীলতা থেকে মুছে যাবে, দূরীভূত হবে। সকল প্রকার কুসংস্কার ও মিথ্যার ব্যাসাতি চিরতরে ম্লান হয়ে যাবে। মহিমান্বিত আল্লাহ সে সত্য বার্তাটি তুলে ধরে বলেন,
كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللهُ الْحَقَّ وَالْبَاطِلَ فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً وَأَمَّا مَا يَنْفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ
এভাবে আল্লাহ সত্য ও অসত্যের দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন; যা আবর্জনা, তা ফেলে দেওয়া হয় এবং যা মানুষের উপকারে আসে, তা জমিনে থেকে যায়, এভাবেই আল্লাহ উপমা দিয়ে থাকেন। [সূরা আর রা’দ, আয়াত: ১৭]।
আয়াতে সত্য ও সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিতদেরকে খাঁটি সুদৃঢ় স্থায়ী এবং বাতিল ক্ষণস্থায়ী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাই সত্য বিরোধীরা বাতিলকে পুঁজি করে সত্য ইসলামের বিরুদ্ধে যত হৈ-হাংগামা ও উপদ্রব সৃষ্টি করুক না কেন, তা পানির উপর ভাসমান ফেনা ও আবজর্নারাশির মতো, যা হয় শুকিয়ে যায়, না হয় ভেসে চলে যায়।
উপসংহার
মহান আল্লাহর অসংখ্য কৃতজ্ঞতা যে, তিনি তাঁর অপার অনুগ্রহ ও সাহায্যে ‘রাসূলুল্লাহর (সা) ভালোবাসায় সিক্ত যারা’, শিরনামে লিখিত বইটি সমাপ্ত করার তাওফীক দিয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ! বইটিতে ঈমানের অপরিহার্য অংশ হিসেবে কুরআন কারীম ও সুন্নাহর নির্দেশনার প্রেক্ষিতে ‘রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি কোনো পর্যায়ের ও কোনো মাত্রার ভালোবাসা থাকতে হয়, তার ভিত্তিতে সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলুল্লাহকে (সা) কি পরিমাণ ভালোবেসেছেন, তা, তার নিদর্শন, উদাহরণ প্রমাণসহ তুলে ধরা হয়েছে। বিষয় বস্তুর উপর সুবিচার করা, সুবিন্যস্ত করা ও তত্ত্ব-তথ্যগুলোকে প্রমাণ্য ও যথাযথ যুক্তি-প্রমাণ সাপেক্ষে সাবলীল ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিষয়টিকে উপস্থাপন করার নিমিত্তে বিষয়বস্তুকে চারটি অধ্যায়ে সুবিন্যস্ত করা হয়েছে;
প্রথম অধ্যায়, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার শার’য়ী মর্যাদা ও প্রতিদান। এ অধ্যায়ের অধীনে দু’টি পরিচ্ছেদ রয়েছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন। এ অধ্যায়ে পাঁচটি পরিচ্ছেদে পাঁচটি নিদর্শনের উপর সাহাবায়ে কিরামগণের জীবনী থেকে উদাহরণ পেশ করা হয়েছে।
তৃতীয় অধ্যায়, এ অধ্যায়ে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি বৈরীভাব ও অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে আর চতুর্থ অধ্যায়ে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টির উপায়সমূহ তুলে ধরা হয়েছে। সবশেষে উপসংহারের মাধ্যমে বইটির সমাপ্তি করা হয়েছে। সত্যানুসন্ধানী ও সত্যাশ্রয়ী শিক্ষার্থীদের একজন বিনয়ী শিক্ষার্থী হিসেবে পুরো বইটির তত্ত্ব ও তথ্যাবলি উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কুরআন কারীম, সহীহ সুন্নাহ, আ-সার, নির্ভরযোগ্য সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থ থেকে দলীল-প্রমাণাদির উপর নির্ভর করা হয়েছে। সহীহাইনের বাইরের হাদীসগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত হাদীসগুলোর মান উল্লেখ করার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে।
আলোচ্য বিষয়ের বিভিন্ন বিষয়বস্তুর প্রতি দলীল ভিত্তিক আলোচনার ক্ষেত্রে একজন লেখক হিসেবে নিজস্ব মতামতের ক্ষেত্রে কোনো বিজ্ঞজনের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও বোধের তারতম্যের কারণে কিছু কথা থাকলে থাকতেও পারে। সেক্ষেত্রে লেখক হিসেবে আমি আল্লাহ তা’আলার কাছে দু’আ করি, তথ্যের আলোকে আমি নিজের মত করে যা বলেছি, তা যেন সঠিক ও পাঠকের জন্য উপকারী হয়। নিতান্তই না হলে, দয়ালু আল্লাহ যেন পাঠকের অন্তর থেকে সে কথাটি মুছে দেন বা ভুলিয়ে দেন।
রাসূলুল্লাহর (সা) ভালোবাসায় সিক্ত যারা’ বিষয়ে বাংলা ভাষায় কোনো বই আছে বলে আমার জানা নেই। আমার শিক্ষক প্রফেসর ড. ফাযল ইলাহী, আল-ইমাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদ-সৌদী ‘আরব কর্তৃক লিখিত ‘রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসা ও এর নিদর্শন’ নামে ‘আরবীতে ছোট একটি বই আছে। তথ্যের সুত্র হিসেবে সে বইটি আমার লেখার ক্ষেত্রে কাজে লেগেছে। করুণাময় আল্লাহ তাকে জাযায়ে খাইর দান করুন! বিন্দু প্রকাশনী আমার এ বইটি প্রকাশ করার দায়িত্ব নিয়ে আমার প্রতি ইহসান করেছে। এ প্রকাশনীর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে যেন আল্লাহ তা’আলা উত্তম পুরস্কার দান করেন! যেহেতু বইটির সকল তত্ত্ব-উপাত্ত নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নিয়ে বিষয়বস্তুকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাই এ বইটি তথ্যবহুল ও তথ্য সমৃদ্ধ বইসমূহের একটি নগন্য প্রয়াস বলে আমি মনে করি। আল-কুরআন ও আস্-সুন্নাহর ভিত্তিতে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার মাত্রা হচ্ছে, নিজ জীবন, সম্পদ, সন্তানাদি এক কথায় সবকিছুর চেয়ে তাকে অধিক ভালোবাসা। আবার এ ভালোবাসার দাবী হচ্ছে, রাসূলুল্লাহর (সা) নিরঙ্কুশ আনুগত্য করে তার আদেশ ও নিষেধ মান্য করা এবং যে কোনো মূল্যে তার অনুসরণ করা, তার দ্বীন, শরী’য়াত ও জীবন আদর্শের প্রচার-প্রসার ও প্রতিষ্ঠা করা এবং তার ও তার পূর্ণাঙ্গ সুন্নাত ও জীবন আদর্শের সুরক্ষা করা ও দুশমনদেরকে প্রতিরোধ করা এবং প্রতিরক্ষায় জীবন ও সম্পদসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু উজাড় করে দেওয়া। সাহাবায়ে কিরাম (রা) মুসলিম উম্মাহর সামনে এ সব বিষয়ে যথাযথ ও সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করেছেন এবং এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছেন। তাদের ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত উজ্জ্বল সেসব দৃষ্টান্ত এ বইটির প্রতিটি পাতায় পাতায় পাঠকগণ দেখতে পাবেন। আমি বিশ্বাস করি যে, পূর্ণতা শুধুমাত্র আল্লাহর, মানুষ হিসেবে আমার লেখায় কমতি থাকা সত্ত্বেও নিষ্ঠাবান পাঠকবৃন্দ এ বইটিতে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা সৃষ্টি এবং এর কাঙ্খিত অনিবার্য দাবী পুরণের অনেক উৎসাহ ও ঈমানী তাকীদ অনুভব করবেন, ইনশা আল্লাহ। বইটির সফলতার সবটুকু কৃতিত্ব ও অনুগ্রহ মহান রাব্বুল ‘আলামীনের। কোনো ত্রুটি হয়ে থাকলে জ্ঞানের জগতের এক অতি নগন্য ছাত্র হিসেবে, তা আমারই দায়-দায়িত্ব। পরমকরুণাময় আল্লাহ যেন ক্ষমা করে দেন। অসীম দয়াময় আল্লাহর কাছে বিনীতভাবে দু’আ করি যে, তিনি যেন বইটি থেকে বাংলা ভাষা-ভাষী মুসলিম নারী-পুরুষ ও পাঠকদেরকে উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান করেন! আমীন!!!
وَصَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلَى نَبِيِّنَا وَرَسُولِنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ وَسَلَّمَ